গত কয়েক বছরে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনার অভাবনীয় সাফল্যের মূল কারিগর কোচ লিওনেল স্কালোনি। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয় এবং টানা দুটি কোপা আমেরিকার শিরোপা নিজেদের শোকেসে তোলা আলবিসেলেস্তেদের জন্য কেবল ট্রফি জয়ের গল্প নয়, বরং এটি তাদের ঐতিহ্যবাহী ফুটবল দর্শনের পুনর্জাগরণ। স্কালোনি কেবল দক্ষ খেলোয়াড়দের এক জায়গায় জড়ো করেননি, বরং অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং আধুনিক কৌশলে দলটিকে সাজিয়েছেন, যেখানে আর্জেন্টিনার নিজস্ব ফুটবল সংস্কৃতি বা লা নুয়েস্ত্রার সঙ্গে আধুনিক ফুটবলের নিখুঁত সমন্বয় ঘটেছে। এই পুরো কৌশলের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছেন লিওনেল মেসি, যাকে ঘিরেই স্কালোনি তার প্রতিটি পরিকল্পনা বুনেছেন।
লা নুয়েস্ত্রা মূলত আর্জেন্টিনার নিজস্ব ফুটবল দর্শন, যার মূলে রয়েছে ব্যক্তিগত সৃজনশীলতা এবং দলগত সংহতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এই দর্শনে খেলোয়াড়দের স্বাধীনভাবে খেলার সুযোগ দেওয়া হয়, যাতে তারা নিজেদের প্রতিভা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দিতে পারে। স্কালোনি মনে করেন, দলকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে রাখলেও খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত স্বকীয়তা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা থাকা জরুরি। তার এই দর্শনের প্রধান চারটি ভিত্তি হলো—নিজেদের পায়ে বল ধরে রাখা, সৃজনশীল আক্রমণ, পুরো দলের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় এবং মেসিকে তার সেরাটা দেওয়ার মতো সর্বোচ্চ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে দেখা গিয়েছিল নামমাত্র ৪-৩-৩ ফরমেশনে। তবে মেসিকে সেন্টার-ফরোয়ার্ডের ভূমিকায় ব্যবহার করে তিনি তাকে দিয়েছেন পুরো মাঠ জুড়ে বিচরণ করার পূর্ণ স্বাধীনতা। ৩৫ বছর বয়সে মেসির ওপর বাড়তি ধকল যেন না যায়, সেজন্য পুরো মিডফিল্ডের বিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছিল যাতে মেসি রক্ষণাত্মক চাপে না পড়ে আক্রমণ সাজানোর কাজে পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারেন। স্কালোনিকে অনেকেই সিচুয়েশন কোচ বলে অভিহিত করেন, কারণ খেলার কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তা তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন।
আধুনিক ফুটবলে সাধারণত একজন হোল্ডিং মিডফিল্ডার রাখা হয়, কিন্তু স্কালোনি এখানে দেখিয়েছেন সাহসী কৌশল। তিনি এনজো ফার্নান্দেজকে মিডফিল্ডের একেবারে নিচ থেকে খেলা গড়ার দায়িত্ব দিয়েছেন। এনজোর এই ভূমিকা কেবল রক্ষণ সামলানোর নয়, বরং নিচ থেকে আক্রমণভাগের জন্য পথ তৈরি করা। এনজোর ওপর যাতে বাড়তি চাপ না পড়ে, সেজন্য তার দুই পাশে রদ্রিগো ডি পল এবং অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের মতো দুই পরিশ্রমী অলরাউন্ডার মিডফিল্ডারকে খেলিয়েছেন। এরা রক্ষণ ও আক্রমণ উভয় দিকেই সমানভাবে দৌড়ঝাঁপ করেন, যার ফলে এনজো নিজের সৃজনশীলতা প্রদর্শনের অঢেল জায়গা পান।
আর্জেন্টিনার প্রেসিং বা বল কেড়ে নেওয়ার কৌশলটিও দারুণ উপভোগ্য। তারা প্রতিপক্ষের ওপর হুটহাট ঝাপিয়ে পড়ার পরিবর্তে দলগতভাবে ছোট ছোট দূরত্ব বজায় রেখে কমপ্যাক্ট প্রেসিং করে, যা প্রতিপক্ষের পাসের রাস্তা বন্ধ করে দেয়। স্কালোনি কেবল একটি ছকেই আটকে থাকেন না। পরিস্থিতির প্রয়োজনে তিনি ৪-৩-৩ থেকে ৪-৩-১-২ বা ৪-৪-২ ডায়মন্ড ফরমেশনে দল সাজাতে দ্বিধা করেন না। এমনকি যখন বাড়তি স্ট্রাইকার খেলানোর প্রয়োজন পড়ে, তখনও তিনি দলের ভারসাম্য বজায় রাখার জাদুকরী সক্ষমতা দেখান।
স্কালোনির এই সাফল্যের মূলমন্ত্র জটিল কোনো কৌশল নয়, বরং তিনি প্রতিটি খেলোয়াড়ের সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতা নিখুঁতভাবে বুঝতে পারেন। মেসিকে কেন্দ্র করে প্রতিটি সদস্যকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমেই আর্জেন্টিনা তাদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করেছে। স্কালোনির হাত ধরে আর্জেন্টিনা এখন ফুটবলের সেই পুরনো নন্দনতত্ত্ব আর আধুনিকতার এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ হয়ে উঠেছে। আসন্ন ম্যাচগুলোতেও এই একই পরিকল্পনায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবেন লিওনেল মেসিরা।

বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬
গত কয়েক বছরে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনার অভাবনীয় সাফল্যের মূল কারিগর কোচ লিওনেল স্কালোনি। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয় এবং টানা দুটি কোপা আমেরিকার শিরোপা নিজেদের শোকেসে তোলা আলবিসেলেস্তেদের জন্য কেবল ট্রফি জয়ের গল্প নয়, বরং এটি তাদের ঐতিহ্যবাহী ফুটবল দর্শনের পুনর্জাগরণ। স্কালোনি কেবল দক্ষ খেলোয়াড়দের এক জায়গায় জড়ো করেননি, বরং অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং আধুনিক কৌশলে দলটিকে সাজিয়েছেন, যেখানে আর্জেন্টিনার নিজস্ব ফুটবল সংস্কৃতি বা লা নুয়েস্ত্রার সঙ্গে আধুনিক ফুটবলের নিখুঁত সমন্বয় ঘটেছে। এই পুরো কৌশলের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছেন লিওনেল মেসি, যাকে ঘিরেই স্কালোনি তার প্রতিটি পরিকল্পনা বুনেছেন।
লা নুয়েস্ত্রা মূলত আর্জেন্টিনার নিজস্ব ফুটবল দর্শন, যার মূলে রয়েছে ব্যক্তিগত সৃজনশীলতা এবং দলগত সংহতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এই দর্শনে খেলোয়াড়দের স্বাধীনভাবে খেলার সুযোগ দেওয়া হয়, যাতে তারা নিজেদের প্রতিভা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দিতে পারে। স্কালোনি মনে করেন, দলকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে রাখলেও খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত স্বকীয়তা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা থাকা জরুরি। তার এই দর্শনের প্রধান চারটি ভিত্তি হলো—নিজেদের পায়ে বল ধরে রাখা, সৃজনশীল আক্রমণ, পুরো দলের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় এবং মেসিকে তার সেরাটা দেওয়ার মতো সর্বোচ্চ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে দেখা গিয়েছিল নামমাত্র ৪-৩-৩ ফরমেশনে। তবে মেসিকে সেন্টার-ফরোয়ার্ডের ভূমিকায় ব্যবহার করে তিনি তাকে দিয়েছেন পুরো মাঠ জুড়ে বিচরণ করার পূর্ণ স্বাধীনতা। ৩৫ বছর বয়সে মেসির ওপর বাড়তি ধকল যেন না যায়, সেজন্য পুরো মিডফিল্ডের বিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছিল যাতে মেসি রক্ষণাত্মক চাপে না পড়ে আক্রমণ সাজানোর কাজে পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারেন। স্কালোনিকে অনেকেই সিচুয়েশন কোচ বলে অভিহিত করেন, কারণ খেলার কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তা তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন।
আধুনিক ফুটবলে সাধারণত একজন হোল্ডিং মিডফিল্ডার রাখা হয়, কিন্তু স্কালোনি এখানে দেখিয়েছেন সাহসী কৌশল। তিনি এনজো ফার্নান্দেজকে মিডফিল্ডের একেবারে নিচ থেকে খেলা গড়ার দায়িত্ব দিয়েছেন। এনজোর এই ভূমিকা কেবল রক্ষণ সামলানোর নয়, বরং নিচ থেকে আক্রমণভাগের জন্য পথ তৈরি করা। এনজোর ওপর যাতে বাড়তি চাপ না পড়ে, সেজন্য তার দুই পাশে রদ্রিগো ডি পল এবং অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের মতো দুই পরিশ্রমী অলরাউন্ডার মিডফিল্ডারকে খেলিয়েছেন। এরা রক্ষণ ও আক্রমণ উভয় দিকেই সমানভাবে দৌড়ঝাঁপ করেন, যার ফলে এনজো নিজের সৃজনশীলতা প্রদর্শনের অঢেল জায়গা পান।
আর্জেন্টিনার প্রেসিং বা বল কেড়ে নেওয়ার কৌশলটিও দারুণ উপভোগ্য। তারা প্রতিপক্ষের ওপর হুটহাট ঝাপিয়ে পড়ার পরিবর্তে দলগতভাবে ছোট ছোট দূরত্ব বজায় রেখে কমপ্যাক্ট প্রেসিং করে, যা প্রতিপক্ষের পাসের রাস্তা বন্ধ করে দেয়। স্কালোনি কেবল একটি ছকেই আটকে থাকেন না। পরিস্থিতির প্রয়োজনে তিনি ৪-৩-৩ থেকে ৪-৩-১-২ বা ৪-৪-২ ডায়মন্ড ফরমেশনে দল সাজাতে দ্বিধা করেন না। এমনকি যখন বাড়তি স্ট্রাইকার খেলানোর প্রয়োজন পড়ে, তখনও তিনি দলের ভারসাম্য বজায় রাখার জাদুকরী সক্ষমতা দেখান।
স্কালোনির এই সাফল্যের মূলমন্ত্র জটিল কোনো কৌশল নয়, বরং তিনি প্রতিটি খেলোয়াড়ের সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতা নিখুঁতভাবে বুঝতে পারেন। মেসিকে কেন্দ্র করে প্রতিটি সদস্যকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমেই আর্জেন্টিনা তাদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করেছে। স্কালোনির হাত ধরে আর্জেন্টিনা এখন ফুটবলের সেই পুরনো নন্দনতত্ত্ব আর আধুনিকতার এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ হয়ে উঠেছে। আসন্ন ম্যাচগুলোতেও এই একই পরিকল্পনায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবেন লিওনেল মেসিরা।

আপনার মতামত লিখুন