এক সময় কিশোর-কিশোরীদের বিকেলের আড্ডা, খেলাধুলা ও সামাজিক মেলামেশা সীমাবদ্ধ থাকত পাড়া-মহল্লা, স্কুলের মাঠ বা চেনা গলির মধ্যে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন ও প্রযুক্তির বিস্তারে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটনির্ভর ভার্চুয়াল জগতে কিশোরদের বড় একটি অংশের সময় কাটছে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের আড়ালেই ধীরে ধীরে বিস্তার ঘটছে কিশোর গ্যাং কালচার ও দলবদ্ধ অপরাধ প্রবণতার।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সমাজবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন অনেক কিশোর অপরাধী চক্রের জন্য যোগাযোগ, সংগঠন ও সদস্য সংগ্রহের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। অনলাইনে গ্রুপ তৈরি, প্রতিপক্ষকে হুমকি দেওয়া, অস্ত্রের ছবি প্রদর্শনের মাধ্যমে ভয়ভীতি সৃষ্টি এবং এলাকায় প্রভাব বিস্তারের মতো কর্মকাণ্ডও এখন এসব প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া কিশোরদের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, গত ছয় বছরে দেশে এক হাজারের বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের বড় একটি অংশের অনলাইন যোগাযোগ ও সংগঠিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ মিলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের ফলে কিশোরদের আচরণে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। অনেকেই সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, পারিবারিক যোগাযোগ কমে যাচ্ছে এবং এক ধরনের আক্রমণাত্মক মনোভাব তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া অনলাইন জনপ্রিয়তা ও স্বীকৃতির প্রতিযোগিতাও অনেককে ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধে ঠেলে দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা এ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, নিয়ন্ত্রণহীন ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে শিশু-কিশোরদের সামাজিক দক্ষতা হ্রাস পাচ্ছে এবং তারা বাস্তব জীবন থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, অনেক শিশু-কিশোর স্বাভাবিক যোগাযোগ ও আচরণে সমস্যা দেখাচ্ছে এবং পারিবারিক মূল্যবোধ থেকেও দূরে সরে যাচ্ছে।
অন্যদিকে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার সমাধান কেবল নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ও শিক্ষামূলক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের মতে, প্রযুক্তির ইতিবাচক দিক যেমন অনলাইন শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগও রয়েছে, যা উপেক্ষা করা উচিত নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধতা এনেছে, ফ্রান্সসহ আরও কয়েকটি দেশও অনুরূপ উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বের বহু দেশে স্কুল পর্যায়ে স্মার্টফোন ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিশুদের মাঠমুখী কার্যক্রম, খেলাধুলা ও বাস্তব সামাজিক মেলামেশায় ফিরিয়ে আনা গেলে কিশোর অপরাধ প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬
এক সময় কিশোর-কিশোরীদের বিকেলের আড্ডা, খেলাধুলা ও সামাজিক মেলামেশা সীমাবদ্ধ থাকত পাড়া-মহল্লা, স্কুলের মাঠ বা চেনা গলির মধ্যে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন ও প্রযুক্তির বিস্তারে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটনির্ভর ভার্চুয়াল জগতে কিশোরদের বড় একটি অংশের সময় কাটছে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের আড়ালেই ধীরে ধীরে বিস্তার ঘটছে কিশোর গ্যাং কালচার ও দলবদ্ধ অপরাধ প্রবণতার।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সমাজবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন অনেক কিশোর অপরাধী চক্রের জন্য যোগাযোগ, সংগঠন ও সদস্য সংগ্রহের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। অনলাইনে গ্রুপ তৈরি, প্রতিপক্ষকে হুমকি দেওয়া, অস্ত্রের ছবি প্রদর্শনের মাধ্যমে ভয়ভীতি সৃষ্টি এবং এলাকায় প্রভাব বিস্তারের মতো কর্মকাণ্ডও এখন এসব প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া কিশোরদের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, গত ছয় বছরে দেশে এক হাজারের বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের বড় একটি অংশের অনলাইন যোগাযোগ ও সংগঠিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ মিলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের ফলে কিশোরদের আচরণে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। অনেকেই সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, পারিবারিক যোগাযোগ কমে যাচ্ছে এবং এক ধরনের আক্রমণাত্মক মনোভাব তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া অনলাইন জনপ্রিয়তা ও স্বীকৃতির প্রতিযোগিতাও অনেককে ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধে ঠেলে দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা এ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, নিয়ন্ত্রণহীন ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে শিশু-কিশোরদের সামাজিক দক্ষতা হ্রাস পাচ্ছে এবং তারা বাস্তব জীবন থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, অনেক শিশু-কিশোর স্বাভাবিক যোগাযোগ ও আচরণে সমস্যা দেখাচ্ছে এবং পারিবারিক মূল্যবোধ থেকেও দূরে সরে যাচ্ছে।
অন্যদিকে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার সমাধান কেবল নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ও শিক্ষামূলক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের মতে, প্রযুক্তির ইতিবাচক দিক যেমন অনলাইন শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগও রয়েছে, যা উপেক্ষা করা উচিত নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধতা এনেছে, ফ্রান্সসহ আরও কয়েকটি দেশও অনুরূপ উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বের বহু দেশে স্কুল পর্যায়ে স্মার্টফোন ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিশুদের মাঠমুখী কার্যক্রম, খেলাধুলা ও বাস্তব সামাজিক মেলামেশায় ফিরিয়ে আনা গেলে কিশোর অপরাধ প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে।

আপনার মতামত লিখুন