বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশক পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো নারী আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হয়নি। দেশের স্বাধীনতা লাভের পর থেকে গত ৫৫ বছরে আদালতের চূড়ান্ত আদেশে কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নজির নেই, এমনকি এই দণ্ড থেকে রেহাই পেতে কোনো নারীকে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদনও করতে হয়নি। অথচ বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন ৯৩ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী কয়েদি।
কারা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে একমাত্র নারী কেন্দ্রীয় কারাগার হিসেবে পরিচিত গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কারাগারেই বন্দি আছেন এই ৯৩ জনের মধ্যে ৫০ জন নারী। এই বন্দিদের সিংহভাগই অত্যন্ত নৃশংস খুনের মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। কারাগারের ভেতরে এই নারীদের বন্দি রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম অনুসরণ করা হয়। সাধারণত ফাঁসির আসামিদের সেলে বিজোড় সংখ্যায় রাখা হয়ে থাকে; অর্থাৎ একটি কক্ষে একজন, তিনজন কিংবা সর্বোচ্চ পাঁচজন করে বন্দি রাখা হয়। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলেও দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ আপিল বিভাগে আবেদন করার পর অধিকাংশ নারীর দণ্ড কমে যাবজ্জীবন বা আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
কারাগারের চার দেয়ালের ভেতরে সাধারণ কয়েদি বা হাজতিদের বিভিন্ন ধরনের কাজকর্ম করার সুযোগ দেওয়া হলেও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারীদের কোনো ধরনের কাজে অংশ নিতে দেওয়া হয় না। দিন-রাতের সিংহভাগ সময়ই তাদের চার দেয়ালের ভেতরে চরম মানসিক চাপের মধ্যে কাটাতে হয়। এই দীর্ঘ বন্দিজীবনে যারা কিছুটা লেখাপড়া জানেন, তারা বই পড়ে সময় পার করার চেষ্টা করেন। সাম্প্রতিক সময়েও এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন বেশ কয়েকজন নারী। ২০২০ সালে বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি বর্তমানে কাশিমপুর কারাগারের কনডেম সেলেই দিন কাটাচ্ছেন। ২০১৯ সালের ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় কামরুন্নাহার ও উম্মে সুলতানাসহ বেশ কয়েকজন নারী ফাঁসির আদেশ মাথায় নিয়ে বন্দি আছেন। এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া একজন আসামি। সর্বশেষ বিগত ১৯ মে ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে রামিসা নামের এক শিশুকে হত্যার দায়ে স্বপ্না খাতুন নামের আরেক নারীকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে আদালত, যার পর পরই তাকে বিশেষ সেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ফৌজদারি আইনে নারীদের ফাঁসি কার্যকরের ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও বিচারিক ও সামাজিক নানা জটিলতার কারণে এটি কার্যকর হয় না বলে মনে করেন আইনজীবীরা। তাদের মতে, কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সাধারণত নারীরা এককভাবে বা একা পরিকল্পনা করে ঘটান না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধের পেছনে অন্য পুরুষ বা সহযোগীরা জড়িত থাকে এবং নারীদের ভূমিকা থাকে কেবল অংশীদারিত্বের। এই মানবিক ও পারিপার্শ্বিক দিক বিবেচনা করে উচ্চ আদালত চূড়ান্ত রায়ে নারীদের ফাঁসি বহাল রাখার ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা দেখান। তাছাড়া, ২০০৭ সালে দেশের একমাত্র নারী কারাগার হিসেবে কাশিমপুর মহিলা কারাগারটি যখন চালু করা হয়, তখন সেখানে কোনো ফাঁসির মঞ্চই তৈরি করা হয়নি, কারণ দেশে নারী আসামির ফাঁসি কার্যকরের কোনো পূর্ব ইতিহাস ছিল না।
আইন বিশেষজ্ঞরা এই জটিলতার পেছনে আইনি ও আন্তর্জাতিক কিছু বাধ্যবাধকতার কথাও উল্লেখ করেছেন। দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইন অনুযায়ী, কোনো নারী যদি গুরুতর অসুস্থ থাকেন কিংবা তার যদি কোনো ছোট বা দুগ্ধপোষ্য শিশু সন্তান থাকে, তবে কোনোভাবেই তার ফাঁসির রায় কার্যকর করা যাবে না। ওই শিশুটি যতদিন পর্যন্ত স্বাবলম্বী বা বড় না হবে, ততদিন পর্যন্ত রায় স্থগিত রাখার বিধান রয়েছে। এছাড়াও বিশ্বের প্রায় ১৯৩টি দেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে নারীদের সাজা কার্যকরের ক্ষেত্রে বিশেষ অনুকম্পা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শনের ব্যাপারে একমত পোষণ করেছে। অন্যদিকে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে যেখানে মৃত্যুদণ্ড প্রথাই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে নারীদের এই দণ্ড দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশের প্রবীণ সংবিধান বিশেষজ্ঞরা।
কারাগারের ভেতরের নিয়ম অনুযায়ী, এই বন্দিদের সার্বক্ষণিক কঠোর পাহারায় রাখা হয়। তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সকাল, দুপুর ও বিকাল মিলিয়ে সর্বোচ্চ মাত্র এক ঘণ্টার জন্য সেলের সামনের আঙিনায় আসার সুযোগ পান, তবে পুরো কারাগারে ঘুরে বেড়ানোর কোনো অনুমতি তাদের নেই। মাসে মাত্র একবার তারা পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা করতে পারেন এবং সপ্তাহে মাত্র একবার নির্ধারিত মোবাইল ফোনে স্বজনদের সাথে কথা বলার সুযোগ পান। কেউ চাইলে নিজের কক্ষে বসে সেলাইয়ের মতো টুকটাক কাজ করতে পারেন, তবে বন্দিদের বেশিরভাগ সময়ই শুয়ে-বসে চরম একাকীত্বের মধ্য দিয়ে পার করতে হয়। কারাবিধি অনুযায়ী একজন বন্দির জন্য ন্যূনতম ছত্রিশ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ থাকার নিয়ম থাকলেও ছোট জানালাযুক্ত এই নিভৃত কক্ষে বছরের পর বছর থাকার কারণে এই নারীরা চরম মানসিক বিপর্যস্ততার শিকার হচ্ছেন।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশক পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো নারী আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হয়নি। দেশের স্বাধীনতা লাভের পর থেকে গত ৫৫ বছরে আদালতের চূড়ান্ত আদেশে কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নজির নেই, এমনকি এই দণ্ড থেকে রেহাই পেতে কোনো নারীকে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদনও করতে হয়নি। অথচ বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন ৯৩ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী কয়েদি।
কারা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে একমাত্র নারী কেন্দ্রীয় কারাগার হিসেবে পরিচিত গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কারাগারেই বন্দি আছেন এই ৯৩ জনের মধ্যে ৫০ জন নারী। এই বন্দিদের সিংহভাগই অত্যন্ত নৃশংস খুনের মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। কারাগারের ভেতরে এই নারীদের বন্দি রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম অনুসরণ করা হয়। সাধারণত ফাঁসির আসামিদের সেলে বিজোড় সংখ্যায় রাখা হয়ে থাকে; অর্থাৎ একটি কক্ষে একজন, তিনজন কিংবা সর্বোচ্চ পাঁচজন করে বন্দি রাখা হয়। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলেও দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ আপিল বিভাগে আবেদন করার পর অধিকাংশ নারীর দণ্ড কমে যাবজ্জীবন বা আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
কারাগারের চার দেয়ালের ভেতরে সাধারণ কয়েদি বা হাজতিদের বিভিন্ন ধরনের কাজকর্ম করার সুযোগ দেওয়া হলেও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারীদের কোনো ধরনের কাজে অংশ নিতে দেওয়া হয় না। দিন-রাতের সিংহভাগ সময়ই তাদের চার দেয়ালের ভেতরে চরম মানসিক চাপের মধ্যে কাটাতে হয়। এই দীর্ঘ বন্দিজীবনে যারা কিছুটা লেখাপড়া জানেন, তারা বই পড়ে সময় পার করার চেষ্টা করেন। সাম্প্রতিক সময়েও এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন বেশ কয়েকজন নারী। ২০২০ সালে বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি বর্তমানে কাশিমপুর কারাগারের কনডেম সেলেই দিন কাটাচ্ছেন। ২০১৯ সালের ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় কামরুন্নাহার ও উম্মে সুলতানাসহ বেশ কয়েকজন নারী ফাঁসির আদেশ মাথায় নিয়ে বন্দি আছেন। এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া একজন আসামি। সর্বশেষ বিগত ১৯ মে ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে রামিসা নামের এক শিশুকে হত্যার দায়ে স্বপ্না খাতুন নামের আরেক নারীকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে আদালত, যার পর পরই তাকে বিশেষ সেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ফৌজদারি আইনে নারীদের ফাঁসি কার্যকরের ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও বিচারিক ও সামাজিক নানা জটিলতার কারণে এটি কার্যকর হয় না বলে মনে করেন আইনজীবীরা। তাদের মতে, কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সাধারণত নারীরা এককভাবে বা একা পরিকল্পনা করে ঘটান না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধের পেছনে অন্য পুরুষ বা সহযোগীরা জড়িত থাকে এবং নারীদের ভূমিকা থাকে কেবল অংশীদারিত্বের। এই মানবিক ও পারিপার্শ্বিক দিক বিবেচনা করে উচ্চ আদালত চূড়ান্ত রায়ে নারীদের ফাঁসি বহাল রাখার ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা দেখান। তাছাড়া, ২০০৭ সালে দেশের একমাত্র নারী কারাগার হিসেবে কাশিমপুর মহিলা কারাগারটি যখন চালু করা হয়, তখন সেখানে কোনো ফাঁসির মঞ্চই তৈরি করা হয়নি, কারণ দেশে নারী আসামির ফাঁসি কার্যকরের কোনো পূর্ব ইতিহাস ছিল না।
আইন বিশেষজ্ঞরা এই জটিলতার পেছনে আইনি ও আন্তর্জাতিক কিছু বাধ্যবাধকতার কথাও উল্লেখ করেছেন। দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইন অনুযায়ী, কোনো নারী যদি গুরুতর অসুস্থ থাকেন কিংবা তার যদি কোনো ছোট বা দুগ্ধপোষ্য শিশু সন্তান থাকে, তবে কোনোভাবেই তার ফাঁসির রায় কার্যকর করা যাবে না। ওই শিশুটি যতদিন পর্যন্ত স্বাবলম্বী বা বড় না হবে, ততদিন পর্যন্ত রায় স্থগিত রাখার বিধান রয়েছে। এছাড়াও বিশ্বের প্রায় ১৯৩টি দেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে নারীদের সাজা কার্যকরের ক্ষেত্রে বিশেষ অনুকম্পা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শনের ব্যাপারে একমত পোষণ করেছে। অন্যদিকে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে যেখানে মৃত্যুদণ্ড প্রথাই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে নারীদের এই দণ্ড দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশের প্রবীণ সংবিধান বিশেষজ্ঞরা।
কারাগারের ভেতরের নিয়ম অনুযায়ী, এই বন্দিদের সার্বক্ষণিক কঠোর পাহারায় রাখা হয়। তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সকাল, দুপুর ও বিকাল মিলিয়ে সর্বোচ্চ মাত্র এক ঘণ্টার জন্য সেলের সামনের আঙিনায় আসার সুযোগ পান, তবে পুরো কারাগারে ঘুরে বেড়ানোর কোনো অনুমতি তাদের নেই। মাসে মাত্র একবার তারা পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা করতে পারেন এবং সপ্তাহে মাত্র একবার নির্ধারিত মোবাইল ফোনে স্বজনদের সাথে কথা বলার সুযোগ পান। কেউ চাইলে নিজের কক্ষে বসে সেলাইয়ের মতো টুকটাক কাজ করতে পারেন, তবে বন্দিদের বেশিরভাগ সময়ই শুয়ে-বসে চরম একাকীত্বের মধ্য দিয়ে পার করতে হয়। কারাবিধি অনুযায়ী একজন বন্দির জন্য ন্যূনতম ছত্রিশ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ থাকার নিয়ম থাকলেও ছোট জানালাযুক্ত এই নিভৃত কক্ষে বছরের পর বছর থাকার কারণে এই নারীরা চরম মানসিক বিপর্যস্ততার শিকার হচ্ছেন।

আপনার মতামত লিখুন