ভারতের কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডর, যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘চিকেনস নেক’ বা মুরগির গলা নামে বহুল পরিচিত, তার নিরাপত্তা বলয়কে নিশ্ছিদ্র করতে এক নজিরবিহীন ও বিশাল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সংযোগ রক্ষাকারী এই অত্যন্ত সরু ও স্পর্শকাতর করিডরটির নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই ভারতের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ছিল। বর্তমান পরিবর্তিত বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই করিডরের সুরক্ষা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের জন্য নতুন সামরিক ঘাঁটি ও পরিকাঠামো নির্মাণে বিপুল পরিমাণ জমি বরাদ্দের এক বিশাল প্রক্রিয়া শুরু করেছে রাজ্য প্রশাসন। শুধু জমি দেওয়াই নয়, আন্তর্জাতিক সীমান্তে নিরেট কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, নতুন আধুনিক সীমান্ত চৌকি স্থাপন এবং সামগ্রিক সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব আধুনিকায়নের ওপর এখন সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।
নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, শিলিগুড়ি করিডরের কৌশলগত গুরুত্ব ভারতের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য কতটা অপরিসীম, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। যেকোনো যুদ্ধকালীন বা জরুরি পরিস্থিতিতে শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলো যদি এই সরু অংশটি কোনোভাবে অবরুদ্ধ করতে পারে, তবে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে উত্তর-পূর্ব ভারত সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এই মারাত্মক ঝুঁকি এড়াতে এবং সম্ভাব্য সব ধরনের সামরিক হুমকি মোকাবিলায় এখন কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজ্য সরকারও এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্ভেদ্য প্রাচীরে পরিণত করতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক সূত্রে প্রাপ্ত অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই প্রায় ১২০ একর জমি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হয়েছে, যেখানে দ্রুত গতিতে পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। এর পাশাপাশি, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান বন্ধে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া এবং নতুন সীমান্ত চৌকি বা ক্যাম্প নির্মাণের জন্য আরও প্রায় ৮৮ একর জমি সরাসরি বাজার থেকে কেনার আইনি অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মাঝেই শিলিগুড়িতে একটি সম্পূর্ণ নতুন ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর বা হেডকোয়ার্টার তৈরির উদ্দেশ্যে আরও অতিরিক্ত ছয় একর জমি চেয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। শুধু সীমান্তরক্ষী বাহিনীই নয়, চীনের সঙ্গে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা পাহারা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশও এই অঞ্চলে তাদের একটি বিশাল বেসক্যাম্প বা ঘাঁটি নির্মাণের জন্য ১০০ একর জমির জন্য রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করেছে।
নবান্নের প্রশাসনিক অলিন্দ থেকে জানা গেছে যে, দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবই এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আন্তর্জাতিক সীমান্ত সুরক্ষাকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক সীমান্তে ২৪ ঘণ্টা কঠোর নজরদারি বজায় রাখা, অবৈধ অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং চোরাচালান রোধে জিরো টলারেন্স নীতি বা শূন্য সহনশীলতা নীতি ঘোষণা করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনার পর ইতিমধ্যেই উত্তরবঙ্গের সীমান্ত সংলগ্ন বেশ কিছু স্পর্শকাতর এলাকায় নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হয়ে গেছে।
এবারের প্রতিরক্ষা কৌশলে কেবল সীমান্ত পাহারা দেওয়ার প্রথাগত ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা হয়নি, বরং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সেনা চলাচল এবং ভারী সামরিক সরঞ্জাম ও যুদ্ধাস্ত্র পরিবহণ সহজ করতে এক সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও সামরিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত সংলগ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাতটি রাজ্য সড়ক বা স্টেট হাইওয়েকে জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের হাতে পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয়েছে, যাতে সেগুলোকে দ্রুত প্রশস্ত ও মজবুত আন্তর্জাতিক মানের সড়কে রূপান্তরিত করা যায়। এর ফলে প্রত্যন্ত সীমান্ত ঘাঁটিগুলোতে রসদ ও অস্ত্রশস্ত্র দ্রুত পৌঁছে দেওয়া যাবে এবং যেকোনো আকস্মিক উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে দ্রুত সেনা মোতায়েন করা অনেক সহজ হবে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ার বর্তমান উত্তপ্ত ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা ভারতের জাতীয় সুরক্ষার জন্য আগের চেয়ে শতগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশের স্থায়ী অবসান, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান বন্ধ এবং যেকোনো বাহ্যিক সামরিক ঝুঁকি মোকাবিলায় এই নতুন গড়ে ওঠা বিশাল সামরিক অবকাঠামো ভবিষ্যতে ভারতের জন্য একটি অভেদ্য ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

রোববার, ২৪ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬
ভারতের কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডর, যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘চিকেনস নেক’ বা মুরগির গলা নামে বহুল পরিচিত, তার নিরাপত্তা বলয়কে নিশ্ছিদ্র করতে এক নজিরবিহীন ও বিশাল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সংযোগ রক্ষাকারী এই অত্যন্ত সরু ও স্পর্শকাতর করিডরটির নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই ভারতের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ছিল। বর্তমান পরিবর্তিত বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই করিডরের সুরক্ষা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের জন্য নতুন সামরিক ঘাঁটি ও পরিকাঠামো নির্মাণে বিপুল পরিমাণ জমি বরাদ্দের এক বিশাল প্রক্রিয়া শুরু করেছে রাজ্য প্রশাসন। শুধু জমি দেওয়াই নয়, আন্তর্জাতিক সীমান্তে নিরেট কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, নতুন আধুনিক সীমান্ত চৌকি স্থাপন এবং সামগ্রিক সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব আধুনিকায়নের ওপর এখন সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।
নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, শিলিগুড়ি করিডরের কৌশলগত গুরুত্ব ভারতের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য কতটা অপরিসীম, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। যেকোনো যুদ্ধকালীন বা জরুরি পরিস্থিতিতে শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলো যদি এই সরু অংশটি কোনোভাবে অবরুদ্ধ করতে পারে, তবে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে উত্তর-পূর্ব ভারত সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এই মারাত্মক ঝুঁকি এড়াতে এবং সম্ভাব্য সব ধরনের সামরিক হুমকি মোকাবিলায় এখন কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজ্য সরকারও এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্ভেদ্য প্রাচীরে পরিণত করতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক সূত্রে প্রাপ্ত অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই প্রায় ১২০ একর জমি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হয়েছে, যেখানে দ্রুত গতিতে পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। এর পাশাপাশি, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান বন্ধে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া এবং নতুন সীমান্ত চৌকি বা ক্যাম্প নির্মাণের জন্য আরও প্রায় ৮৮ একর জমি সরাসরি বাজার থেকে কেনার আইনি অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মাঝেই শিলিগুড়িতে একটি সম্পূর্ণ নতুন ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর বা হেডকোয়ার্টার তৈরির উদ্দেশ্যে আরও অতিরিক্ত ছয় একর জমি চেয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। শুধু সীমান্তরক্ষী বাহিনীই নয়, চীনের সঙ্গে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা পাহারা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশও এই অঞ্চলে তাদের একটি বিশাল বেসক্যাম্প বা ঘাঁটি নির্মাণের জন্য ১০০ একর জমির জন্য রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করেছে।
নবান্নের প্রশাসনিক অলিন্দ থেকে জানা গেছে যে, দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবই এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আন্তর্জাতিক সীমান্ত সুরক্ষাকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক সীমান্তে ২৪ ঘণ্টা কঠোর নজরদারি বজায় রাখা, অবৈধ অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং চোরাচালান রোধে জিরো টলারেন্স নীতি বা শূন্য সহনশীলতা নীতি ঘোষণা করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনার পর ইতিমধ্যেই উত্তরবঙ্গের সীমান্ত সংলগ্ন বেশ কিছু স্পর্শকাতর এলাকায় নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হয়ে গেছে।
এবারের প্রতিরক্ষা কৌশলে কেবল সীমান্ত পাহারা দেওয়ার প্রথাগত ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা হয়নি, বরং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সেনা চলাচল এবং ভারী সামরিক সরঞ্জাম ও যুদ্ধাস্ত্র পরিবহণ সহজ করতে এক সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও সামরিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত সংলগ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাতটি রাজ্য সড়ক বা স্টেট হাইওয়েকে জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের হাতে পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয়েছে, যাতে সেগুলোকে দ্রুত প্রশস্ত ও মজবুত আন্তর্জাতিক মানের সড়কে রূপান্তরিত করা যায়। এর ফলে প্রত্যন্ত সীমান্ত ঘাঁটিগুলোতে রসদ ও অস্ত্রশস্ত্র দ্রুত পৌঁছে দেওয়া যাবে এবং যেকোনো আকস্মিক উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে দ্রুত সেনা মোতায়েন করা অনেক সহজ হবে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ার বর্তমান উত্তপ্ত ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা ভারতের জাতীয় সুরক্ষার জন্য আগের চেয়ে শতগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশের স্থায়ী অবসান, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান বন্ধ এবং যেকোনো বাহ্যিক সামরিক ঝুঁকি মোকাবিলায় এই নতুন গড়ে ওঠা বিশাল সামরিক অবকাঠামো ভবিষ্যতে ভারতের জন্য একটি অভেদ্য ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

আপনার মতামত লিখুন