দিকপাল

শেখার সুযোগের পাশাপাশি বাড়ছে অতিরিক্ত ব্যবহারের ঝুঁকি

শিশুদের হাতে স্মার্টফোন: উপকার নাকি ক্ষতি?


ইসরাত জাহান
ইসরাত জাহান
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৩:০১ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

শিশুদের হাতে স্মার্টফোন: উপকার নাকি ক্ষতি?
স্মার্টফোন কি তাহলে ক্ষতিকর?

গত কয়েক দশকে প্রযুক্তি আমাদের জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন এনেছে। একসময় ইন্টারনেট ছিল সীমিতসংখ্যক মানুষের নাগালের মধ্যে। এখন এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই পরিবর্তনের সঙ্গে শিশুরাও দ্রুত প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। পড়াশোনা, বিনোদন, বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা নতুন কিছু শেখা—বিভিন্ন কাজে এখন শিশুরা ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহার করছে।

তবে শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া কতটা নিরাপদ? এটি কি তাদের শেখার সুযোগ বাড়াচ্ছে, নাকি অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে তৈরি হচ্ছে নতুন কিছু ঝুঁকি?

স্মার্টফোনের ভালো দিকও রয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষামূলক ভিডিও, অ্যাপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিশুরা নতুন নতুন বিষয় শিখতে পারে। ভাষা শেখা, সাধারণ জ্ঞান বাড়ানো, বিজ্ঞান বা গণিতের বিভিন্ন বিষয় বোঝার পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতাও তৈরি হতে পারে।

বর্তমানে অনেক বাবা-মাকেই দেখা যায়, নিজেদের কাজের ব্যস্ততার মধ্যে শিশুকে কিছুক্ষণ শান্ত বা ব্যস্ত রাখতে তার হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেন। এমনকি খাবার খাওয়ানোর সময়ও অনেক শিশুকে মোবাইলে কার্টুন, ভিডিও কিংবা গেম দেখানো হয়। এতে শিশুকে খাবার খাওয়ানো সহজ মনে হলেও, নিয়মিত এমন অভ্যাস তৈরি হলে খাবার খাওয়ার সময় ফোনের ওপর নির্ভরতা তৈরি হতে পারে।

ইউনিসেফের ২০২৫ সালের Childhood in a Digital World প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজিটাল প্রযুক্তি শিশুদের শেখা, যোগাযোগ এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজিটাল দক্ষতা তৈরির সুযোগ করে দিতে পারে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে নিরাপদ, বয়স উপযোগী এবং ভারসাম্যপূর্ণ।

অতিরিক্ত ব্যবহারে ঝুঁকি

স্মার্টফোন বা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলে শিশুর দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। স্ক্রিনের সামনে বেশি সময় কাটালে খেলাধুলা, পড়াশোনা, ঘুম এবং পরিবারের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোর সুযোগ কমে যেতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশনায় ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে স্ক্রিনের সামনে বসে থাকার সময় সীমিত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির মতে, শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত শারীরিক কর্মকাণ্ড, ভালো ঘুম এবং কম সময় বসে থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

WHO-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, এক বছর বয়সী শিশুদের জন্য sedentary screen time সুপারিশ করা হয় না। দুই বছর বয়সে দিনে এক ঘণ্টার বেশি না রাখার পরামর্শ রয়েছে। তিন থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রেও দিনে এক ঘণ্টার মধ্যে স্ক্রিনের সামনে বসে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে—কম হলে আরও ভালো।

শুধু কতক্ষণ নয়, কী দেখছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ

শিশু কতক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করছে, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সে কী দেখছে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। শিক্ষামূলক কনটেন্টের পাশাপাশি শিশুরা এমন কিছু ভিডিও বা গেমের সংস্পর্শে আসতে পারে, যা তাদের বয়সের জন্য উপযুক্ত নয়।

এ কারণে বাবা-মায়ের উচিত শিশুরা কোন ধরনের কনটেন্ট দেখছে, কোন অ্যাপ ব্যবহার করছে এবং অনলাইনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে—এসব বিষয়ে নজর রাখা। একই সঙ্গে শিশুকে ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে শেয়ার না করার বিষয়েও সচেতন করা দরকার।

অভিভাবকের ভূমিকা

শিশুকে পুরোপুরি প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখা বর্তমান সময়ে সব ক্ষেত্রে সম্ভব নাও হতে পারে। বরং প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেদিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

বাবা-মা চাইলে শিশুর সঙ্গে বসে শিক্ষামূলক ভিডিও দেখতে পারেন, তার পছন্দের কনটেন্ট সম্পর্কে জানতে পারেন এবং প্রয়োজনে নিরাপদ কনটেন্ট বেছে দিতে পারেন। পাশাপাশি শিশুর দৈনন্দিন জীবনে খেলাধুলা, বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং পর্যাপ্ত ঘুমের জন্যও সময় রাখা জরুরি।

স্মার্টফোনকে শিশুদের জন্য এক কথায় ভালো বা খারাপ বলা কঠিন। এর প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করে শিশু কী দেখছে, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে, কতক্ষণ ব্যবহার করছে এবং ব্যবহারের সময় অভিভাবকের নজরদারি কতটা রয়েছে—তার ওপর।

প্রযুক্তি শিশুদের সামনে শেখার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। আবার অসচেতন ও অতিরিক্ত ব্যবহার তৈরি করতে পারে বিভিন্ন সমস্যা। তাই শিশুদের প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি দূরে রাখার পরিবর্তে তাদের নিরাপদ, সচেতন ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শেখানোই হতে পারে বেশি কার্যকর পথ।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬


শিশুদের হাতে স্মার্টফোন: উপকার নাকি ক্ষতি?

প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

গত কয়েক দশকে প্রযুক্তি আমাদের জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন এনেছে। একসময় ইন্টারনেট ছিল সীমিতসংখ্যক মানুষের নাগালের মধ্যে। এখন এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই পরিবর্তনের সঙ্গে শিশুরাও দ্রুত প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। পড়াশোনা, বিনোদন, বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা নতুন কিছু শেখা—বিভিন্ন কাজে এখন শিশুরা ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহার করছে।

তবে শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া কতটা নিরাপদ? এটি কি তাদের শেখার সুযোগ বাড়াচ্ছে, নাকি অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে তৈরি হচ্ছে নতুন কিছু ঝুঁকি?

স্মার্টফোনের ভালো দিকও রয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষামূলক ভিডিও, অ্যাপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিশুরা নতুন নতুন বিষয় শিখতে পারে। ভাষা শেখা, সাধারণ জ্ঞান বাড়ানো, বিজ্ঞান বা গণিতের বিভিন্ন বিষয় বোঝার পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতাও তৈরি হতে পারে।

বর্তমানে অনেক বাবা-মাকেই দেখা যায়, নিজেদের কাজের ব্যস্ততার মধ্যে শিশুকে কিছুক্ষণ শান্ত বা ব্যস্ত রাখতে তার হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেন। এমনকি খাবার খাওয়ানোর সময়ও অনেক শিশুকে মোবাইলে কার্টুন, ভিডিও কিংবা গেম দেখানো হয়। এতে শিশুকে খাবার খাওয়ানো সহজ মনে হলেও, নিয়মিত এমন অভ্যাস তৈরি হলে খাবার খাওয়ার সময় ফোনের ওপর নির্ভরতা তৈরি হতে পারে।

ইউনিসেফের ২০২৫ সালের Childhood in a Digital World প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজিটাল প্রযুক্তি শিশুদের শেখা, যোগাযোগ এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজিটাল দক্ষতা তৈরির সুযোগ করে দিতে পারে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে নিরাপদ, বয়স উপযোগী এবং ভারসাম্যপূর্ণ।

অতিরিক্ত ব্যবহারে ঝুঁকি

স্মার্টফোন বা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলে শিশুর দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। স্ক্রিনের সামনে বেশি সময় কাটালে খেলাধুলা, পড়াশোনা, ঘুম এবং পরিবারের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোর সুযোগ কমে যেতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশনায় ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে স্ক্রিনের সামনে বসে থাকার সময় সীমিত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির মতে, শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত শারীরিক কর্মকাণ্ড, ভালো ঘুম এবং কম সময় বসে থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

WHO-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, এক বছর বয়সী শিশুদের জন্য sedentary screen time সুপারিশ করা হয় না। দুই বছর বয়সে দিনে এক ঘণ্টার বেশি না রাখার পরামর্শ রয়েছে। তিন থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রেও দিনে এক ঘণ্টার মধ্যে স্ক্রিনের সামনে বসে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে—কম হলে আরও ভালো।

শুধু কতক্ষণ নয়, কী দেখছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ

শিশু কতক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করছে, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সে কী দেখছে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। শিক্ষামূলক কনটেন্টের পাশাপাশি শিশুরা এমন কিছু ভিডিও বা গেমের সংস্পর্শে আসতে পারে, যা তাদের বয়সের জন্য উপযুক্ত নয়।

এ কারণে বাবা-মায়ের উচিত শিশুরা কোন ধরনের কনটেন্ট দেখছে, কোন অ্যাপ ব্যবহার করছে এবং অনলাইনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে—এসব বিষয়ে নজর রাখা। একই সঙ্গে শিশুকে ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে শেয়ার না করার বিষয়েও সচেতন করা দরকার।

অভিভাবকের ভূমিকা

শিশুকে পুরোপুরি প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখা বর্তমান সময়ে সব ক্ষেত্রে সম্ভব নাও হতে পারে। বরং প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেদিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

বাবা-মা চাইলে শিশুর সঙ্গে বসে শিক্ষামূলক ভিডিও দেখতে পারেন, তার পছন্দের কনটেন্ট সম্পর্কে জানতে পারেন এবং প্রয়োজনে নিরাপদ কনটেন্ট বেছে দিতে পারেন। পাশাপাশি শিশুর দৈনন্দিন জীবনে খেলাধুলা, বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং পর্যাপ্ত ঘুমের জন্যও সময় রাখা জরুরি।

স্মার্টফোনকে শিশুদের জন্য এক কথায় ভালো বা খারাপ বলা কঠিন। এর প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করে শিশু কী দেখছে, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে, কতক্ষণ ব্যবহার করছে এবং ব্যবহারের সময় অভিভাবকের নজরদারি কতটা রয়েছে—তার ওপর।

প্রযুক্তি শিশুদের সামনে শেখার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। আবার অসচেতন ও অতিরিক্ত ব্যবহার তৈরি করতে পারে বিভিন্ন সমস্যা। তাই শিশুদের প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি দূরে রাখার পরিবর্তে তাদের নিরাপদ, সচেতন ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শেখানোই হতে পারে বেশি কার্যকর পথ।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল