দিকপাল

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাদার অব অল বোম্বস’ দিয়ে সর্বাত্মক হামলার বিস্ফোরক ছক


শামিমা লিয়া
শামিমা লিয়া আন্তর্জাতিক ডেস্ক এডিটর
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৩৪ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাদার অব অল বোম্বস’ দিয়ে সর্বাত্মক হামলার বিস্ফোরক ছক

ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র রক্তক্ষয়ী সংঘাত যখন এক চরম রাজনৈতিক ও সামরিক অনিশ্চয়তায় মোড় নিয়েছে, ঠিক তখনই মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক বিস্ফোরক রণকৌশল প্রকাশ্যে এসেছে। পারমাণবিক অস্ত্রের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ অ-পারমাণবিক বোমা ‘মাদার অব অল বোম্বস’ দিয়ে ইরানে সর্বাত্মক হামলার ছক কষছে পেন্টাগন।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় জোরদার সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিলে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দিতে মার্কিন অস্ত্রাগারে থাকা এই ভয়াবহ বোমাটি ব্যবহারের পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। 

সামনে আসা মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে এই দীর্ঘায়িত যুদ্ধের চরম অপ্রিয়তা এবং উভয়পক্ষের মধ্যে কোনো টেকসই কূটনৈতিক সমঝোতা না হওয়ায় চরম রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পকে একটি 'প্রতীকী জয়' এনে দিতে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে সম্মানজনক উপায়ে সেনা গুটিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করতেই পেন্টাগন এই অতি-উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক বিকল্পটি প্রস্তুত রেখেছে।

কী এই ‘মাদার অব অল বোম্বস’?

যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনীর ভাণ্ডারে থাকা অ-পারমাণবিক ক্ষমতার সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী বোমার দাপ্তরিক নাম ‘জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট’ (GBU-43/B MOAB), যা সামরিক মহলে ‘মাদার অব অল বোম্বস’ নামে পরিচিত।

  • ওজন ও বিস্ফোরণ: ২১,৬০০ পাউন্ড (প্রায় ৯,৭৯৭ কেজি) ওজনের এই বোমাটিতে বিশাল পরিমাণে বিস্ফোরক রয়েছে। এটি মাটিতে স্পর্শ করার ঠিক আগেই বাতাসে বিস্ফোরিত হয়ে চারপাশের ৯টি সিটি ব্লকের সমান বিস্তীর্ণ এলাকা মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে।

  • ইতিহাস: ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে ফেলে আত্মসমর্পণ করাতে এটি তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আফগানিস্তানে আইএসের গভীর ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ধ্বংস করতে এটি প্রথমবারের মতো বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়েছিল।

ইরান হামলায় কার্যকারিতা নিয়ে সংশয়:

পেন্টাগন সূত্রের বরাতে সামরিক বিশ্লেষকরা এই বোমার প্রকৃত কার্যকারিতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলো—বিশেষ করে 'পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন'-এর মতো কেন্দ্রগুলো সুউচ্চ পর্বতমালা ও শক্ত গ্রানাইট পাথরের বহু গভীরে নির্মিত। জিবিইউ-৪৩/বি বোমাটি পৃষ্ঠভাগে বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম হলেও, পাহাড়ি গ্রানাইট ভেদ করে অত গভীরে পৌঁছানোর সক্ষমতা এর নেই। ফলে এটি ব্যবহারে ইরানের মূল ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক কার্যক্রম ধ্বংস করা সম্ভব নাও হতে পারে। তাছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ বা সাধারণ মানুষের আবাসের কাছাকাছি থাকা জ্বালানি ক্ষেত্রে এটি ফেলা হলে ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির ভয়াবহ ঝুঁকি সৃষ্টি হবে।

তা সত্ত্বেও সেন্টকমের (CENTCOM) আওতাধীন অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্র এই বড় ধরনের হামলা চালিয়ে 'মনস্তাত্ত্বিক বিজয়' ঘোষণা করতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বিস্তারিত মন্তব্য না করে জানিয়েছেন, ইরান যাতে কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক শক্তি অর্জন করতে না পারে, সে জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব ধরনের সামরিক ও কূটনৈতিক পথ খোলা রাখছেন। সব মিলিয়ে, ইরানের ওপর 'এমওএবি' ব্যবহারের এই রণকৌশল মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিকে আরও ভয়ঙ্কর ট্র্যাকে ঠেলে দিল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাদার অব অল বোম্বস’ দিয়ে সর্বাত্মক হামলার বিস্ফোরক ছক

প্রকাশের তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র রক্তক্ষয়ী সংঘাত যখন এক চরম রাজনৈতিক ও সামরিক অনিশ্চয়তায় মোড় নিয়েছে, ঠিক তখনই মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক বিস্ফোরক রণকৌশল প্রকাশ্যে এসেছে। পারমাণবিক অস্ত্রের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ অ-পারমাণবিক বোমা ‘মাদার অব অল বোম্বস’ দিয়ে ইরানে সর্বাত্মক হামলার ছক কষছে পেন্টাগন।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় জোরদার সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিলে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দিতে মার্কিন অস্ত্রাগারে থাকা এই ভয়াবহ বোমাটি ব্যবহারের পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। 

সামনে আসা মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে এই দীর্ঘায়িত যুদ্ধের চরম অপ্রিয়তা এবং উভয়পক্ষের মধ্যে কোনো টেকসই কূটনৈতিক সমঝোতা না হওয়ায় চরম রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পকে একটি 'প্রতীকী জয়' এনে দিতে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে সম্মানজনক উপায়ে সেনা গুটিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করতেই পেন্টাগন এই অতি-উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক বিকল্পটি প্রস্তুত রেখেছে।

কী এই ‘মাদার অব অল বোম্বস’?

যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনীর ভাণ্ডারে থাকা অ-পারমাণবিক ক্ষমতার সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী বোমার দাপ্তরিক নাম ‘জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট’ (GBU-43/B MOAB), যা সামরিক মহলে ‘মাদার অব অল বোম্বস’ নামে পরিচিত।

  • ওজন ও বিস্ফোরণ: ২১,৬০০ পাউন্ড (প্রায় ৯,৭৯৭ কেজি) ওজনের এই বোমাটিতে বিশাল পরিমাণে বিস্ফোরক রয়েছে। এটি মাটিতে স্পর্শ করার ঠিক আগেই বাতাসে বিস্ফোরিত হয়ে চারপাশের ৯টি সিটি ব্লকের সমান বিস্তীর্ণ এলাকা মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে।

  • ইতিহাস: ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে ফেলে আত্মসমর্পণ করাতে এটি তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আফগানিস্তানে আইএসের গভীর ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ধ্বংস করতে এটি প্রথমবারের মতো বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়েছিল।

ইরান হামলায় কার্যকারিতা নিয়ে সংশয়:

পেন্টাগন সূত্রের বরাতে সামরিক বিশ্লেষকরা এই বোমার প্রকৃত কার্যকারিতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলো—বিশেষ করে 'পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন'-এর মতো কেন্দ্রগুলো সুউচ্চ পর্বতমালা ও শক্ত গ্রানাইট পাথরের বহু গভীরে নির্মিত। জিবিইউ-৪৩/বি বোমাটি পৃষ্ঠভাগে বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম হলেও, পাহাড়ি গ্রানাইট ভেদ করে অত গভীরে পৌঁছানোর সক্ষমতা এর নেই। ফলে এটি ব্যবহারে ইরানের মূল ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক কার্যক্রম ধ্বংস করা সম্ভব নাও হতে পারে। তাছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ বা সাধারণ মানুষের আবাসের কাছাকাছি থাকা জ্বালানি ক্ষেত্রে এটি ফেলা হলে ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির ভয়াবহ ঝুঁকি সৃষ্টি হবে।

তা সত্ত্বেও সেন্টকমের (CENTCOM) আওতাধীন অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্র এই বড় ধরনের হামলা চালিয়ে 'মনস্তাত্ত্বিক বিজয়' ঘোষণা করতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বিস্তারিত মন্তব্য না করে জানিয়েছেন, ইরান যাতে কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক শক্তি অর্জন করতে না পারে, সে জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব ধরনের সামরিক ও কূটনৈতিক পথ খোলা রাখছেন। সব মিলিয়ে, ইরানের ওপর 'এমওএবি' ব্যবহারের এই রণকৌশল মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিকে আরও ভয়ঙ্কর ট্র্যাকে ঠেলে দিল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল