দিকপাল

ঢাকার বাস টার্মিনাল স্থানান্তরে সামনে ৭ বড় চ্যালেঞ্জ


সুমাইয়া জাবির
সুমাইয়া জাবির ন্যাশনাল ডেস্ক এডিটর
প্রকাশ : রবিবার, ২১ জুন ২০২৬ | ১০:৩৫ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার বাস টার্মিনাল স্থানান্তরে সামনে ৭ বড় চ্যালেঞ্জ

রাজধানীর দীর্ঘদিনের তীব্র যানজট নিরসনে ঢাকার প্রধান চারটি বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তরের সরকারি সিদ্ধান্তকে নগর বিশেষজ্ঞরা স্বাগত জানালেও, এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও সতর্কবার্তা জানিয়েছেন তারা। সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী এবং ফুলবাড়িয়া টার্মিনালকে কেন্দ্র করে যে অসহনীয় যানজট ও বিশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে সম্প্রতি সরকার এগুলোকে শহরের উপকণ্ঠে সরিয়ে নেওয়ার জোরালো নির্দেশনা দিয়েছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাবতলী সাভারের হেমায়েতপুরে, সায়েদাবাদ কাঁচপুরে, ফুলবাড়িয়া কেরানীগঞ্জে এবং মহাখালী প্রাথমিকভাবে পূর্বাচলে স্থানান্তরিত হবে; পরবর্তীতে মহাখালী টার্মিনাল টঙ্গির কাছাকাছি সরিয়ে নেওয়ার রূপরেখাও বিবেচনায় রয়েছে।

তবে নগর পরিকল্পনাবিদ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টার্মিনাল স্থানান্তর করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, বরং এর সফল বাস্তবায়নে সাতটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে। অতীতে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা, দীর্ঘসূত্রতা এবং বাজেট বৃদ্ধির যে তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে এবারের পরিকল্পনাটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের বিশেষজ্ঞদের মতে, সুনির্দিষ্ট সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া এ ধরনের বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বাস রাখার আধুনিক অবকাঠামো, যাত্রীসেবার মান এবং কার্যকর বাস ডিপো নিশ্চিত না করলে টার্মিনাল সরানোর পর উল্টো ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে যাত্রীদের যাতায়াত ব্যবস্থা। শহরের বাইরে টার্মিনাল থেকে যাত্রীরা কীভাবে সহজে এবং সুলভ মূল্যে নগরীর গন্তব্যে পৌঁছাবেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট শাটল সার্ভিস বা আধুনিক সংযোগ ব্যবস্থা এখনো অস্পষ্ট। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক হাদিউজ্জামানের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, হেমায়েতপুর বা কাঁচপুরের মতো প্রবেশমুখগুলোতে বিপুলসংখ্যক যাত্রী নামার পর তারা যখন ছোট ছোট বাহনে ঢাকায় প্রবেশের চেষ্টা করবেন, তখন সেই এলাকাগুলোতে নতুন করে ভয়াবহ যানজট তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাস রুট রেশনালাইজেশন বা বাস পরিচালনায় যে শৃঙ্খলার উদ্যোগ অতীতে নেওয়া হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় টার্মিনাল স্থানান্তরের সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

পাশাপাশি পরিবহন খাতের প্রভাবশালী মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও একটি বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রভাববলয় এবং আয়ের কাঠামোর পরিবর্তন ঘটিয়ে একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জটিল। এছাড়া নতুন টার্মিনালগুলোতে যাত্রীদের নিরাপত্তা, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার নিশ্চয়তা দিতে না পারলে সাধারণ যাত্রীরা এসব নতুন স্থাপনা ব্যবহারে আগ্রহী হবেন না। বিশেষ করে গভীর রাত বা ভোরে চলাচলকারী যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবি রাখে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, কেবল টার্মিনাল স্থানান্তরের মতো বাহ্যিক পরিবর্তন দিয়ে যানজট সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান সম্ভব নয়। পুরো পরিবহন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং যাত্রীসেবাকে মূল কেন্দ্রে রেখে আধুনিক ও উন্নত গণপরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলাই হবে এ সমস্যার আসল চাবিকাঠি।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

রোববার, ২১ জুন ২০২৬


ঢাকার বাস টার্মিনাল স্থানান্তরে সামনে ৭ বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬

featured Image

রাজধানীর দীর্ঘদিনের তীব্র যানজট নিরসনে ঢাকার প্রধান চারটি বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তরের সরকারি সিদ্ধান্তকে নগর বিশেষজ্ঞরা স্বাগত জানালেও, এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও সতর্কবার্তা জানিয়েছেন তারা। সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী এবং ফুলবাড়িয়া টার্মিনালকে কেন্দ্র করে যে অসহনীয় যানজট ও বিশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে সম্প্রতি সরকার এগুলোকে শহরের উপকণ্ঠে সরিয়ে নেওয়ার জোরালো নির্দেশনা দিয়েছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাবতলী সাভারের হেমায়েতপুরে, সায়েদাবাদ কাঁচপুরে, ফুলবাড়িয়া কেরানীগঞ্জে এবং মহাখালী প্রাথমিকভাবে পূর্বাচলে স্থানান্তরিত হবে; পরবর্তীতে মহাখালী টার্মিনাল টঙ্গির কাছাকাছি সরিয়ে নেওয়ার রূপরেখাও বিবেচনায় রয়েছে।

তবে নগর পরিকল্পনাবিদ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টার্মিনাল স্থানান্তর করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, বরং এর সফল বাস্তবায়নে সাতটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে। অতীতে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা, দীর্ঘসূত্রতা এবং বাজেট বৃদ্ধির যে তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে এবারের পরিকল্পনাটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের বিশেষজ্ঞদের মতে, সুনির্দিষ্ট সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া এ ধরনের বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বাস রাখার আধুনিক অবকাঠামো, যাত্রীসেবার মান এবং কার্যকর বাস ডিপো নিশ্চিত না করলে টার্মিনাল সরানোর পর উল্টো ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে যাত্রীদের যাতায়াত ব্যবস্থা। শহরের বাইরে টার্মিনাল থেকে যাত্রীরা কীভাবে সহজে এবং সুলভ মূল্যে নগরীর গন্তব্যে পৌঁছাবেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট শাটল সার্ভিস বা আধুনিক সংযোগ ব্যবস্থা এখনো অস্পষ্ট। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক হাদিউজ্জামানের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, হেমায়েতপুর বা কাঁচপুরের মতো প্রবেশমুখগুলোতে বিপুলসংখ্যক যাত্রী নামার পর তারা যখন ছোট ছোট বাহনে ঢাকায় প্রবেশের চেষ্টা করবেন, তখন সেই এলাকাগুলোতে নতুন করে ভয়াবহ যানজট তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাস রুট রেশনালাইজেশন বা বাস পরিচালনায় যে শৃঙ্খলার উদ্যোগ অতীতে নেওয়া হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় টার্মিনাল স্থানান্তরের সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

পাশাপাশি পরিবহন খাতের প্রভাবশালী মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও একটি বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রভাববলয় এবং আয়ের কাঠামোর পরিবর্তন ঘটিয়ে একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জটিল। এছাড়া নতুন টার্মিনালগুলোতে যাত্রীদের নিরাপত্তা, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার নিশ্চয়তা দিতে না পারলে সাধারণ যাত্রীরা এসব নতুন স্থাপনা ব্যবহারে আগ্রহী হবেন না। বিশেষ করে গভীর রাত বা ভোরে চলাচলকারী যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবি রাখে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, কেবল টার্মিনাল স্থানান্তরের মতো বাহ্যিক পরিবর্তন দিয়ে যানজট সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান সম্ভব নয়। পুরো পরিবহন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং যাত্রীসেবাকে মূল কেন্দ্রে রেখে আধুনিক ও উন্নত গণপরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলাই হবে এ সমস্যার আসল চাবিকাঠি।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল