দিকপাল

হাদি হত্যাকাণ্ডে মমতার জালে অমিত শাহ


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬ | ০২:০৬ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

হাদি হত্যাকাণ্ডে মমতার জালে অমিত শাহ

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অভূতপূর্ব ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। দেড় দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক একটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে অত্যন্ত বিস্ফোরক দাবি করেছেন। ভারতের শাসনব্যবস্থা অনুযায়ী, সাধারণত প্রতিটি রাজ্যের পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর অধীনেই পরিচালিত হয় এবং বেশিরভাগ রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিজের হাতে রাখেন। পশ্চিমবঙ্গও এর ব্যতিক্রম নয়, যার ফলে রাজ্যের পুরো পুলিশ বাহিনী এবং বিশেষায়িত গোয়েন্দা শাখা সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। এই প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে রাজ্য পুলিশের গোপন গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো সরাসরি তাঁর কাছে পৌঁছায়। ফলশ্রুতিতে, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো বিশেষ অভিযান বা স্পর্শকাতর ঘটনা সম্পর্কে তিনি যখন কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য জনসমক্ষে উপস্থাপন করেন, তখন তা নিয়ে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক মহলে সংশয় প্রকাশের তেমন কোনো অবকাশ থাকে না।

সম্প্রতি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ধর্মতলায় আয়োজিত এক বিশাল রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচীতে বক্তব্য রাখার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশের সামাজিক সংগঠন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর অন্যতম প্রধান মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে এমন কিছু তথ্য প্রকাশ করেছেন, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের তোলপাড় সৃষ্টি করতে পারে। তিনি প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন যে, হাদি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আসলে কারা জড়িত ছিল, কোন শক্তির ইশারায় এই নৃশংস অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং এর পেছনে কার মূল নির্দেশ ছিল, তার সমস্ত গোপন নথিপত্র এবং আদ্যোপান্ত তিনি বিস্তারিতভাবে জানেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা এই চাঞ্চল্যকর ও ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামিদের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স অত্যন্ত দক্ষতার সাথে গ্রেপ্তার করেছিল, যা নিয়ে বাংলাদেশেও ব্যাপক শোরগোল হয়। অন্য একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলার আইনি অধিকার তাঁর নেই উল্লেখ করে তিনি জানান যে, হাদির খুনিরা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে মেঘালয় সীমান্ত অতিক্রম করে অত্যন্ত গোপনে পশ্চিমবঙ্গের সীমানায় প্রবেশ করেছিল। বাংলায় আসার পরপরই রাজ্য পুলিশের বিশেষ শাখা তাদের অবস্থান চিহ্নিত করে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে, যা ছিল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের জন্য এক মস্ত বড় সাফল্য।

কিন্তু এর পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ভূমিকা নিয়ে এক মারাত্মক ও নজিরবিহীন অভিযোগ তোলেন। তিনি দাবি করেন, আসামিরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর পরই ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে তাঁকে সরাসরি ফোন করেছিলেন। তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়ে বলেছিলেন যে, যেহেতু এটি দেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জাতীয় স্বার্থের সাথে জড়িত একটি বিষয়, তাই রাজ্য পুলিশ যেন এই গ্রেপ্তারের খবরটি কোনোভাবেই গণমাধ্যমে প্রকাশ না করে এবং পুরো বিষয়টি যেন কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে রাখা হয়। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, এতদিন রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ও জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে তিনি এই সত্যটি নিজের মুখেই চেপে রেখেছিলেন, কিন্তু বর্তমানে প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক অত্যাচার ও অন্যায় সব সীমানা অতিক্রম করায় আজ তিনি সত্য প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছেন। তবে দেশের স্বার্থ এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার কথা চিন্তা করে তিনি সেই মূল নির্দেশদাতার নাম এই মুহূর্তে মুখে আনছেন না, কারণ সেই নাম প্রকাশ করলে ওপার বাংলায় এক মহা বিপর্যয় ও উত্তাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অত্যন্ত সংবেদনশীল বক্তব্য থেকে কয়েকটি বিষয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীরা অপরাধ সংঘটনের পর নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছিল এবং দ্বিতীয়ত, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজেই এই আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনের ওপর সরাসরি প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছিলেন। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, অমিত শাহ কাকে দিয়ে এই হত্যাকাণ্ডটি করিয়েছেন এবং তদন্তে কাদের নাম বেরিয়ে এসেছে, তার সমস্ত বিবরণ তাঁর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি মূলত এই সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের জন্য সরাসরি ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকেই আঙুল তুলেছেন। জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া হাদি হত্যা মামলার প্রধান দুই আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং আলমগীর হোসেন বর্তমানে ভারতের একমাত্র কেন্দ্রীয় সন্ত্রাসবাদবিরোধী বিশেষ তদন্তকারী সংস্থা বা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির হেফাজতে রয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় সংস্থার হেফাজতে যাওয়ার আগে এই দুই দুর্ধর্ষ অপরাধীকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ শাখা দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল এবং সেই সময় আসামিদের দেওয়া জবানবন্দি থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সব গোপন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য জেনেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নিহত শরীফ ওসমান বিন হাদি ছিলেন মূলত ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং তাদের একতরফা আঞ্চলিক নীতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশে জনমত গঠনে এক অত্যন্ত সোচ্চার ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণে তিনি ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের একাংশের বা তাদের গোয়েন্দা সংস্থার টার্গেটে পরিণত হওয়া খুব একটা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। তবে এটি কেবল কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশের বিষয় নয়; বরং ভারতের জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক প্রভাবের বিরুদ্ধে যারা কথা বলেন, অতীতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেও তাদের ওপর এই ধরনের গুপ্তহামলা বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হত্যাকাণ্ড চালানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতাবলম্বীদের নিশ্চিহ্ন করতে ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং বা ‘র’ এবং তাদের সহযোগী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র বা ভাড়াটে খুনিদের ব্যবহার করার কুখ্যাতি সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে বেশ কয়েকবার প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বের তিনটি প্রধান দেশে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক কিছু আন্তর্জাতিক ঘটনা বিশ্লেষণ করলে হাদি হত্যাকাণ্ডের এই চক্রান্তের ধরনটি খুব সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব।

প্রথম উদাহরণটি পাওয়া যায় উত্তর আমেরিকার দেশ কানাডায়। ২০২৩ সালের ১৮ জুন ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিশিষ্ট কানাডিয়ান শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জরকে কানাডার একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের বাইরে অত্যন্ত নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে কানাডিয়ান পুলিশের নিবিড় তদন্ত শেষে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো স্বয়ং সে দেশের পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে এক ঐতিহাসিক ও বিস্ফোরক বিবৃতিতে জানান যে, প্রখ্যাত শিখ কর্মী নিজ্জর হত্যাকাণ্ডের পেছনে সরাসরি ভারতীয় সরকারের গোয়েন্দা এজেন্টদের হাত থাকার সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে। তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, ভারতের কুখ্যাত এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী চক্র 'লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং'-কে ভাড়াটে খুনি হিসেবে ব্যবহার করে এই হত্যাকাণ্ডটি সম্পন্ন করা হয়েছিল। কানাডা সরকার এই ঘটনাকে তাদের দেশের সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইনের ওপর এক চরম ও সরাসরি আঘাত হিসেবে অভিহিত করে। এর তীব্র প্রতিক্রিয়ায় দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে ফাটল ধরে এবং উভয় দেশই একে অপরের শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক ও গোয়েন্দা প্রধানদের নিজ দেশ থেকে বহিষ্কার করে, যার রেশ এখনো কাটেনি।

এই ঘটনার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র প্রকাশ করে, যা বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করে দেয়। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই-এর তদন্ত প্রতিবেদনে সবিস্তারে তুলে ধরা হয় যে, কীভাবে ভারতের একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার সরাসরি নির্দেশে নিউ ইয়র্কের মাটিতে আরেকজন প্রভাবশালী মার্কিন-শিখ নাগরিক গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যা করার জন্য এক লাখ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে একজন পেশাদার খুনি ভাড়া করার চক্রান্ত করা হয়েছিল। এই আন্তর্জাতিক চক্রান্তের মূল সমন্বয়কারী হিসেবে নিখিল গুপ্ত নামের এক বায়ান্ন বছর বয়সী ভারতীয় ব্যবসায়ীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যার সাথে আন্তর্জাতিক মাদক ও অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান চক্রের গভীর সংযোগ ছিল। তবে ভাগ্যের পরিহাসে, নিখিল গুপ্ত পান্নুনকে খুন করার জন্য একজন পেশাদার শুটার খুঁজতে গিয়ে অজান্তেই মার্কিন মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার একজন ছদ্মবেশী তথ্যদাতার সাথে যোগাযোগ করে বসেন এবং চক্রান্তের অগ্রিম হিসেবে পনেরো হাজার ডলারের লেনদেন করেন। পুরো বিষয়টি মার্কিন গোয়েন্দারা গোপনে অডিও ও ভিডিও রেকর্ডের মাধ্যমে নথিবদ্ধ করে ফেলেন, যার ফলে মার্কিন মাটিতে ভারতের এই গুপ্তহত্যার পরিকল্পনাটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুনে চেক প্রজাতন্ত্র থেকে নিখিল গুপ্তকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয় এবং ২০blank২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন ফেডারেল আদালতে তিনি নিজের অপরাধ সম্পূর্ণ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন যে, ভারতীয় এক শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তার নির্দেশেই তিনি এই চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে মার্কিন বিচার বিভাগ এই চক্রান্তের মূল মাস্টারমাইন্ড হিসেবে ভারতের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা বিকাশ যাদবের নাম প্রকাশ করে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল করে, যিনি বর্তমানে এফবিআই-এর ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় রয়েছেন।

কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও প্রতিবেশী পাকিস্তানেও ভারতের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ধারাবাহিক গুপ্তহত্যার এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করে ব্রিটেনের বিখ্যাত ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকা। ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল প্রকাশিত ওই বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ভারতীয় ও পাকিস্তানি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের গোপন নথির বরাত দিয়ে জানানো হয় যে, ২০১৯ সালের পর থেকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ তাদের রণকৌশল পরিবর্তন করে বিদেশের মাটিতে আগ্রাসী পদক্ষেপ হিসেবে গুপ্তহত্যা শুরু করে এবং এর অধীনে পাকিস্তানে অন্তত ২০টি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটানো হয়। এই হত্যাকাণ্ডগুলো মূলত সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে পরিচালিত ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার গোপন ‘স্লিপার সেল’ দ্বারা অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে সমন্বিত হতো। স্থানীয় দরিদ্র পাকিস্তানি নাগরিক বা অপরাধী চক্রকে দুবাইয়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে অথবা ধর্মীয় উগ্রবাদীদের মগজ ধোলাই করে এই লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হানা হতো, যার গোপন বৈঠকগুলো নেপাল, মালদ্বীপ এবং মরিশাসের মতো দেশগুলোতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার এই সমস্ত আন্তর্জাতিক গুপ্তহত্যার নির্মম ও পেশাদার কৌশলের সাথে আমরা যদি বাংলাদেশের ওসমাণ হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি মেলাই, তবে অত্যন্ত নিখুঁত ও হুবহু এক সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। হাদি হত্যার প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ছিলেন বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের একজন সাবেক প্রভাবশালী নেতা এবং অন্য পলাতক আসামি আলমগীর হোসেন ছিলেন যুবলীগের সক্রিয় কর্মী। বাংলাদেশের পুলিশের তদন্ত ও মামলার প্রাথমিক বিবরণী অনুযায়ী, রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা এই সন্ত্রাসী চক্রটিকে ব্যবহার করেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ওসমাণ হাদিকে সরাসরি লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে হত্যা করা হয়। আমরা জানি যে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের বহু প্রভাবশালী নেতা বর্তমানে ভারতের কলকাতা ও দিল্লির মতো জায়গায় নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করছেন এবং স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও দেশটির বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের গভীর যোগাযোগ রয়েছে। ফলে কানাডা বা পাকিস্তানের মতো, বাংলাদেশেও নিজেদের আধিপত্যবাদবিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে ভারতের রাষ্ট্রযন্ত্র এই নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী উপাদানগুলোকে ভাড়াটে খুনি হিসেবে ব্যবহার করেছে—এমন আশঙ্কা এখন আর উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় ভারতের এই গুপ্তহত্যার প্রবণতা একটি মস্ত বড় বৈশ্বিক কেলেঙ্কারি হিসেবে দেখা হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই স্বীকারোক্তি অমিত শাহ এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার আন্তর্জাতিক অপরাধের মুখোশ আরও একবার উন্মোচন করে দিল। মমতার এই বিস্ফোরক দাবির পর নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ভারতের এই বিপজ্জনক গুপ্তহত্যার সংস্কৃতির বিষয়ে আরও বেশি সতর্ক হবে। তবে বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য এটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক একটি বার্তা, তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আনুষ্ঠানিক অভিযোগের পর বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের উচিত হবে এই হত্যাকাণ্ডটিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিয়ে যাওয়া এবং জাতিসংঘের মতো বিশ্ব সংস্থার সহযোগিতায় এর একটি নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক তদন্ত নিশ্চিত করা।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


হাদি হত্যাকাণ্ডে মমতার জালে অমিত শাহ

প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬

featured Image

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অভূতপূর্ব ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। দেড় দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক একটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে অত্যন্ত বিস্ফোরক দাবি করেছেন। ভারতের শাসনব্যবস্থা অনুযায়ী, সাধারণত প্রতিটি রাজ্যের পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর অধীনেই পরিচালিত হয় এবং বেশিরভাগ রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিজের হাতে রাখেন। পশ্চিমবঙ্গও এর ব্যতিক্রম নয়, যার ফলে রাজ্যের পুরো পুলিশ বাহিনী এবং বিশেষায়িত গোয়েন্দা শাখা সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। এই প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে রাজ্য পুলিশের গোপন গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো সরাসরি তাঁর কাছে পৌঁছায়। ফলশ্রুতিতে, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো বিশেষ অভিযান বা স্পর্শকাতর ঘটনা সম্পর্কে তিনি যখন কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য জনসমক্ষে উপস্থাপন করেন, তখন তা নিয়ে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক মহলে সংশয় প্রকাশের তেমন কোনো অবকাশ থাকে না।

সম্প্রতি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ধর্মতলায় আয়োজিত এক বিশাল রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচীতে বক্তব্য রাখার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশের সামাজিক সংগঠন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর অন্যতম প্রধান মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে এমন কিছু তথ্য প্রকাশ করেছেন, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের তোলপাড় সৃষ্টি করতে পারে। তিনি প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন যে, হাদি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আসলে কারা জড়িত ছিল, কোন শক্তির ইশারায় এই নৃশংস অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং এর পেছনে কার মূল নির্দেশ ছিল, তার সমস্ত গোপন নথিপত্র এবং আদ্যোপান্ত তিনি বিস্তারিতভাবে জানেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা এই চাঞ্চল্যকর ও ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামিদের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স অত্যন্ত দক্ষতার সাথে গ্রেপ্তার করেছিল, যা নিয়ে বাংলাদেশেও ব্যাপক শোরগোল হয়। অন্য একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলার আইনি অধিকার তাঁর নেই উল্লেখ করে তিনি জানান যে, হাদির খুনিরা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে মেঘালয় সীমান্ত অতিক্রম করে অত্যন্ত গোপনে পশ্চিমবঙ্গের সীমানায় প্রবেশ করেছিল। বাংলায় আসার পরপরই রাজ্য পুলিশের বিশেষ শাখা তাদের অবস্থান চিহ্নিত করে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে, যা ছিল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের জন্য এক মস্ত বড় সাফল্য।

কিন্তু এর পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ভূমিকা নিয়ে এক মারাত্মক ও নজিরবিহীন অভিযোগ তোলেন। তিনি দাবি করেন, আসামিরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর পরই ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে তাঁকে সরাসরি ফোন করেছিলেন। তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়ে বলেছিলেন যে, যেহেতু এটি দেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জাতীয় স্বার্থের সাথে জড়িত একটি বিষয়, তাই রাজ্য পুলিশ যেন এই গ্রেপ্তারের খবরটি কোনোভাবেই গণমাধ্যমে প্রকাশ না করে এবং পুরো বিষয়টি যেন কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে রাখা হয়। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, এতদিন রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ও জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে তিনি এই সত্যটি নিজের মুখেই চেপে রেখেছিলেন, কিন্তু বর্তমানে প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক অত্যাচার ও অন্যায় সব সীমানা অতিক্রম করায় আজ তিনি সত্য প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছেন। তবে দেশের স্বার্থ এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার কথা চিন্তা করে তিনি সেই মূল নির্দেশদাতার নাম এই মুহূর্তে মুখে আনছেন না, কারণ সেই নাম প্রকাশ করলে ওপার বাংলায় এক মহা বিপর্যয় ও উত্তাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অত্যন্ত সংবেদনশীল বক্তব্য থেকে কয়েকটি বিষয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীরা অপরাধ সংঘটনের পর নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছিল এবং দ্বিতীয়ত, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজেই এই আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনের ওপর সরাসরি প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছিলেন। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, অমিত শাহ কাকে দিয়ে এই হত্যাকাণ্ডটি করিয়েছেন এবং তদন্তে কাদের নাম বেরিয়ে এসেছে, তার সমস্ত বিবরণ তাঁর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি মূলত এই সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের জন্য সরাসরি ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকেই আঙুল তুলেছেন। জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া হাদি হত্যা মামলার প্রধান দুই আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং আলমগীর হোসেন বর্তমানে ভারতের একমাত্র কেন্দ্রীয় সন্ত্রাসবাদবিরোধী বিশেষ তদন্তকারী সংস্থা বা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির হেফাজতে রয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় সংস্থার হেফাজতে যাওয়ার আগে এই দুই দুর্ধর্ষ অপরাধীকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ শাখা দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল এবং সেই সময় আসামিদের দেওয়া জবানবন্দি থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সব গোপন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য জেনেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নিহত শরীফ ওসমান বিন হাদি ছিলেন মূলত ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং তাদের একতরফা আঞ্চলিক নীতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশে জনমত গঠনে এক অত্যন্ত সোচ্চার ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণে তিনি ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের একাংশের বা তাদের গোয়েন্দা সংস্থার টার্গেটে পরিণত হওয়া খুব একটা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। তবে এটি কেবল কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশের বিষয় নয়; বরং ভারতের জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক প্রভাবের বিরুদ্ধে যারা কথা বলেন, অতীতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেও তাদের ওপর এই ধরনের গুপ্তহামলা বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হত্যাকাণ্ড চালানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতাবলম্বীদের নিশ্চিহ্ন করতে ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং বা ‘র’ এবং তাদের সহযোগী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র বা ভাড়াটে খুনিদের ব্যবহার করার কুখ্যাতি সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে বেশ কয়েকবার প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বের তিনটি প্রধান দেশে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক কিছু আন্তর্জাতিক ঘটনা বিশ্লেষণ করলে হাদি হত্যাকাণ্ডের এই চক্রান্তের ধরনটি খুব সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব।

প্রথম উদাহরণটি পাওয়া যায় উত্তর আমেরিকার দেশ কানাডায়। ২০২৩ সালের ১৮ জুন ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিশিষ্ট কানাডিয়ান শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জরকে কানাডার একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের বাইরে অত্যন্ত নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে কানাডিয়ান পুলিশের নিবিড় তদন্ত শেষে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো স্বয়ং সে দেশের পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে এক ঐতিহাসিক ও বিস্ফোরক বিবৃতিতে জানান যে, প্রখ্যাত শিখ কর্মী নিজ্জর হত্যাকাণ্ডের পেছনে সরাসরি ভারতীয় সরকারের গোয়েন্দা এজেন্টদের হাত থাকার সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে। তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, ভারতের কুখ্যাত এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী চক্র 'লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং'-কে ভাড়াটে খুনি হিসেবে ব্যবহার করে এই হত্যাকাণ্ডটি সম্পন্ন করা হয়েছিল। কানাডা সরকার এই ঘটনাকে তাদের দেশের সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইনের ওপর এক চরম ও সরাসরি আঘাত হিসেবে অভিহিত করে। এর তীব্র প্রতিক্রিয়ায় দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে ফাটল ধরে এবং উভয় দেশই একে অপরের শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক ও গোয়েন্দা প্রধানদের নিজ দেশ থেকে বহিষ্কার করে, যার রেশ এখনো কাটেনি।

এই ঘটনার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র প্রকাশ করে, যা বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করে দেয়। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই-এর তদন্ত প্রতিবেদনে সবিস্তারে তুলে ধরা হয় যে, কীভাবে ভারতের একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার সরাসরি নির্দেশে নিউ ইয়র্কের মাটিতে আরেকজন প্রভাবশালী মার্কিন-শিখ নাগরিক গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যা করার জন্য এক লাখ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে একজন পেশাদার খুনি ভাড়া করার চক্রান্ত করা হয়েছিল। এই আন্তর্জাতিক চক্রান্তের মূল সমন্বয়কারী হিসেবে নিখিল গুপ্ত নামের এক বায়ান্ন বছর বয়সী ভারতীয় ব্যবসায়ীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যার সাথে আন্তর্জাতিক মাদক ও অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান চক্রের গভীর সংযোগ ছিল। তবে ভাগ্যের পরিহাসে, নিখিল গুপ্ত পান্নুনকে খুন করার জন্য একজন পেশাদার শুটার খুঁজতে গিয়ে অজান্তেই মার্কিন মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার একজন ছদ্মবেশী তথ্যদাতার সাথে যোগাযোগ করে বসেন এবং চক্রান্তের অগ্রিম হিসেবে পনেরো হাজার ডলারের লেনদেন করেন। পুরো বিষয়টি মার্কিন গোয়েন্দারা গোপনে অডিও ও ভিডিও রেকর্ডের মাধ্যমে নথিবদ্ধ করে ফেলেন, যার ফলে মার্কিন মাটিতে ভারতের এই গুপ্তহত্যার পরিকল্পনাটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুনে চেক প্রজাতন্ত্র থেকে নিখিল গুপ্তকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয় এবং ২০blank২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন ফেডারেল আদালতে তিনি নিজের অপরাধ সম্পূর্ণ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন যে, ভারতীয় এক শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তার নির্দেশেই তিনি এই চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে মার্কিন বিচার বিভাগ এই চক্রান্তের মূল মাস্টারমাইন্ড হিসেবে ভারতের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা বিকাশ যাদবের নাম প্রকাশ করে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল করে, যিনি বর্তমানে এফবিআই-এর ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় রয়েছেন।

কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও প্রতিবেশী পাকিস্তানেও ভারতের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ধারাবাহিক গুপ্তহত্যার এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করে ব্রিটেনের বিখ্যাত ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকা। ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল প্রকাশিত ওই বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ভারতীয় ও পাকিস্তানি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের গোপন নথির বরাত দিয়ে জানানো হয় যে, ২০১৯ সালের পর থেকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ তাদের রণকৌশল পরিবর্তন করে বিদেশের মাটিতে আগ্রাসী পদক্ষেপ হিসেবে গুপ্তহত্যা শুরু করে এবং এর অধীনে পাকিস্তানে অন্তত ২০টি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটানো হয়। এই হত্যাকাণ্ডগুলো মূলত সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে পরিচালিত ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার গোপন ‘স্লিপার সেল’ দ্বারা অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে সমন্বিত হতো। স্থানীয় দরিদ্র পাকিস্তানি নাগরিক বা অপরাধী চক্রকে দুবাইয়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে অথবা ধর্মীয় উগ্রবাদীদের মগজ ধোলাই করে এই লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হানা হতো, যার গোপন বৈঠকগুলো নেপাল, মালদ্বীপ এবং মরিশাসের মতো দেশগুলোতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার এই সমস্ত আন্তর্জাতিক গুপ্তহত্যার নির্মম ও পেশাদার কৌশলের সাথে আমরা যদি বাংলাদেশের ওসমাণ হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি মেলাই, তবে অত্যন্ত নিখুঁত ও হুবহু এক সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। হাদি হত্যার প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ছিলেন বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের একজন সাবেক প্রভাবশালী নেতা এবং অন্য পলাতক আসামি আলমগীর হোসেন ছিলেন যুবলীগের সক্রিয় কর্মী। বাংলাদেশের পুলিশের তদন্ত ও মামলার প্রাথমিক বিবরণী অনুযায়ী, রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা এই সন্ত্রাসী চক্রটিকে ব্যবহার করেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ওসমাণ হাদিকে সরাসরি লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে হত্যা করা হয়। আমরা জানি যে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের বহু প্রভাবশালী নেতা বর্তমানে ভারতের কলকাতা ও দিল্লির মতো জায়গায় নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করছেন এবং স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও দেশটির বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের গভীর যোগাযোগ রয়েছে। ফলে কানাডা বা পাকিস্তানের মতো, বাংলাদেশেও নিজেদের আধিপত্যবাদবিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে ভারতের রাষ্ট্রযন্ত্র এই নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী উপাদানগুলোকে ভাড়াটে খুনি হিসেবে ব্যবহার করেছে—এমন আশঙ্কা এখন আর উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় ভারতের এই গুপ্তহত্যার প্রবণতা একটি মস্ত বড় বৈশ্বিক কেলেঙ্কারি হিসেবে দেখা হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই স্বীকারোক্তি অমিত শাহ এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার আন্তর্জাতিক অপরাধের মুখোশ আরও একবার উন্মোচন করে দিল। মমতার এই বিস্ফোরক দাবির পর নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ভারতের এই বিপজ্জনক গুপ্তহত্যার সংস্কৃতির বিষয়ে আরও বেশি সতর্ক হবে। তবে বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য এটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক একটি বার্তা, তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আনুষ্ঠানিক অভিযোগের পর বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের উচিত হবে এই হত্যাকাণ্ডটিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিয়ে যাওয়া এবং জাতিসংঘের মতো বিশ্ব সংস্থার সহযোগিতায় এর একটি নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক তদন্ত নিশ্চিত করা।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল