সামান্য পিঠের ব্যথা নিয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছিলেন ষাটোর্ধ্ব অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসক তাঁর ব্যবস্থাপত্রে বা প্রেসক্রিপশনে একে একে ৯টি ওষুধের নাম লিখে দেন। এর মধ্যে ছিল দুই ধরনের কড়া ব্যথানাশক, দুটি গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, একটি উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক, দুটি ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট, একটি ঘুমের ওষুধ এবং একটি পেশি শিথিলকারী বা রিল্যাক্সেন্ট। তিনি যখন চিকিৎসকের চেম্বার থেকে বের হলেন, তখনই দরজার সামনে ওত পেতে থাকা বিভিন্ন নামী-বেনামী ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা তাঁর ব্যবস্থাপত্রটির একটি আলোকচিত্র বা ছবি তোলার জন্য রীতিমতো জোরাজুরি শুরু করে দেন। আমজাদ হোসেনের সাথে থাকা তাঁর ছেলে আসিফ ইকবালের মনে তখন এক বড় খটকা ও ক্ষোভের জন্ম নেয়। তাঁর ভাষায়, সামান্য পিঠ ব্যথার জন্য একজন মানুষের ৯টি ভিন্ন ভিন্ন ওষুধ কেন লাগবে? তার চেয়ে বড় কথা, শরীরে কোনো ধরনের জ্বর বা সংক্রমণের লক্ষণ না থাকা সত্ত্বেও কেন এমন উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলো? আমরা কি হাসপাতালে সুচিকিৎসা নিতে এসেছি, নাকি কোনো কর্পোরেট ব্যবসার অংশ হয়ে গেছি?
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এই চিত্রটি বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্য খাতের একটি নিত্যদিনের নির্মম ও তিতা বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। সরকারের মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থার চরম গাফিলতি, প্রচলিত আইনের নানা ফাঁকফোকর, দুর্বল নজরদারি ব্যবস্থা এবং ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর অনৈতিক বিপণন বা বাজারজাতকরণ কৌশলের কারণে দেশের সাধারণ রোগীরা আজ ‘প্রেসক্রিপশন বাণিজ্যের’ জাঁতাকলে পড়ে প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবনের ফলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়ছে, অন্যদিকে তেমনি তাদের পকেট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হচ্ছে। এর চেয়েও বড় ক্ষতি হচ্ছে যে, এই অসুস্থ বাণিজ্যের কারণে পবিত্র চিকিৎসাপেশা এবং চিকিৎসকদের ওপর থেকে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থার জায়গাটি ধসে পড়ছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অন্যতম গর্বের জায়গা এই ওষুধশিল্পকে যদি দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে হয়, তবে অনতিবিলম্বে বাজারের এই অনৈতিক প্রতিযোগিতা ও লেনদেন বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর এক চরম আস্থার সংকট তৈরি হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
স্বাস্থ্য খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমানে দেশের সিংহভাগ চিকিৎসাপত্র বা প্রেসক্রিপশন সনাতন পদ্ধতিতে কাগজে হাতে লেখা হয়। ফলে কোনো একজন নির্দিষ্ট চিকিৎসক কত ধরনের বা কত মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক লিখছেন, কোন বিশেষ কোম্পানির ওষুধ রোগীদের বেশি দিচ্ছেন কিংবা মূল চিকিৎসা নির্দেশিকার বাইরে গিয়ে কতটা অপ্রয়োজনীয় প্রেসক্রিপশন তৈরি হচ্ছে—সে বিষয়ে সরকারের কাছে কেন্দ্রীয় কোনো তথ্যভাণ্ডার বা স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ব্যবস্থা নেই। এই কেন্দ্রীয় নজরদারির অভাবে চিকিৎসকদের এমন অনৈতিক কার্যক্রম বা অনিয়ম সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক সাম্প্রতিক চাঞ্চল্যকর গবেষণা থেকে জানা গেছে, আমাদের দেশে হাসপাতালে ভর্তি থাকা একজন রোগীর মোট চিকিৎসা ব্যয়ের সর্বোচ্চ ২৬ শতাংশ খরচ হয় শুধুমাত্র ওষুধ কেনাকাটায়, আর প্রায় ১৭ শতাংশ অর্থ চলে যায় বিভিন্ন ধরনের রোগনির্ণয় বা ল্যাবরেটরি পরীক্ষায়। দেশের একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রতি মাসে গড়ে চিকিৎসাবাবদ ব্যয় হয় তিন হাজার ৪৫৪ টাকা, যা তাদের মোট পারিবারিক আয়ের প্রায় ১১ শতাংশের সমান। গবেষকদের মতে, এই আকাশচুম্বী ব্যয়ের কারণে দেশের বহু দরিদ্র মানুষ অর্থের অভাবে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও জীবনের শেষ মুহূর্তে এসেও কোনো সুচিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পান না।
আমাদের দেশে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদন, বাজারজাতকরণ এবং এর মান নিয়ন্ত্রণের একমাত্র রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হলো ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। তবে দেশের এই বিশাল ওষুধ বাজার এবং বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় এই সংস্থার মাঠপর্যায়ের জনবল ও তদারকি ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত। ল্যাবরেটরিতে ওষুধের মান পরীক্ষার ধীরগতির কারণে একদিকে যেমন দেশের বাজারে নিম্নমানের বা ভেজাল ওষুধ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে, ঠিক তেমনি ওষুধ কোম্পানিগুলোর অনৈতিক বিপণন কার্যক্রমের ওপরও এই অধিদপ্তর কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নিতে পারছে না। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মূল মনোযোগ থাকে শুধু নতুন ওষুধের লাইসেন্স প্রদান এবং কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপর। কিন্তু বাজারে আসার পর সেই ওষুধগুলো কিভাবে চিকিৎসকদের মাধ্যমে সাধারণ রোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কিংবা চিকিৎসকদের কোনো অনৈতিক সুবিধা দিয়ে প্রভাবিত করা হচ্ছে কি না—সেসব বিষয়ে তাদের নজরদারি নেই বললেই চলে।
বায়োমেডিক্যাল গবেষকেরা বলছেন, বাজারে কোনো নতুন ওষুধ আসার পর তার ব্যবহার, প্রকৃত কার্যকারিতা এবং সম্ভাব্য অনিয়ম সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য ‘পোস্ট মার্কেটিং মনিটরিং’ বা বাজার-পরবর্তী নজরদারি ব্যবস্থা অত্যন্ত জোরদার করা প্রয়োজন। চিকিৎসক এবং ওষুধ কোম্পানির মধ্যকার এই স্বার্থের সংঘাতই মূলত রোগীদের প্রেসক্রিপশনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে থাকে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উচিত সাধারণ ও প্রেসক্রিপশন ছাড়া পাওয়া যায় এমন ওষুধের তালিকা নিয়মিত প্রকাশ করা, ওষুধের মূল জেনেরিক নাম বা উপাদানের নামসহ বাজারে থাকা সমস্ত ওষুধের তথ্য প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওষুধের চটকদার বিজ্ঞাপন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা। দেশের পুরো চিকিৎসাব্যবস্থাকে রোগী এবং ভোক্তাকেন্দ্রিক করে গড়ে তুলতে পারলেই কেবল সেবার প্রকৃত মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব।
যদিও দেশে ওষুধ খাত নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘ওষুধ আইন ২০২৩’ কার্যকর রয়েছে এবং এই আইনে ভেজাল বা নিম্নমানের ওষুধ তৈরির জন্য অত্যন্ত কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, তবুও আইনের কিছু ফাঁকফোকরের কারণে এই অদৃশ্য বাণিজ্য বন্ধ করা যাচ্ছে না। ১৯৪০ সালের পুরনো ড্রাগস অ্যাক্ট এবং পরবর্তী সময়ে প্রণীত বিভিন্ন নীতিমালায় ওষুুধের অনৈতিক প্রচারণার ওপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ নেই। দেশে ‘কোড অফ ফার্মাসিউটিক্যাল মার্কেটিং প্র্যাকটিসেস’ নামের একটি চমৎকার লিখিত নীতিমালা রয়েছে, যা ওষুধ কোম্পানিগুলোর প্রচারণার একটি নির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। এই জাতীয় নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো চিকিৎসককে কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে নগদ অর্থ, কোনো দামি উপহার সামগ্রী কিংবা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো সুবিধা দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি ও নিষিদ্ধ।
কিন্তু নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অভিযোগ না এলে তারা সাধারণত স্বপ্রণোদিত হয়ে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেন না। তাছাড়া ওষুধ কোম্পানি এবং চিকিৎসকদের মধ্যকার এই অনৈতিক ‘লেনদেন’ বা চুক্তির কোনো লিখিত প্রমাণ বা দলিল না থাকায় প্রচলিত আইনে এই অদৃশ্য ও গোপন বাণিজ্য বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল এবং ঔষধ প্রশাসনের কাছে প্রায়ই মৌখিক বা লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নজির অত্যন্ত বিরল।
এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেশের একটি শক্তিশালী ‘স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর’ প্রচণ্ড রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবকে দায়ী করা হয়েছে। বাংলাদেশের ওষুধশিল্প এখন দেশের অন্যতম একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক খাত, যা দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ মেটানোর পাশাপাশি বিশ্বের বহু উন্নত দেশে সুনামের সাথে ওষুধ রপ্তানি করছে। এই বিশাল অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে ওষুধ খাতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কোম্পানি মালিকদের শীর্ষ সংগঠন ‘বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতি’র একচ্ছত্র প্রভাব রয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, দেশের চিকিৎসকদের বড় বড় সংগঠন বা প্রভাবশালী অ্যাসোসিয়েশনগুলোর বার্ষিক জমকালো সম্মেলন, বৈজ্ঞানিক সেমিনার, এমনকি চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত বা সপরিবারে বিনোদন সফরের সম্পূর্ণ খরচ পর্দার আড়াল থেকে এই ওষুধ কোম্পানিগুলোই বহন করে থাকে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে অনৈতিক বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠলেও রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাবে তা খুব দ্রুত ধামাচাপা পড়ে যায়।
এই প্রেসক্রিপশন বাণিজ্যের সবচেয়ে মারাত্মক ও ক্ষতিকর দিকটি প্রকাশ পাচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ও অপব্যবহারের মাধ্যমে। সাধারণ জ্বর, সর্দি কিংবা কাশির মতো সাধারণ ও উপশমযোগ্য রোগেও চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ রোগীদের উচ্চমাত্রার ও দামি অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন করছেন। কোনো ধরনের ল্যাবরেটরি বা কালচার রিপোর্ট ছাড়াই এভাবে নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে মানুষের শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলো ক্রমান্বয়ে এই ওষুধের বিরুদ্ধে এক অভেদ্য প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যেই সতর্কবার্তা জারি করেছে যে, এই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলা আগামী দিনের মানব সভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যসংকট হতে চলেছে এবং বাংলাদেশে এই নীরব ঘাতক সংকটটি ইতিমধ্যে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, কোনো রোগীর একটি মূল বা নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসার জন্য যদি তিনটির বেশি ওষুধ দেওয়া হয়, তবে তাকে অনেক সময় ‘অপ্রয়োজনীয় ওষুধ’ বা অযৌক্তিক প্রেসক্রিপশন হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে একজন সাধারণ রোগীর গড় প্রেসক্রিপশনে ওষুধের সংখ্যা থাকে চার থেকে পাঁচটি, যা বিশ্বের যেকোনো উন্নত দেশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই কারণে রোগীর শরীরে একসাথে একাধিক ওষুধের পারস্পরিক রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, যার ফলে রোগীর লিভার এবং কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে এগুলো বিকল হয়ে যায়। স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি এর একটি বড় দিক হলো মারাত্মক আর্থিক ক্ষতি। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতের মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৮ শতাংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে মেটাতে হয়। ফলে অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত ওষুধ কিনে অকারণে অর্থ ব্যয়ের কারণে দেশের বহু নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক পরিবার ঋণের জালে জড়িয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দেশের ওষুধশিল্পে স্বচ্ছতা এবং চিকিৎসা পেশায় নৈতিকতা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ক্যাবের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কাগজে-কলমে আইন করে বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে এই গভীর সংকট দূর করা যাবে না; এর জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক নীতিগত সংস্কার এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার। বাজারে নিজেদের কোম্পানির ওষুধ বেশি বেশি লেখানোর জন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে যে এক অসুস্থ ও অনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে, তা এখন ওপেন সিক্রেট বা প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় বিক্রয় প্রতিনিধি এবং চিকিৎসকদের একটি অংশ সরাসরি জড়িয়ে পড়েছেন, যা এক স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত। চিকিৎসকদের উপহার থেকে শুরু করে নগদ অর্থ দেওয়ার এই যে কালচার শুরু হয়েছে, তা থেকে সাধারণ রোগীদের রেহাই দিতে সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের কঠোর বাস্তবায়ন দরকার এবং এই কাজের মূল দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকেই নিতে হবে। চিকিৎসা খাতকে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিকীকরণ থেকে বাঁচাতে পুরো ব্যবস্থাটিকে প্রযুক্তির চাদরে ঢেকে ফেলা এখন সময়ের দাবি।
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশ, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী ভারতের কিছু রাজ্যেও ওষুধ বিপণন ও প্রেসক্রিপশন নিয়ন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট ও কঠোর ব্যবস্থা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ‘ফিজিসিয়ান পেমেন্টস সানশাইন অ্যাক্ট’-এর মতো অত্যন্ত স্বচ্ছ আইন রয়েছে। এই আইন অনুযায়ী কোনো ওষুধ কোম্পানি যদি কোনো চিকিৎসককে সামান্যতম কোনো উপহার, দুপুরের খাবারের খরচ কিংবা গবেষণার জন্য অর্থ প্রদান করে, তবে তা একটি কেন্দ্রীয় সরকারি ওয়েবসাইটে জনগণের সামনে প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশকে যদি এই সংকট থেকে বাঁচতে হয়, তবে অবশ্যই এই আধুনিক পথে হাঁটতে হবে। চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনে ওষুধের কোনো নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক বা ব্র্যান্ডের নাম লেখার পরিবর্তে মূল রাসায়নিক বা জেনেরিক নাম লেখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এটি সফলভাবে করা গেলে ওষুধ কোম্পানিগুলোর চিকিৎসকদের পেছনে কোটি কোটি টাকা ঢালার প্রবণতা এক ধাক্কায় চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে, কারণ তখন চিকিৎসক নির্দিষ্ট কোনো ব্র্যান্ডের প্রচার করতে পারবেন না। দেশের ওষুধশিল্পের শীর্ষ সংগঠনের নেতারাও স্বীকার করছেন যে, কোম্পানিগুলোর মোট টার্নওভার বা আয়ের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ অনৈতিক বিপণনে ব্যয় করার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে, তা বন্ধে ‘বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতি’কেই সবচেয়ে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
এই অনৈতিক চর্চা বন্ধে দেশের চিকিৎসা খাতকে সম্পূর্ণ কাগজের আড়াল থেকে বের করে এনে ডিজিটাইজ করা এখন অত্যন্ত জরুরি। দেশের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ‘ই-প্রেসক্রিপশন’ বা ইলেকট্রনিক চিকিৎসাপত্র ব্যবস্থা চালু করতে হবে। চিকিৎসক যখন একটি বিশেষ সফটওয়্যার বা কম্পিউটারের মাধ্যমে প্রেসক্রিপশন তৈরি করবেন, তখন সেটি সরাসরি একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারে জমা থাকবে। কোনো চিকিৎসক যদি নির্দিষ্ট কোনো রোগের জন্য আন্তর্জাতিক চিকিৎসা গাইডলাইনের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ওষুধ বা অপ্রয়োজনীয় উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক লেখেন, তবে সেই সফটওয়্যারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি লাল সংকেত বা ‘অ্যালার্ট’ দেবে। এতে চিকিৎসকদের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এবং কোনো কোম্পানি তাদের প্রভাবিত করতে পারবে না। পাশাপাশি আইন করে চিকিৎসকদের জন্য ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে নেওয়া যেকোনো আর্থিক সুবিধা বা স্পনসরশিপের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। রোগীদেরও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে রোগীকে প্রশ্ন করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
অবশ্য সরকারের ঔষধ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে, দেশের ওষুধ খাতের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং যেকোনো ধরনের অনীহা ও অনৈতিক চর্চা প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে তাদের কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনিক তৎপরতা চলমান রয়েছে। ওয়ান স্টপ মনিটরিং নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে সারা দেশে জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্বে জেলা পর্যায়ে একটি করে শক্তিশালী ‘অ্যাকশন কমিটি’ কাজ করছে। কোনো অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য ও লিখিত অভিযোগ এলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সাথে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, একজন রোগীর চিকিৎসাপত্র বা প্রেসক্রিপশন দেশের প্রচলিত আইনে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং একটি অত্যন্ত গোপনীয় নথি। রোগী নিজে না চাইলে বা অনুমতি না দিলে এই তথ্য অন্য কারো দেখার কিংবা জানার কোনো আইনগত অধিকার নেই। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যদি দেখা যায় কোনো নির্দিষ্ট সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে এই গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘন করে রিপ্রেজেন্টেটিভরা ছবি তুলে রোগীদের হয়রানি করছে, তবে সেই হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬
সামান্য পিঠের ব্যথা নিয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছিলেন ষাটোর্ধ্ব অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসক তাঁর ব্যবস্থাপত্রে বা প্রেসক্রিপশনে একে একে ৯টি ওষুধের নাম লিখে দেন। এর মধ্যে ছিল দুই ধরনের কড়া ব্যথানাশক, দুটি গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, একটি উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক, দুটি ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট, একটি ঘুমের ওষুধ এবং একটি পেশি শিথিলকারী বা রিল্যাক্সেন্ট। তিনি যখন চিকিৎসকের চেম্বার থেকে বের হলেন, তখনই দরজার সামনে ওত পেতে থাকা বিভিন্ন নামী-বেনামী ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা তাঁর ব্যবস্থাপত্রটির একটি আলোকচিত্র বা ছবি তোলার জন্য রীতিমতো জোরাজুরি শুরু করে দেন। আমজাদ হোসেনের সাথে থাকা তাঁর ছেলে আসিফ ইকবালের মনে তখন এক বড় খটকা ও ক্ষোভের জন্ম নেয়। তাঁর ভাষায়, সামান্য পিঠ ব্যথার জন্য একজন মানুষের ৯টি ভিন্ন ভিন্ন ওষুধ কেন লাগবে? তার চেয়ে বড় কথা, শরীরে কোনো ধরনের জ্বর বা সংক্রমণের লক্ষণ না থাকা সত্ত্বেও কেন এমন উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলো? আমরা কি হাসপাতালে সুচিকিৎসা নিতে এসেছি, নাকি কোনো কর্পোরেট ব্যবসার অংশ হয়ে গেছি?
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এই চিত্রটি বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্য খাতের একটি নিত্যদিনের নির্মম ও তিতা বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। সরকারের মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থার চরম গাফিলতি, প্রচলিত আইনের নানা ফাঁকফোকর, দুর্বল নজরদারি ব্যবস্থা এবং ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর অনৈতিক বিপণন বা বাজারজাতকরণ কৌশলের কারণে দেশের সাধারণ রোগীরা আজ ‘প্রেসক্রিপশন বাণিজ্যের’ জাঁতাকলে পড়ে প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবনের ফলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়ছে, অন্যদিকে তেমনি তাদের পকেট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হচ্ছে। এর চেয়েও বড় ক্ষতি হচ্ছে যে, এই অসুস্থ বাণিজ্যের কারণে পবিত্র চিকিৎসাপেশা এবং চিকিৎসকদের ওপর থেকে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থার জায়গাটি ধসে পড়ছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অন্যতম গর্বের জায়গা এই ওষুধশিল্পকে যদি দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে হয়, তবে অনতিবিলম্বে বাজারের এই অনৈতিক প্রতিযোগিতা ও লেনদেন বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর এক চরম আস্থার সংকট তৈরি হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
স্বাস্থ্য খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমানে দেশের সিংহভাগ চিকিৎসাপত্র বা প্রেসক্রিপশন সনাতন পদ্ধতিতে কাগজে হাতে লেখা হয়। ফলে কোনো একজন নির্দিষ্ট চিকিৎসক কত ধরনের বা কত মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক লিখছেন, কোন বিশেষ কোম্পানির ওষুধ রোগীদের বেশি দিচ্ছেন কিংবা মূল চিকিৎসা নির্দেশিকার বাইরে গিয়ে কতটা অপ্রয়োজনীয় প্রেসক্রিপশন তৈরি হচ্ছে—সে বিষয়ে সরকারের কাছে কেন্দ্রীয় কোনো তথ্যভাণ্ডার বা স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ব্যবস্থা নেই। এই কেন্দ্রীয় নজরদারির অভাবে চিকিৎসকদের এমন অনৈতিক কার্যক্রম বা অনিয়ম সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক সাম্প্রতিক চাঞ্চল্যকর গবেষণা থেকে জানা গেছে, আমাদের দেশে হাসপাতালে ভর্তি থাকা একজন রোগীর মোট চিকিৎসা ব্যয়ের সর্বোচ্চ ২৬ শতাংশ খরচ হয় শুধুমাত্র ওষুধ কেনাকাটায়, আর প্রায় ১৭ শতাংশ অর্থ চলে যায় বিভিন্ন ধরনের রোগনির্ণয় বা ল্যাবরেটরি পরীক্ষায়। দেশের একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রতি মাসে গড়ে চিকিৎসাবাবদ ব্যয় হয় তিন হাজার ৪৫৪ টাকা, যা তাদের মোট পারিবারিক আয়ের প্রায় ১১ শতাংশের সমান। গবেষকদের মতে, এই আকাশচুম্বী ব্যয়ের কারণে দেশের বহু দরিদ্র মানুষ অর্থের অভাবে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও জীবনের শেষ মুহূর্তে এসেও কোনো সুচিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পান না।
আমাদের দেশে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদন, বাজারজাতকরণ এবং এর মান নিয়ন্ত্রণের একমাত্র রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হলো ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। তবে দেশের এই বিশাল ওষুধ বাজার এবং বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় এই সংস্থার মাঠপর্যায়ের জনবল ও তদারকি ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত। ল্যাবরেটরিতে ওষুধের মান পরীক্ষার ধীরগতির কারণে একদিকে যেমন দেশের বাজারে নিম্নমানের বা ভেজাল ওষুধ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে, ঠিক তেমনি ওষুধ কোম্পানিগুলোর অনৈতিক বিপণন কার্যক্রমের ওপরও এই অধিদপ্তর কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নিতে পারছে না। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মূল মনোযোগ থাকে শুধু নতুন ওষুধের লাইসেন্স প্রদান এবং কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপর। কিন্তু বাজারে আসার পর সেই ওষুধগুলো কিভাবে চিকিৎসকদের মাধ্যমে সাধারণ রোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কিংবা চিকিৎসকদের কোনো অনৈতিক সুবিধা দিয়ে প্রভাবিত করা হচ্ছে কি না—সেসব বিষয়ে তাদের নজরদারি নেই বললেই চলে।
বায়োমেডিক্যাল গবেষকেরা বলছেন, বাজারে কোনো নতুন ওষুধ আসার পর তার ব্যবহার, প্রকৃত কার্যকারিতা এবং সম্ভাব্য অনিয়ম সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য ‘পোস্ট মার্কেটিং মনিটরিং’ বা বাজার-পরবর্তী নজরদারি ব্যবস্থা অত্যন্ত জোরদার করা প্রয়োজন। চিকিৎসক এবং ওষুধ কোম্পানির মধ্যকার এই স্বার্থের সংঘাতই মূলত রোগীদের প্রেসক্রিপশনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে থাকে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উচিত সাধারণ ও প্রেসক্রিপশন ছাড়া পাওয়া যায় এমন ওষুধের তালিকা নিয়মিত প্রকাশ করা, ওষুধের মূল জেনেরিক নাম বা উপাদানের নামসহ বাজারে থাকা সমস্ত ওষুধের তথ্য প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওষুধের চটকদার বিজ্ঞাপন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা। দেশের পুরো চিকিৎসাব্যবস্থাকে রোগী এবং ভোক্তাকেন্দ্রিক করে গড়ে তুলতে পারলেই কেবল সেবার প্রকৃত মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব।
যদিও দেশে ওষুধ খাত নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘ওষুধ আইন ২০২৩’ কার্যকর রয়েছে এবং এই আইনে ভেজাল বা নিম্নমানের ওষুধ তৈরির জন্য অত্যন্ত কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, তবুও আইনের কিছু ফাঁকফোকরের কারণে এই অদৃশ্য বাণিজ্য বন্ধ করা যাচ্ছে না। ১৯৪০ সালের পুরনো ড্রাগস অ্যাক্ট এবং পরবর্তী সময়ে প্রণীত বিভিন্ন নীতিমালায় ওষুুধের অনৈতিক প্রচারণার ওপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ নেই। দেশে ‘কোড অফ ফার্মাসিউটিক্যাল মার্কেটিং প্র্যাকটিসেস’ নামের একটি চমৎকার লিখিত নীতিমালা রয়েছে, যা ওষুধ কোম্পানিগুলোর প্রচারণার একটি নির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। এই জাতীয় নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো চিকিৎসককে কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে নগদ অর্থ, কোনো দামি উপহার সামগ্রী কিংবা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো সুবিধা দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি ও নিষিদ্ধ।
কিন্তু নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অভিযোগ না এলে তারা সাধারণত স্বপ্রণোদিত হয়ে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেন না। তাছাড়া ওষুধ কোম্পানি এবং চিকিৎসকদের মধ্যকার এই অনৈতিক ‘লেনদেন’ বা চুক্তির কোনো লিখিত প্রমাণ বা দলিল না থাকায় প্রচলিত আইনে এই অদৃশ্য ও গোপন বাণিজ্য বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল এবং ঔষধ প্রশাসনের কাছে প্রায়ই মৌখিক বা লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নজির অত্যন্ত বিরল।
এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেশের একটি শক্তিশালী ‘স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর’ প্রচণ্ড রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবকে দায়ী করা হয়েছে। বাংলাদেশের ওষুধশিল্প এখন দেশের অন্যতম একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক খাত, যা দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ মেটানোর পাশাপাশি বিশ্বের বহু উন্নত দেশে সুনামের সাথে ওষুধ রপ্তানি করছে। এই বিশাল অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে ওষুধ খাতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কোম্পানি মালিকদের শীর্ষ সংগঠন ‘বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতি’র একচ্ছত্র প্রভাব রয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, দেশের চিকিৎসকদের বড় বড় সংগঠন বা প্রভাবশালী অ্যাসোসিয়েশনগুলোর বার্ষিক জমকালো সম্মেলন, বৈজ্ঞানিক সেমিনার, এমনকি চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত বা সপরিবারে বিনোদন সফরের সম্পূর্ণ খরচ পর্দার আড়াল থেকে এই ওষুধ কোম্পানিগুলোই বহন করে থাকে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে অনৈতিক বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠলেও রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাবে তা খুব দ্রুত ধামাচাপা পড়ে যায়।
এই প্রেসক্রিপশন বাণিজ্যের সবচেয়ে মারাত্মক ও ক্ষতিকর দিকটি প্রকাশ পাচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ও অপব্যবহারের মাধ্যমে। সাধারণ জ্বর, সর্দি কিংবা কাশির মতো সাধারণ ও উপশমযোগ্য রোগেও চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ রোগীদের উচ্চমাত্রার ও দামি অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন করছেন। কোনো ধরনের ল্যাবরেটরি বা কালচার রিপোর্ট ছাড়াই এভাবে নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে মানুষের শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলো ক্রমান্বয়ে এই ওষুধের বিরুদ্ধে এক অভেদ্য প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যেই সতর্কবার্তা জারি করেছে যে, এই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলা আগামী দিনের মানব সভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যসংকট হতে চলেছে এবং বাংলাদেশে এই নীরব ঘাতক সংকটটি ইতিমধ্যে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, কোনো রোগীর একটি মূল বা নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসার জন্য যদি তিনটির বেশি ওষুধ দেওয়া হয়, তবে তাকে অনেক সময় ‘অপ্রয়োজনীয় ওষুধ’ বা অযৌক্তিক প্রেসক্রিপশন হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে একজন সাধারণ রোগীর গড় প্রেসক্রিপশনে ওষুধের সংখ্যা থাকে চার থেকে পাঁচটি, যা বিশ্বের যেকোনো উন্নত দেশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই কারণে রোগীর শরীরে একসাথে একাধিক ওষুধের পারস্পরিক রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, যার ফলে রোগীর লিভার এবং কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে এগুলো বিকল হয়ে যায়। স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি এর একটি বড় দিক হলো মারাত্মক আর্থিক ক্ষতি। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতের মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৮ শতাংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে মেটাতে হয়। ফলে অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত ওষুধ কিনে অকারণে অর্থ ব্যয়ের কারণে দেশের বহু নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক পরিবার ঋণের জালে জড়িয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দেশের ওষুধশিল্পে স্বচ্ছতা এবং চিকিৎসা পেশায় নৈতিকতা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ক্যাবের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কাগজে-কলমে আইন করে বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে এই গভীর সংকট দূর করা যাবে না; এর জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক নীতিগত সংস্কার এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার। বাজারে নিজেদের কোম্পানির ওষুধ বেশি বেশি লেখানোর জন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে যে এক অসুস্থ ও অনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে, তা এখন ওপেন সিক্রেট বা প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় বিক্রয় প্রতিনিধি এবং চিকিৎসকদের একটি অংশ সরাসরি জড়িয়ে পড়েছেন, যা এক স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত। চিকিৎসকদের উপহার থেকে শুরু করে নগদ অর্থ দেওয়ার এই যে কালচার শুরু হয়েছে, তা থেকে সাধারণ রোগীদের রেহাই দিতে সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের কঠোর বাস্তবায়ন দরকার এবং এই কাজের মূল দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকেই নিতে হবে। চিকিৎসা খাতকে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিকীকরণ থেকে বাঁচাতে পুরো ব্যবস্থাটিকে প্রযুক্তির চাদরে ঢেকে ফেলা এখন সময়ের দাবি।
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশ, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী ভারতের কিছু রাজ্যেও ওষুধ বিপণন ও প্রেসক্রিপশন নিয়ন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট ও কঠোর ব্যবস্থা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ‘ফিজিসিয়ান পেমেন্টস সানশাইন অ্যাক্ট’-এর মতো অত্যন্ত স্বচ্ছ আইন রয়েছে। এই আইন অনুযায়ী কোনো ওষুধ কোম্পানি যদি কোনো চিকিৎসককে সামান্যতম কোনো উপহার, দুপুরের খাবারের খরচ কিংবা গবেষণার জন্য অর্থ প্রদান করে, তবে তা একটি কেন্দ্রীয় সরকারি ওয়েবসাইটে জনগণের সামনে প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশকে যদি এই সংকট থেকে বাঁচতে হয়, তবে অবশ্যই এই আধুনিক পথে হাঁটতে হবে। চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনে ওষুধের কোনো নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক বা ব্র্যান্ডের নাম লেখার পরিবর্তে মূল রাসায়নিক বা জেনেরিক নাম লেখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এটি সফলভাবে করা গেলে ওষুধ কোম্পানিগুলোর চিকিৎসকদের পেছনে কোটি কোটি টাকা ঢালার প্রবণতা এক ধাক্কায় চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে, কারণ তখন চিকিৎসক নির্দিষ্ট কোনো ব্র্যান্ডের প্রচার করতে পারবেন না। দেশের ওষুধশিল্পের শীর্ষ সংগঠনের নেতারাও স্বীকার করছেন যে, কোম্পানিগুলোর মোট টার্নওভার বা আয়ের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ অনৈতিক বিপণনে ব্যয় করার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে, তা বন্ধে ‘বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতি’কেই সবচেয়ে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
এই অনৈতিক চর্চা বন্ধে দেশের চিকিৎসা খাতকে সম্পূর্ণ কাগজের আড়াল থেকে বের করে এনে ডিজিটাইজ করা এখন অত্যন্ত জরুরি। দেশের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ‘ই-প্রেসক্রিপশন’ বা ইলেকট্রনিক চিকিৎসাপত্র ব্যবস্থা চালু করতে হবে। চিকিৎসক যখন একটি বিশেষ সফটওয়্যার বা কম্পিউটারের মাধ্যমে প্রেসক্রিপশন তৈরি করবেন, তখন সেটি সরাসরি একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারে জমা থাকবে। কোনো চিকিৎসক যদি নির্দিষ্ট কোনো রোগের জন্য আন্তর্জাতিক চিকিৎসা গাইডলাইনের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ওষুধ বা অপ্রয়োজনীয় উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক লেখেন, তবে সেই সফটওয়্যারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি লাল সংকেত বা ‘অ্যালার্ট’ দেবে। এতে চিকিৎসকদের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এবং কোনো কোম্পানি তাদের প্রভাবিত করতে পারবে না। পাশাপাশি আইন করে চিকিৎসকদের জন্য ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে নেওয়া যেকোনো আর্থিক সুবিধা বা স্পনসরশিপের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। রোগীদেরও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে রোগীকে প্রশ্ন করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
অবশ্য সরকারের ঔষধ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে, দেশের ওষুধ খাতের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং যেকোনো ধরনের অনীহা ও অনৈতিক চর্চা প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে তাদের কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনিক তৎপরতা চলমান রয়েছে। ওয়ান স্টপ মনিটরিং নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে সারা দেশে জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্বে জেলা পর্যায়ে একটি করে শক্তিশালী ‘অ্যাকশন কমিটি’ কাজ করছে। কোনো অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য ও লিখিত অভিযোগ এলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সাথে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, একজন রোগীর চিকিৎসাপত্র বা প্রেসক্রিপশন দেশের প্রচলিত আইনে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং একটি অত্যন্ত গোপনীয় নথি। রোগী নিজে না চাইলে বা অনুমতি না দিলে এই তথ্য অন্য কারো দেখার কিংবা জানার কোনো আইনগত অধিকার নেই। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যদি দেখা যায় কোনো নির্দিষ্ট সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে এই গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘন করে রিপ্রেজেন্টেটিভরা ছবি তুলে রোগীদের হয়রানি করছে, তবে সেই হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন