দিকপাল

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা: উপভাষা নয়, জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য


জহিরুল ইসলাম
জহিরুল ইসলাম সাংবাদিক ও কলামিস্ট, কক্সবাজার
প্রকাশ : সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:৩৩ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা: উপভাষা নয়, জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

একটি ভাষার ভেতরে কতটা ইতিহাস বাস করে? কতটা শৈশব, কতটা অভিমান, কতটা হাসি-কান্না আর কতটা মানুষের না-বলা কথা জমা থাকে তার শব্দে? অভিধান হয়তো একটি শব্দের অর্থ জানাতে পারে, কিন্তু সেই শব্দ উচ্চারণের সময় মানুষের কণ্ঠে যে মমতা, স্নেহ কিংবা অভিমানের সুর তৈরি হয়, তার সবটুকু কি অভিধানে ধরা পড়ে? প্রতিটি জনপদের ভাষার ভেতরে এমন একটি অদৃশ্য জগৎ রয়েছে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাও তেমন—একটি জনপদের জীবন, স্মৃতি, সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার জীবন্ত আধার।

এই ভাষার শক্তি বোঝার জন্য কখনো কখনো একটি গানের দিকে তাকানোই যথেষ্ট। গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী সিরাজুল ইসলাম আজাদের ‘ও মামুরে, হেডমাস্টরে তোঁয়ারে তোয়ার’ গানটির কথা মনে করা যেতে পারে। ২০০২ সালে চট্টগ্রামের আমিন স্টোর থেকে প্রকাশিত ‘হেডমাস্টর’ অ্যালবামের এই গানটি তখন চট্টগ্রামের অতীত সব রেকর্ড ভেঙে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছিল। গানটির শব্দচয়ন, সম্বোধনরীতি ও ছন্দে চট্টগ্রামের ভাষিক স্বাতন্ত্র্য শুধু প্রকাশিত হয়নি, ধরা পড়েছে একটি জনপদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক অনুভবও।

এখানে আঞ্চলিক ভাষা কোনো অনুবাদের অপেক্ষায় থাকা অসম্পূর্ণ প্রকাশমাধ্যম নয়; নিজের শক্তিতেই তা পরিস্থিতি ও জীবনঘনিষ্ঠ অনুভূতি প্রকাশ করে। একটি গান কীভাবে স্থানীয় ভাষাকে মানুষের স্মৃতিতে স্থায়ী করে তুলতে পারে, সিরাজুল ইসলাম আজাদের এই সৃষ্টি তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

ভাষার পরিচয়, পরিচয়ের ভাষা

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার স্বাতন্ত্র্য তার উচ্চারণ, শব্দভান্ডার, বাক্যগঠন, বাগ্‌ভঙ্গি ও প্রকাশের নিজস্বতায়। বৃহত্তর বাংলা ভাষার সঙ্গে এর সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ এর আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে স্বতন্ত্রভাবে বোঝা। চট্টগ্রামের সব এলাকার কথ্যরীতি এক নয়; অঞ্চল, বয়স, পরিবার ও সামাজিক পরিবেশের ভেদে ভাষার ব্যবহারে পার্থক্য দেখা যায়। এই বৈচিত্র্যকে একটি ছাঁচে ফেলে বিচার করলে ভাষাটির প্রকৃত রূপ ধরা পড়বে না।

ভাষাবিজ্ঞানে ‘উপভাষা’ একটি স্বাভাবিক পরিভাষা। উপভাষা মানেই বিকৃত ভাষা নয়, কিংবা প্রমিত ভাষার অসম্পূর্ণ সংস্করণও নয়। একটি ভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপের নিজস্ব ধ্বনি, শব্দ ও ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। তাই চট্টগ্রামের ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য ‘উপভাষা’ পরিচয় অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন সেই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, যা আঞ্চলিক ভাষাকে হীনতর বলে বিবেচনা করে।

প্রমিত বাংলা শিক্ষা, প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম ও বৃহত্তর যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার প্রয়োজনীয়তা আঞ্চলিক ভাষার সাংস্কৃতিক মূল্যকে বাতিল করে না। একজন মানুষ প্রমিত বাংলায় লিখতে পারেন, বিভিন্ন পরিবেশে প্রমিত ভাষায় কথা বলতে পারেন, আবার নিজের অঞ্চলের ভাষায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন। এই সহাবস্থান কোনো দুর্বলতা নয়; বরং ভাষিক সক্ষমতার পরিচয়।

চট্টগ্রামের ভাষার কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এখানে উল্লেখযোগ্য। প্রমিত বাংলায় নিষেধার্থক ‘না’ ক্রিয়ার পরে বসে (‘আমি যাব না’), কিন্তু চট্টগ্রামে এটি ক্রিয়ার আগে বসে (‘আঁই ন যাইয়ুম’)। শব্দভান্ডারেও স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়—‘টাকা’ হয় ‘টিঁয়া’, ‘ভালো’ হয় ‘গম’, ‘ছেলেমেয়ে’ হয় ‘ফোয়াসা’। উচ্চারণে মহাপ্রাণ ধ্বনির হ্রাস, অনুনাসিকতার ব্যাপক ব্যবহার এবং আরবি-ফার্সি-পর্তুগিজ উৎসের শব্দের উপস্থিতি এই ভাষাকে আরও স্বতন্ত্র করে তুলেছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো শুধু ধ্বনিগত নয়, একটি জনপদের ইতিহাসেরও সাক্ষ্য।

জনপদের স্মৃতি ও ভাষার অন্তর্জগৎ

একটি অঞ্চলের ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহ, রাজনৈতিক ঘটনা কিংবা লিখিত দলিলে সংরক্ষিত থাকে না। ইতিহাসের আরেকটি বড় অংশ ছড়িয়ে থাকে মানুষের মুখের ভাষায়—প্রবাদে, লোককথায়, পারিবারিক সম্বোধনে, পেশাগত শব্দে এবং দৈনন্দিন কথোপকথনে। এসবের মধ্যে এমন অভিজ্ঞতা জমা থাকে, যা আনুষ্ঠানিক ইতিহাসে খুব কমই জায়গা পায়।

চট্টগ্রামের ভাষার ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। কর্ণফুলী, সাঙ্গু ও মাতামুহুরীর অববাহিকা, উপকূলের জীবন, মাছ ধরা, নৌযাত্রা, কৃষিকাজ, বাণিজ্য এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্গে ভাষার নানা প্রকাশরীতি যুক্ত হয়ে আছে। চট্টগ্রাম বন্দর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরব, পারস্য, তুর্কি ও পর্তুগিজ বণিকদের মিলনকেন্দ্র ছিল। আরাকানি শাসনের প্রভাবও এখানে পড়েছে। এই বহুভাষিক যোগাযোগের ফলে ভাষায় আরবি-ফার্সি-পর্তুগিজ শব্দের স্তর তৈরি হয়েছে, যা প্রমিত বাংলার তুলনায় অনেক বেশি ঘন। কোনো শব্দ কীভাবে তৈরি হলো, কোনো প্রবাদ কোন সামাজিক অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নিল, কিংবা কোনো সম্বোধন কীভাবে ঘনিষ্ঠতা ও শ্রদ্ধার পার্থক্য প্রকাশ করে—এসব অনুসন্ধান একটি জনপদের সামাজিক ইতিহাস বোঝার পথ খুলে দিতে পারে।

ভাষার এই সম্পদ সব সময় অভিধানে ধরা পড়ে না। অনেক শব্দের অর্থ বোঝা যায় পরিস্থিতি, স্বরভঙ্গি ও সম্পর্কের ভেতর দিয়ে। একই বাক্য কখনো স্নেহ, কখনো অভিমান, কখনো কৌতুক, আবার কখনো প্রতিবাদের অর্থ বহন করতে পারে। ফলে ভাষা সংরক্ষণ মানে শুধু শব্দ সংগ্রহ করা নয়; শব্দের সঙ্গে যুক্ত ব্যবহার, পরিস্থিতি ও অনুভূতিকেও বোঝা।

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান এই মৌখিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিল্পী, গীতিকার ও সুরকারেরা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, হাসি-কান্না, প্রেম, বিচ্ছেদ, সামাজিক সম্পর্ক ও সমকালীন অভিজ্ঞতাকে গানের ভাষায় রূপ দিয়েছেন। সিরাজুল ইসলাম আজাদের পাশাপাশি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগীতের অন্য শিল্পীদের কাজও এই ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। গবেষক দীপংকর দে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানকে এই অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের পাঠ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। গানের এই শক্তি আমাদের একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়: কোনো ভাষা যখন মানুষের মুখে মুখে ফেরে, তখন তা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না; হয়ে ওঠে সমষ্টিগত স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বাহক।

মর্যাদার প্রশ্ন: কোন ভাষা শুদ্ধ, কোন ভাষা অশুদ্ধ?

ভাষা নিয়ে সামাজিক বৈষম্যের একটি সূক্ষ্ম দিক রয়েছে। মানুষের উচ্চারণ থেকে তার শিক্ষা, সামাজিক অবস্থান কিংবা যোগ্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। কোনো আঞ্চলিক উচ্চারণ শুনে কাউকে কম শিক্ষিত বা কম পরিশীলিত মনে করা হলে ভাষাগত পার্থক্য সামাজিক বিচার করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

কিন্তু ভাষার উচ্চারণ আর মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা এক বিষয় নয়। একজন মানুষ নিজের আঞ্চলিক ভাষায় গভীর চিন্তা প্রকাশ করতে পারেন, জটিল অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে পারেন, সূক্ষ্ম অনুভূতি ব্যক্ত করতে পারেন এবং অন্যের মনোভাব অনুধাবন করতে পারেন। তার ভাষা প্রমিত বাংলার সঙ্গে কতটা মেলে, তা দিয়ে এসব সক্ষমতার বিচার করা যায় না।

এখানেই আঞ্চলিক ভাষার সাংস্কৃতিক তাৎপর্য নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়। যে ভাষার উচ্চারণকে কোনো কোনো সামাজিক পরিবেশে অবজ্ঞা করা হয়, সেই ভাষাই যখন সংগীত, কবিতা বা দৈনন্দিন কথোপকথনে মানুষের আনন্দ, বেদনা, প্রেম, বিচ্ছেদ, সামাজিক সম্পর্ক এবং জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে সক্ষম হয়, তখন তার প্রকাশক্ষমতা অস্বীকার করা কঠিন। সিরাজুল ইসলাম আজাদের গানগুলো এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ মাত্র। এসব সৃষ্টি দেখায়, আঞ্চলিক ভাষা শুধু আবেগের বাহন নয়; চট্টগ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা, স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতাকেও জীবন্ত করে তুলতে পারে। অবশ্য একটি জনপ্রিয় গান দিয়ে ভাষার সব বৈশিষ্ট্য বিচার করা যায় না; কিন্তু এ ধরনের সৃষ্টি দেখায়, আঞ্চলিক ভাষা সৃজনশীল শিল্পের শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।

প্রমিত ভাষার প্রয়োজন অস্বীকার করারও সুযোগ নেই। শিক্ষা, প্রশাসন, সংবাদপত্র ও বৃহত্তর যোগাযোগের জন্য একটি মান্য লিখিত রীতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রমিত ভাষার ব্যবহারকে যদি শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড বানানো হয়, তাহলে আঞ্চলিক ভাষার স্বাভাবিক বৈচিত্র্য অযথা অবমূল্যায়িত হয়। সিলেটি বা নোয়াখাইল্যা ভাষার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সামাজিক চাপ দেখা যায়। নিজের ভাষাকে সম্মান করার অর্থ অন্য ভাষাকে ছোট করা নয়। বরং ভাষার মর্যাদা সম্পর্কে এমন একটি উদার ধারণা তৈরি করা, যেখানে পার্থক্যকে ত্রুটি না ভেবে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে দেখা হয়।

পরিবর্তন কি ভাষার সংকট, নাকি স্বাভাবিক বিবর্তন?

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে আলোচনায় একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ: নতুন প্রজন্ম কি আগের প্রজন্মের মতো এই ভাষা ব্যবহার করছে? পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং অভিবাসী জীবনে ভাষার ব্যবহার কি বদলে যাচ্ছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে দেওয়া উচিত নয়। কোন ভাষারূপ বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, তা বুঝতে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্র আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পরিবারে শিশুদের সঙ্গে কোন ভাষায় কথা বলা হয়, বন্ধুমহলে কোন ভাষা স্বাভাবিক, কর্মক্ষেত্রে কোন ভাষা প্রয়োজন হয় এবং অনলাইনে মানুষ কীভাবে নিজের ভাব প্রকাশ করে—এসবের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।

কেউ প্রমিত বাংলা শিখছেন বলেই যে তিনি আঞ্চলিক ভাষা ছেড়ে দিচ্ছেন, এমন সিদ্ধান্ত যথার্থ নয়। আবার ঘরে ভাষাটি প্রচলিত আছে বলেই তার সব শব্দ, প্রবাদ ও পুরোনো প্রকাশরীতি সমানভাবে টিকে আছে, তা-ও ধরে নেওয়া যায় না।

ভাষার পরিবর্তন এবং ভাষার বিলুপ্তি এক বিষয় নয়। ভাষা নতুন শব্দ গ্রহণ করে, পুরোনো শব্দের ব্যবহার বদলায়, উচ্চারণে পরিবর্তন আসে। এসবই ভাষার স্বাভাবিক জীবনের অংশ। উদ্বেগের জায়গা হলো, কোনো ভাষা যদি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সৃজনশীলতা ও প্রজন্মান্তরের যোগাযোগ থেকে ক্রমে সরে যেতে থাকে, তখন তার বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো হারানোর ঝুঁকি বাড়ে।

তাই চট্টগ্রামের ভাষা নিয়ে প্রয়োজন আবেগনির্ভর বিপন্নতার ঘোষণা নয়, বরং পরিকল্পিত অনুসন্ধান। বিভিন্ন এলাকার কথ্যরীতি, শিশু-কিশোরদের ভাষা ব্যবহার, পারিবারিক ভাষাচর্চা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে আঞ্চলিক ভাষার উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা হলে ভাষাটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব।

সংরক্ষণ মানে অতীতকে আটকে রাখা নয়

ভাষা সংরক্ষণের কথা উঠলেই কখনো কখনো মনে হয়, পুরোনো শব্দ ও উচ্চারণকে অপরিবর্তিত রাখাই প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু জীবন্ত ভাষাকে এভাবে স্থির করে রাখা যায় না। মানুষ বদলায়, সমাজ বদলায়, ভাষাও বদলায়। তাই চট্টগ্রামের ভাষা রক্ষার অর্থ কোনো একটি রূপকে একমাত্র শুদ্ধ রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং এর বৈচিত্র্য, ব্যবহার ও সৃজনশীলতাকে সচল রাখা।

পরিবারে শিশুদের সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা, বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে পুরোনো শব্দ ও প্রবাদ সংগ্রহ করা, স্থানীয় গল্প ও লোকগান ধারণ করা এবং ভাষার বিভিন্ন রূপ যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করা—এসব কাজ একই বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলো চট্টগ্রামের ভাষার শব্দভান্ডার, ধ্বনি, বাক্যগঠন ও আঞ্চলিক পার্থক্য নিয়ে গবেষণা করতে পারে। স্থানীয় লেখক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা তৈরি করতে পারেন প্রবাদ-প্রবচনের সংকলন, মৌখিক ইতিহাসের সংগ্রহ এবং আঞ্চলিক ভাষায় গল্প, কবিতা ও শিশুতোষ বই। বেতার, দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই ভাষার সৃজনশীল ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব।

প্রযুক্তি এ ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। মানুষের মুখের ভাষা অডিও ও ভিডিওতে ধারণ করা যায়; শব্দের অর্থ, ব্যবহার ও উচ্চারণের নমুনা নিয়ে উন্মুক্ত ডিজিটাল সংগ্রহশালা গড়ে তোলা যায়। তবে এসব সংগ্রহে শুধু বহুল পরিচিত শব্দ নয়, বিভিন্ন এলাকার ও প্রজন্মের ভাষাগত বৈচিত্র্যকেও জায়গা দিতে হবে।

সংরক্ষণকে কেবল উৎসব, আনুষ্ঠানিক দিবস কিংবা স্মারক প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ভাষা বাঁচে ব্যবহারে, নতুন সৃষ্টিতে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তার প্রয়োজনীয়তা বজায় থাকার মধ্য দিয়ে। আঞ্চলিক ভাষায় মানসম্মত সাহিত্য রচিত হলে, তরুণেরা সেই ভাষায় নতুন বিষয় নিয়ে লিখলে এবং ডিজিটাল মাধ্যমে ভাষাটি স্বাভাবিকভাবে ব্যবহৃত হলে তার সাংস্কৃতিক পরিসরও প্রসারিত হবে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের দায়

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা সংরক্ষণের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত কেবল ভাষার প্রশ্ন নয়; এটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্ন। আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে কী দিয়ে যেতে চাই—কিছু পুরোনো শব্দের তালিকা, কয়েকটি লোকগানের রেকর্ড, নাকি এমন একটি জীবন্ত ভাষিক পরিবেশ, যেখানে তারা নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ বজায় রেখেও নতুন পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে?

এই দায়িত্ব কোনো একক প্রতিষ্ঠান কিংবা কয়েকজন ভাষাপ্রেমীর নয়। পরিবারের আছে ভাষাকে স্বাভাবিক জীবনের অংশ করে রাখার দায়িত্ব; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আছে ভাষার বৈচিত্র্য সম্পর্কে সম্মানজনক ধারণা তৈরির দায়িত্ব; গবেষকদের আছে ভাষার বৈশিষ্ট্য ও পরিবর্তন নথিবদ্ধ করার দায়িত্ব; আর লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের আছে ভাষাটিকে নতুন সৃষ্টির মাধ্যমে জীবন্ত রাখার সুযোগ।

তবে এসব উদ্যোগের আগে প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। নিজের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলাকে যেন কেউ অশিক্ষার লক্ষণ মনে না করেন, আবার ভাষাপ্রেমের নামে প্রমিত বাংলার প্রয়োজনীয়তাকেও অস্বীকার না করেন। একটি ভাষার প্রতি ভালোবাসা তখনই পরিণত হয়, যখন তা অন্য ভাষার প্রতি অবজ্ঞা তৈরি না করে বরং ভাষিক বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ায়।

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাকে অতীতের স্মারক হিসেবে নয়, বর্তমানের সৃজনশীল শক্তি হিসেবে দেখতে হবে। এর শব্দে রয়েছে মানুষের অভিজ্ঞতা, প্রকাশভঙ্গিতে রয়েছে সম্পর্কের সূক্ষ্মতা, আর এর পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে সময়ের চলমান ইতিহাস। সেই সম্পদকে ধরে রাখার অর্থ ভাষাকে কাচের ঘরে বন্দী করা নয়; বরং তার স্বাভাবিক জীবনকে আরও বিস্তৃত করা।

আঞ্চলিক ভাষায় রচিত গান, কবিতা বা সাহিত্যকর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি আঞ্চলিক ভাষা তার নিজস্ব স্বর ও ছন্দ নিয়েই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে। সেই ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার কাজ তাই শুধু অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা নয়; এটি ভবিষ্যতের প্রতি দায়িত্বও।

চট্টগ্রামের ভাষাকে আমরা কি শুধু আমাদের শৈশবের স্মৃতি হিসেবে রেখে দিতে চাই, নাকি আগামী প্রজন্মের জীবন্ত অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবেও বাঁচিয়ে রাখতে চাই?


zahirulislam2933@gmail.com

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬


চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা: উপভাষা নয়, জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

একটি ভাষার ভেতরে কতটা ইতিহাস বাস করে? কতটা শৈশব, কতটা অভিমান, কতটা হাসি-কান্না আর কতটা মানুষের না-বলা কথা জমা থাকে তার শব্দে? অভিধান হয়তো একটি শব্দের অর্থ জানাতে পারে, কিন্তু সেই শব্দ উচ্চারণের সময় মানুষের কণ্ঠে যে মমতা, স্নেহ কিংবা অভিমানের সুর তৈরি হয়, তার সবটুকু কি অভিধানে ধরা পড়ে? প্রতিটি জনপদের ভাষার ভেতরে এমন একটি অদৃশ্য জগৎ রয়েছে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাও তেমন—একটি জনপদের জীবন, স্মৃতি, সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার জীবন্ত আধার।

এই ভাষার শক্তি বোঝার জন্য কখনো কখনো একটি গানের দিকে তাকানোই যথেষ্ট। গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী সিরাজুল ইসলাম আজাদের ‘ও মামুরে, হেডমাস্টরে তোঁয়ারে তোয়ার’ গানটির কথা মনে করা যেতে পারে। ২০০২ সালে চট্টগ্রামের আমিন স্টোর থেকে প্রকাশিত ‘হেডমাস্টর’ অ্যালবামের এই গানটি তখন চট্টগ্রামের অতীত সব রেকর্ড ভেঙে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছিল। গানটির শব্দচয়ন, সম্বোধনরীতি ও ছন্দে চট্টগ্রামের ভাষিক স্বাতন্ত্র্য শুধু প্রকাশিত হয়নি, ধরা পড়েছে একটি জনপদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক অনুভবও।

এখানে আঞ্চলিক ভাষা কোনো অনুবাদের অপেক্ষায় থাকা অসম্পূর্ণ প্রকাশমাধ্যম নয়; নিজের শক্তিতেই তা পরিস্থিতি ও জীবনঘনিষ্ঠ অনুভূতি প্রকাশ করে। একটি গান কীভাবে স্থানীয় ভাষাকে মানুষের স্মৃতিতে স্থায়ী করে তুলতে পারে, সিরাজুল ইসলাম আজাদের এই সৃষ্টি তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

ভাষার পরিচয়, পরিচয়ের ভাষা

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার স্বাতন্ত্র্য তার উচ্চারণ, শব্দভান্ডার, বাক্যগঠন, বাগ্‌ভঙ্গি ও প্রকাশের নিজস্বতায়। বৃহত্তর বাংলা ভাষার সঙ্গে এর সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ এর আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে স্বতন্ত্রভাবে বোঝা। চট্টগ্রামের সব এলাকার কথ্যরীতি এক নয়; অঞ্চল, বয়স, পরিবার ও সামাজিক পরিবেশের ভেদে ভাষার ব্যবহারে পার্থক্য দেখা যায়। এই বৈচিত্র্যকে একটি ছাঁচে ফেলে বিচার করলে ভাষাটির প্রকৃত রূপ ধরা পড়বে না।

ভাষাবিজ্ঞানে ‘উপভাষা’ একটি স্বাভাবিক পরিভাষা। উপভাষা মানেই বিকৃত ভাষা নয়, কিংবা প্রমিত ভাষার অসম্পূর্ণ সংস্করণও নয়। একটি ভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপের নিজস্ব ধ্বনি, শব্দ ও ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। তাই চট্টগ্রামের ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য ‘উপভাষা’ পরিচয় অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন সেই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, যা আঞ্চলিক ভাষাকে হীনতর বলে বিবেচনা করে।

প্রমিত বাংলা শিক্ষা, প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম ও বৃহত্তর যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার প্রয়োজনীয়তা আঞ্চলিক ভাষার সাংস্কৃতিক মূল্যকে বাতিল করে না। একজন মানুষ প্রমিত বাংলায় লিখতে পারেন, বিভিন্ন পরিবেশে প্রমিত ভাষায় কথা বলতে পারেন, আবার নিজের অঞ্চলের ভাষায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন। এই সহাবস্থান কোনো দুর্বলতা নয়; বরং ভাষিক সক্ষমতার পরিচয়।

চট্টগ্রামের ভাষার কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এখানে উল্লেখযোগ্য। প্রমিত বাংলায় নিষেধার্থক ‘না’ ক্রিয়ার পরে বসে (‘আমি যাব না’), কিন্তু চট্টগ্রামে এটি ক্রিয়ার আগে বসে (‘আঁই ন যাইয়ুম’)। শব্দভান্ডারেও স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়—‘টাকা’ হয় ‘টিঁয়া’, ‘ভালো’ হয় ‘গম’, ‘ছেলেমেয়ে’ হয় ‘ফোয়াসা’। উচ্চারণে মহাপ্রাণ ধ্বনির হ্রাস, অনুনাসিকতার ব্যাপক ব্যবহার এবং আরবি-ফার্সি-পর্তুগিজ উৎসের শব্দের উপস্থিতি এই ভাষাকে আরও স্বতন্ত্র করে তুলেছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো শুধু ধ্বনিগত নয়, একটি জনপদের ইতিহাসেরও সাক্ষ্য।

জনপদের স্মৃতি ও ভাষার অন্তর্জগৎ

একটি অঞ্চলের ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহ, রাজনৈতিক ঘটনা কিংবা লিখিত দলিলে সংরক্ষিত থাকে না। ইতিহাসের আরেকটি বড় অংশ ছড়িয়ে থাকে মানুষের মুখের ভাষায়—প্রবাদে, লোককথায়, পারিবারিক সম্বোধনে, পেশাগত শব্দে এবং দৈনন্দিন কথোপকথনে। এসবের মধ্যে এমন অভিজ্ঞতা জমা থাকে, যা আনুষ্ঠানিক ইতিহাসে খুব কমই জায়গা পায়।

চট্টগ্রামের ভাষার ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। কর্ণফুলী, সাঙ্গু ও মাতামুহুরীর অববাহিকা, উপকূলের জীবন, মাছ ধরা, নৌযাত্রা, কৃষিকাজ, বাণিজ্য এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্গে ভাষার নানা প্রকাশরীতি যুক্ত হয়ে আছে। চট্টগ্রাম বন্দর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরব, পারস্য, তুর্কি ও পর্তুগিজ বণিকদের মিলনকেন্দ্র ছিল। আরাকানি শাসনের প্রভাবও এখানে পড়েছে। এই বহুভাষিক যোগাযোগের ফলে ভাষায় আরবি-ফার্সি-পর্তুগিজ শব্দের স্তর তৈরি হয়েছে, যা প্রমিত বাংলার তুলনায় অনেক বেশি ঘন। কোনো শব্দ কীভাবে তৈরি হলো, কোনো প্রবাদ কোন সামাজিক অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নিল, কিংবা কোনো সম্বোধন কীভাবে ঘনিষ্ঠতা ও শ্রদ্ধার পার্থক্য প্রকাশ করে—এসব অনুসন্ধান একটি জনপদের সামাজিক ইতিহাস বোঝার পথ খুলে দিতে পারে।

ভাষার এই সম্পদ সব সময় অভিধানে ধরা পড়ে না। অনেক শব্দের অর্থ বোঝা যায় পরিস্থিতি, স্বরভঙ্গি ও সম্পর্কের ভেতর দিয়ে। একই বাক্য কখনো স্নেহ, কখনো অভিমান, কখনো কৌতুক, আবার কখনো প্রতিবাদের অর্থ বহন করতে পারে। ফলে ভাষা সংরক্ষণ মানে শুধু শব্দ সংগ্রহ করা নয়; শব্দের সঙ্গে যুক্ত ব্যবহার, পরিস্থিতি ও অনুভূতিকেও বোঝা।

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান এই মৌখিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিল্পী, গীতিকার ও সুরকারেরা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, হাসি-কান্না, প্রেম, বিচ্ছেদ, সামাজিক সম্পর্ক ও সমকালীন অভিজ্ঞতাকে গানের ভাষায় রূপ দিয়েছেন। সিরাজুল ইসলাম আজাদের পাশাপাশি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগীতের অন্য শিল্পীদের কাজও এই ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। গবেষক দীপংকর দে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানকে এই অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের পাঠ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। গানের এই শক্তি আমাদের একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়: কোনো ভাষা যখন মানুষের মুখে মুখে ফেরে, তখন তা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না; হয়ে ওঠে সমষ্টিগত স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বাহক।

মর্যাদার প্রশ্ন: কোন ভাষা শুদ্ধ, কোন ভাষা অশুদ্ধ?

ভাষা নিয়ে সামাজিক বৈষম্যের একটি সূক্ষ্ম দিক রয়েছে। মানুষের উচ্চারণ থেকে তার শিক্ষা, সামাজিক অবস্থান কিংবা যোগ্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। কোনো আঞ্চলিক উচ্চারণ শুনে কাউকে কম শিক্ষিত বা কম পরিশীলিত মনে করা হলে ভাষাগত পার্থক্য সামাজিক বিচার করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

কিন্তু ভাষার উচ্চারণ আর মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা এক বিষয় নয়। একজন মানুষ নিজের আঞ্চলিক ভাষায় গভীর চিন্তা প্রকাশ করতে পারেন, জটিল অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে পারেন, সূক্ষ্ম অনুভূতি ব্যক্ত করতে পারেন এবং অন্যের মনোভাব অনুধাবন করতে পারেন। তার ভাষা প্রমিত বাংলার সঙ্গে কতটা মেলে, তা দিয়ে এসব সক্ষমতার বিচার করা যায় না।

এখানেই আঞ্চলিক ভাষার সাংস্কৃতিক তাৎপর্য নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়। যে ভাষার উচ্চারণকে কোনো কোনো সামাজিক পরিবেশে অবজ্ঞা করা হয়, সেই ভাষাই যখন সংগীত, কবিতা বা দৈনন্দিন কথোপকথনে মানুষের আনন্দ, বেদনা, প্রেম, বিচ্ছেদ, সামাজিক সম্পর্ক এবং জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে সক্ষম হয়, তখন তার প্রকাশক্ষমতা অস্বীকার করা কঠিন। সিরাজুল ইসলাম আজাদের গানগুলো এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ মাত্র। এসব সৃষ্টি দেখায়, আঞ্চলিক ভাষা শুধু আবেগের বাহন নয়; চট্টগ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা, স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতাকেও জীবন্ত করে তুলতে পারে। অবশ্য একটি জনপ্রিয় গান দিয়ে ভাষার সব বৈশিষ্ট্য বিচার করা যায় না; কিন্তু এ ধরনের সৃষ্টি দেখায়, আঞ্চলিক ভাষা সৃজনশীল শিল্পের শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।

প্রমিত ভাষার প্রয়োজন অস্বীকার করারও সুযোগ নেই। শিক্ষা, প্রশাসন, সংবাদপত্র ও বৃহত্তর যোগাযোগের জন্য একটি মান্য লিখিত রীতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রমিত ভাষার ব্যবহারকে যদি শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড বানানো হয়, তাহলে আঞ্চলিক ভাষার স্বাভাবিক বৈচিত্র্য অযথা অবমূল্যায়িত হয়। সিলেটি বা নোয়াখাইল্যা ভাষার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সামাজিক চাপ দেখা যায়। নিজের ভাষাকে সম্মান করার অর্থ অন্য ভাষাকে ছোট করা নয়। বরং ভাষার মর্যাদা সম্পর্কে এমন একটি উদার ধারণা তৈরি করা, যেখানে পার্থক্যকে ত্রুটি না ভেবে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে দেখা হয়।

পরিবর্তন কি ভাষার সংকট, নাকি স্বাভাবিক বিবর্তন?

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে আলোচনায় একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ: নতুন প্রজন্ম কি আগের প্রজন্মের মতো এই ভাষা ব্যবহার করছে? পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং অভিবাসী জীবনে ভাষার ব্যবহার কি বদলে যাচ্ছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে দেওয়া উচিত নয়। কোন ভাষারূপ বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, তা বুঝতে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্র আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পরিবারে শিশুদের সঙ্গে কোন ভাষায় কথা বলা হয়, বন্ধুমহলে কোন ভাষা স্বাভাবিক, কর্মক্ষেত্রে কোন ভাষা প্রয়োজন হয় এবং অনলাইনে মানুষ কীভাবে নিজের ভাব প্রকাশ করে—এসবের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।

কেউ প্রমিত বাংলা শিখছেন বলেই যে তিনি আঞ্চলিক ভাষা ছেড়ে দিচ্ছেন, এমন সিদ্ধান্ত যথার্থ নয়। আবার ঘরে ভাষাটি প্রচলিত আছে বলেই তার সব শব্দ, প্রবাদ ও পুরোনো প্রকাশরীতি সমানভাবে টিকে আছে, তা-ও ধরে নেওয়া যায় না।

ভাষার পরিবর্তন এবং ভাষার বিলুপ্তি এক বিষয় নয়। ভাষা নতুন শব্দ গ্রহণ করে, পুরোনো শব্দের ব্যবহার বদলায়, উচ্চারণে পরিবর্তন আসে। এসবই ভাষার স্বাভাবিক জীবনের অংশ। উদ্বেগের জায়গা হলো, কোনো ভাষা যদি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সৃজনশীলতা ও প্রজন্মান্তরের যোগাযোগ থেকে ক্রমে সরে যেতে থাকে, তখন তার বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো হারানোর ঝুঁকি বাড়ে।

তাই চট্টগ্রামের ভাষা নিয়ে প্রয়োজন আবেগনির্ভর বিপন্নতার ঘোষণা নয়, বরং পরিকল্পিত অনুসন্ধান। বিভিন্ন এলাকার কথ্যরীতি, শিশু-কিশোরদের ভাষা ব্যবহার, পারিবারিক ভাষাচর্চা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে আঞ্চলিক ভাষার উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা হলে ভাষাটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব।

সংরক্ষণ মানে অতীতকে আটকে রাখা নয়

ভাষা সংরক্ষণের কথা উঠলেই কখনো কখনো মনে হয়, পুরোনো শব্দ ও উচ্চারণকে অপরিবর্তিত রাখাই প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু জীবন্ত ভাষাকে এভাবে স্থির করে রাখা যায় না। মানুষ বদলায়, সমাজ বদলায়, ভাষাও বদলায়। তাই চট্টগ্রামের ভাষা রক্ষার অর্থ কোনো একটি রূপকে একমাত্র শুদ্ধ রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং এর বৈচিত্র্য, ব্যবহার ও সৃজনশীলতাকে সচল রাখা।

পরিবারে শিশুদের সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা, বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে পুরোনো শব্দ ও প্রবাদ সংগ্রহ করা, স্থানীয় গল্প ও লোকগান ধারণ করা এবং ভাষার বিভিন্ন রূপ যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করা—এসব কাজ একই বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলো চট্টগ্রামের ভাষার শব্দভান্ডার, ধ্বনি, বাক্যগঠন ও আঞ্চলিক পার্থক্য নিয়ে গবেষণা করতে পারে। স্থানীয় লেখক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা তৈরি করতে পারেন প্রবাদ-প্রবচনের সংকলন, মৌখিক ইতিহাসের সংগ্রহ এবং আঞ্চলিক ভাষায় গল্প, কবিতা ও শিশুতোষ বই। বেতার, দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই ভাষার সৃজনশীল ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব।

প্রযুক্তি এ ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। মানুষের মুখের ভাষা অডিও ও ভিডিওতে ধারণ করা যায়; শব্দের অর্থ, ব্যবহার ও উচ্চারণের নমুনা নিয়ে উন্মুক্ত ডিজিটাল সংগ্রহশালা গড়ে তোলা যায়। তবে এসব সংগ্রহে শুধু বহুল পরিচিত শব্দ নয়, বিভিন্ন এলাকার ও প্রজন্মের ভাষাগত বৈচিত্র্যকেও জায়গা দিতে হবে।

সংরক্ষণকে কেবল উৎসব, আনুষ্ঠানিক দিবস কিংবা স্মারক প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ভাষা বাঁচে ব্যবহারে, নতুন সৃষ্টিতে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তার প্রয়োজনীয়তা বজায় থাকার মধ্য দিয়ে। আঞ্চলিক ভাষায় মানসম্মত সাহিত্য রচিত হলে, তরুণেরা সেই ভাষায় নতুন বিষয় নিয়ে লিখলে এবং ডিজিটাল মাধ্যমে ভাষাটি স্বাভাবিকভাবে ব্যবহৃত হলে তার সাংস্কৃতিক পরিসরও প্রসারিত হবে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের দায়

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা সংরক্ষণের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত কেবল ভাষার প্রশ্ন নয়; এটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্ন। আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে কী দিয়ে যেতে চাই—কিছু পুরোনো শব্দের তালিকা, কয়েকটি লোকগানের রেকর্ড, নাকি এমন একটি জীবন্ত ভাষিক পরিবেশ, যেখানে তারা নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ বজায় রেখেও নতুন পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে?

এই দায়িত্ব কোনো একক প্রতিষ্ঠান কিংবা কয়েকজন ভাষাপ্রেমীর নয়। পরিবারের আছে ভাষাকে স্বাভাবিক জীবনের অংশ করে রাখার দায়িত্ব; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আছে ভাষার বৈচিত্র্য সম্পর্কে সম্মানজনক ধারণা তৈরির দায়িত্ব; গবেষকদের আছে ভাষার বৈশিষ্ট্য ও পরিবর্তন নথিবদ্ধ করার দায়িত্ব; আর লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের আছে ভাষাটিকে নতুন সৃষ্টির মাধ্যমে জীবন্ত রাখার সুযোগ।

তবে এসব উদ্যোগের আগে প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। নিজের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলাকে যেন কেউ অশিক্ষার লক্ষণ মনে না করেন, আবার ভাষাপ্রেমের নামে প্রমিত বাংলার প্রয়োজনীয়তাকেও অস্বীকার না করেন। একটি ভাষার প্রতি ভালোবাসা তখনই পরিণত হয়, যখন তা অন্য ভাষার প্রতি অবজ্ঞা তৈরি না করে বরং ভাষিক বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ায়।

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাকে অতীতের স্মারক হিসেবে নয়, বর্তমানের সৃজনশীল শক্তি হিসেবে দেখতে হবে। এর শব্দে রয়েছে মানুষের অভিজ্ঞতা, প্রকাশভঙ্গিতে রয়েছে সম্পর্কের সূক্ষ্মতা, আর এর পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে সময়ের চলমান ইতিহাস। সেই সম্পদকে ধরে রাখার অর্থ ভাষাকে কাচের ঘরে বন্দী করা নয়; বরং তার স্বাভাবিক জীবনকে আরও বিস্তৃত করা।

আঞ্চলিক ভাষায় রচিত গান, কবিতা বা সাহিত্যকর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি আঞ্চলিক ভাষা তার নিজস্ব স্বর ও ছন্দ নিয়েই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে। সেই ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার কাজ তাই শুধু অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা নয়; এটি ভবিষ্যতের প্রতি দায়িত্বও।

চট্টগ্রামের ভাষাকে আমরা কি শুধু আমাদের শৈশবের স্মৃতি হিসেবে রেখে দিতে চাই, নাকি আগামী প্রজন্মের জীবন্ত অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবেও বাঁচিয়ে রাখতে চাই?


zahirulislam2933@gmail.com


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল