আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ খেলাপি ঋণ, তীব্র তারল্য সংকট এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) অবসায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর ড. মো. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, অবসায়নের জন্য নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকট, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং নানা অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতাও হারিয়েছে তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার আমানতকারীর প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগের পর আইন অনুযায়ী আমানত ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রথম ধাপে ক্ষুদ্র ও সাধারণ আমানতকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যক্তি-আমানতকারীরা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি ও অন্যান্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বাকি পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রথমে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। এরপর সম্পদ ও দায়-দেনার প্রকৃত চিত্র মূল্যায়ন করে ধাপে ধাপে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হবে। তিনি জানান, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হবে।
মঙ্গলবারের সভায় সংকটে থাকা মোট নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে পাঁচটির বিরুদ্ধে অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও আরও চারটি প্রতিষ্ঠানকে পুনরুদ্ধারের জন্য তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স এবং প্রাইম ফাইন্যান্স।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানকে সাধারণ আমানতকারীদের মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক খাতে চলমান অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও খেলাপি ঋণের কারণে সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে এবার কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, আর্থিক খাতের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৪ সালের মে মাসে ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তী মূল্যায়নে নয়টি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা সন্তোষজনক না হওয়ায় তাদের বিষয়ে বিশেষ পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতেই পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অবসায়নের এবং চারটিকে শেষ সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর্থিক খাত বিশ্লেষকদের মতে, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং খাতটির প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর পদক্ষেপ।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ খেলাপি ঋণ, তীব্র তারল্য সংকট এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) অবসায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর ড. মো. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, অবসায়নের জন্য নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকট, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং নানা অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতাও হারিয়েছে তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার আমানতকারীর প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগের পর আইন অনুযায়ী আমানত ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রথম ধাপে ক্ষুদ্র ও সাধারণ আমানতকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যক্তি-আমানতকারীরা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি ও অন্যান্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বাকি পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রথমে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। এরপর সম্পদ ও দায়-দেনার প্রকৃত চিত্র মূল্যায়ন করে ধাপে ধাপে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হবে। তিনি জানান, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হবে।
মঙ্গলবারের সভায় সংকটে থাকা মোট নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে পাঁচটির বিরুদ্ধে অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও আরও চারটি প্রতিষ্ঠানকে পুনরুদ্ধারের জন্য তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স এবং প্রাইম ফাইন্যান্স।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানকে সাধারণ আমানতকারীদের মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক খাতে চলমান অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও খেলাপি ঋণের কারণে সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে এবার কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, আর্থিক খাতের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৪ সালের মে মাসে ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তী মূল্যায়নে নয়টি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা সন্তোষজনক না হওয়ায় তাদের বিষয়ে বিশেষ পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতেই পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অবসায়নের এবং চারটিকে শেষ সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর্থিক খাত বিশ্লেষকদের মতে, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং খাতটির প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর পদক্ষেপ।

আপনার মতামত লিখুন