দেশের পোশাক শিল্প খাতে বর্তমানে এক গভীর সংকটময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গাজীপুর ও সাভারের মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে একের পর এক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, যা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদের পর থেকে সাভার ও গাজীপুর এলাকার কয়েকটি বড় কারখানায় হঠাৎ শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধের ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক শ্রমিক ঈদের ছুটি শেষে কাজে যোগ দিতে গিয়ে জানতে পেরেছেন যে তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা তাদের জীবন-জীবিকাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
কারখানা বন্ধের এই নেতিবাচক ধারার পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের ক্রয়াদেশের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে ভোক্তা চাহিদা হ্রাস পাওয়া এবং অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য অসহনীয় চাপের সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ফলে শ্রম ব্যয় বাড়লেও, অধিকাংশ কারখানায় সেই অনুপাতে উৎপাদনশীলতা বাড়েনি। ফলে ছোট ও মাঝারি অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয়ভার সামাল দিতে না পেরে কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে। বিগত তিন বছরে কয়েকশ কারখানা বন্ধ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে আর্থিক ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
পোশাক শিল্প মালিকরা জানিয়েছেন, পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পারার কারণে কারখানার স্থায়ী ব্যয়ের চাপ বেড়েই চলেছে। ব্যাংক ঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল এবং প্রশাসনিক ব্যয় নিয়মিত বহন করতে হচ্ছে, অথচ কাঙ্ক্ষিত মুনাফা বা কাজের অর্ডার নেই। অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, সরকারিভাবে ঘোষিত শিল্প সহায়তার তহবিলটি দ্রুত বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে না। ফলে রুগ্ন কারখানাগুলো টিকে থাকার লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে। অভিজ্ঞ ও পুরোনো শ্রমিকদের বাদ দিয়ে নতুন নিয়োগের মাধ্যমে ব্যয় কমানোর কৌশলকে অনেক প্রতিষ্ঠান বেছে নিচ্ছে, যা শ্রমিকদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী চাকরির নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলো এই পরিস্থিতির জন্য মালিকপক্ষের দায়সারা মনোভাবকে দায়ী করছে। তাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের পাওনা ও ক্ষতিপূরণ সঠিকভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে না। ব্যবসায়িক মন্দার অজুহাত দেখিয়ে শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হচ্ছে, যা তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও পরিবারগুলোর ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলোকে বিশেষ সহায়তার আওতায় আনা। রফতানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি এই খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে দ্রুত আর্থিক প্রণোদনা, ব্যাংক ঋণে বিশেষ সুবিধা, উৎপাদন ব্যয় কমানোর কৌশল এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না গেলে কর্মসংস্থান সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করবে, যার মাশুল দিতে হবে দেশের হাজার হাজার শ্রমিককে, যারা বছরের পর বছর এই শিল্পের চাকা সচল রেখেছেন।

শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬
দেশের পোশাক শিল্প খাতে বর্তমানে এক গভীর সংকটময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গাজীপুর ও সাভারের মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে একের পর এক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, যা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদের পর থেকে সাভার ও গাজীপুর এলাকার কয়েকটি বড় কারখানায় হঠাৎ শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধের ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক শ্রমিক ঈদের ছুটি শেষে কাজে যোগ দিতে গিয়ে জানতে পেরেছেন যে তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা তাদের জীবন-জীবিকাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
কারখানা বন্ধের এই নেতিবাচক ধারার পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের ক্রয়াদেশের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে ভোক্তা চাহিদা হ্রাস পাওয়া এবং অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য অসহনীয় চাপের সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ফলে শ্রম ব্যয় বাড়লেও, অধিকাংশ কারখানায় সেই অনুপাতে উৎপাদনশীলতা বাড়েনি। ফলে ছোট ও মাঝারি অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয়ভার সামাল দিতে না পেরে কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে। বিগত তিন বছরে কয়েকশ কারখানা বন্ধ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে আর্থিক ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
পোশাক শিল্প মালিকরা জানিয়েছেন, পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পারার কারণে কারখানার স্থায়ী ব্যয়ের চাপ বেড়েই চলেছে। ব্যাংক ঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল এবং প্রশাসনিক ব্যয় নিয়মিত বহন করতে হচ্ছে, অথচ কাঙ্ক্ষিত মুনাফা বা কাজের অর্ডার নেই। অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, সরকারিভাবে ঘোষিত শিল্প সহায়তার তহবিলটি দ্রুত বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে না। ফলে রুগ্ন কারখানাগুলো টিকে থাকার লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে। অভিজ্ঞ ও পুরোনো শ্রমিকদের বাদ দিয়ে নতুন নিয়োগের মাধ্যমে ব্যয় কমানোর কৌশলকে অনেক প্রতিষ্ঠান বেছে নিচ্ছে, যা শ্রমিকদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী চাকরির নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলো এই পরিস্থিতির জন্য মালিকপক্ষের দায়সারা মনোভাবকে দায়ী করছে। তাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের পাওনা ও ক্ষতিপূরণ সঠিকভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে না। ব্যবসায়িক মন্দার অজুহাত দেখিয়ে শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হচ্ছে, যা তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও পরিবারগুলোর ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলোকে বিশেষ সহায়তার আওতায় আনা। রফতানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি এই খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে দ্রুত আর্থিক প্রণোদনা, ব্যাংক ঋণে বিশেষ সুবিধা, উৎপাদন ব্যয় কমানোর কৌশল এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না গেলে কর্মসংস্থান সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করবে, যার মাশুল দিতে হবে দেশের হাজার হাজার শ্রমিককে, যারা বছরের পর বছর এই শিল্পের চাকা সচল রেখেছেন।

আপনার মতামত লিখুন