রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে সাড়া জাগানো দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও হত্যার মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে এখনো সংশ্লিষ্ট বিচারক স্বাক্ষর করেননি। আজ মঙ্গলবার উচ্চ আদালত তথা হাইকোর্টে এই মামলার মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের নথি বা ডেথ রেফারেন্স পাঠানোর কথা রয়েছে, যা বিচারকের আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর সম্পন্ন হওয়ার পরই পাঠানো সম্ভব হবে। গতকাল সোমবার হাইকোর্টের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এর আগে গত রবিবার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক মাসরুর সালেকীন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও বহুল আলোচিত এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। আদালতের রায়ে প্রধান অভিযুক্ত আসামি সোহেল রানা এবং অপরাধে সহায়তাকারী তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। সবশেষ সোমবার আইনি প্রক্রিয়া মেনে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সোহেল ও স্বপ্নাকে কারাগারের সাধারণ সেল থেকে সরিয়ে ফাঁসির আসামিদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ সেলে নেওয়া হয়েছে।
মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিজ্ঞ আদালত অত্যন্ত কঠোর ভাষায় উল্লেখ করেন যে, নিষ্পাপ শিশু রামিসাকে নির্মমভাবে হত্যার পূর্বে পাশবিকভাবে ধর্ষণ এবং তার শরীরের বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে গুরুতর জখম করার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। এ ছাড়া প্রধান আসামি সোহেল রানা আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেওয়ার পর তা প্রত্যাহারের জন্য আইনি কোনো আবেদন না করায় এটি পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয় যে, সে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে নিজের দোষ স্বীকার করেছে। অন্যদিকে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার এই জঘন্য অপরাধের কথা জানা সত্ত্বেও তার স্বামীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাত থেকে বাঁচাতে এবং পালিয়ে যেতে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন, যা তাকে সমভাবে অপরাধী করে তুলেছে। বিচারিক ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করে মাত্র চার কার্যদিবসের মধ্যে এই চাঞ্চল্যকর মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করা হয়। গত ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়েছিল, যার পরদিনই অর্থাৎ ২ জুনে মামলার ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনেরই জবানবন্দি গ্রহণ শেষ হয়। এরপর ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি এবং ৪ জুন উভয় পক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে আদালত রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন। রবিবারের এই রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত চত্বরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, যেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদেরও সতর্ক অবস্থানে দেখা যায়।
এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের মামলার বিবরণী ও এজাহার থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে নয়টার দিকে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী রামিসা আক্তার প্রতিদিনের মতো বাসা থেকে বের হয়েছিল। সেই সময় প্রতিবেশী স্বপ্না আক্তার কৌশলে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে শিশুটিকে নিজেদের ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে যান। পরবর্তীতে সকাল সাড়ে দশটার দিকে রামিসার মা তার মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পুরো এলাকায় না পেয়ে একপর্যায়ে তিনি প্রতিবেশী সোহেল রানার বন্ধ দরজার সামনে তার মেয়ের জুতা জোড়া পড়ে থাকতে দেখেন। এই দেখে সন্দেহ হলে তিনি বারবার দরজায় করাঘাত করেন এবং অনেক ডাকাডাকি করার পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে রামিসার বাবা-মাসহ ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারা সমবেত হয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মাথাবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ এবং পাশে থাকা একটি বড় প্লাস্টিকের বালতির ভেতর তার বিচ্ছিন্ন মাথাটি উদ্ধার করা হয়, যা দেখে পুরো এলাকায় স্তব্ধতা নেমে আসে।
এই ভয়াবহ ঘটনার পর উপস্থিত জনতা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরে ফোন দিলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে জনরোষ থেকে স্বপ্না আক্তারকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। তবে ঘটনার মূল হোতা সোহেল রানা ঘরের পেছনের জানালার গ্রিল কেটে কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সম্মুখভাগ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এই অমানবিক ও নৃশংস ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ২০ মে পল্লবী থানায় রামিসার বাবা বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন, যার দ্রুত বিচার শেষে আদালত এই ঐতিহাসিক ও দৃষ্টান্তমূলক রায় প্রদান করলেন।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে সাড়া জাগানো দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও হত্যার মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে এখনো সংশ্লিষ্ট বিচারক স্বাক্ষর করেননি। আজ মঙ্গলবার উচ্চ আদালত তথা হাইকোর্টে এই মামলার মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের নথি বা ডেথ রেফারেন্স পাঠানোর কথা রয়েছে, যা বিচারকের আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর সম্পন্ন হওয়ার পরই পাঠানো সম্ভব হবে। গতকাল সোমবার হাইকোর্টের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এর আগে গত রবিবার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক মাসরুর সালেকীন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও বহুল আলোচিত এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। আদালতের রায়ে প্রধান অভিযুক্ত আসামি সোহেল রানা এবং অপরাধে সহায়তাকারী তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। সবশেষ সোমবার আইনি প্রক্রিয়া মেনে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সোহেল ও স্বপ্নাকে কারাগারের সাধারণ সেল থেকে সরিয়ে ফাঁসির আসামিদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ সেলে নেওয়া হয়েছে।
মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিজ্ঞ আদালত অত্যন্ত কঠোর ভাষায় উল্লেখ করেন যে, নিষ্পাপ শিশু রামিসাকে নির্মমভাবে হত্যার পূর্বে পাশবিকভাবে ধর্ষণ এবং তার শরীরের বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে গুরুতর জখম করার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। এ ছাড়া প্রধান আসামি সোহেল রানা আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেওয়ার পর তা প্রত্যাহারের জন্য আইনি কোনো আবেদন না করায় এটি পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয় যে, সে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে নিজের দোষ স্বীকার করেছে। অন্যদিকে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার এই জঘন্য অপরাধের কথা জানা সত্ত্বেও তার স্বামীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাত থেকে বাঁচাতে এবং পালিয়ে যেতে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন, যা তাকে সমভাবে অপরাধী করে তুলেছে। বিচারিক ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করে মাত্র চার কার্যদিবসের মধ্যে এই চাঞ্চল্যকর মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করা হয়। গত ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়েছিল, যার পরদিনই অর্থাৎ ২ জুনে মামলার ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনেরই জবানবন্দি গ্রহণ শেষ হয়। এরপর ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি এবং ৪ জুন উভয় পক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে আদালত রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন। রবিবারের এই রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত চত্বরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, যেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদেরও সতর্ক অবস্থানে দেখা যায়।
এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের মামলার বিবরণী ও এজাহার থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে নয়টার দিকে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী রামিসা আক্তার প্রতিদিনের মতো বাসা থেকে বের হয়েছিল। সেই সময় প্রতিবেশী স্বপ্না আক্তার কৌশলে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে শিশুটিকে নিজেদের ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে যান। পরবর্তীতে সকাল সাড়ে দশটার দিকে রামিসার মা তার মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পুরো এলাকায় না পেয়ে একপর্যায়ে তিনি প্রতিবেশী সোহেল রানার বন্ধ দরজার সামনে তার মেয়ের জুতা জোড়া পড়ে থাকতে দেখেন। এই দেখে সন্দেহ হলে তিনি বারবার দরজায় করাঘাত করেন এবং অনেক ডাকাডাকি করার পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে রামিসার বাবা-মাসহ ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারা সমবেত হয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মাথাবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ এবং পাশে থাকা একটি বড় প্লাস্টিকের বালতির ভেতর তার বিচ্ছিন্ন মাথাটি উদ্ধার করা হয়, যা দেখে পুরো এলাকায় স্তব্ধতা নেমে আসে।
এই ভয়াবহ ঘটনার পর উপস্থিত জনতা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরে ফোন দিলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে জনরোষ থেকে স্বপ্না আক্তারকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। তবে ঘটনার মূল হোতা সোহেল রানা ঘরের পেছনের জানালার গ্রিল কেটে কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সম্মুখভাগ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এই অমানবিক ও নৃশংস ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ২০ মে পল্লবী থানায় রামিসার বাবা বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন, যার দ্রুত বিচার শেষে আদালত এই ঐতিহাসিক ও দৃষ্টান্তমূলক রায় প্রদান করলেন।

আপনার মতামত লিখুন