বাংলা সাহিত্যের আকাশে সাম্য, দ্রোহ ও প্রেমের দীপ্ত প্রতীক, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী আজ যথাযথ মর্যাদা ও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হচ্ছে। বাংলা ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার অন্তর্গত জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে এই মহান বিপ্লবীর জন্ম হয়েছিল। জাতীয় পর্যায়ে কবির এই জন্মবার্ষিকী স্মরণীয় করে রাখতে দেশজুড়ে নানামুখী কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এই বছর কবিকে স্মরণের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে ‘দ্রোহের কবি, প্রাণের কবি নজরুল’।
জাতীয় কবির এই জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী একটি বছরকে অর্থাৎ ২৫ মে ২০২৬ থেকে ২৫ মে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময়কালকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। কবির স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন।
বিশেষ এই দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে কবি কাজী নজরুল ইসলামের চির অম্লান ও কালজয়ী স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদন করেন এবং কবির বিদেহী আত্মার মাগফirat কামনা করেন। বাণীতে তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক অবিস্মরণীয় এবং অনিবার্য নাম। পরাধীনতা ও শোষণে জর্জরিত একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন জাতির ভাগ্যাকাশে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন এক আলোর দিশারি বা বাতিঘরের মতো। এক মুমূর্ষু ও ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য এবং সামগ্রিকভাবে মুক্তিকামী মানুষকে সচেতন ও স্বাবলম্বী করার জন্য তৎকালীন সময়ে যে ধরনের সর্বগ্রাসী এবং অদম্য প্রতিভার প্রয়োজন ছিল, জাতীয় কবি ছিলেন ঠিক সেই আকাঙ্ক্ষিত পুরুষ।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের পুরো জীবনটাই ছিল যেন অন্যায় আর শোষণের বিরুদ্ধে এক অবিরাম যুদ্ধ ঘোষণা এবং একটি অনন্য সাধারণ বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ ছিল ঔপনিবেশিক শাসন, পরাধীনতার শৃঙ্খল, জুলুম, অমানুষিক নির্যাতন, অর্থনৈতিক শোষণ, সামাজিক অসাম্য, বৈষম্য, অন্ধ কুসংস্কার এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে। মানুষ, মানবিকতা, পূর্ণ স্বাধীনতা, শোষণমুক্ত সমাজ গঠন এবং নারীমুক্তির পক্ষে নজরুলের চেয়ে বেশি শক্তিশালী ও শিল্পসফল শব্দ আর কেউ রচনা করতে পারেননি। তিনিই ছিলেন এই উপমহাদেশের প্রথম এমন এক কবি, সাংবাদিক ও রাজনীতিক যিনি ঔপনিবেশিক শক্তির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এই অঞ্চলের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি সরাসরি উত্থাপন করেছিলেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর যে অকৃত্রিম দরদ ও গভীর অঙ্গীকার ছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে সত্যি অতুলনীয়।
মাতৃভূমিকে ভালোবাসার ক্ষেত্রেও তিনি আমাদের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস। আমাদের সাধারণ মানুষের জীবন, আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য কবির রচনার মধ্যে এক মহিমাময় সৌন্দর্যে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিধি এতই বিশাল যে সেখানে সব কালের এবং সব শ্রেণির মানুষের প্রবেশাধিকার রয়েছে। যে কোনো অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কবির সৃষ্টি আজও আমাদের প্রধান পাথেয়। তাই বর্তমান সময়েও কবির প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজনীয়তা কোনোভাবেই ফুরিয়ে যাওয়ার নয়।
সরকার প্রধান তাঁর বক্তব্যে আরও মনে করিয়ে দেন যে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে কবির কবিতা ও গান ছিল সাধারণ মানুষের অনুপ্রেরণার এক প্রবল শক্তি। ঠিক একইভাবে আমাদের অতীতের সব ধরনের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও স্বাধিকার সংগ্রামে কবির সৃষ্টিশীলতাই হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মূল ভাষা। তিনি আমাদের দৈনন্দিন যাপিত জীবনের এক অনিবার্য অংশ। বাংলা কাব্য ও সংগীতে তাঁর আবির্ভাব ছিল আকাশছোঁয়া এক ধূমকেতুর মতো বিস্ময়কর ও অভূতপূর্ব। মাত্র দুই দশকের সৃজনশীল সাধনা দিয়ে তিনি এই পুরো জাতিকে আত্মপ্রত্যয়ী ও সাহসী করে তুলেছেন এবং আমাদের জাতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করে দিয়ে গেছেন। তিনি সত্যিকার অর্থেই আমাদের জাতীয় রেনেসাঁ বা নবজাগরণের এক প্রধান নিশানবরদার। একই সাথে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি হলেও সারা পৃথিবীর শোষিত, বঞ্চিত ও মজলুম মানুষের হৃদয়ের অত্যন্ত আপনজন। বাংলাদেশ এবং কাজী নজরুল ইসলাম আসলে এক অবিভাজ্য সত্তা। তিনি বিশ্ব কবিসভার একজন অন্যতম প্রধান নায়ক এবং আমাদের জাতীয় চেতনা ও জাতীয়তাবাদের মূল পথিকৃৎ। কবির এই জন্মদিনে আমাদের মূল প্রত্যয় হওয়া উচিত সব ধরনের অন্যায়, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও পারস্পরিক বিভেদের গ্লানি মুছে ফেলে সুখী, সমৃদ্ধ ও একটি গণতান্ত্রিক মাতৃভূমি গড়ে তোলার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করা।
জাতীয় কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে আজ সোমবার দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ভাবগম্ভীর কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এই উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা খুব ভোরে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সমবেত হন। সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহকারে সবাই কবির মাজারে গমন করেন। সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ফাতেহা পাঠ ও কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে কবির স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কুমিল্লার দৌলতপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যথাযথ মর্যাদায় কবির জন্মবার্ষিকী উদ্যাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ দেশের সব বেসরকারি টেলিভিশন ও বেতার কেন্দ্রগুলো এই উপলক্ষে দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করছে।
১৮৯৯ সালের ২৫ মে জন্মগ্রহণ করা এই মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন একাধারে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিক ও দার্শনিক। তাঁর রচিত প্রায় তিন হাজার গান এবং সেগুলোর চমৎকার সুরারোপ বাংলা সংগীতে ‘নজরুলসংগীত’ নামে এক স্বতন্ত্র ও সমৃদ্ধ ধারা তৈরি করেছে। শৈশবে চরম দারিদ্র্যের কারণে তাঁর ডাকনাম রাখা হয়েছিল ‘দুখু মিয়া’। মাত্র ৯ বছর বয়সে ১৯০৮ সালে তিনি পিতৃহারা হন এবং একসময় জীবিকার তাগিদে গ্রামীণ মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজও করেন। ১৯১৭ সালের শেষভাগ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত তিনি ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে কর্মজীবন কাটান এবং নিজের যোগ্যতায় করপোরাল থেকে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পদে উন্নীত হন। যুদ্ধ শেষ করে কলকাতায় ফিরে এসে তিনি মূলত সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মূল ধারায় প্রবেশ করেন।
১৯২১ সালে কুমিল্লার প্রমীলা দেবীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর ১৯২২ সালে তাঁর বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে পুরো উপমহাদেশে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হয়। একই বছরের শেষের দিকে ব্রিটিশ সরকার তাঁর ‘যুগবাণী’ নামক প্রবন্ধগ্রন্থটি বাজেয়াপ্ত করে এবং তাঁকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯২৩ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের পক্ষে যে ঐতিহাসিক জবানবন্দি দিয়েছিলেন, তা বাংলা সাহিত্যে ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ নামে এক অনন্য সাহিত্যিক মর্যাদা লাভ করেছে। দুর্ভাগ্যবশত, জীবনের মধ্যবয়সে এসে কবি এক বিরল রোগে আক্রান্ত হন এবং চিরতরে নিজের বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এর ফলে আমৃত্যু তাঁকে তাঁর প্রিয় সাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট এই মহান বিপ্লবী কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬
বাংলা সাহিত্যের আকাশে সাম্য, দ্রোহ ও প্রেমের দীপ্ত প্রতীক, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী আজ যথাযথ মর্যাদা ও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হচ্ছে। বাংলা ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার অন্তর্গত জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে এই মহান বিপ্লবীর জন্ম হয়েছিল। জাতীয় পর্যায়ে কবির এই জন্মবার্ষিকী স্মরণীয় করে রাখতে দেশজুড়ে নানামুখী কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এই বছর কবিকে স্মরণের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে ‘দ্রোহের কবি, প্রাণের কবি নজরুল’।
জাতীয় কবির এই জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী একটি বছরকে অর্থাৎ ২৫ মে ২০২৬ থেকে ২৫ মে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময়কালকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। কবির স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন।
বিশেষ এই দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে কবি কাজী নজরুল ইসলামের চির অম্লান ও কালজয়ী স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদন করেন এবং কবির বিদেহী আত্মার মাগফirat কামনা করেন। বাণীতে তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক অবিস্মরণীয় এবং অনিবার্য নাম। পরাধীনতা ও শোষণে জর্জরিত একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন জাতির ভাগ্যাকাশে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন এক আলোর দিশারি বা বাতিঘরের মতো। এক মুমূর্ষু ও ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য এবং সামগ্রিকভাবে মুক্তিকামী মানুষকে সচেতন ও স্বাবলম্বী করার জন্য তৎকালীন সময়ে যে ধরনের সর্বগ্রাসী এবং অদম্য প্রতিভার প্রয়োজন ছিল, জাতীয় কবি ছিলেন ঠিক সেই আকাঙ্ক্ষিত পুরুষ।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের পুরো জীবনটাই ছিল যেন অন্যায় আর শোষণের বিরুদ্ধে এক অবিরাম যুদ্ধ ঘোষণা এবং একটি অনন্য সাধারণ বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ ছিল ঔপনিবেশিক শাসন, পরাধীনতার শৃঙ্খল, জুলুম, অমানুষিক নির্যাতন, অর্থনৈতিক শোষণ, সামাজিক অসাম্য, বৈষম্য, অন্ধ কুসংস্কার এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে। মানুষ, মানবিকতা, পূর্ণ স্বাধীনতা, শোষণমুক্ত সমাজ গঠন এবং নারীমুক্তির পক্ষে নজরুলের চেয়ে বেশি শক্তিশালী ও শিল্পসফল শব্দ আর কেউ রচনা করতে পারেননি। তিনিই ছিলেন এই উপমহাদেশের প্রথম এমন এক কবি, সাংবাদিক ও রাজনীতিক যিনি ঔপনিবেশিক শক্তির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এই অঞ্চলের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি সরাসরি উত্থাপন করেছিলেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর যে অকৃত্রিম দরদ ও গভীর অঙ্গীকার ছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে সত্যি অতুলনীয়।
মাতৃভূমিকে ভালোবাসার ক্ষেত্রেও তিনি আমাদের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস। আমাদের সাধারণ মানুষের জীবন, আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য কবির রচনার মধ্যে এক মহিমাময় সৌন্দর্যে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিধি এতই বিশাল যে সেখানে সব কালের এবং সব শ্রেণির মানুষের প্রবেশাধিকার রয়েছে। যে কোনো অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কবির সৃষ্টি আজও আমাদের প্রধান পাথেয়। তাই বর্তমান সময়েও কবির প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজনীয়তা কোনোভাবেই ফুরিয়ে যাওয়ার নয়।
সরকার প্রধান তাঁর বক্তব্যে আরও মনে করিয়ে দেন যে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে কবির কবিতা ও গান ছিল সাধারণ মানুষের অনুপ্রেরণার এক প্রবল শক্তি। ঠিক একইভাবে আমাদের অতীতের সব ধরনের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও স্বাধিকার সংগ্রামে কবির সৃষ্টিশীলতাই হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মূল ভাষা। তিনি আমাদের দৈনন্দিন যাপিত জীবনের এক অনিবার্য অংশ। বাংলা কাব্য ও সংগীতে তাঁর আবির্ভাব ছিল আকাশছোঁয়া এক ধূমকেতুর মতো বিস্ময়কর ও অভূতপূর্ব। মাত্র দুই দশকের সৃজনশীল সাধনা দিয়ে তিনি এই পুরো জাতিকে আত্মপ্রত্যয়ী ও সাহসী করে তুলেছেন এবং আমাদের জাতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করে দিয়ে গেছেন। তিনি সত্যিকার অর্থেই আমাদের জাতীয় রেনেসাঁ বা নবজাগরণের এক প্রধান নিশানবরদার। একই সাথে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি হলেও সারা পৃথিবীর শোষিত, বঞ্চিত ও মজলুম মানুষের হৃদয়ের অত্যন্ত আপনজন। বাংলাদেশ এবং কাজী নজরুল ইসলাম আসলে এক অবিভাজ্য সত্তা। তিনি বিশ্ব কবিসভার একজন অন্যতম প্রধান নায়ক এবং আমাদের জাতীয় চেতনা ও জাতীয়তাবাদের মূল পথিকৃৎ। কবির এই জন্মদিনে আমাদের মূল প্রত্যয় হওয়া উচিত সব ধরনের অন্যায়, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও পারস্পরিক বিভেদের গ্লানি মুছে ফেলে সুখী, সমৃদ্ধ ও একটি গণতান্ত্রিক মাতৃভূমি গড়ে তোলার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করা।
জাতীয় কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে আজ সোমবার দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ভাবগম্ভীর কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এই উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা খুব ভোরে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সমবেত হন। সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহকারে সবাই কবির মাজারে গমন করেন। সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ফাতেহা পাঠ ও কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে কবির স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কুমিল্লার দৌলতপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যথাযথ মর্যাদায় কবির জন্মবার্ষিকী উদ্যাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ দেশের সব বেসরকারি টেলিভিশন ও বেতার কেন্দ্রগুলো এই উপলক্ষে দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করছে।
১৮৯৯ সালের ২৫ মে জন্মগ্রহণ করা এই মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন একাধারে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিক ও দার্শনিক। তাঁর রচিত প্রায় তিন হাজার গান এবং সেগুলোর চমৎকার সুরারোপ বাংলা সংগীতে ‘নজরুলসংগীত’ নামে এক স্বতন্ত্র ও সমৃদ্ধ ধারা তৈরি করেছে। শৈশবে চরম দারিদ্র্যের কারণে তাঁর ডাকনাম রাখা হয়েছিল ‘দুখু মিয়া’। মাত্র ৯ বছর বয়সে ১৯০৮ সালে তিনি পিতৃহারা হন এবং একসময় জীবিকার তাগিদে গ্রামীণ মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজও করেন। ১৯১৭ সালের শেষভাগ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত তিনি ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে কর্মজীবন কাটান এবং নিজের যোগ্যতায় করপোরাল থেকে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পদে উন্নীত হন। যুদ্ধ শেষ করে কলকাতায় ফিরে এসে তিনি মূলত সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মূল ধারায় প্রবেশ করেন।
১৯২১ সালে কুমিল্লার প্রমীলা দেবীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর ১৯২২ সালে তাঁর বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে পুরো উপমহাদেশে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হয়। একই বছরের শেষের দিকে ব্রিটিশ সরকার তাঁর ‘যুগবাণী’ নামক প্রবন্ধগ্রন্থটি বাজেয়াপ্ত করে এবং তাঁকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯২৩ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের পক্ষে যে ঐতিহাসিক জবানবন্দি দিয়েছিলেন, তা বাংলা সাহিত্যে ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ নামে এক অনন্য সাহিত্যিক মর্যাদা লাভ করেছে। দুর্ভাগ্যবশত, জীবনের মধ্যবয়সে এসে কবি এক বিরল রোগে আক্রান্ত হন এবং চিরতরে নিজের বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এর ফলে আমৃত্যু তাঁকে তাঁর প্রিয় সাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট এই মহান বিপ্লবী কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

আপনার মতামত লিখুন