দিকপাল

একটি মহামারি, কিছু হারিয়ে যাওয়া দিন, কিছু নতুন অভ্যাস, আর বদলে যাওয়া মানুষের গল্প।

করোনার আগে ও পরে: বদলে যাওয়া পৃথিবী, বদলে যাওয়া মানুষ


ইসরাত জাহান
ইসরাত জাহান
প্রকাশ : সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩১ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার আগে ও পরে: বদলে যাওয়া পৃথিবী, বদলে যাওয়া মানুষ
মহামারির স্মৃতি ও বদলে যাওয়া বাস্তবতা

একসময় বিকেল মানেই ছিল বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার অজুহাত। কারও বাসায় হঠাৎ চলে যাওয়া, চায়ের কাপে দীর্ঘ আড্ডা, পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাইরে খেতে যাওয়া—এসবের জন্য কোনো বিশেষ উপলক্ষ লাগত না। অথচ একটা সময় এলো, যখন পাশের বাড়ির মানুষটির সঙ্গেও দেখা করাটা অনিশ্চিত হয়ে উঠল। একটি অদৃশ্য ভাইরাস আমাদের শিখিয়ে দিল, মানুষের কাছে থাকা কত বড় আশীর্বাদ।

মানুষ বেঁচে থাকে, আর বেঁচে থাকার সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যায়। সময় বদলায়, পরিস্থিতি বদলায়, বদলে যায় মানুষের চিন্তা, চাওয়া-পাওয়া, সম্পর্ক, অভ্যাস, এমনকি জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও। তবে কিছু পরিবর্তন আসে এতটাই আকস্মিকভাবে, যা শুধু একজন মানুষের জীবন নয়, বদলে দেয় একটি সমাজ, একটি প্রজন্ম, এমনকি গোটা পৃথিবীর চেনা মানচিত্র।

আমাদের জীবনে করোনা মহামারি ছিল তেমনই এক পরিবর্তনের নাম। ২০২০ সালের আগে যে পৃথিবীকে আমরা চিনতাম, মহামারির পর সেই পৃথিবী আর পুরোপুরি আগের মতো থাকেনি। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে, সময় এগিয়েছে, রাস্তাঘাট আবার মানুষের পদচারণায় মুখর হয়েছে। কিন্তু মানুষের ভেতরে, চিন্তায়, সম্পর্কে, অভ্যাসে এবং জীবনযাপনে যে পরিবর্তন ঘটে গেছে, তার সবটুকু কি আর আগের জায়গায় ফিরেছে?

মনির চৌধুরীর রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকের একটি সংলাপ এখানে বিশেষভাবে মনে পড়ে—

“মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়, কারণে-অকারণে, সকাল-বিকেল বদলায়।”

কথাটি যেন মানুষের চিরন্তন বাস্তবতাকে তুলে ধরে। মানুষ বেঁচে থাকলে বদলায়—কখনো নিজের ইচ্ছায়, কখনো পরিস্থিতির চাপে, কখনো অভিজ্ঞতার তাড়নায়। করোনা ছিল তেমনই এক পরিস্থিতি, যা আমাদের অনেককে বদলে দিয়েছে; হয়তো এমনভাবে, যা আমরা নিজেরাও আগে কল্পনা করিনি।

করোনার আগে: জীবন ছিল ব্যস্ত, তবু কত সহজ!

একবার ফিরে তাকাই করোনার আগের দিনগুলোতে। কী অদ্ভুত স্বাভাবিক ছিল সেই জীবন! সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অফিসে যাওয়ার তাড়া। ঢাকার রাস্তায় যানজট, বাসের অপেক্ষায় মানুষের ভিড়, ফুটপাতের চায়ের দোকানে আড্ডা, বন্ধুদের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া, ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া—সবই ছিল আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ।

তখন কারও বাড়িতে যেতে আগে থেকে বিশেষ কোনো পরিকল্পনার প্রয়োজন হতো না। আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়াতে যাওয়া, বিয়ে কিংবা জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা—এসবের জন্য আলাদা করে কোনো উপলক্ষও লাগত না।

একটি ফোনকলেই বন্ধুকে বলা যেত, 'চলো, দেখা করি।' বিকেলের আড্ডা কখন যে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে যেত, তা বোঝাই যেত না।

মানুষ তখনও ব্যস্ত ছিল, দুশ্চিন্তা ছিল, জীবিকার সংগ্রাম ছিল, সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল। কিন্তু জীবন চলার পথে একে অপরের সান্নিধ্য পাওয়া এত কঠিন ছিল না। পাশাপাশি বসে কথা বলা, হাত মেলানো, আলিঙ্গন করা কিংবা প্রিয়জনের মুখোমুখি হওয়া—এসবের মধ্যে কোনো অদৃশ্য ভয়ের দেয়াল ছিল না।

আমরা হয়তো তখন বুঝতেই পারিনি, এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই একদিন আমাদের কাছে অসাধারণ স্মৃতি হয়ে উঠবে।

করোনা: হঠাৎ থেমে যাওয়া পৃথিবী

তারপর এলো করোনা। একটি অদৃশ্য ভাইরাস যেন গোটা পৃথিবীকে থামিয়ে দিল। যে পৃথিবী প্রতিদিন ছুটছিল সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, সেই পৃথিবী একদিন হঠাৎ ঘরবন্দি হয়ে পড়ল।

বাংলাদেশেও ২০২০ সালের মার্চ মাসে প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর শুরু হলো এক নতুন বাস্তবতা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, অফিস-আদালতের কার্যক্রম সীমিত, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, রাস্তাঘাটে নীরবতা। ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো হয়ে উঠল জনশূন্য। যে শহরের রাতও কখনো পুরোপুরি ঘুমাত না, সেই শহর যেন নিজের শব্দ হারিয়ে ফেলল।

মাস্ক হয়ে উঠল পরিচয়ের অংশ, স্যানিটাইজার হয়ে উঠল নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, আর সামাজিক দূরত্ব হয়ে উঠল বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত।

সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল মানুষের কাছ থেকে মানুষের দূরে সরে যাওয়া। যাকে দেখলে কাছে ছুটে যেতাম, তাকেই দূর থেকে দেখতে হতো। প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা থাকলেও দেখা করা সম্ভব হতো না। একই শহরে থেকেও অনেকে মাসের পর মাস আপনজনের মুখ দেখতে পারেননি।

আর মৃত্যুভয়! প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে মৃত্যুর সংখ্যা, হাসপাতালের খবর, অক্সিজেনের সংকট, অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন—সব মিলিয়ে জীবন যেন এক অনিশ্চিত অপেক্ষার নাম হয়ে উঠেছিল।

কত মানুষ প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। কেউ শেষবারের মতো বাবার হাত ধরতে পারেননি, কেউ মায়ের পাশে বসে থাকতে পারেননি, কেউ জীবনসঙ্গীকে বিদায় জানানোর সুযোগটুকুও পাননি। কিছু বিদায় ছিল নিঃশব্দ, কিছু শোক ছিল একান্ত ব্যক্তিগত। অনেক মানুষের জীবনে করোনা শুধু একটি মহামারি নয়, চিরস্থায়ী শূন্যতার নাম হয়ে রয়ে গেছে।

আমরা কী হারিয়েছি?

করোনা আমাদের কাছ থেকে শুধু জীবন কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য স্বাভাবিক মুহূর্ত, নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকার অনুভূতি এবং অনেক মানুষের জীবনের নিরাপত্তা।

আমরা হারিয়েছি প্রিয়জন, হারিয়েছি চাকরি, ব্যবসা ও জীবিকার নিশ্চয়তা। অনেক শিশু হারিয়েছে তাদের শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দ। শিক্ষার্থীরা হারিয়েছে শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে বেড়ে ওঠার দিনগুলো। অনেক পরিবার হারিয়েছে তাদের আর্থিক স্থিতি।

আমরা হয়তো হারিয়েছি সেই অনায়াস সামাজিকতা, যেখানে কোনো দ্বিধা ছাড়াই মানুষের কাছে যাওয়া যেত। হারিয়েছি হঠাৎ কোথাও বেড়াতে যাওয়ার স্বাধীনতা, প্রিয়জনের সঙ্গে নিশ্চিন্তে সময় কাটানোর সুযোগ।

তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়তো আমাদের অজান্তেই হয়েছে—মানুষের সঙ্গে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সংযোগের জায়গায় তৈরি হয়েছে এক ধরনের দূরত্ব। আমরা যোগাযোগ করছি, কিন্তু সব সময় কি সত্যিকার অর্থে সংযুক্ত থাকতে পারছি?

আবার আমরা কী পেয়েছি?

প্রতিটি সংকটের ভেতরেই কিছু উপলব্ধির জন্ম হয়। করোনা আমাদের জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।

আমরা বুঝেছি, সুস্থ শরীর, নিরাপদ আশ্রয় এবং পরিবারের মানুষগুলোর উপস্থিতি কত বড় সম্পদ। যে মানুষগুলোকে প্রতিদিন পাশে পেতাম, তাদের মূল্য হয়তো তখন এতটা গভীরভাবে উপলব্ধি করিনি। কিন্তু দূরে থাকার অভিজ্ঞতা আমাদের বুঝিয়েছে, প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য কোনো সাধারণ প্রাপ্তি নয়।

অনেকে পরিবারের সঙ্গে নতুন করে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন। কেউ রান্না শিখেছেন, কেউ বই পড়ায় মন দিয়েছেন, কেউ পুরোনো শখ ফিরিয়ে এনেছেন। কেউ নতুন করে ব্যবসা শুরু করেছেন, কেউ জীবনের অগ্রাধিকার বদলেছেন।

আমরা শিখেছি, জীবনের সব পরিকল্পনা আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি জরুরি, কিন্তু বর্তমানকে উপভোগ করাও সমান জরুরি।

ইন্টারনেটনির্ভর মানুষ: পৃথিবী হাতের মুঠোয়, মানুষ কি আরও কাছে?

করোনা-পরবর্তী পৃথিবীর সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনগুলোর একটি হলো প্রযুক্তিনির্ভরতা। মহামারির আগে ইন্টারনেট আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, কিন্তু করোনার সময় এটি অনেকের কাছে হয়ে ওঠে জীবন পরিচালনার অপরিহার্য মাধ্যম।

স্কুলের শ্রেণিকক্ষের জায়গা নিল অনলাইন ক্লাস। অফিসের মিটিং চলে গেল ভিডিও কনফারেন্সে। বাজার করা, খাবার অর্ডার, ব্যাংকিং, চিকিৎসকের পরামর্শ, এমনকি সামাজিক যোগাযোগও ক্রমশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভর হয়ে উঠল।

ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ভিডিও কল—এসব মাধ্যম দূরে থাকা মানুষকে কাছে রাখার চেষ্টা করেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবীর এক প্রান্তে বসে অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে।

অনলাইন ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল লেনদেন ও ঘরে বসে কাজের সুযোগও বেড়েছে। অনেকেই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নতুন জীবিকার পথ খুঁজে পেয়েছেন।

কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নতুন কিছু প্রশ্ন।

আমরা কি এখন আগের চেয়ে বেশি কথা বলি, নাকি বেশি বার্তা আদান-প্রদান করি? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত মানুষের সঙ্গে যুক্ত থেকেও কেন কখনো নিজেকে এত একা মনে হয়? একই ঘরে বসে পরিবারের সদস্যরা কেন অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে কথা না বলে নিজ নিজ মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকেন?

একসময় মানুষ দেখা করার জন্য সময় বের করত, এখন দেখা করার বদলে একটি মেসেজ পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করে। জন্মদিনে শুভেচ্ছা আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, উৎসবের আনন্দ ভাগ হয় ছবির মাধ্যমে, আর অনেক সম্পর্ক টিকে থাকে শুধু অনলাইন উপস্থিতির ওপর।

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, নিঃসন্দেহে। কিন্তু সহজ যোগাযোগ আর গভীর সম্পর্ক এক জিনিস নয়। পৃথিবী আমাদের হাতের মুঠোয় এসেছে, অথচ কখনো কখনো পাশের মানুষটির কাছেই আমরা পৌঁছাতে পারছি না।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছি, নাকি ধীরে ধীরে প্রযুক্তিই আমাদের ব্যবহার করছে?

সম্পর্ক বদলেছে, বদলেছে মানুষের অগ্রাধিকার

করোনার সময় অনেক সম্পর্ক নতুনভাবে চেনা হয়েছে। কেউ কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন, আবার কেউ দূরে সরে গেছেন। কেউ সামান্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, কেউ নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

এই সময় আমাদের সামনে মানুষের দুটি রূপই স্পষ্ট হয়েছে—একদিকে স্বার্থপরতা, আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব; অন্যদিকে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।

তবে করোনার পরে সামাজিক জীবনে আরেকটি পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। মানুষ আগের মতোই সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছে, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করছে, ভ্রমণে যাচ্ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কের গভীরতার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগের প্রদর্শন যেন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

ছবি আছে, পোস্ট আছে, শুভেচ্ছা আছে—কিন্তু সব সময় কি মনের যোগাযোগ আছে?

অবশ্য সবাই এমন নয়। এখনো অসংখ্য মানুষ আছেন, যাঁরা সম্পর্কের মূল্য বোঝেন, বিপদে পাশে দাঁড়ান, নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসেন। তাই পরিবর্তনের গল্পটি একরৈখিক নয়। মানুষ বদলেছে, তবে সবার বদলে যাওয়ার ধরন এক নয়।

অর্থনীতি, শিক্ষা ও জীবনের নতুন সমীকরণ

করোনার অভিঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ছোট ব্যবসায়ী, দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক, নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষকে কঠিন সময় পার করতে হয়েছে।

অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন, ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন, আবার কেউ নতুনভাবে শুরু করার সাহস পেয়েছেন। অনলাইন ব্যবসা, হোম ডেলিভারি, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার প্রসার নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

শিক্ষাক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। অনলাইন শিক্ষার অভিজ্ঞতা আমাদের প্রযুক্তির গুরুত্ব বুঝিয়েছে, আবার এটিও দেখিয়েছে যে প্রযুক্তির সুবিধা সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের সুযোগের পার্থক্য, ডিভাইস ও ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতা—সবই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

অর্থাৎ করোনা শুধু পুরোনো ব্যবস্থাকে থামিয়ে দেয়নি; অনেক ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাও সামনে নিয়ে এসেছে।

আমরা কি সত্যিই আগের চেয়ে ভালো আছি?

আজ আমরা আবার ব্যস্ত। অফিসে যাচ্ছি, সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছি, ব্যবসা করছি, কেনাকাটা করছি, ভ্রমণ করছি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, পৃথিবী তার পুরোনো ছন্দ ফিরে পেয়েছে।

কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায়, আমাদের জীবনযাপনের ধরন বদলেছে। আমরা স্বাস্থ্য নিয়ে বেশি সচেতন, প্রযুক্তির ওপর বেশি নির্ভরশীল, ভবিষ্যৎ নিয়ে কখনো বেশি সতর্ক, আবার কখনো আগের চেয়ে বেশি অস্থির।

করোনা আমাদের শিখিয়েছে মৃত্যুর অনিবার্যতা, কিন্তু আমরা কি জীবনকে আরও ভালোভাবে ভালোবাসতে শিখেছি? আমরা বুঝেছি সম্পর্কের মূল্য, কিন্তু সেই সম্পর্কগুলোকে সময় দিচ্ছি তো? আমরা মানবিকতার কথা বলেছি, কিন্তু অন্যের বিপদে আজও কি একইভাবে পাশে দাঁড়াই?

হয়তো এই প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রত্যেকের কাছে আলাদা।

শেষ পর্যন্ত, কী রয়ে গেল?

সময় এগিয়ে গেছে। মহামারির ভয়াবহ দিনগুলো পেছনে পড়ে আছে। কিন্তু সেই সময়ের স্মৃতি, হারানোর বেদনা, বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং নতুন করে শুরু করার গল্পগুলো এখনো আমাদের জীবনের অংশ।

করোনার আগে আমরা হয়তো অনেক কিছু পেয়েও তার মূল্য বুঝিনি। করোনার সময় অনেক কিছু হারিয়ে বুঝেছি, আসলে কী কী আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। আর করোনার পরে প্রযুক্তি, নতুন অভ্যাস ও পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখেছি।

আমরা পেয়েছি প্রযুক্তির গতি, কাজের নতুন সুযোগ, কিছু নতুন দক্ষতা এবং জীবনের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। আবার হারিয়েছি অসংখ্য জীবন, স্বাভাবিকতার নিশ্চিন্ত অনুভূতি, অনেক সম্পর্কের উষ্ণতা এবং জীবনের এমন কিছু মুহূর্ত, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।

মানুষ বেঁচে থাকলে বদলায়—কখনো সময়ের কারণে, কখনো অভিজ্ঞতার কারণে, কখনো পরিস্থিতির নির্মম বাস্তবতায়। করোনা আমাদেরও বদলেছে। কিন্তু সেই বদল কতটা ইতিবাচক, কতটা নেতিবাচক, আর কতটা আমাদের নিজেদের হাতে তৈরি—সেই হিসাব এখনো বাকি।

আজ তাই প্রশ্নটি শুধু করোনার আগে ও পরে পৃথিবী কতটা বদলেছে, তা নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর—

আমরা কী হারিয়েছি, কী পেয়েছি? আমরা কি শুধু আধুনিক হয়েছি, নাকি আরও মানবিকও হয়েছি? পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনেছি, কিন্তু মানুষের হাতটা কি আগের মতোই ধরে রাখতে পেরেছি?

হয়তো সময়ের কাছে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পাওয়াই আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

কারণ পৃথিবী বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলাবে। কিন্তু এই পরিবর্তনের ভিড়ে মানুষ যেন মানুষকে ভুলে না যায়—সেটুকুই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬


করোনার আগে ও পরে: বদলে যাওয়া পৃথিবী, বদলে যাওয়া মানুষ

প্রকাশের তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

একসময় বিকেল মানেই ছিল বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার অজুহাত। কারও বাসায় হঠাৎ চলে যাওয়া, চায়ের কাপে দীর্ঘ আড্ডা, পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাইরে খেতে যাওয়া—এসবের জন্য কোনো বিশেষ উপলক্ষ লাগত না। অথচ একটা সময় এলো, যখন পাশের বাড়ির মানুষটির সঙ্গেও দেখা করাটা অনিশ্চিত হয়ে উঠল। একটি অদৃশ্য ভাইরাস আমাদের শিখিয়ে দিল, মানুষের কাছে থাকা কত বড় আশীর্বাদ।

মানুষ বেঁচে থাকে, আর বেঁচে থাকার সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যায়। সময় বদলায়, পরিস্থিতি বদলায়, বদলে যায় মানুষের চিন্তা, চাওয়া-পাওয়া, সম্পর্ক, অভ্যাস, এমনকি জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও। তবে কিছু পরিবর্তন আসে এতটাই আকস্মিকভাবে, যা শুধু একজন মানুষের জীবন নয়, বদলে দেয় একটি সমাজ, একটি প্রজন্ম, এমনকি গোটা পৃথিবীর চেনা মানচিত্র।

আমাদের জীবনে করোনা মহামারি ছিল তেমনই এক পরিবর্তনের নাম। ২০২০ সালের আগে যে পৃথিবীকে আমরা চিনতাম, মহামারির পর সেই পৃথিবী আর পুরোপুরি আগের মতো থাকেনি। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে, সময় এগিয়েছে, রাস্তাঘাট আবার মানুষের পদচারণায় মুখর হয়েছে। কিন্তু মানুষের ভেতরে, চিন্তায়, সম্পর্কে, অভ্যাসে এবং জীবনযাপনে যে পরিবর্তন ঘটে গেছে, তার সবটুকু কি আর আগের জায়গায় ফিরেছে?

মনির চৌধুরীর রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকের একটি সংলাপ এখানে বিশেষভাবে মনে পড়ে—

“মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়, কারণে-অকারণে, সকাল-বিকেল বদলায়।”

কথাটি যেন মানুষের চিরন্তন বাস্তবতাকে তুলে ধরে। মানুষ বেঁচে থাকলে বদলায়—কখনো নিজের ইচ্ছায়, কখনো পরিস্থিতির চাপে, কখনো অভিজ্ঞতার তাড়নায়। করোনা ছিল তেমনই এক পরিস্থিতি, যা আমাদের অনেককে বদলে দিয়েছে; হয়তো এমনভাবে, যা আমরা নিজেরাও আগে কল্পনা করিনি।

করোনার আগে: জীবন ছিল ব্যস্ত, তবু কত সহজ!

একবার ফিরে তাকাই করোনার আগের দিনগুলোতে। কী অদ্ভুত স্বাভাবিক ছিল সেই জীবন! সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অফিসে যাওয়ার তাড়া। ঢাকার রাস্তায় যানজট, বাসের অপেক্ষায় মানুষের ভিড়, ফুটপাতের চায়ের দোকানে আড্ডা, বন্ধুদের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া, ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া—সবই ছিল আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ।

তখন কারও বাড়িতে যেতে আগে থেকে বিশেষ কোনো পরিকল্পনার প্রয়োজন হতো না। আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়াতে যাওয়া, বিয়ে কিংবা জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা—এসবের জন্য আলাদা করে কোনো উপলক্ষও লাগত না।

একটি ফোনকলেই বন্ধুকে বলা যেত, 'চলো, দেখা করি।' বিকেলের আড্ডা কখন যে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে যেত, তা বোঝাই যেত না।

মানুষ তখনও ব্যস্ত ছিল, দুশ্চিন্তা ছিল, জীবিকার সংগ্রাম ছিল, সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল। কিন্তু জীবন চলার পথে একে অপরের সান্নিধ্য পাওয়া এত কঠিন ছিল না। পাশাপাশি বসে কথা বলা, হাত মেলানো, আলিঙ্গন করা কিংবা প্রিয়জনের মুখোমুখি হওয়া—এসবের মধ্যে কোনো অদৃশ্য ভয়ের দেয়াল ছিল না।

আমরা হয়তো তখন বুঝতেই পারিনি, এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই একদিন আমাদের কাছে অসাধারণ স্মৃতি হয়ে উঠবে।

করোনা: হঠাৎ থেমে যাওয়া পৃথিবী

তারপর এলো করোনা। একটি অদৃশ্য ভাইরাস যেন গোটা পৃথিবীকে থামিয়ে দিল। যে পৃথিবী প্রতিদিন ছুটছিল সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, সেই পৃথিবী একদিন হঠাৎ ঘরবন্দি হয়ে পড়ল।

বাংলাদেশেও ২০২০ সালের মার্চ মাসে প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর শুরু হলো এক নতুন বাস্তবতা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, অফিস-আদালতের কার্যক্রম সীমিত, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, রাস্তাঘাটে নীরবতা। ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো হয়ে উঠল জনশূন্য। যে শহরের রাতও কখনো পুরোপুরি ঘুমাত না, সেই শহর যেন নিজের শব্দ হারিয়ে ফেলল।

মাস্ক হয়ে উঠল পরিচয়ের অংশ, স্যানিটাইজার হয়ে উঠল নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, আর সামাজিক দূরত্ব হয়ে উঠল বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত।

সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল মানুষের কাছ থেকে মানুষের দূরে সরে যাওয়া। যাকে দেখলে কাছে ছুটে যেতাম, তাকেই দূর থেকে দেখতে হতো। প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা থাকলেও দেখা করা সম্ভব হতো না। একই শহরে থেকেও অনেকে মাসের পর মাস আপনজনের মুখ দেখতে পারেননি।

আর মৃত্যুভয়! প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে মৃত্যুর সংখ্যা, হাসপাতালের খবর, অক্সিজেনের সংকট, অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন—সব মিলিয়ে জীবন যেন এক অনিশ্চিত অপেক্ষার নাম হয়ে উঠেছিল।

কত মানুষ প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। কেউ শেষবারের মতো বাবার হাত ধরতে পারেননি, কেউ মায়ের পাশে বসে থাকতে পারেননি, কেউ জীবনসঙ্গীকে বিদায় জানানোর সুযোগটুকুও পাননি। কিছু বিদায় ছিল নিঃশব্দ, কিছু শোক ছিল একান্ত ব্যক্তিগত। অনেক মানুষের জীবনে করোনা শুধু একটি মহামারি নয়, চিরস্থায়ী শূন্যতার নাম হয়ে রয়ে গেছে।

আমরা কী হারিয়েছি?

করোনা আমাদের কাছ থেকে শুধু জীবন কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য স্বাভাবিক মুহূর্ত, নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকার অনুভূতি এবং অনেক মানুষের জীবনের নিরাপত্তা।

আমরা হারিয়েছি প্রিয়জন, হারিয়েছি চাকরি, ব্যবসা ও জীবিকার নিশ্চয়তা। অনেক শিশু হারিয়েছে তাদের শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দ। শিক্ষার্থীরা হারিয়েছে শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে বেড়ে ওঠার দিনগুলো। অনেক পরিবার হারিয়েছে তাদের আর্থিক স্থিতি।

আমরা হয়তো হারিয়েছি সেই অনায়াস সামাজিকতা, যেখানে কোনো দ্বিধা ছাড়াই মানুষের কাছে যাওয়া যেত। হারিয়েছি হঠাৎ কোথাও বেড়াতে যাওয়ার স্বাধীনতা, প্রিয়জনের সঙ্গে নিশ্চিন্তে সময় কাটানোর সুযোগ।

তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়তো আমাদের অজান্তেই হয়েছে—মানুষের সঙ্গে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সংযোগের জায়গায় তৈরি হয়েছে এক ধরনের দূরত্ব। আমরা যোগাযোগ করছি, কিন্তু সব সময় কি সত্যিকার অর্থে সংযুক্ত থাকতে পারছি?

আবার আমরা কী পেয়েছি?

প্রতিটি সংকটের ভেতরেই কিছু উপলব্ধির জন্ম হয়। করোনা আমাদের জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।

আমরা বুঝেছি, সুস্থ শরীর, নিরাপদ আশ্রয় এবং পরিবারের মানুষগুলোর উপস্থিতি কত বড় সম্পদ। যে মানুষগুলোকে প্রতিদিন পাশে পেতাম, তাদের মূল্য হয়তো তখন এতটা গভীরভাবে উপলব্ধি করিনি। কিন্তু দূরে থাকার অভিজ্ঞতা আমাদের বুঝিয়েছে, প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য কোনো সাধারণ প্রাপ্তি নয়।

অনেকে পরিবারের সঙ্গে নতুন করে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন। কেউ রান্না শিখেছেন, কেউ বই পড়ায় মন দিয়েছেন, কেউ পুরোনো শখ ফিরিয়ে এনেছেন। কেউ নতুন করে ব্যবসা শুরু করেছেন, কেউ জীবনের অগ্রাধিকার বদলেছেন।

আমরা শিখেছি, জীবনের সব পরিকল্পনা আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি জরুরি, কিন্তু বর্তমানকে উপভোগ করাও সমান জরুরি।

ইন্টারনেটনির্ভর মানুষ: পৃথিবী হাতের মুঠোয়, মানুষ কি আরও কাছে?

করোনা-পরবর্তী পৃথিবীর সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনগুলোর একটি হলো প্রযুক্তিনির্ভরতা। মহামারির আগে ইন্টারনেট আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, কিন্তু করোনার সময় এটি অনেকের কাছে হয়ে ওঠে জীবন পরিচালনার অপরিহার্য মাধ্যম।

স্কুলের শ্রেণিকক্ষের জায়গা নিল অনলাইন ক্লাস। অফিসের মিটিং চলে গেল ভিডিও কনফারেন্সে। বাজার করা, খাবার অর্ডার, ব্যাংকিং, চিকিৎসকের পরামর্শ, এমনকি সামাজিক যোগাযোগও ক্রমশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভর হয়ে উঠল।

ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ভিডিও কল—এসব মাধ্যম দূরে থাকা মানুষকে কাছে রাখার চেষ্টা করেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবীর এক প্রান্তে বসে অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে।

অনলাইন ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল লেনদেন ও ঘরে বসে কাজের সুযোগও বেড়েছে। অনেকেই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নতুন জীবিকার পথ খুঁজে পেয়েছেন।

কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নতুন কিছু প্রশ্ন।

আমরা কি এখন আগের চেয়ে বেশি কথা বলি, নাকি বেশি বার্তা আদান-প্রদান করি? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত মানুষের সঙ্গে যুক্ত থেকেও কেন কখনো নিজেকে এত একা মনে হয়? একই ঘরে বসে পরিবারের সদস্যরা কেন অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে কথা না বলে নিজ নিজ মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকেন?

একসময় মানুষ দেখা করার জন্য সময় বের করত, এখন দেখা করার বদলে একটি মেসেজ পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করে। জন্মদিনে শুভেচ্ছা আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, উৎসবের আনন্দ ভাগ হয় ছবির মাধ্যমে, আর অনেক সম্পর্ক টিকে থাকে শুধু অনলাইন উপস্থিতির ওপর।

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, নিঃসন্দেহে। কিন্তু সহজ যোগাযোগ আর গভীর সম্পর্ক এক জিনিস নয়। পৃথিবী আমাদের হাতের মুঠোয় এসেছে, অথচ কখনো কখনো পাশের মানুষটির কাছেই আমরা পৌঁছাতে পারছি না।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছি, নাকি ধীরে ধীরে প্রযুক্তিই আমাদের ব্যবহার করছে?

সম্পর্ক বদলেছে, বদলেছে মানুষের অগ্রাধিকার

করোনার সময় অনেক সম্পর্ক নতুনভাবে চেনা হয়েছে। কেউ কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন, আবার কেউ দূরে সরে গেছেন। কেউ সামান্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, কেউ নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

এই সময় আমাদের সামনে মানুষের দুটি রূপই স্পষ্ট হয়েছে—একদিকে স্বার্থপরতা, আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব; অন্যদিকে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।

তবে করোনার পরে সামাজিক জীবনে আরেকটি পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। মানুষ আগের মতোই সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছে, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করছে, ভ্রমণে যাচ্ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কের গভীরতার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগের প্রদর্শন যেন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

ছবি আছে, পোস্ট আছে, শুভেচ্ছা আছে—কিন্তু সব সময় কি মনের যোগাযোগ আছে?

অবশ্য সবাই এমন নয়। এখনো অসংখ্য মানুষ আছেন, যাঁরা সম্পর্কের মূল্য বোঝেন, বিপদে পাশে দাঁড়ান, নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসেন। তাই পরিবর্তনের গল্পটি একরৈখিক নয়। মানুষ বদলেছে, তবে সবার বদলে যাওয়ার ধরন এক নয়।

অর্থনীতি, শিক্ষা ও জীবনের নতুন সমীকরণ

করোনার অভিঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ছোট ব্যবসায়ী, দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক, নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষকে কঠিন সময় পার করতে হয়েছে।

অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন, ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন, আবার কেউ নতুনভাবে শুরু করার সাহস পেয়েছেন। অনলাইন ব্যবসা, হোম ডেলিভারি, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার প্রসার নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

শিক্ষাক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। অনলাইন শিক্ষার অভিজ্ঞতা আমাদের প্রযুক্তির গুরুত্ব বুঝিয়েছে, আবার এটিও দেখিয়েছে যে প্রযুক্তির সুবিধা সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের সুযোগের পার্থক্য, ডিভাইস ও ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতা—সবই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

অর্থাৎ করোনা শুধু পুরোনো ব্যবস্থাকে থামিয়ে দেয়নি; অনেক ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাও সামনে নিয়ে এসেছে।

আমরা কি সত্যিই আগের চেয়ে ভালো আছি?

আজ আমরা আবার ব্যস্ত। অফিসে যাচ্ছি, সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছি, ব্যবসা করছি, কেনাকাটা করছি, ভ্রমণ করছি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, পৃথিবী তার পুরোনো ছন্দ ফিরে পেয়েছে।

কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায়, আমাদের জীবনযাপনের ধরন বদলেছে। আমরা স্বাস্থ্য নিয়ে বেশি সচেতন, প্রযুক্তির ওপর বেশি নির্ভরশীল, ভবিষ্যৎ নিয়ে কখনো বেশি সতর্ক, আবার কখনো আগের চেয়ে বেশি অস্থির।

করোনা আমাদের শিখিয়েছে মৃত্যুর অনিবার্যতা, কিন্তু আমরা কি জীবনকে আরও ভালোভাবে ভালোবাসতে শিখেছি? আমরা বুঝেছি সম্পর্কের মূল্য, কিন্তু সেই সম্পর্কগুলোকে সময় দিচ্ছি তো? আমরা মানবিকতার কথা বলেছি, কিন্তু অন্যের বিপদে আজও কি একইভাবে পাশে দাঁড়াই?

হয়তো এই প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রত্যেকের কাছে আলাদা।

শেষ পর্যন্ত, কী রয়ে গেল?

সময় এগিয়ে গেছে। মহামারির ভয়াবহ দিনগুলো পেছনে পড়ে আছে। কিন্তু সেই সময়ের স্মৃতি, হারানোর বেদনা, বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং নতুন করে শুরু করার গল্পগুলো এখনো আমাদের জীবনের অংশ।

করোনার আগে আমরা হয়তো অনেক কিছু পেয়েও তার মূল্য বুঝিনি। করোনার সময় অনেক কিছু হারিয়ে বুঝেছি, আসলে কী কী আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। আর করোনার পরে প্রযুক্তি, নতুন অভ্যাস ও পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখেছি।

আমরা পেয়েছি প্রযুক্তির গতি, কাজের নতুন সুযোগ, কিছু নতুন দক্ষতা এবং জীবনের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। আবার হারিয়েছি অসংখ্য জীবন, স্বাভাবিকতার নিশ্চিন্ত অনুভূতি, অনেক সম্পর্কের উষ্ণতা এবং জীবনের এমন কিছু মুহূর্ত, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।

মানুষ বেঁচে থাকলে বদলায়—কখনো সময়ের কারণে, কখনো অভিজ্ঞতার কারণে, কখনো পরিস্থিতির নির্মম বাস্তবতায়। করোনা আমাদেরও বদলেছে। কিন্তু সেই বদল কতটা ইতিবাচক, কতটা নেতিবাচক, আর কতটা আমাদের নিজেদের হাতে তৈরি—সেই হিসাব এখনো বাকি।

আজ তাই প্রশ্নটি শুধু করোনার আগে ও পরে পৃথিবী কতটা বদলেছে, তা নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর—

আমরা কী হারিয়েছি, কী পেয়েছি? আমরা কি শুধু আধুনিক হয়েছি, নাকি আরও মানবিকও হয়েছি? পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনেছি, কিন্তু মানুষের হাতটা কি আগের মতোই ধরে রাখতে পেরেছি?

হয়তো সময়ের কাছে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পাওয়াই আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

কারণ পৃথিবী বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলাবে। কিন্তু এই পরিবর্তনের ভিড়ে মানুষ যেন মানুষকে ভুলে না যায়—সেটুকুই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল