দিকপাল

সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে চালের দামে অস্থিরতা বাড়ছে


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ | ০১:০৫ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে চালের দামে অস্থিরতা বাড়ছে

জাতীয় বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে চালের বাজার নতুন করে অস্থির হয়ে উঠেছে, যা সাধারণ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। গত কয়েক সপ্তাহে খুচরা ও পাইকারি বাজারে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে পাঁচ থেকে দশ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্রেতা ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একটি অসাধু সিন্ডিকেট ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটানো হচ্ছে। অন্যদিকে, মিল মালিকদের দাবি—বাজারে ধানের সরবরাহ কম এবং ধানের উচ্চমূল্যের কারণে চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। তবে সরকারি তদারকি সংস্থাগুলো এ পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করলেও, বাজারে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, এক মাসের ব্যবধানে সরু, মাঝারি ও মোটা—সব ধরনের চালের দামই কয়েক শতাংশ হারে বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন বড় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিক্রেতারা বাধ্য হয়েই বাড়তি দামে চাল বিক্রি করছেন, কারণ পাইকারি পর্যায়ে মিল মালিকরা চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের মতে, দেশের চালের বাজার মূলত দশ থেকে বারোটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে, যারা বোরো মৌসুমের ধান ওঠার পরপরই তা বিপুল পরিমাণে মজুত করেছে। এখন ধানের দাম বাড়ার অজুহাতে তারা কৌশলে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। বিশেষ করে চাল আমদানির ঋণপত্র বা এলসি খোলার প্রক্রিয়াটি সহজ না থাকায় বাজার অস্থিতিশীল করার সুযোগ পাচ্ছে এই করপোরেট হাউসগুলো।

বাজারের বাস্তব চিত্র এখন বেশ নাজুক। তেজগাঁও ও কারওয়ান বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ঈদুল ফিতরের তুলনায় এখন মিনিকেট ও আটাশ জাতের চালের দাম বস্তাপ্রতি কয়েকশ টাকা বেড়ে গেছে। নাজিরশাইল ও পোলাওর চালের দামেও ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চালের পাশাপাশি আটা, ময়দা ও সয়াবিন তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারে এ ধরনের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্নআয়ের মানুষেরা এখন দিশেহারা। ভোক্তাদের দাবি, বাজারের কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ নেই এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করছে। অবিলম্বে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করতে হবে।

খাদ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ধান-চালের দাম কিছুটা বাড়লে কৃষকরা লাভবান হন। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে ওএমএস কর্মসূচি জোরদার করার পাশাপাশি প্রয়োজনে বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির ঋণপত্র বা এলসি সুবিধা উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রগুলোও জানিয়েছে যে, বাজার স্বাভাবিক রাখতে এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কঠোর আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তবে ক্রেতাদের মতে, শুধু ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা গেলেই কেবল এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।

ভোক্তা অধিকার সংস্থাগুলোর মতে, বাজেট ঘোষণার আগে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রভাবে চালের বাজারসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের ওপর এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত বাজেটে অনেক পণ্যের কর ও শুল্ক হ্রাসের সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও, সাধারণ মানুষ তার সুফল কতটা পাবে তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। মাঠপর্যায়ে তদারকি সংস্থাগুলোর নিস্ক্রিয়তাকে কাজে লাগিয়েই অসাধু ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে। বাজেটের ইতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের বাজার ব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেট বিরোধী লড়াইয়ে আরও বেশি সংবেদনশীল ও কঠোর হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬


সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে চালের দামে অস্থিরতা বাড়ছে

প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬

featured Image

জাতীয় বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে চালের বাজার নতুন করে অস্থির হয়ে উঠেছে, যা সাধারণ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। গত কয়েক সপ্তাহে খুচরা ও পাইকারি বাজারে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে পাঁচ থেকে দশ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্রেতা ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একটি অসাধু সিন্ডিকেট ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটানো হচ্ছে। অন্যদিকে, মিল মালিকদের দাবি—বাজারে ধানের সরবরাহ কম এবং ধানের উচ্চমূল্যের কারণে চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। তবে সরকারি তদারকি সংস্থাগুলো এ পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করলেও, বাজারে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, এক মাসের ব্যবধানে সরু, মাঝারি ও মোটা—সব ধরনের চালের দামই কয়েক শতাংশ হারে বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন বড় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিক্রেতারা বাধ্য হয়েই বাড়তি দামে চাল বিক্রি করছেন, কারণ পাইকারি পর্যায়ে মিল মালিকরা চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের মতে, দেশের চালের বাজার মূলত দশ থেকে বারোটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে, যারা বোরো মৌসুমের ধান ওঠার পরপরই তা বিপুল পরিমাণে মজুত করেছে। এখন ধানের দাম বাড়ার অজুহাতে তারা কৌশলে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। বিশেষ করে চাল আমদানির ঋণপত্র বা এলসি খোলার প্রক্রিয়াটি সহজ না থাকায় বাজার অস্থিতিশীল করার সুযোগ পাচ্ছে এই করপোরেট হাউসগুলো।

বাজারের বাস্তব চিত্র এখন বেশ নাজুক। তেজগাঁও ও কারওয়ান বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ঈদুল ফিতরের তুলনায় এখন মিনিকেট ও আটাশ জাতের চালের দাম বস্তাপ্রতি কয়েকশ টাকা বেড়ে গেছে। নাজিরশাইল ও পোলাওর চালের দামেও ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চালের পাশাপাশি আটা, ময়দা ও সয়াবিন তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারে এ ধরনের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্নআয়ের মানুষেরা এখন দিশেহারা। ভোক্তাদের দাবি, বাজারের কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ নেই এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করছে। অবিলম্বে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করতে হবে।

খাদ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ধান-চালের দাম কিছুটা বাড়লে কৃষকরা লাভবান হন। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে ওএমএস কর্মসূচি জোরদার করার পাশাপাশি প্রয়োজনে বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির ঋণপত্র বা এলসি সুবিধা উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রগুলোও জানিয়েছে যে, বাজার স্বাভাবিক রাখতে এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কঠোর আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তবে ক্রেতাদের মতে, শুধু ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা গেলেই কেবল এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।

ভোক্তা অধিকার সংস্থাগুলোর মতে, বাজেট ঘোষণার আগে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রভাবে চালের বাজারসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের ওপর এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত বাজেটে অনেক পণ্যের কর ও শুল্ক হ্রাসের সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও, সাধারণ মানুষ তার সুফল কতটা পাবে তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। মাঠপর্যায়ে তদারকি সংস্থাগুলোর নিস্ক্রিয়তাকে কাজে লাগিয়েই অসাধু ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে। বাজেটের ইতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের বাজার ব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেট বিরোধী লড়াইয়ে আরও বেশি সংবেদনশীল ও কঠোর হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল