দিকপাল

অস্বাভাবিক গরমে ইউরোপে প্রাণহানি, বাড়ছে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬ | ১১:১০ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

অস্বাভাবিক গরমে ইউরোপে প্রাণহানি, বাড়ছে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা

তীব্র দাবদাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে গোটা পশ্চিম ইউরোপ। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবে এই মহাদেশটি পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হয়ে উঠছে, যার ফলে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা আবহাওয়ার সব রেকর্ড একের পর এক ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। অস্বাভাবিক এই তাপমাত্রার কারণে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, স্পেন ও ইতালিসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা রেড অ্যালার্ট। চরম এই আবহাওয়া জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তোলার পাশাপাশি পানি সরবরাহের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া দাবানল নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে দমকল বাহিনীকে, আর প্রচণ্ড গরমে স্বস্তি খুঁজতে গিয়ে পানিতে নেমে ডুবে মৃত্যুর মতো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

ফ্রান্সের অবস্থা সবচেয়ে উদ্বেগজনক। বুধবার দেশটিতে জাতীয় তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, যা ১৯৪৭ সালে রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটির ইতিহাসে উষ্ণতম দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্যারিসসহ পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরগুলোতে তাপমাত্রা ৩৯ থেকে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে পৌঁছে গেছে। এই প্রচণ্ড উত্তাপের কারণে প্যারিসের আইফেল টাওয়ার ও ঐতিহাসিক লুভর মিউজিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রগুলো স্বাভাবিক সময়ের আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাপপ্রবাহের কারণে পানিতে ডুবে ফ্রান্সে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ছয় বছর বয়সী এক শিশুও রয়েছে। দেশটিতে বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে এবং মেইন-এট-লোয়ার অঞ্চলের বনাঞ্চলে দাবানল নেভাতে দেড় শতাধিক দমকলকর্মীকে দিনরাত কাজ করতে হচ্ছে। ফ্রান্সের শ্রমমন্ত্রী জঁ-পিয়ের ফারান্দু সমাজকে এই পরিবর্তিত উষ্ণ জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

এদিকে যুক্তরাজ্য ও স্পেনেও জুন মাসের অতীতের সব তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে গিয়েছে। যুক্তরাজ্যের হ্যাম্পশায়ারে তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে, যা জুন মাসের জন্য সর্বোচ্চ। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এটি ৩৮ ডিগ্রি পর্যন্ত গড়াতে পারে। অন্যদিকে, স্পেনে ১৯৫০ সালের পর জুন মাসের সর্বোচ্চ দৈনিক গড় তাপমাত্রা নথিভুক্ত হয়েছে, আর উত্তর স্পেনের বেশ কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছোঁয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। ইতালির উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের ১৬টি অঞ্চলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডস এবং বেলজিয়ামও এই তাপপ্রবাহের কবল থেকে রেহাই পায়নি; সেখানে বিপজ্জনক আবহাওয়ার সংকেত হিসেবে কোড অরেঞ্জ জারি করা হয়েছে এবং তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

জার্মানির বিভিন্ন নদী ও লেকেও ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং ব্র্যান্ডেনবার্গ ও হেসের মতো অঞ্চলগুলোতে খরার আশঙ্কায় জনগণকে পানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দাবানলের ঝুঁকি এড়াতে স্টুটগার্টের মতো শহরগুলোতে খোলা জায়গায় আগুন জ্বালানো বা বারবিকিউ করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যদিও আবহাওয়াবিদদের মতে, শুক্রবারের পর থেকে পশ্চিম ইউরোপে তাপমাত্রার পারদ কিছুটা নামতে শুরু করবে, তবে আগামী কয়েক দিনে এই তীব্র তাপপ্রবাহ পূর্ব ইউরোপের পোল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গেরির মতো দেশগুলোর দিকে ধাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের যে অভিঘাত, তা ইউরোপের এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সূত্র: রয়টার্স।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬


অস্বাভাবিক গরমে ইউরোপে প্রাণহানি, বাড়ছে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা

প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬

featured Image

তীব্র দাবদাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে গোটা পশ্চিম ইউরোপ। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবে এই মহাদেশটি পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হয়ে উঠছে, যার ফলে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা আবহাওয়ার সব রেকর্ড একের পর এক ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। অস্বাভাবিক এই তাপমাত্রার কারণে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, স্পেন ও ইতালিসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা রেড অ্যালার্ট। চরম এই আবহাওয়া জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তোলার পাশাপাশি পানি সরবরাহের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া দাবানল নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে দমকল বাহিনীকে, আর প্রচণ্ড গরমে স্বস্তি খুঁজতে গিয়ে পানিতে নেমে ডুবে মৃত্যুর মতো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

ফ্রান্সের অবস্থা সবচেয়ে উদ্বেগজনক। বুধবার দেশটিতে জাতীয় তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, যা ১৯৪৭ সালে রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটির ইতিহাসে উষ্ণতম দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্যারিসসহ পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরগুলোতে তাপমাত্রা ৩৯ থেকে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে পৌঁছে গেছে। এই প্রচণ্ড উত্তাপের কারণে প্যারিসের আইফেল টাওয়ার ও ঐতিহাসিক লুভর মিউজিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রগুলো স্বাভাবিক সময়ের আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাপপ্রবাহের কারণে পানিতে ডুবে ফ্রান্সে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ছয় বছর বয়সী এক শিশুও রয়েছে। দেশটিতে বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে এবং মেইন-এট-লোয়ার অঞ্চলের বনাঞ্চলে দাবানল নেভাতে দেড় শতাধিক দমকলকর্মীকে দিনরাত কাজ করতে হচ্ছে। ফ্রান্সের শ্রমমন্ত্রী জঁ-পিয়ের ফারান্দু সমাজকে এই পরিবর্তিত উষ্ণ জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

এদিকে যুক্তরাজ্য ও স্পেনেও জুন মাসের অতীতের সব তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে গিয়েছে। যুক্তরাজ্যের হ্যাম্পশায়ারে তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে, যা জুন মাসের জন্য সর্বোচ্চ। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এটি ৩৮ ডিগ্রি পর্যন্ত গড়াতে পারে। অন্যদিকে, স্পেনে ১৯৫০ সালের পর জুন মাসের সর্বোচ্চ দৈনিক গড় তাপমাত্রা নথিভুক্ত হয়েছে, আর উত্তর স্পেনের বেশ কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছোঁয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। ইতালির উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের ১৬টি অঞ্চলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডস এবং বেলজিয়ামও এই তাপপ্রবাহের কবল থেকে রেহাই পায়নি; সেখানে বিপজ্জনক আবহাওয়ার সংকেত হিসেবে কোড অরেঞ্জ জারি করা হয়েছে এবং তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

জার্মানির বিভিন্ন নদী ও লেকেও ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং ব্র্যান্ডেনবার্গ ও হেসের মতো অঞ্চলগুলোতে খরার আশঙ্কায় জনগণকে পানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দাবানলের ঝুঁকি এড়াতে স্টুটগার্টের মতো শহরগুলোতে খোলা জায়গায় আগুন জ্বালানো বা বারবিকিউ করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যদিও আবহাওয়াবিদদের মতে, শুক্রবারের পর থেকে পশ্চিম ইউরোপে তাপমাত্রার পারদ কিছুটা নামতে শুরু করবে, তবে আগামী কয়েক দিনে এই তীব্র তাপপ্রবাহ পূর্ব ইউরোপের পোল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গেরির মতো দেশগুলোর দিকে ধাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের যে অভিঘাত, তা ইউরোপের এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সূত্র: রয়টার্স।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল