দিকপাল

দুর্যোগের মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা: ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও নেটিজেনদের তোপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী


ইয়াসরির মাহবুব
ইয়াসরির মাহবুব স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬ | ০৩:২০ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্যোগের মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা: ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও নেটিজেনদের তোপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী

বন্যা পরিস্থিতি ও ভারী বর্ষণে সৃষ্ট তীব্র জলাবদ্ধতার মধ্যেই আজ সোমবার (১৩ জুলাই) দেশজুড়ে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন পাঁচ জেলায় আজকের পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়। দেশের বাকি অংশে কোমরসমান পানি ও চরম প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে যেতে হওয়ায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষাবিদরা। দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে পরীক্ষা স্থগিত না করায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।


পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী আজ সকাল থেকে আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডসহ মাদরাসা ও কারিগরি বোর্ডের অধীনে পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্রের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সকাল থেকেই রাজধানীসহ কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, সিলেট, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় দেখা দেয় নজিরবিহীন জলাবদ্ধতা।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ও চিত্রে দেখা যায়, পরীক্ষার্থীরা হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি পেরিয়ে, কোথাও নৌকা বা ভ্যানে চড়ে কেন্দ্রে পৌঁছাচ্ছেন। বিশেষ করে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ, ভিক্টোরিয়া কলেজসহ নোয়াখালীর হাতিয়ার বেশ কিছু কেন্দ্রে পানি ঢুকে পড়ায় পরীক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অনেক শিক্ষার্থী ভিজে যাওয়া পোশাকে ও ভেজা উত্তরপত্র নিয়েই পরীক্ষা দিতে বাধ্য হন।


এই পরিস্থিতিকে ‘অমানবিক’ আখ্যা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীর সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করছেন নেটিজেন ও ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। চিকিৎসক ও অ্যাক্টিভিস্ট সাদিকুর রহমান সাদাব ফেসবুকে লেখেন, “আবহাওয়ার এই অবস্থায় বুয়েট-ঢাবির ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ বা অনলাইনে নেওয়া হলেও এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়নি। হাঁটুপানিতে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে বাচ্চারা আজ পরীক্ষা দিয়েছে, যা অমানবিকতার চূড়ান্ত রূপ।” বৈরী আবহাওয়ায় পরীক্ষা নেওয়ার একরোখা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন জাতীয় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার, ছাত্রনেতা সারজিস আলমসহ অনেকেই।


শিক্ষাবিদরাও সরকারের এই সিদ্ধান্তে বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, “দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা নিলে সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান পরিবেশ নিশ্চিত হয় না। একই প্রশ্নে কোথাও পরীক্ষা হওয়া আর কোথাও স্থগিত থাকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করে।” গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী পাবলিক পরীক্ষাগুলোকে দুর্যোগহীন অনুকূল মৌসুমে সরিয়ে নেওয়ার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনার তাগিদ দেন।


ব্যপক সমালোচনা ও জবাবদিহিতার মুখে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত মূলত স্থানীয় জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য সব জেলা প্রশাসন পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে প্রতিবেদন দিয়েছিল। তবে রাতের বৃষ্টিতে সৃষ্ট নতুন পরিস্থিতি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। উদ্ভূত বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।


সাধারণত প্রতি বছর জুন-জুলাই মাসে বাংলাদেশে বর্ষা ও বন্যা পরিস্থিতির কারণে পাবলিক পরীক্ষাগুলো নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। চলতি বছরেও দেশের পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় পরীক্ষাসূচি পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এর আগে পরিস্থিতি বিবেচনায় শুধু চট্টগ্রাম বিভাগের পরীক্ষা আংশিক স্থগিত করা হলেও, দেশব্যাপী সমন্বিত সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় প্রতি বছরই এমন দুর্যোগে লাখ লাখ পরীক্ষার্থীকে চরম ট্রমা ও ভোগান্তির মধ্য দিয়ে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬


দুর্যোগের মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা: ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও নেটিজেনদের তোপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী

প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুলাই ২০২৬

featured Image

বন্যা পরিস্থিতি ও ভারী বর্ষণে সৃষ্ট তীব্র জলাবদ্ধতার মধ্যেই আজ সোমবার (১৩ জুলাই) দেশজুড়ে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন পাঁচ জেলায় আজকের পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়। দেশের বাকি অংশে কোমরসমান পানি ও চরম প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে যেতে হওয়ায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষাবিদরা। দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে পরীক্ষা স্থগিত না করায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।


পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী আজ সকাল থেকে আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডসহ মাদরাসা ও কারিগরি বোর্ডের অধীনে পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্রের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সকাল থেকেই রাজধানীসহ কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, সিলেট, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় দেখা দেয় নজিরবিহীন জলাবদ্ধতা।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ও চিত্রে দেখা যায়, পরীক্ষার্থীরা হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি পেরিয়ে, কোথাও নৌকা বা ভ্যানে চড়ে কেন্দ্রে পৌঁছাচ্ছেন। বিশেষ করে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ, ভিক্টোরিয়া কলেজসহ নোয়াখালীর হাতিয়ার বেশ কিছু কেন্দ্রে পানি ঢুকে পড়ায় পরীক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অনেক শিক্ষার্থী ভিজে যাওয়া পোশাকে ও ভেজা উত্তরপত্র নিয়েই পরীক্ষা দিতে বাধ্য হন।


এই পরিস্থিতিকে ‘অমানবিক’ আখ্যা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীর সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করছেন নেটিজেন ও ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। চিকিৎসক ও অ্যাক্টিভিস্ট সাদিকুর রহমান সাদাব ফেসবুকে লেখেন, “আবহাওয়ার এই অবস্থায় বুয়েট-ঢাবির ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ বা অনলাইনে নেওয়া হলেও এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়নি। হাঁটুপানিতে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে বাচ্চারা আজ পরীক্ষা দিয়েছে, যা অমানবিকতার চূড়ান্ত রূপ।” বৈরী আবহাওয়ায় পরীক্ষা নেওয়ার একরোখা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন জাতীয় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার, ছাত্রনেতা সারজিস আলমসহ অনেকেই।


শিক্ষাবিদরাও সরকারের এই সিদ্ধান্তে বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, “দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা নিলে সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান পরিবেশ নিশ্চিত হয় না। একই প্রশ্নে কোথাও পরীক্ষা হওয়া আর কোথাও স্থগিত থাকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করে।” গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী পাবলিক পরীক্ষাগুলোকে দুর্যোগহীন অনুকূল মৌসুমে সরিয়ে নেওয়ার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনার তাগিদ দেন।


ব্যপক সমালোচনা ও জবাবদিহিতার মুখে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত মূলত স্থানীয় জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য সব জেলা প্রশাসন পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে প্রতিবেদন দিয়েছিল। তবে রাতের বৃষ্টিতে সৃষ্ট নতুন পরিস্থিতি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। উদ্ভূত বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।


সাধারণত প্রতি বছর জুন-জুলাই মাসে বাংলাদেশে বর্ষা ও বন্যা পরিস্থিতির কারণে পাবলিক পরীক্ষাগুলো নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। চলতি বছরেও দেশের পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় পরীক্ষাসূচি পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এর আগে পরিস্থিতি বিবেচনায় শুধু চট্টগ্রাম বিভাগের পরীক্ষা আংশিক স্থগিত করা হলেও, দেশব্যাপী সমন্বিত সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় প্রতি বছরই এমন দুর্যোগে লাখ লাখ পরীক্ষার্থীকে চরম ট্রমা ও ভোগান্তির মধ্য দিয়ে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল