দিকপাল

নির্বাচনের আড়ালে রক্তাক্ত মিয়ানমার, সেনা অভিযানে নিহত শত শত মানুষ


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৫ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচনের আড়ালে রক্তাক্ত মিয়ানমার, সেনা অভিযানে নিহত শত শত মানুষ

মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও মানবিক পরিস্থিতি যে চরম বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তা জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে সাত শতাধিক বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। ভয়াবহ এই মৃত্যুর মিছিলে নারী ও শিশুদের অংশগ্রহণ উদ্বেগজনকভাবে বেশি, যা সামরিক বাহিনীর কঠোর অভিযানের অমানবিক চিত্রই তুলে ধরে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিমান হামলা এবং নির্বিচার গোলাবর্ষণ সাধারণ মানুষের প্রাণহানির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


প্রতিবেদনটির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যাচাইকৃত অন্তত সাতশ দুই জন নিহতের মধ্যে ২২৪ জন নারী এবং ১৫৩ জন শিশু রয়েছে। সহিংসতার দিক থেকে সাগাইং অঞ্চলকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে কেবল সেনাবাহিনীর অভিযানের কারণেই ১৯১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর একটি হলো গত অক্টোবরে সাগাইংয়ের চাউং-ইউ এলাকায় একটি স্কুলের সামনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গোলাবর্ষণ, যেখানে শিশুসহ ২৩ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। এছাড়া ডিসেম্বরে তাবায়িন এলাকার একটি চায়ের দোকানে বিমান হামলায় খেলা দেখতে জড়ো হওয়া ১৯ জন সাধারণ মানুষ নিহত হন। সেনাবাহিনীর এই নির্মমতা কেবল নির্দিষ্ট কিছু হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা পরিকল্পিতভাবে জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।


২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই মিয়ানমার এক গভীর গৃহযুদ্ধের কবলে পড়েছে। অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের পর থেকে দেশটিতে স্থিতিশীলতা তলানিতে ঠেকেছে। সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের পরিকল্পনা এবং প্রধান বিরোধী দলগুলোকে বাদ দিয়ে সাজানো এই নির্বাচন প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আরাকান আর্মির সদস্য সংগ্রহ এবং রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, হত্যা ও যৌন সহিংসতার মতো ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ এবং ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সেনাবাহিনী বর্তমানে বেশ কিছু অঞ্চলে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।


জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার টুর্ক মিয়ানমারের জনগণের এই চরম দুর্ভোগের বিষয়ে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ মন্তব্য করেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, একদিকে অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও মানবিক সহায়তার অভাবে কোটি মানুষ ধুঁকছে, অন্যদিকে বিশ্ববাসী ধীরে ধীরে এই সংকটের কথা ভুলে যাচ্ছে। অং সান সু চিকে কারাগারে পাঠানোর পর থেকে মিয়ানমার যে অন্ধকার যুগে প্রবেশ করেছে, তা থেকে উত্তরণের পথ বর্তমানে বেশ সংকীর্ণ। সামরিক জান্তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের আসীন হওয়া এবং একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টা দেশটির ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চিত পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের উদাসীনতা মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের কষ্টকে প্রতিদিন কেবল দীর্ঘই করছে।

সূত্র: বিবিসি।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬


নির্বাচনের আড়ালে রক্তাক্ত মিয়ানমার, সেনা অভিযানে নিহত শত শত মানুষ

প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুন ২০২৬

featured Image

মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও মানবিক পরিস্থিতি যে চরম বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তা জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে সাত শতাধিক বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। ভয়াবহ এই মৃত্যুর মিছিলে নারী ও শিশুদের অংশগ্রহণ উদ্বেগজনকভাবে বেশি, যা সামরিক বাহিনীর কঠোর অভিযানের অমানবিক চিত্রই তুলে ধরে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিমান হামলা এবং নির্বিচার গোলাবর্ষণ সাধারণ মানুষের প্রাণহানির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


প্রতিবেদনটির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যাচাইকৃত অন্তত সাতশ দুই জন নিহতের মধ্যে ২২৪ জন নারী এবং ১৫৩ জন শিশু রয়েছে। সহিংসতার দিক থেকে সাগাইং অঞ্চলকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে কেবল সেনাবাহিনীর অভিযানের কারণেই ১৯১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর একটি হলো গত অক্টোবরে সাগাইংয়ের চাউং-ইউ এলাকায় একটি স্কুলের সামনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গোলাবর্ষণ, যেখানে শিশুসহ ২৩ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। এছাড়া ডিসেম্বরে তাবায়িন এলাকার একটি চায়ের দোকানে বিমান হামলায় খেলা দেখতে জড়ো হওয়া ১৯ জন সাধারণ মানুষ নিহত হন। সেনাবাহিনীর এই নির্মমতা কেবল নির্দিষ্ট কিছু হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা পরিকল্পিতভাবে জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।


২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই মিয়ানমার এক গভীর গৃহযুদ্ধের কবলে পড়েছে। অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের পর থেকে দেশটিতে স্থিতিশীলতা তলানিতে ঠেকেছে। সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের পরিকল্পনা এবং প্রধান বিরোধী দলগুলোকে বাদ দিয়ে সাজানো এই নির্বাচন প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আরাকান আর্মির সদস্য সংগ্রহ এবং রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, হত্যা ও যৌন সহিংসতার মতো ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ এবং ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সেনাবাহিনী বর্তমানে বেশ কিছু অঞ্চলে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।


জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার টুর্ক মিয়ানমারের জনগণের এই চরম দুর্ভোগের বিষয়ে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ মন্তব্য করেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, একদিকে অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও মানবিক সহায়তার অভাবে কোটি মানুষ ধুঁকছে, অন্যদিকে বিশ্ববাসী ধীরে ধীরে এই সংকটের কথা ভুলে যাচ্ছে। অং সান সু চিকে কারাগারে পাঠানোর পর থেকে মিয়ানমার যে অন্ধকার যুগে প্রবেশ করেছে, তা থেকে উত্তরণের পথ বর্তমানে বেশ সংকীর্ণ। সামরিক জান্তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের আসীন হওয়া এবং একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টা দেশটির ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চিত পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের উদাসীনতা মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের কষ্টকে প্রতিদিন কেবল দীর্ঘই করছে।

সূত্র: বিবিসি।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল