দিকপাল

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় কমছে জনশক্তি রপ্তানি


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬ | ০২:১০ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় কমছে জনশক্তি রপ্তানি

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং সৌদি আরবের কঠোর ভিসা নীতি ও বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাত এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। করোনা মহামারির পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের শ্রমবাজার যে গতি ফিরে পেয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সেই ধারা ব্যাহত হচ্ছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ছাড়পত্র পাওয়া কর্মীর সংখ্যা প্রতি মাসে ৪৪ হাজার থেকে ৬৫ হাজারের কোঠায় ওঠানামা করছে। অথচ মহামারির ধকল কাটিয়ে ওঠার পর প্রতি মাসে গড়ে ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার কর্মী বিদেশে পাড়ি জমাতেন। এই নিম্নমুখী প্রবণতা সরকারের আগামী অর্থবছরের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মসংস্থান পরিকল্পনার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিদেশে কর্মসংস্থানের ছাড়পত্র পেয়েছিলেন ৬৫ হাজার ৬৩৪ জন। এরপর মার্চ মাসে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে দাঁড়ায় ৪৪ হাজার ৬৫৮ জনে। এপ্রিল মাসে কিছুটা বেড়ে ৪৮ হাজার ৮৫৯ জন হলেও মে মাসে তা ৬০ হাজার ১১৯ জনে পৌঁছায়। মে মাসে ছাড়পত্র পাওয়া কর্মীদের মধ্যে বড় একটি অংশ অর্থাৎ ৩০ হাজার ৫০৯ জন সৌদি আরবে গেছেন। এছাড়াও কাতারে ৮ হাজার ৯০১ জন এবং সিঙ্গাপুরে ৫ হাজার ৬৮৩ জন কর্মী পাড়ি জমিয়েছেন। মে মাসের সংখ্যাটি এপ্রিলের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি হলেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তা ৪৩ শতাংশ কম। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, শ্রমবাজার আগের গতি হারিয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে ভবিষ্যতে শ্রম রপ্তানির গতি ধরে রাখা কঠিন হবে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস বা বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব টিপু সুলতান এই সংকট সম্পর্কে বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সৌদি আরব থেকে আসা নতুন ভিসার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। জুন মাসে হাতেগোনা মাত্র দুই-তিনটি নতুন ভিসা পাওয়া গেছে, যেখানে গত মাসেও এই সংখ্যা ছয়-সাতের ঘরে ছিল। তার আগের মাসেও পাওয়া গিয়েছিল সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২টি। তিনি মনে করেন, মালয়েশিয়া, ওমান, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারগুলো যেন স্বল্পদক্ষ কর্মীদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হয়, সে লক্ষ্যে সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।

শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে সরকারের পরিকল্পনাও এখন ঝুঁকির মুখে। ৮ জুন জাতীয় সংসদে প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর জানিয়েছিলেন যে, আগামী অর্থবছরে সরকার প্রায় ১৪ লাখ কর্মীকে বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যেখানে চলতি অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৫ জন। এছাড়াও আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থান তৈরির নির্বাচনী অঙ্গীকারও রয়েছে। তবে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে ৯৫ হাজারের বেশি কর্মী বিদেশে যাওয়ার যে ধারাবাহিকতা ছিল, তা বর্তমানে বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মী পাঠানোর ওপর সরকার জোর দিলেও বিদ্যমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে উঠতে বহুমুখী কৌশলী উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬


মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় কমছে জনশক্তি রপ্তানি

প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুন ২০২৬

featured Image

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং সৌদি আরবের কঠোর ভিসা নীতি ও বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাত এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। করোনা মহামারির পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের শ্রমবাজার যে গতি ফিরে পেয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সেই ধারা ব্যাহত হচ্ছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ছাড়পত্র পাওয়া কর্মীর সংখ্যা প্রতি মাসে ৪৪ হাজার থেকে ৬৫ হাজারের কোঠায় ওঠানামা করছে। অথচ মহামারির ধকল কাটিয়ে ওঠার পর প্রতি মাসে গড়ে ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার কর্মী বিদেশে পাড়ি জমাতেন। এই নিম্নমুখী প্রবণতা সরকারের আগামী অর্থবছরের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মসংস্থান পরিকল্পনার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিদেশে কর্মসংস্থানের ছাড়পত্র পেয়েছিলেন ৬৫ হাজার ৬৩৪ জন। এরপর মার্চ মাসে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে দাঁড়ায় ৪৪ হাজার ৬৫৮ জনে। এপ্রিল মাসে কিছুটা বেড়ে ৪৮ হাজার ৮৫৯ জন হলেও মে মাসে তা ৬০ হাজার ১১৯ জনে পৌঁছায়। মে মাসে ছাড়পত্র পাওয়া কর্মীদের মধ্যে বড় একটি অংশ অর্থাৎ ৩০ হাজার ৫০৯ জন সৌদি আরবে গেছেন। এছাড়াও কাতারে ৮ হাজার ৯০১ জন এবং সিঙ্গাপুরে ৫ হাজার ৬৮৩ জন কর্মী পাড়ি জমিয়েছেন। মে মাসের সংখ্যাটি এপ্রিলের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি হলেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তা ৪৩ শতাংশ কম। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, শ্রমবাজার আগের গতি হারিয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে ভবিষ্যতে শ্রম রপ্তানির গতি ধরে রাখা কঠিন হবে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস বা বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব টিপু সুলতান এই সংকট সম্পর্কে বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সৌদি আরব থেকে আসা নতুন ভিসার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। জুন মাসে হাতেগোনা মাত্র দুই-তিনটি নতুন ভিসা পাওয়া গেছে, যেখানে গত মাসেও এই সংখ্যা ছয়-সাতের ঘরে ছিল। তার আগের মাসেও পাওয়া গিয়েছিল সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২টি। তিনি মনে করেন, মালয়েশিয়া, ওমান, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারগুলো যেন স্বল্পদক্ষ কর্মীদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হয়, সে লক্ষ্যে সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।

শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে সরকারের পরিকল্পনাও এখন ঝুঁকির মুখে। ৮ জুন জাতীয় সংসদে প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর জানিয়েছিলেন যে, আগামী অর্থবছরে সরকার প্রায় ১৪ লাখ কর্মীকে বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যেখানে চলতি অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৫ জন। এছাড়াও আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থান তৈরির নির্বাচনী অঙ্গীকারও রয়েছে। তবে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে ৯৫ হাজারের বেশি কর্মী বিদেশে যাওয়ার যে ধারাবাহিকতা ছিল, তা বর্তমানে বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মী পাঠানোর ওপর সরকার জোর দিলেও বিদ্যমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে উঠতে বহুমুখী কৌশলী উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল