দেশে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে রাজধানী ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের উচ্চ সক্ষমতার এবং সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো একের পর এক বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে দূরবর্তী বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও দেশের বাইরে থেকে বিদ্যুৎ এনে ঢাকার চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বড় ধরনের সঞ্চালন অপচয় বা ‘সিস্টেম লস’ হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিবিপিলসি)। এই পরিস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাপর্যায়ে বিদ্যুতের দামের ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন বিদ্যুতের গড় চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। অথচ বিতরণ কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির আওতাধীন অন্তত ৬ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি সংকটের কারণে আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এসব কেন্দ্র সচল রাখতে প্রতিদিন ৯৯৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরবরাহ মিলছে চাহিদার মাত্র ২৭ শতাংশ, যা পরিমাণে মাত্র ২৭০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি।
পেট্রোবাংলার দৈনিক পরিসংখ্যান বলছে, তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে নরসিংদীর ঘোড়াশালে ১ হাজার ৩১৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সবগুলো ইউনিটই এখন পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে উচ্চ দক্ষতা ও সাশ্রয়ী ২ হাজার মেগাওয়াটের তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সবগুলো একসঙ্গে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। গ্যাসের তীব্র রেশনিংয়ের কারণে মেঘনাঘাট, সিদ্ধিরগঞ্জ, হরিপুর (এইচপিএস), আশুলিয়া ও রূপগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকার রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি খাতের (আইপিপি) বহু বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র এখন উৎপাদনে নেই। ঢাকার কাছের এই কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে ভারতের আদানি পাওয়ার কিংবা পটুয়াখালীর পায়রা ও রামপালের মতো দূরবর্তী কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে দীর্ঘ সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে ঢাকায় বিদ্যুৎ আনতে হচ্ছে।
তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহনেওয়াজ পারভেজ এ প্রসঙ্গে জানান, তিতাসের দৈনিক চাহিদার তুলনায় পেট্রোবাংলা থেকে গ্যাসের বরাদ্দ অনেক কম পাওয়া যাচ্ছে। দৈনিক ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস পেলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অন্যান্য খাতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হতো, অথচ বরাদ্দ মিলছে ২৭০ মিলিয়ন ঘনফুটেরও কম। পেট্রোবাংলার দৈনিক বরাদ্দের ওপরই তিতাসের এই সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি নির্ভরশীল।
এদিকে দূর থেকে বিদ্যুৎ টেনে আনার ফলে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তিন ধরনের সঞ্চালন লাইনেই কারিগরি অপচয় ও ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। সামগ্রিক আর্থিক ক্ষতি সামাল দিতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে সঞ্চালন ট্যারিফ বা মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব পাঠিয়েছিল পাওয়ার গ্রিড, যার ভিত্তিতে সম্প্রতি সঞ্চালন ট্যারিফ বাড়ানোও হয়েছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অর্থবছর শেষে সঞ্চালন লাইনের প্রকৃত সিস্টেম লস আগের চেয়ে আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই লোকসান ও জাতীয় অপচয় কমাতে হলে নিয়ম বা ‘মেরিট অর্ডার ডিসপ্যাচ’ অনুযায়ী দ্রুত ঢাকার পার্শ্ববর্তী লোড সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক করা জরুরি।
কয়েক বছর ধরেই দেশীয় খনিগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের রূপান্তর চলছে। ঢাকার কাছাকাছি অবস্থিত গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো সবচেয়ে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হলেও জ্বালানির অভাবে সেগুলোকে বসিয়ে রেখে দূরবর্তী কয়লাভিত্তিক বা আমদানিকৃত বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এর ফলে বিপিডিবির উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি বিদ্যুৎ খাতের পুঞ্জীভূত ভর্তুকির বোঝাও ভারী হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে সাধারণ গ্রাহকদের ওপরই মূল্যবৃদ্ধির চাপ হিসেবে ফিরে আসছে।

শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুন ২০২৬
দেশে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে রাজধানী ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের উচ্চ সক্ষমতার এবং সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো একের পর এক বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে দূরবর্তী বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও দেশের বাইরে থেকে বিদ্যুৎ এনে ঢাকার চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বড় ধরনের সঞ্চালন অপচয় বা ‘সিস্টেম লস’ হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিবিপিলসি)। এই পরিস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাপর্যায়ে বিদ্যুতের দামের ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন বিদ্যুতের গড় চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। অথচ বিতরণ কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির আওতাধীন অন্তত ৬ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি সংকটের কারণে আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এসব কেন্দ্র সচল রাখতে প্রতিদিন ৯৯৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরবরাহ মিলছে চাহিদার মাত্র ২৭ শতাংশ, যা পরিমাণে মাত্র ২৭০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি।
পেট্রোবাংলার দৈনিক পরিসংখ্যান বলছে, তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে নরসিংদীর ঘোড়াশালে ১ হাজার ৩১৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সবগুলো ইউনিটই এখন পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে উচ্চ দক্ষতা ও সাশ্রয়ী ২ হাজার মেগাওয়াটের তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সবগুলো একসঙ্গে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। গ্যাসের তীব্র রেশনিংয়ের কারণে মেঘনাঘাট, সিদ্ধিরগঞ্জ, হরিপুর (এইচপিএস), আশুলিয়া ও রূপগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকার রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি খাতের (আইপিপি) বহু বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র এখন উৎপাদনে নেই। ঢাকার কাছের এই কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে ভারতের আদানি পাওয়ার কিংবা পটুয়াখালীর পায়রা ও রামপালের মতো দূরবর্তী কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে দীর্ঘ সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে ঢাকায় বিদ্যুৎ আনতে হচ্ছে।
তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহনেওয়াজ পারভেজ এ প্রসঙ্গে জানান, তিতাসের দৈনিক চাহিদার তুলনায় পেট্রোবাংলা থেকে গ্যাসের বরাদ্দ অনেক কম পাওয়া যাচ্ছে। দৈনিক ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস পেলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অন্যান্য খাতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হতো, অথচ বরাদ্দ মিলছে ২৭০ মিলিয়ন ঘনফুটেরও কম। পেট্রোবাংলার দৈনিক বরাদ্দের ওপরই তিতাসের এই সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি নির্ভরশীল।
এদিকে দূর থেকে বিদ্যুৎ টেনে আনার ফলে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তিন ধরনের সঞ্চালন লাইনেই কারিগরি অপচয় ও ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। সামগ্রিক আর্থিক ক্ষতি সামাল দিতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে সঞ্চালন ট্যারিফ বা মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব পাঠিয়েছিল পাওয়ার গ্রিড, যার ভিত্তিতে সম্প্রতি সঞ্চালন ট্যারিফ বাড়ানোও হয়েছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অর্থবছর শেষে সঞ্চালন লাইনের প্রকৃত সিস্টেম লস আগের চেয়ে আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই লোকসান ও জাতীয় অপচয় কমাতে হলে নিয়ম বা ‘মেরিট অর্ডার ডিসপ্যাচ’ অনুযায়ী দ্রুত ঢাকার পার্শ্ববর্তী লোড সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক করা জরুরি।
কয়েক বছর ধরেই দেশীয় খনিগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের রূপান্তর চলছে। ঢাকার কাছাকাছি অবস্থিত গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো সবচেয়ে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হলেও জ্বালানির অভাবে সেগুলোকে বসিয়ে রেখে দূরবর্তী কয়লাভিত্তিক বা আমদানিকৃত বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এর ফলে বিপিডিবির উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি বিদ্যুৎ খাতের পুঞ্জীভূত ভর্তুকির বোঝাও ভারী হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে সাধারণ গ্রাহকদের ওপরই মূল্যবৃদ্ধির চাপ হিসেবে ফিরে আসছে।

আপনার মতামত লিখুন