দিকপাল

পূর্ণোদ্যমে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান শুরুর ঘোষণা সরকারের


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : সোমবার, ২৫ মে ২০২৬ | ০৩:১৮ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

পূর্ণোদ্যমে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান শুরুর ঘোষণা সরকারের

বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলসীমায় লুকিয়ে থাকা বিপুল পরিমাণ তেল, গ্যাস ও অন্যান্য মূল্যবান খনিজসম্পদ উত্তোলনের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি খাতের রূপান্তরে এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। দেশের সমুদ্রসীমার গভীর ও অগভীর অঞ্চলের মোট ২৬টি ব্লকে এই অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ও নামী বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলো অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। সরকারের লক্ষ্য হলো, সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে ২০২৭ সালের মধ্যেই সাগরে এই অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করা। দীর্ঘমেয়াদী এই প্রকল্পের আওতায় যোগ্য ও নির্বাচিত কোম্পানির সঙ্গে গ্যাস উত্তোলনের জন্য ২৫ বছর এবং তেল উত্তোলনের জন্য ২০ বছর মেয়াদি চুক্তি করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এই নতুন জ্বালানি নীতি ও উৎপাদন বণ্টন চুক্তি এবং দরপত্র প্রক্রিয়ার নানাদিক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের সচিব সাইফুল ইসলাম। দেশের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান এই দরপত্রের মূল শর্ত ও কারিগরি বিষয়গুলো একটি বিস্তারিত প্রবন্ধের মাধ্যমে সবার সামনে তুলে ধরেন।


সংবাদ সম্মেলনে সাগরে খনিজসম্পদ অনুসন্ধানের যৌক্তিকতা ও গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই খাতে কোনো বাস্তবমুখী বা কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় দেশের সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ বহু বছর আগেই সুরাহা হয়ে গেছে। সেই প্রতিবেশী দেশগুলো নিজেদের জলসীমায় সফলভাবে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন সম্পন্ন করে তা ইতিমধ্যে বিদেশে রপ্তানিও শুরু করে দিয়েছে। অথচ বাংলাদেশে এই অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কেবল কালক্ষেপণ ও নানা ধরনের টালবাহানা করা হয়েছে। মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ১৯৯৩ সালে বিএনপি সরকারের সময় দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে যে গতিশীলতা তৈরি হয়েছিল, এবারও বর্তমান সরকারের হাত ধরে এই খাতে এক ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জিত হবে। এই প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত অভিযোগ করেন, বিগত সরকার দেশের মাটির নিচে থাকা নিজস্ব সম্পদ উত্তোলন না করে কেবল বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করার নীতিকে উৎসাহিত করেছিল। বর্তমান প্রশাসন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পরনির্ভরশীলতা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে এবং দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

নতুন খসড়া চুক্তি বা মডেল উৎপাদন বণ্টন চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, পুরো অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার জন্য মোট ৯ বছর সময় দেওয়া হবে। এর মধ্যে প্রথম ৪ বছরের মধ্যে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে সমুদ্রের ভূগর্ভস্থ গঠন পরীক্ষা বা ভূতাত্ত্বিক জরিপ এবং দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক জরিপ সম্পন্ন করতে হবে। জরিপের কাজ শেষ হওয়ার পর কূপ খননের জন্য পরবর্তী ২ বছর সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপরের ৩ বছরের মধ্যে কোম্পানিগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে মূল উৎপাদনে যেতে হবে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রাথমিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ করা সব কোম্পানির জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এই চুক্তির আর্থিক নিরাপত্তা ও লভ্যাংশের বিষয়ে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, কোনো কোম্পানি কাজ পাওয়ার পর জরিপ শুরু করার আগেই তাদের ৩০ লাখ মার্কিন ডলার ব্যাংক জামানত হিসেবে জমা দিতে হবে। এরপর সমুদ্রের বুকে মূল কূপ খননের কাজ শুরু করার আগে আরও ২ কোটি ডলার এবং পরবর্তীতে গ্যাস বা তেলের সন্ধান পাওয়া গেলে তা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের ঠিক আগে আরও ২ কোটি ডলার ব্যাংক গ্যারান্টি হিসেবে জমা দিতে হবে। বিদেশি কোম্পানিগুলো অনুসন্ধান ও উত্তোলনে যে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করবে, তা উত্তোলিত তেল বা গ্যাস বিক্রির টাকা থেকে পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়ার সুযোগ পাবে। তবে কোনো অর্থবছরই তারা মোট খরচের ৭৫ শতাংশের বেশি অর্থ একবারে তুলতে পারবে না। খরচ বাদে বাকি যে লভ্যাংশ বা লাভ অবশিষ্ট থাকবে, তা পেট্রোবাংলা এবং সংশ্লিষ্ট বিদেশি কোম্পানির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে বণ্টন করা হবে। অগভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার লাভের অংশ থাকবে ৪০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং গভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে তা হবে ৩৫ থেকে ৬০ শতাংশ। বাকি অংশটি পাবে উত্তোলনকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠান। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনের সব স্তরে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে সব ধরনের শুল্ক সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে।


নতুন এই চুক্তিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও কিছু আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। সমুদ্রে তেল বা গ্যাস পাওয়া গেলে বিদেশি কোম্পানিগুলো তা আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করার অধিকার পাবে, তবে সে ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলা সেই জ্বালানি নিজে কেনার জন্য সবার আগে অগ্রাধিকার পাবে। যদি পেট্রোবাংলা তা কিনতে অসমর্থ হয় বা না নেয়, তবেই কোম্পানিগুলো তা বাইরে রপ্তানি করতে পারবে। গ্যাসের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে এটি সমন্বয় করা হবে। চুক্তিতে গ্যাসের একটি সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন দামের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। গভীর সমুদ্রের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের যা দাম থাকবে, গ্যাসের দাম হবে তার ঠিক ১১ শতাংশ। উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক বাজারে যদি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার হয়, তবে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম হবে ১১ ডলার। বিশ্ববাজারে তেলের দাম এর চেয়ে যতই বাড়ুক না কেন, গ্যাসের দাম কখনোই প্রতি হাজার ঘনফুটে ১১ ডলারের বেশি হবে না। একইভাবে তেলের দাম অনেক কমে গেলেও গ্যাসের দাম কখনোই সাড়ে ৭ ডলারের নিচে নামবে না। অন্যদিকে, অগভীর সমুদ্রের ব্লকের জন্য গ্যাসের সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করা হয়েছে সাড় ১০ ডলার।


এছাড়াও দেশের প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী সব ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠানে মোট লাভের ৫ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও, সমুদ্রের এই বিশাল ও ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে বিনিয়োগকারীদের জন্য এই হার কমিয়ে মাত্র দেড় শতাংশ করা হয়েছে। সমুদ্র থেকে তেল বা গ্যাস মূল ভূখণ্ডে নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় পাইপলাইন নির্মাণের সম্পূর্ণ খরচ ও দায়দায়িত্ব বহন করতে হবে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে। এ ক্ষেত্রে সমুদ্রের গভীরতা, তীরের দূরত্ব এবং খনির সম্ভাব্য মজুদের পরিমাণ বিবেচনা করা হবে। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে অগভীর সমুদ্রের ব্লকে তাদের জন্য ১০ শতাংশ অংশীদারিত্ব বা হিস্যা রাখা হয়েছে, তবে গভীর সমুদ্রের অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল ব্লকে বাপেক্সের কোনো অংশ থাকবে না। প্রাথমিকভাবে চুক্তির মেয়াদ গ্যাসক্ষেত্রের জন্য ২৫ বছর এবং তেলখনির জন্য ২০ বছর করা হলেও, প্রয়োজনবোধে উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই মেয়াদ আরও ১০ বছর বাড়ানো যাবে।


সংবাদ সম্মেলনের শেষ অংশে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশের জ্বালানি অনুসন্ধানে একটি নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে উল্লেখ করে বলেন, অতীতে দেশের স্বার্থ রক্ষা করে যেভাবে দেশীয় কোম্পানির সক্ষমতা বাড়ানো এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আনা হয়েছিল, বর্তমান সরকারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে। সমুদ্রের তলদেশে খনিজ অনুসন্ধান অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ একটি কাজ, যার জন্য প্রায় ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলারের বিপুল তহবিলের প্রয়োজন হয়। চুক্তি অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যদি সাগরে অনুসন্ধান চালিয়ে তেল বা গ্যাস খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়, তবে সরকার তাদের বিনিয়োগ করা কোনো অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে না এবং তাদের জমা দেওয়া ব্যাংক গ্যারান্টির অর্থও বাজেয়াপ্ত করা হবে। এই কারণে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে যেন বড় বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগ করতে আসে, নতুন চুক্তিতে সেই বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক এই দরপত্র আহ্বানের ফলে বিশ্বের বড় বড় বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচক সাড়া দেবেন এবং তাদের উন্নত প্রযুক্তি ও কর্মতৎপরতার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের বুক থেকে নতুন নতুন গ্যাস ও তেল ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হবে বলে সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।

 

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬


পূর্ণোদ্যমে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান শুরুর ঘোষণা সরকারের

প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬

featured Image

বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলসীমায় লুকিয়ে থাকা বিপুল পরিমাণ তেল, গ্যাস ও অন্যান্য মূল্যবান খনিজসম্পদ উত্তোলনের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি খাতের রূপান্তরে এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। দেশের সমুদ্রসীমার গভীর ও অগভীর অঞ্চলের মোট ২৬টি ব্লকে এই অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ও নামী বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলো অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। সরকারের লক্ষ্য হলো, সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে ২০২৭ সালের মধ্যেই সাগরে এই অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করা। দীর্ঘমেয়াদী এই প্রকল্পের আওতায় যোগ্য ও নির্বাচিত কোম্পানির সঙ্গে গ্যাস উত্তোলনের জন্য ২৫ বছর এবং তেল উত্তোলনের জন্য ২০ বছর মেয়াদি চুক্তি করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এই নতুন জ্বালানি নীতি ও উৎপাদন বণ্টন চুক্তি এবং দরপত্র প্রক্রিয়ার নানাদিক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের সচিব সাইফুল ইসলাম। দেশের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান এই দরপত্রের মূল শর্ত ও কারিগরি বিষয়গুলো একটি বিস্তারিত প্রবন্ধের মাধ্যমে সবার সামনে তুলে ধরেন।


সংবাদ সম্মেলনে সাগরে খনিজসম্পদ অনুসন্ধানের যৌক্তিকতা ও গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই খাতে কোনো বাস্তবমুখী বা কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় দেশের সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ বহু বছর আগেই সুরাহা হয়ে গেছে। সেই প্রতিবেশী দেশগুলো নিজেদের জলসীমায় সফলভাবে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন সম্পন্ন করে তা ইতিমধ্যে বিদেশে রপ্তানিও শুরু করে দিয়েছে। অথচ বাংলাদেশে এই অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কেবল কালক্ষেপণ ও নানা ধরনের টালবাহানা করা হয়েছে। মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ১৯৯৩ সালে বিএনপি সরকারের সময় দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে যে গতিশীলতা তৈরি হয়েছিল, এবারও বর্তমান সরকারের হাত ধরে এই খাতে এক ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জিত হবে। এই প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত অভিযোগ করেন, বিগত সরকার দেশের মাটির নিচে থাকা নিজস্ব সম্পদ উত্তোলন না করে কেবল বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করার নীতিকে উৎসাহিত করেছিল। বর্তমান প্রশাসন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পরনির্ভরশীলতা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে এবং দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

নতুন খসড়া চুক্তি বা মডেল উৎপাদন বণ্টন চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, পুরো অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার জন্য মোট ৯ বছর সময় দেওয়া হবে। এর মধ্যে প্রথম ৪ বছরের মধ্যে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে সমুদ্রের ভূগর্ভস্থ গঠন পরীক্ষা বা ভূতাত্ত্বিক জরিপ এবং দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক জরিপ সম্পন্ন করতে হবে। জরিপের কাজ শেষ হওয়ার পর কূপ খননের জন্য পরবর্তী ২ বছর সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপরের ৩ বছরের মধ্যে কোম্পানিগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে মূল উৎপাদনে যেতে হবে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রাথমিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ করা সব কোম্পানির জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এই চুক্তির আর্থিক নিরাপত্তা ও লভ্যাংশের বিষয়ে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, কোনো কোম্পানি কাজ পাওয়ার পর জরিপ শুরু করার আগেই তাদের ৩০ লাখ মার্কিন ডলার ব্যাংক জামানত হিসেবে জমা দিতে হবে। এরপর সমুদ্রের বুকে মূল কূপ খননের কাজ শুরু করার আগে আরও ২ কোটি ডলার এবং পরবর্তীতে গ্যাস বা তেলের সন্ধান পাওয়া গেলে তা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের ঠিক আগে আরও ২ কোটি ডলার ব্যাংক গ্যারান্টি হিসেবে জমা দিতে হবে। বিদেশি কোম্পানিগুলো অনুসন্ধান ও উত্তোলনে যে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করবে, তা উত্তোলিত তেল বা গ্যাস বিক্রির টাকা থেকে পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়ার সুযোগ পাবে। তবে কোনো অর্থবছরই তারা মোট খরচের ৭৫ শতাংশের বেশি অর্থ একবারে তুলতে পারবে না। খরচ বাদে বাকি যে লভ্যাংশ বা লাভ অবশিষ্ট থাকবে, তা পেট্রোবাংলা এবং সংশ্লিষ্ট বিদেশি কোম্পানির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে বণ্টন করা হবে। অগভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার লাভের অংশ থাকবে ৪০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং গভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে তা হবে ৩৫ থেকে ৬০ শতাংশ। বাকি অংশটি পাবে উত্তোলনকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠান। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনের সব স্তরে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে সব ধরনের শুল্ক সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে।


নতুন এই চুক্তিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও কিছু আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। সমুদ্রে তেল বা গ্যাস পাওয়া গেলে বিদেশি কোম্পানিগুলো তা আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করার অধিকার পাবে, তবে সে ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলা সেই জ্বালানি নিজে কেনার জন্য সবার আগে অগ্রাধিকার পাবে। যদি পেট্রোবাংলা তা কিনতে অসমর্থ হয় বা না নেয়, তবেই কোম্পানিগুলো তা বাইরে রপ্তানি করতে পারবে। গ্যাসের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে এটি সমন্বয় করা হবে। চুক্তিতে গ্যাসের একটি সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন দামের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। গভীর সমুদ্রের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের যা দাম থাকবে, গ্যাসের দাম হবে তার ঠিক ১১ শতাংশ। উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক বাজারে যদি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার হয়, তবে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম হবে ১১ ডলার। বিশ্ববাজারে তেলের দাম এর চেয়ে যতই বাড়ুক না কেন, গ্যাসের দাম কখনোই প্রতি হাজার ঘনফুটে ১১ ডলারের বেশি হবে না। একইভাবে তেলের দাম অনেক কমে গেলেও গ্যাসের দাম কখনোই সাড়ে ৭ ডলারের নিচে নামবে না। অন্যদিকে, অগভীর সমুদ্রের ব্লকের জন্য গ্যাসের সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করা হয়েছে সাড় ১০ ডলার।


এছাড়াও দেশের প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী সব ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠানে মোট লাভের ৫ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও, সমুদ্রের এই বিশাল ও ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে বিনিয়োগকারীদের জন্য এই হার কমিয়ে মাত্র দেড় শতাংশ করা হয়েছে। সমুদ্র থেকে তেল বা গ্যাস মূল ভূখণ্ডে নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় পাইপলাইন নির্মাণের সম্পূর্ণ খরচ ও দায়দায়িত্ব বহন করতে হবে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে। এ ক্ষেত্রে সমুদ্রের গভীরতা, তীরের দূরত্ব এবং খনির সম্ভাব্য মজুদের পরিমাণ বিবেচনা করা হবে। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে অগভীর সমুদ্রের ব্লকে তাদের জন্য ১০ শতাংশ অংশীদারিত্ব বা হিস্যা রাখা হয়েছে, তবে গভীর সমুদ্রের অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল ব্লকে বাপেক্সের কোনো অংশ থাকবে না। প্রাথমিকভাবে চুক্তির মেয়াদ গ্যাসক্ষেত্রের জন্য ২৫ বছর এবং তেলখনির জন্য ২০ বছর করা হলেও, প্রয়োজনবোধে উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই মেয়াদ আরও ১০ বছর বাড়ানো যাবে।


সংবাদ সম্মেলনের শেষ অংশে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশের জ্বালানি অনুসন্ধানে একটি নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে উল্লেখ করে বলেন, অতীতে দেশের স্বার্থ রক্ষা করে যেভাবে দেশীয় কোম্পানির সক্ষমতা বাড়ানো এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আনা হয়েছিল, বর্তমান সরকারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে। সমুদ্রের তলদেশে খনিজ অনুসন্ধান অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ একটি কাজ, যার জন্য প্রায় ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলারের বিপুল তহবিলের প্রয়োজন হয়। চুক্তি অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যদি সাগরে অনুসন্ধান চালিয়ে তেল বা গ্যাস খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়, তবে সরকার তাদের বিনিয়োগ করা কোনো অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে না এবং তাদের জমা দেওয়া ব্যাংক গ্যারান্টির অর্থও বাজেয়াপ্ত করা হবে। এই কারণে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে যেন বড় বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগ করতে আসে, নতুন চুক্তিতে সেই বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক এই দরপত্র আহ্বানের ফলে বিশ্বের বড় বড় বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচক সাড়া দেবেন এবং তাদের উন্নত প্রযুক্তি ও কর্মতৎপরতার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের বুক থেকে নতুন নতুন গ্যাস ও তেল ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হবে বলে সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।

 


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল