হাতে রঙিন ফুল, কাঁধে বইয়ের ব্যাগ কিংবা মাঠে খেলার সাথীদের সাথে দুরন্ত শৈশব—একটি শিশুর বেড়ে ওঠার চিত্র এমন হওয়ার কথা থাকলেও আজকের বাস্তবতা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও উদ্বেগজনক। যে ঘরকে শিশুরা সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে করে, সেই ঘর এবং যে পথে তারা প্রতিদিন হেঁটে বেড়ায়, তা এখন অনেক ক্ষেত্রেই ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের অতি পরিচিত মানুষ, নিকটাত্মীয় কিংবা বিশ্বস্ত প্রতিবেশীর হাতেই শিশুরা আজ নৃশংস নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি কেবল একটি শিশুর জীবনই ধ্বংস করছে না, বরং পুরো সমাজব্যবস্থাকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো প্রান্ত থেকে শিশু নির্যাতন, সহিংসতা ও যৌন নিপীড়নের খবর আমাদের ব্যথিত করছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই দেশে ২৫০ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ১৬৬ জনই কন্যাশিশু। এছাড়া ৩১টি শিশু দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১২ শিশুকে। কেবল ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন নয়, বিভিন্ন কারণে মোট ৬৩টি শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, বরং আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের এক করুণ দলিল।
সেভ দ্য চিলড্রেনের শিশু সুরক্ষা ও অধিকার বিভাগের পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, শিশু ধর্ষণের ক্রমবর্ধমান এই হার কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তার মতে, শিশুদের সুরক্ষা কেবল আইনি বিষয় নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। রাষ্ট্র যতদিন পর্যন্ত শিশুদের নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা দিতে না পারবে, ততদিন পরিবার ও অভিভাবকদের ওপরই মূল দায়িত্ব বর্তাবে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, অপরাধীর মনে যদি কঠোর শাস্তির ভয় জাগ্রত করা যায়, তবেই এমন ঘৃণ্য প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ১৫২টি নির্যাতনের ঘটনার বিপরীতে মামলা হয়েছে মাত্র ৪৭টি। এই বিশাল ব্যবধান অপরাধীদের আরও দুঃসাহসী করে তুলছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান মনে করেন, আমাদের বিচারিক ব্যবস্থায় জনবলের সংকট ও মামলার পাহাড়সম জট এই সমস্যার বড় অন্তরায়। সারা দেশে প্রায় পঁচিশ শ বিচারক পঁয়তাল্লিশ লাখ মামলার বোঝা নিয়ে কাজ করছেন, যা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় বাধা। সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা ও প্রশাসনিক সংস্কার না আনলে এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ভুক্তভোগীর পূর্বপরিচিত। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির পাশাপাশি পারিবারিক সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগের মতে, শৈশব থেকেই শিশুদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা জরুরি। কোনো শিশু যদি ছোটবেলা থেকে কাউকে উত্যক্ত করার মতো আচরণ করে বড় হয়, তবে ভবিষ্যতে তার মধ্যে অপরাধপ্রবণতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই পরিবারের দায়িত্ব হলো একটি সুস্থ মানসিকতার প্রজন্ম গড়ে তোলা।
শিশু অধিকারকর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি, বিচার কখনোই প্রতিরোধের বিকল্প হতে পারে না। প্রতিরোধ শুরু করতে হবে পরিবার থেকে। ছেলে শিশুকে নারী ও শিশুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত সেমিনার এবং স্কুল পর্যায়ের শিক্ষাক্রমে শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

রোববার, ২১ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬
হাতে রঙিন ফুল, কাঁধে বইয়ের ব্যাগ কিংবা মাঠে খেলার সাথীদের সাথে দুরন্ত শৈশব—একটি শিশুর বেড়ে ওঠার চিত্র এমন হওয়ার কথা থাকলেও আজকের বাস্তবতা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও উদ্বেগজনক। যে ঘরকে শিশুরা সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে করে, সেই ঘর এবং যে পথে তারা প্রতিদিন হেঁটে বেড়ায়, তা এখন অনেক ক্ষেত্রেই ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের অতি পরিচিত মানুষ, নিকটাত্মীয় কিংবা বিশ্বস্ত প্রতিবেশীর হাতেই শিশুরা আজ নৃশংস নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি কেবল একটি শিশুর জীবনই ধ্বংস করছে না, বরং পুরো সমাজব্যবস্থাকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো প্রান্ত থেকে শিশু নির্যাতন, সহিংসতা ও যৌন নিপীড়নের খবর আমাদের ব্যথিত করছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই দেশে ২৫০ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ১৬৬ জনই কন্যাশিশু। এছাড়া ৩১টি শিশু দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১২ শিশুকে। কেবল ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন নয়, বিভিন্ন কারণে মোট ৬৩টি শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, বরং আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের এক করুণ দলিল।
সেভ দ্য চিলড্রেনের শিশু সুরক্ষা ও অধিকার বিভাগের পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, শিশু ধর্ষণের ক্রমবর্ধমান এই হার কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তার মতে, শিশুদের সুরক্ষা কেবল আইনি বিষয় নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। রাষ্ট্র যতদিন পর্যন্ত শিশুদের নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা দিতে না পারবে, ততদিন পরিবার ও অভিভাবকদের ওপরই মূল দায়িত্ব বর্তাবে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, অপরাধীর মনে যদি কঠোর শাস্তির ভয় জাগ্রত করা যায়, তবেই এমন ঘৃণ্য প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ১৫২টি নির্যাতনের ঘটনার বিপরীতে মামলা হয়েছে মাত্র ৪৭টি। এই বিশাল ব্যবধান অপরাধীদের আরও দুঃসাহসী করে তুলছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান মনে করেন, আমাদের বিচারিক ব্যবস্থায় জনবলের সংকট ও মামলার পাহাড়সম জট এই সমস্যার বড় অন্তরায়। সারা দেশে প্রায় পঁচিশ শ বিচারক পঁয়তাল্লিশ লাখ মামলার বোঝা নিয়ে কাজ করছেন, যা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় বাধা। সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা ও প্রশাসনিক সংস্কার না আনলে এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ভুক্তভোগীর পূর্বপরিচিত। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির পাশাপাশি পারিবারিক সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগের মতে, শৈশব থেকেই শিশুদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা জরুরি। কোনো শিশু যদি ছোটবেলা থেকে কাউকে উত্যক্ত করার মতো আচরণ করে বড় হয়, তবে ভবিষ্যতে তার মধ্যে অপরাধপ্রবণতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই পরিবারের দায়িত্ব হলো একটি সুস্থ মানসিকতার প্রজন্ম গড়ে তোলা।
শিশু অধিকারকর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি, বিচার কখনোই প্রতিরোধের বিকল্প হতে পারে না। প্রতিরোধ শুরু করতে হবে পরিবার থেকে। ছেলে শিশুকে নারী ও শিশুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত সেমিনার এবং স্কুল পর্যায়ের শিক্ষাক্রমে শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

আপনার মতামত লিখুন