বাংলা কবিতায় ‘সুরঞ্জনা’ নামটি এক চিরকালীন রহস্য, এক মায়াবী আকুতি এবং রোমান্টিক বিষাদের প্রতিশব্দ। জীবনানন্দ দাশের কবিতার সেই স্তব্ধ হরিণী সুরঞ্জনাকে একবিংশ শতাব্দীর ইট-কাঠ-পাথরের যান্ত্রিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এনে দাঁড় করিয়েছেন কবি সাজিদুল হক তাঁর ‘অন্য কোনো সুরঞ্জনা’ (ফেব্রুয়ারি ২০০০) কাব্যগ্রন্থে। এটি কেবল জীবনানন্দের নস্টালজিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করার কোনো গতানুগতিক কাব্য নয় বরং এটি ঐতিহ্য ও আধুনিক মননের এক তীব্র দ্বান্দ্বিক রূপায়ণ যেখানে জীবনানন্দ বা জীবনানন্দের সুরঞ্জনার দেখা পাওয়ার পরিবর্তে পাঠক পরিচিত হয় সাজিদুল হকের সুরঞ্জনার সাথে।
বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ দাশ কল্পিত 'সুরঞ্জনা' নামটি এক চিরকালের মায়াবী আকুতি, নৈঃশব্দ্য বা নীরবতার প্রতীক এবং গ্রামবাংলার শালিক-কুয়াশায় মোড়ানো এক শান্ত রোমান্টিক সত্তা। জীবনানন্দের কাছে সুরঞ্জনা ছিল সেই নারী, যার সঙ্গে কবি নিভৃতে কথা বলতে চেয়েছিলেন—অনুমিত হয় তাঁর সেই পঙক্তির মতো: "সুরঞ্জনা, অচল টাকার মতো এত কোলাহল ভালো লাগে না আমার;" যেখানে একধরনের গ্রামীণ নিরাসক্তি ও আত্মমগ্ন দূরত্ব স্পষ্ট। কিন্তু সাজিদুল হকের ‘অন্য কোনো সুরঞ্জনা’-র ক্যানভাস সম্পূর্ণ ভিন্ন, বৈরী ও একবিংশ শতাব্দীর যান্ত্রিক বাস্তবতায় জারিত।
সাজিদুল হকের কবিতায় সুরঞ্জনা কেবল কোনো নস্টালজিক বা দূরবর্তী গ্রামীণ প্রেরণা নয় বরং সে আধুনিক নগরজীবনের নির্মম মনঘাতী কোলাহল, সময়খেকো ট্রাফিক জ্যাম, বিচ্ছিন্নতা এবং অস্তিত্বের রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে পথ চলা এক সমসাময়িক মানবী। 'সুরঞ্জনা ফিরেছে' শীর্ষক কবিতায় সেই অস্তিত্বের রাজনৈতিক সংকটকে মিলিয়েছেন প্রথম স্তবকে। কবির ভাষায়—
“সুরঞ্জনা গতকাল সকালে ফিরেছে
ঝরেছিল অঝর ধারায় বৃষ্টি
করুণ শোকের আতর মিলিছে বাইশে শ্রাবণে
তরুণ প্রাণেরা জেগেছিল যমুনার তীরে;”
অথবা 'স্বপ্নের বুনন' কবিতার শেষ স্তবকে—
"মহাকাল এসেছে নতুন কবিতার পাঠ নিয়েঃ
'চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি'
বিমুখ প্রান্তরে
মুখোমুখি-আমি আর সুরঞ্জনা।"
এখানে আবহমান বাংলার চিরচেনা বর্ষা ও নদীর আবহের সঙ্গে বা বিমুখ প্রান্তরে মিশে গেছে বৈরী সময়ে চলমান দ্বন্দ্বের আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক রূপকল্প। কবিতাগুলো পাঠ শেষে পাঠক শুধু চরিত্র বা চিত্রকল্পের বিনির্মাণের ভাবাতেই যাতে সীমাবদ্ধ না থাকেন কবি তা বাতলে দিচ্ছেন 'সেই সব আজ উপকথা' শীর্ষক কবিতার—
"তোমরা হয়তো জানো
জীবনানন্দের সেই নাম
খঞ্জনার নামে রাখিলাম
অনেক সাধের সুরঞ্জনা।"
এই স্তবকের মাধ্যমে।
জীবনানন্দের রোমান্টিক রোশনাই ভেঙে সাজিদুল হক সুরঞ্জনাকে দাঁড় করিয়েছেন এক নতুন অস্তিত্ববাদী লড়াইয়ের মুখোমুখি। এখানে রয়েছে উত্তর-আধুনিক শহরের ইট-কাঠ-পাথরে পিষ্ট হওয়া মানুষের হাহাকার ও আত্মিক ক্ষয়। কবি প্রথাগত প্রেমের মোহভঙ্গের মধ্য দিয়ে সুরঞ্জনাকে এমন এক বাস্তবতায় রূপায়িত করেছেন যেখানে প্রেম কেবল হৃদয়ের প্রশান্তি নয় বরং তা এক যুগসন্ধিক্ষণের সংকটে রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাঙচুরের ভেতর টিকে থাকার নির্মম সংগ্রাম। ফলে এই 'সুরঞ্জনা' বিগত শতাব্দীর কোনো কবিতার চরিত্রমাত্র হয়ে থাকে না; সে হয়ে ওঠে বর্তমানের এই অস্থির সময়েরই এক প্রতিবাদী ও বহুমাত্রিক প্রতীক।
বাংলা কবিতার ইতিহাসে প্রেম এবং রাজনীতি চিরকালই একে অপরের পরিপূরক অথবা বিপরীত মেরুর বাসিন্দা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু সাজিদুল হকের ‘অন্য কোনো সুরঞ্জনা’ কাব্যগ্রন্থে প্রেম ও দ্রোহ কোনো বিচ্ছিন্ন বা রৈখিক রেখায় অবস্থান করে না। তা এক অবিচ্ছেদ্য রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চিত্রকল্পের ক্যানভাসে রূপ নেয়। তাঁর কবিতা কেবল নিভৃত প্রকোষ্ঠের আত্মমগ্ন প্রেমের পদ্য নয়। এর প্রতিটি পঙক্তির অন্তরালে লুকিয়ে আছে সময়ের বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ক্ষত, নাগরিক অবক্ষয়ের ইমেজ এবং দ্রোহের আগুন। সমকালীন সামাজিক অস্থিরতা, ক্ষমতার রদবদল এবং ইতিহাসের ঘাত-প্রতিঘাত কবির চেতনায় গভীর রেখাপাত করেছে, যা তাঁর শব্দচয়নে বারবার ফিরে আসে বিশ্বাসের আগুনে, আর্ত দোয়েল পাখির কন্ঠে, বাগানের রক্তগোলাপে,ভাঙা আয়নায় প্রতিফলিত ম্রিয়মাণ প্রতিচ্ছবি বা 'বাবুই পাখির বাসার আদলে'-র মাধ্যমে।
এখানে সুরঞ্জনা নিছক কোনো প্রিয়া বা রোমান্টিক কল্পনার প্রতিমা নয়, সে হয়ে ওঠে সময়ের দূষিত বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রতিবাদী মানবিক সত্তা। 'খুল্লুনার অভিমান' শীর্ষক কবিতায় কবির নিজস্ব উচ্চারণে—
“লোকজ আগুনে পোড়া কবিতার সুষমায়
আঁকৃতির ব্যঞ্জনে
সুরঞ্জনার মানবিক অভিমান
নির্মাণ করেছে
অন্তঃপুরের সুরঞ্জনা!”
এই পঙক্তিমালা অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রমাণ করে কবির কাছে প্রেম কোনো কাচের বাক্সে বন্দি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয় বরং তা পারিপার্শ্বিকতার নির্মম আঘাত, সামাজিক বৈষম্য ও সমষ্টিগত যন্ত্রণার সাথে সংঘাতে ক্ষতবিক্ষত এক মানবিক ও আত্মিক চিৎকার। রাষ্ট্র ও সমাজের যান্ত্রিক যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া মানুষের আবেগ যখন কোণঠাসা।তখন কবি প্রেমকে এক রাজনৈতিক হাতিয়ার এবং দ্রোহের অনন্য ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এখানে ব্যক্তিগত প্রেমের আর্তনাদ শেষ পর্যন্ত সমষ্টির মুক্তির লড়াইয়ের সাথেই মিলে যায়। যেমন—
"মনে পড়ে
আজ সব মনে পড়ে তার
নিভৃত-পল্লীতে মাছ ভাতের দুপুর;"
কবিতাটির ভাষা নীরব হলেও তার অন্তর্নিহিত ভার অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও সামষ্টিক।
কবিতার দীর্ঘ ঐতিহ্যজুড়ে প্রেম এবং শরীরকে প্রায়শই দুটি ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করাতে দেখা গেছে। কোথাও শরীরকে অস্বীকার করে প্রেমকে কেবল নিভৃত ভাবালুতায় পর্যবসিত করা হয়েছে, কিংবা এর বিপরীতে কেবল স্থূল কামনার অতলে তাকে সঁপে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাজিদুল হকের ‘অন্য কোনো সুরঞ্জনা’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম প্রধান নান্দনিক শক্তির জায়গাটি নিহিত রয়েছে প্রেম ও শরীরকে আলাদা না করে, তাদের এক অবিচ্ছেদ্য এবং দ্বন্দ্বসংকুল পঙক্তিতে মিলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতার মধ্যে। কবি এখানে কোনো রাখঢাক না রেখে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে জৈবিক অনুভবের ভেতর দিয়ে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক তল্লাশি চালিয়েছেন।
"মেয়েটির ফর্সা দুটো হাত
মেঘের কোমল একজোড়া স্তন
ঈগল পাখির ঠোঁটে তুলে দিয়ে
আমাকে বললেঃ"
পঙক্তি সম্বলিত কবিতাটি পাঠে পাঠক কবির মতোই উন্মোচন করবেন মানব মনের সুপ্ত ও অবদমিত গহ্বর।
কবির মুন্সিয়ানা এখানেই। তিনি শরীরকে কেবল মাংসের বিন্যাস হিসেবে দেখেননি বা সুপারী-শরীর হিসেবেও নয় বরং তাকে আত্মার গভীরতম উপলব্ধির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। কবিতার পঙক্তিমালা পাঠ ও অনুধাবন প্রচেষ্টায় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
“মৈথুনের প্রেমে নিমগ্ন যৌবন
দৈবাৎ আমার সুরঞ্জনাকেও
হাতছানি দিয়ে ঢাকবে
অশ্লীল স্পর্ধায়।”
এই উচ্চারণের মধ্য দিয়ে স্পর্শ কেবল কোনো সাময়িক কামনার বস্তু বা তৃপ্তির খোরাক হয়ে থাকে না; এটি হয়ে ওঠে মানবজীবনের আদিমতম ক্ষুধা, অন্তহীন একাকীত্ব থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় এবং এই নির্মম পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার বা প্রমাণ করার অনিবার্য ইশারা। শরীর ও মনের এই দ্বান্দ্বিক টানাপোড়েনেই সাজিদুল হকের সুরঞ্জনা রক্ত-মাংসের এক জীবন্ত সত্তা হয়ে ওঠে, যার ছোঁয়া ও উষ্ণতার ভেতর দিয়েই কবি খুঁজে ফেরেন তাঁর আত্মিক মুক্তি ও পরম পূর্ণতার ঠিকানা। পুরো গ্রন্থটিতে
কবির ভাষা ব্যবহারে রয়েছে এক ধরনের নিরীক্ষাধর্মিতা। ক্লাসিক্যাল উপমার পাশাপাশি তিনি এমন কিছু আধুনিক ইমেজের ব্যবহার করেছেন যা পাঠককে চিন্তার এক নতুন দিগন্তে নিয়ে যায়। তবে কোথাও কোথাও এই রূপকের বহুমুখিতা ও বিমূর্ত প্রকাশ ক্ষেত্রবিশেষে রৈখিক পাঠকে বাধাগ্রস্ত করলেও তা কবিতার বহুমাত্রিক অর্থকে উন্মুক্ত করে। তা সত্ত্বেও, শব্দের বুনন এবং স্বগতোক্তিমূলক স্বর পুরো গ্রন্থটিকে এক অনন্য কাব্যিক গতিশীলতা দান করেছে।
সাজিদুল হকের ‘অন্য কোনো সুরঞ্জনা’ নিছক কোনো নারীর প্রতি প্রেম নিবেদনের কাব্য নয়। এটি এক যুগসন্ধিক্ষণের দলিল যেখানে কবি তাঁর সমকালের সমস্ত হাহাকার, ক্লান্তি এবং বিশ্বাসের সংকটকে সুরঞ্জনার মধ্য দিয়ে এক বৈশ্বিক রূপ দিতে চেয়েছেন। মননশীল পাঠকদের জন্য এই কাব্যগ্রন্থটি ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অনবদ্য পাঠ যা পাঠককে বিনির্মানের ভাবনায় সমৃদ্ধ করবে।

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬
বাংলা কবিতায় ‘সুরঞ্জনা’ নামটি এক চিরকালীন রহস্য, এক মায়াবী আকুতি এবং রোমান্টিক বিষাদের প্রতিশব্দ। জীবনানন্দ দাশের কবিতার সেই স্তব্ধ হরিণী সুরঞ্জনাকে একবিংশ শতাব্দীর ইট-কাঠ-পাথরের যান্ত্রিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এনে দাঁড় করিয়েছেন কবি সাজিদুল হক তাঁর ‘অন্য কোনো সুরঞ্জনা’ (ফেব্রুয়ারি ২০০০) কাব্যগ্রন্থে। এটি কেবল জীবনানন্দের নস্টালজিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করার কোনো গতানুগতিক কাব্য নয় বরং এটি ঐতিহ্য ও আধুনিক মননের এক তীব্র দ্বান্দ্বিক রূপায়ণ যেখানে জীবনানন্দ বা জীবনানন্দের সুরঞ্জনার দেখা পাওয়ার পরিবর্তে পাঠক পরিচিত হয় সাজিদুল হকের সুরঞ্জনার সাথে।
বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ দাশ কল্পিত 'সুরঞ্জনা' নামটি এক চিরকালের মায়াবী আকুতি, নৈঃশব্দ্য বা নীরবতার প্রতীক এবং গ্রামবাংলার শালিক-কুয়াশায় মোড়ানো এক শান্ত রোমান্টিক সত্তা। জীবনানন্দের কাছে সুরঞ্জনা ছিল সেই নারী, যার সঙ্গে কবি নিভৃতে কথা বলতে চেয়েছিলেন—অনুমিত হয় তাঁর সেই পঙক্তির মতো: "সুরঞ্জনা, অচল টাকার মতো এত কোলাহল ভালো লাগে না আমার;" যেখানে একধরনের গ্রামীণ নিরাসক্তি ও আত্মমগ্ন দূরত্ব স্পষ্ট। কিন্তু সাজিদুল হকের ‘অন্য কোনো সুরঞ্জনা’-র ক্যানভাস সম্পূর্ণ ভিন্ন, বৈরী ও একবিংশ শতাব্দীর যান্ত্রিক বাস্তবতায় জারিত।
সাজিদুল হকের কবিতায় সুরঞ্জনা কেবল কোনো নস্টালজিক বা দূরবর্তী গ্রামীণ প্রেরণা নয় বরং সে আধুনিক নগরজীবনের নির্মম মনঘাতী কোলাহল, সময়খেকো ট্রাফিক জ্যাম, বিচ্ছিন্নতা এবং অস্তিত্বের রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে পথ চলা এক সমসাময়িক মানবী। 'সুরঞ্জনা ফিরেছে' শীর্ষক কবিতায় সেই অস্তিত্বের রাজনৈতিক সংকটকে মিলিয়েছেন প্রথম স্তবকে। কবির ভাষায়—
“সুরঞ্জনা গতকাল সকালে ফিরেছে
ঝরেছিল অঝর ধারায় বৃষ্টি
করুণ শোকের আতর মিলিছে বাইশে শ্রাবণে
তরুণ প্রাণেরা জেগেছিল যমুনার তীরে;”
অথবা 'স্বপ্নের বুনন' কবিতার শেষ স্তবকে—
"মহাকাল এসেছে নতুন কবিতার পাঠ নিয়েঃ
'চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি'
বিমুখ প্রান্তরে
মুখোমুখি-আমি আর সুরঞ্জনা।"
এখানে আবহমান বাংলার চিরচেনা বর্ষা ও নদীর আবহের সঙ্গে বা বিমুখ প্রান্তরে মিশে গেছে বৈরী সময়ে চলমান দ্বন্দ্বের আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক রূপকল্প। কবিতাগুলো পাঠ শেষে পাঠক শুধু চরিত্র বা চিত্রকল্পের বিনির্মাণের ভাবাতেই যাতে সীমাবদ্ধ না থাকেন কবি তা বাতলে দিচ্ছেন 'সেই সব আজ উপকথা' শীর্ষক কবিতার—
"তোমরা হয়তো জানো
জীবনানন্দের সেই নাম
খঞ্জনার নামে রাখিলাম
অনেক সাধের সুরঞ্জনা।"
এই স্তবকের মাধ্যমে।
জীবনানন্দের রোমান্টিক রোশনাই ভেঙে সাজিদুল হক সুরঞ্জনাকে দাঁড় করিয়েছেন এক নতুন অস্তিত্ববাদী লড়াইয়ের মুখোমুখি। এখানে রয়েছে উত্তর-আধুনিক শহরের ইট-কাঠ-পাথরে পিষ্ট হওয়া মানুষের হাহাকার ও আত্মিক ক্ষয়। কবি প্রথাগত প্রেমের মোহভঙ্গের মধ্য দিয়ে সুরঞ্জনাকে এমন এক বাস্তবতায় রূপায়িত করেছেন যেখানে প্রেম কেবল হৃদয়ের প্রশান্তি নয় বরং তা এক যুগসন্ধিক্ষণের সংকটে রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাঙচুরের ভেতর টিকে থাকার নির্মম সংগ্রাম। ফলে এই 'সুরঞ্জনা' বিগত শতাব্দীর কোনো কবিতার চরিত্রমাত্র হয়ে থাকে না; সে হয়ে ওঠে বর্তমানের এই অস্থির সময়েরই এক প্রতিবাদী ও বহুমাত্রিক প্রতীক।
বাংলা কবিতার ইতিহাসে প্রেম এবং রাজনীতি চিরকালই একে অপরের পরিপূরক অথবা বিপরীত মেরুর বাসিন্দা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু সাজিদুল হকের ‘অন্য কোনো সুরঞ্জনা’ কাব্যগ্রন্থে প্রেম ও দ্রোহ কোনো বিচ্ছিন্ন বা রৈখিক রেখায় অবস্থান করে না। তা এক অবিচ্ছেদ্য রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চিত্রকল্পের ক্যানভাসে রূপ নেয়। তাঁর কবিতা কেবল নিভৃত প্রকোষ্ঠের আত্মমগ্ন প্রেমের পদ্য নয়। এর প্রতিটি পঙক্তির অন্তরালে লুকিয়ে আছে সময়ের বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ক্ষত, নাগরিক অবক্ষয়ের ইমেজ এবং দ্রোহের আগুন। সমকালীন সামাজিক অস্থিরতা, ক্ষমতার রদবদল এবং ইতিহাসের ঘাত-প্রতিঘাত কবির চেতনায় গভীর রেখাপাত করেছে, যা তাঁর শব্দচয়নে বারবার ফিরে আসে বিশ্বাসের আগুনে, আর্ত দোয়েল পাখির কন্ঠে, বাগানের রক্তগোলাপে,ভাঙা আয়নায় প্রতিফলিত ম্রিয়মাণ প্রতিচ্ছবি বা 'বাবুই পাখির বাসার আদলে'-র মাধ্যমে।
এখানে সুরঞ্জনা নিছক কোনো প্রিয়া বা রোমান্টিক কল্পনার প্রতিমা নয়, সে হয়ে ওঠে সময়ের দূষিত বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রতিবাদী মানবিক সত্তা। 'খুল্লুনার অভিমান' শীর্ষক কবিতায় কবির নিজস্ব উচ্চারণে—
“লোকজ আগুনে পোড়া কবিতার সুষমায়
আঁকৃতির ব্যঞ্জনে
সুরঞ্জনার মানবিক অভিমান
নির্মাণ করেছে
অন্তঃপুরের সুরঞ্জনা!”
এই পঙক্তিমালা অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রমাণ করে কবির কাছে প্রেম কোনো কাচের বাক্সে বন্দি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয় বরং তা পারিপার্শ্বিকতার নির্মম আঘাত, সামাজিক বৈষম্য ও সমষ্টিগত যন্ত্রণার সাথে সংঘাতে ক্ষতবিক্ষত এক মানবিক ও আত্মিক চিৎকার। রাষ্ট্র ও সমাজের যান্ত্রিক যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া মানুষের আবেগ যখন কোণঠাসা।তখন কবি প্রেমকে এক রাজনৈতিক হাতিয়ার এবং দ্রোহের অনন্য ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এখানে ব্যক্তিগত প্রেমের আর্তনাদ শেষ পর্যন্ত সমষ্টির মুক্তির লড়াইয়ের সাথেই মিলে যায়। যেমন—
"মনে পড়ে
আজ সব মনে পড়ে তার
নিভৃত-পল্লীতে মাছ ভাতের দুপুর;"
কবিতাটির ভাষা নীরব হলেও তার অন্তর্নিহিত ভার অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও সামষ্টিক।
কবিতার দীর্ঘ ঐতিহ্যজুড়ে প্রেম এবং শরীরকে প্রায়শই দুটি ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করাতে দেখা গেছে। কোথাও শরীরকে অস্বীকার করে প্রেমকে কেবল নিভৃত ভাবালুতায় পর্যবসিত করা হয়েছে, কিংবা এর বিপরীতে কেবল স্থূল কামনার অতলে তাকে সঁপে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাজিদুল হকের ‘অন্য কোনো সুরঞ্জনা’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম প্রধান নান্দনিক শক্তির জায়গাটি নিহিত রয়েছে প্রেম ও শরীরকে আলাদা না করে, তাদের এক অবিচ্ছেদ্য এবং দ্বন্দ্বসংকুল পঙক্তিতে মিলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতার মধ্যে। কবি এখানে কোনো রাখঢাক না রেখে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে জৈবিক অনুভবের ভেতর দিয়ে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক তল্লাশি চালিয়েছেন।
"মেয়েটির ফর্সা দুটো হাত
মেঘের কোমল একজোড়া স্তন
ঈগল পাখির ঠোঁটে তুলে দিয়ে
আমাকে বললেঃ"
পঙক্তি সম্বলিত কবিতাটি পাঠে পাঠক কবির মতোই উন্মোচন করবেন মানব মনের সুপ্ত ও অবদমিত গহ্বর।
কবির মুন্সিয়ানা এখানেই। তিনি শরীরকে কেবল মাংসের বিন্যাস হিসেবে দেখেননি বা সুপারী-শরীর হিসেবেও নয় বরং তাকে আত্মার গভীরতম উপলব্ধির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। কবিতার পঙক্তিমালা পাঠ ও অনুধাবন প্রচেষ্টায় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
“মৈথুনের প্রেমে নিমগ্ন যৌবন
দৈবাৎ আমার সুরঞ্জনাকেও
হাতছানি দিয়ে ঢাকবে
অশ্লীল স্পর্ধায়।”
এই উচ্চারণের মধ্য দিয়ে স্পর্শ কেবল কোনো সাময়িক কামনার বস্তু বা তৃপ্তির খোরাক হয়ে থাকে না; এটি হয়ে ওঠে মানবজীবনের আদিমতম ক্ষুধা, অন্তহীন একাকীত্ব থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় এবং এই নির্মম পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার বা প্রমাণ করার অনিবার্য ইশারা। শরীর ও মনের এই দ্বান্দ্বিক টানাপোড়েনেই সাজিদুল হকের সুরঞ্জনা রক্ত-মাংসের এক জীবন্ত সত্তা হয়ে ওঠে, যার ছোঁয়া ও উষ্ণতার ভেতর দিয়েই কবি খুঁজে ফেরেন তাঁর আত্মিক মুক্তি ও পরম পূর্ণতার ঠিকানা। পুরো গ্রন্থটিতে
কবির ভাষা ব্যবহারে রয়েছে এক ধরনের নিরীক্ষাধর্মিতা। ক্লাসিক্যাল উপমার পাশাপাশি তিনি এমন কিছু আধুনিক ইমেজের ব্যবহার করেছেন যা পাঠককে চিন্তার এক নতুন দিগন্তে নিয়ে যায়। তবে কোথাও কোথাও এই রূপকের বহুমুখিতা ও বিমূর্ত প্রকাশ ক্ষেত্রবিশেষে রৈখিক পাঠকে বাধাগ্রস্ত করলেও তা কবিতার বহুমাত্রিক অর্থকে উন্মুক্ত করে। তা সত্ত্বেও, শব্দের বুনন এবং স্বগতোক্তিমূলক স্বর পুরো গ্রন্থটিকে এক অনন্য কাব্যিক গতিশীলতা দান করেছে।
সাজিদুল হকের ‘অন্য কোনো সুরঞ্জনা’ নিছক কোনো নারীর প্রতি প্রেম নিবেদনের কাব্য নয়। এটি এক যুগসন্ধিক্ষণের দলিল যেখানে কবি তাঁর সমকালের সমস্ত হাহাকার, ক্লান্তি এবং বিশ্বাসের সংকটকে সুরঞ্জনার মধ্য দিয়ে এক বৈশ্বিক রূপ দিতে চেয়েছেন। মননশীল পাঠকদের জন্য এই কাব্যগ্রন্থটি ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অনবদ্য পাঠ যা পাঠককে বিনির্মানের ভাবনায় সমৃদ্ধ করবে।

আপনার মতামত লিখুন