ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির বর্তমান নিম্নমুখী প্রবণতা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রধান পোশাক রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে পরিচিত ইইউর দেশগুলোতে চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে যে ধরনের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে, তা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ইউরোস্ট্যাটের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২৮৮ কোটি ইউরো, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ কম। গত বছর একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ৩৫৭ কোটি ইউরো। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয়ে প্রায় ৬৯ কোটি ইউরোর ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা দেশের পোশাক খাতের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই মন্দা পরিস্থিতি কেবল সামগ্রিক আয়ের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং একক মাস হিসেবে ফেব্রুয়ারিতেও রপ্তানির হার আগের বছরের তুলনায় ১২ দশমিক ৩৯ শতাংশ কমেছে। ইইউভুক্ত দেশগুলো চলতি বছরের শুরুর দুই মাসে বিশ্ববাজার থেকে মোট ১ হাজার ৩৮৩ কোটি ইউরোর পোশাক আমদানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ২৭ শতাংশ কম। একই সঙ্গে আমদানির পরিমাণের দিক থেকেও ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ পতন ঘটেছে। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা পোশাকের পরিমাণের পাশাপাশি পণ্যের গড় মূল্যও কমেছে, যা আয়ের এই পতনের অন্যতম প্রধান কারণ। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ১১ দশমিক ১৪ শতাংশ কমেছে এবং প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম কমেছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।
এই নাজুক পরিস্থিতির পেছনে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থবিরতা মূল ভূমিকা পালন করছে। ইউরোপের দেশগুলোতে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং সুদের হার বৃদ্ধির ফলে ভোক্তারা পোশাক কেনার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে উঠেছেন, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। ফলে ইউরোপের খুচরা বিক্রেতারা এখন অনেক হিসাব-নিকাশ করে অর্ডার দিচ্ছেন এবং দামের বিষয়েও কঠোর দরকষাকষি করছেন। সেই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ফলে চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর প্রতিনিয়ত মূল্যছাড়ের চাপ বাড়ছে, যা দিনশেষে রপ্তানিকারকদের মুনাফার ওপর আঘাত করছে।
কেবল বাংলাদেশ নয়, বরং এই মন্দার আঁচ লেগেছে চীন ও তুরস্কের মতো বড় রপ্তানিকারক দেশগুলোর গায়েও। চীন, যারা ইউরোপের বাজারে বরাবরের মতো শীর্ষস্থানে রয়েছে, তাদের রপ্তানিও প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে। তুরস্কের মতো দেশগুলো আরও বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। পোশাক খাতের নীতিনির্ধারকদের মতে, সামগ্রিকভাবেই ইইউ বাজারে পোশাকের চাহিদা কমেছে, যার ফলে বড় সব রপ্তানিকারক দেশই একই পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে হলে এখনকার সনাতন রপ্তানি পদ্ধতির বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে। তার মতে, চীন যেভাবে ডিটুসি বা ডিরেক্ট টু কনজ্যুমার প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি গ্রাহকদের কাছে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে, আমাদেরও সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি পোশাক রপ্তানি খাতের অভ্যন্তরীণ জটিলতাগুলো দ্রুত নিরসন না করলে বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে বাজার ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে পোশাক খাতের অবদানের কথা বিবেচনায় নিয়ে এই সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির বর্তমান নিম্নমুখী প্রবণতা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রধান পোশাক রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে পরিচিত ইইউর দেশগুলোতে চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে যে ধরনের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে, তা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ইউরোস্ট্যাটের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২৮৮ কোটি ইউরো, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ কম। গত বছর একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ৩৫৭ কোটি ইউরো। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয়ে প্রায় ৬৯ কোটি ইউরোর ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা দেশের পোশাক খাতের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই মন্দা পরিস্থিতি কেবল সামগ্রিক আয়ের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং একক মাস হিসেবে ফেব্রুয়ারিতেও রপ্তানির হার আগের বছরের তুলনায় ১২ দশমিক ৩৯ শতাংশ কমেছে। ইইউভুক্ত দেশগুলো চলতি বছরের শুরুর দুই মাসে বিশ্ববাজার থেকে মোট ১ হাজার ৩৮৩ কোটি ইউরোর পোশাক আমদানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ২৭ শতাংশ কম। একই সঙ্গে আমদানির পরিমাণের দিক থেকেও ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ পতন ঘটেছে। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা পোশাকের পরিমাণের পাশাপাশি পণ্যের গড় মূল্যও কমেছে, যা আয়ের এই পতনের অন্যতম প্রধান কারণ। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ১১ দশমিক ১৪ শতাংশ কমেছে এবং প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম কমেছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।
এই নাজুক পরিস্থিতির পেছনে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থবিরতা মূল ভূমিকা পালন করছে। ইউরোপের দেশগুলোতে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং সুদের হার বৃদ্ধির ফলে ভোক্তারা পোশাক কেনার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে উঠেছেন, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। ফলে ইউরোপের খুচরা বিক্রেতারা এখন অনেক হিসাব-নিকাশ করে অর্ডার দিচ্ছেন এবং দামের বিষয়েও কঠোর দরকষাকষি করছেন। সেই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ফলে চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর প্রতিনিয়ত মূল্যছাড়ের চাপ বাড়ছে, যা দিনশেষে রপ্তানিকারকদের মুনাফার ওপর আঘাত করছে।
কেবল বাংলাদেশ নয়, বরং এই মন্দার আঁচ লেগেছে চীন ও তুরস্কের মতো বড় রপ্তানিকারক দেশগুলোর গায়েও। চীন, যারা ইউরোপের বাজারে বরাবরের মতো শীর্ষস্থানে রয়েছে, তাদের রপ্তানিও প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে। তুরস্কের মতো দেশগুলো আরও বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। পোশাক খাতের নীতিনির্ধারকদের মতে, সামগ্রিকভাবেই ইইউ বাজারে পোশাকের চাহিদা কমেছে, যার ফলে বড় সব রপ্তানিকারক দেশই একই পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে হলে এখনকার সনাতন রপ্তানি পদ্ধতির বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে। তার মতে, চীন যেভাবে ডিটুসি বা ডিরেক্ট টু কনজ্যুমার প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি গ্রাহকদের কাছে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে, আমাদেরও সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি পোশাক রপ্তানি খাতের অভ্যন্তরীণ জটিলতাগুলো দ্রুত নিরসন না করলে বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে বাজার ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে পোশাক খাতের অবদানের কথা বিবেচনায় নিয়ে এই সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন