দিকপাল

এআই ট্রাফিক জরিমানার নামে প্রতারণা, ক্লোন ওয়েবসাইট চক্রের ৩ সদস্য গ্রেফতার


ইয়াসরির মাহবুব
ইয়াসরির মাহবুব স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ | ০৩:২৭ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

এআই ট্রাফিক জরিমানার নামে প্রতারণা, ক্লোন ওয়েবসাইট চক্রের ৩ সদস্য গ্রেফতার

অফিসে যাওয়ার তাড়া কিংবা দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততার মাঝেই হঠাৎ মোবাইল ফোনে একটি এসএমএস—"আপনার গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করেছে। জরিমানা পরিশোধ না করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" বার্তার সঙ্গে দেওয়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হুবহু নকল একটি ওয়েবসাইট লিংক। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম ও আইনি ঝামেলার আশঙ্কায় অনেকেই সেই লিংকে প্রবেশ করে জরিমানা পরিশোধের চেষ্টা করেন। আর ঠিক সেখানেই পাতা ছিল সাইবার অপরাধীদের অভিনব ফিশিং ফাঁদ। বিআরটিএর ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি করা ভুয়া পোর্টাল ব্যবহার করে ট্রাফিক জরিমানা আদায়ের নামে সাধারণ মানুষের ব্যাংকিং ও ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এ ঘটনায় চক্রের মূলহোতাসহ তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, এক ভুক্তভোগী তার মোবাইল ফোনে বিআরটিএর নামে একটি ভুয়া ট্রাফিক জরিমানা ও মামলার এসএমএস পান। লিংকে প্রবেশ করতেই তিনি দেখতে পান, তার অফিসের গাড়ির বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তবে কৌশলী প্রতারকেরা সেখানে উল্লেখ করে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জরিমানা পরিশোধ করলে ৫০ শতাংশ ছাড়ে মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকা দিলেই চলবে।

বিষয়টি সত্য মনে করে তিনি একটি অনলাইন পেমেন্ট পোর্টালে প্রবেশ করেন এবং সেখানে তার স্ত্রীর ক্রেডিট কার্ডের তথ্য, ব্যাংক অ্যাপের লগইন আইডি ও ওটিপি (OTP) প্রদান করেন। এর কিছুক্ষণ পরই জরিমানা পরিশোধের পরিবর্তে তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব থেকে প্রতারণামূলকভাবে ৩ লাখ টাকা অন্য একটি ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করে নেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ভুক্তভোগী সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারে (সিপিসি) আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানান। একই ধরনের আরও দুটি অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি জানতে পারে, প্রতারক চক্রটি ভুয়া ট্রাফিক মামলার ভয় দেখিয়ে এসএমএসের মাধ্যমে ফিশিং লিংক পাঠাত। সিআইডির সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের একাধিক আভিযানিক দল প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে খুলনা, ফেনী ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন—খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার মো. রাব্বি শেখ (২৪), ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মো. রিয়াদ হোসেন (৩১) এবং ঢাকার দক্ষিণখান এলাকার মো. সাজ্জাদ হোসেন (৩১)। প্রথমে খুলনা থেকে রাব্বিকে গ্রেফতারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফেনী ও ঢাকা থেকে বাকি দুজনকে গ্রেফতার করা হয়।

এ ঘটনায় রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার তদন্তভার গ্রহণ করেছে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার।

তদন্তে জানা যায়, চক্রটি বিআরটিএর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের নকশা ও লোগো ক্লোন করে হুবহু মিল রেখে একটি ভুয়া ফিশিং সাইট তৈরি করেছিল। সরকারি ওয়েবসাইটের মতো দেখতে হওয়ায় সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হতেন। চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন কৌশলে ভুক্তভোগীদের ওটিপি সংগ্রহ করে তাদের ব্যাংক হিসাব ও কার্ড থেকে অননুমোদিত লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করত। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত একই কৌশলে অন্তত ৭ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি। চক্রের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফাতারের লক্ষ্যে অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আসামিদের আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

সিআইডি জনগণকে এ ধরনের ফিশিং প্রতারণা সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে পাঠানো এসএমএস, লিংক বা অনলাইন পেমেন্ট সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগমাধ্যম থেকে তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অপরিচিত, সন্দেহজনক বা অনিরাপদ কোনো লিংকে প্রবেশ করে ব্যাংক কার্ডের তথ্য, পিন নম্বর কিংবা ওটিপি শেয়ার না করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেছে সিআইডি।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬


এআই ট্রাফিক জরিমানার নামে প্রতারণা, ক্লোন ওয়েবসাইট চক্রের ৩ সদস্য গ্রেফতার

প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬

featured Image

অফিসে যাওয়ার তাড়া কিংবা দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততার মাঝেই হঠাৎ মোবাইল ফোনে একটি এসএমএস—"আপনার গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করেছে। জরিমানা পরিশোধ না করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" বার্তার সঙ্গে দেওয়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হুবহু নকল একটি ওয়েবসাইট লিংক। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম ও আইনি ঝামেলার আশঙ্কায় অনেকেই সেই লিংকে প্রবেশ করে জরিমানা পরিশোধের চেষ্টা করেন। আর ঠিক সেখানেই পাতা ছিল সাইবার অপরাধীদের অভিনব ফিশিং ফাঁদ। বিআরটিএর ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি করা ভুয়া পোর্টাল ব্যবহার করে ট্রাফিক জরিমানা আদায়ের নামে সাধারণ মানুষের ব্যাংকিং ও ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এ ঘটনায় চক্রের মূলহোতাসহ তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, এক ভুক্তভোগী তার মোবাইল ফোনে বিআরটিএর নামে একটি ভুয়া ট্রাফিক জরিমানা ও মামলার এসএমএস পান। লিংকে প্রবেশ করতেই তিনি দেখতে পান, তার অফিসের গাড়ির বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তবে কৌশলী প্রতারকেরা সেখানে উল্লেখ করে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জরিমানা পরিশোধ করলে ৫০ শতাংশ ছাড়ে মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকা দিলেই চলবে।

বিষয়টি সত্য মনে করে তিনি একটি অনলাইন পেমেন্ট পোর্টালে প্রবেশ করেন এবং সেখানে তার স্ত্রীর ক্রেডিট কার্ডের তথ্য, ব্যাংক অ্যাপের লগইন আইডি ও ওটিপি (OTP) প্রদান করেন। এর কিছুক্ষণ পরই জরিমানা পরিশোধের পরিবর্তে তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব থেকে প্রতারণামূলকভাবে ৩ লাখ টাকা অন্য একটি ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করে নেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ভুক্তভোগী সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারে (সিপিসি) আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানান। একই ধরনের আরও দুটি অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি জানতে পারে, প্রতারক চক্রটি ভুয়া ট্রাফিক মামলার ভয় দেখিয়ে এসএমএসের মাধ্যমে ফিশিং লিংক পাঠাত। সিআইডির সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের একাধিক আভিযানিক দল প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে খুলনা, ফেনী ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন—খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার মো. রাব্বি শেখ (২৪), ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মো. রিয়াদ হোসেন (৩১) এবং ঢাকার দক্ষিণখান এলাকার মো. সাজ্জাদ হোসেন (৩১)। প্রথমে খুলনা থেকে রাব্বিকে গ্রেফতারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফেনী ও ঢাকা থেকে বাকি দুজনকে গ্রেফতার করা হয়।

এ ঘটনায় রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার তদন্তভার গ্রহণ করেছে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার।

তদন্তে জানা যায়, চক্রটি বিআরটিএর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের নকশা ও লোগো ক্লোন করে হুবহু মিল রেখে একটি ভুয়া ফিশিং সাইট তৈরি করেছিল। সরকারি ওয়েবসাইটের মতো দেখতে হওয়ায় সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হতেন। চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন কৌশলে ভুক্তভোগীদের ওটিপি সংগ্রহ করে তাদের ব্যাংক হিসাব ও কার্ড থেকে অননুমোদিত লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করত। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত একই কৌশলে অন্তত ৭ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি। চক্রের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফাতারের লক্ষ্যে অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আসামিদের আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

সিআইডি জনগণকে এ ধরনের ফিশিং প্রতারণা সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে পাঠানো এসএমএস, লিংক বা অনলাইন পেমেন্ট সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগমাধ্যম থেকে তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অপরিচিত, সন্দেহজনক বা অনিরাপদ কোনো লিংকে প্রবেশ করে ব্যাংক কার্ডের তথ্য, পিন নম্বর কিংবা ওটিপি শেয়ার না করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেছে সিআইডি।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল