আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থান ও অপরাধ দমনের বার্তা দিতে গিয়ে সম্প্রতি পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার’ করার মন্তব্য দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর ২০২৬) রাজধানীর চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া এই বক্তব্যের পর মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যদিও পরবর্তীতে পুলিশ সদর দফতর থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যে, আইজিপি আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে আক্ষরিক অর্থে এই শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং এর মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যা বোঝানো হয়নি—তবুও এই মন্তব্য ঘিরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মানবাধিকারের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে চলে এসেছে।
সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিকের আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে। অপরাধ দমনে রাষ্ট্রের ভূমিকা সবসময় প্রচলিত আইন এবং বিচারিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ শব্দটি সাধারণ মানুষের কাছে এক দীর্ঘ ট্রমা ও বিচারহীনতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ২০০৪ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে র্যাব ও পুলিশের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের যে অভিযোগগুলো উঠেছিল, তার বহু প্রামাণিক দলিল দেশি-বিদেশে নথিভুক্ত হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভূমিকার বিষয়টি উঠে এসেছে। এছাড়া ২০২৫ সালের জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতরের অনুসন্ধানেও বিগত আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগের তথ্য উঠে আসায় বর্তমান সময়ে এমন মন্তব্য জনমনে নতুন করে ভীতির সঞ্চার করেছে।
আইজিপির এই বক্তব্যের পর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। টিটিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান একে ‘অপরিণামদর্শী ও বিপজ্জনক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যার বৈধতা খোঁজা আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি ছাড়া কিছু নয়। আসকের মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল করিম জানান, একজন দায়িত্বশীল পুলিশপ্রধানের কাছ থেকে এমন বক্তব্য কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয় এবং তা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পেশাগত নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অন্যদিকে, অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন যে, শুধু বলপ্রয়োগ বা কঠোরতার মাধ্যমে অপরাধ নির্মূল সম্ভব নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ মনে করেন, অপরাধীদের পাশাপাশি তাদের আশ্রয়দাতা ও মদদদাতাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি। এছাড়া সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকও উল্লেখ করেছেন যে, অভিযুক্ত ব্যক্তির যত বড় অপরাধই থাক না কেন, প্রচলিত বিচারব্যবস্থা ও সংশোধিত হওয়ার অধিকার তার রয়েছে। অতীতের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতিতে ফিরে না গিয়ে, প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মাধ্যমেই কেবল টেকসই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থান ও অপরাধ দমনের বার্তা দিতে গিয়ে সম্প্রতি পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার’ করার মন্তব্য দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর ২০২৬) রাজধানীর চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া এই বক্তব্যের পর মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যদিও পরবর্তীতে পুলিশ সদর দফতর থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যে, আইজিপি আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে আক্ষরিক অর্থে এই শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং এর মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যা বোঝানো হয়নি—তবুও এই মন্তব্য ঘিরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মানবাধিকারের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে চলে এসেছে।
সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিকের আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে। অপরাধ দমনে রাষ্ট্রের ভূমিকা সবসময় প্রচলিত আইন এবং বিচারিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ শব্দটি সাধারণ মানুষের কাছে এক দীর্ঘ ট্রমা ও বিচারহীনতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ২০০৪ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে র্যাব ও পুলিশের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের যে অভিযোগগুলো উঠেছিল, তার বহু প্রামাণিক দলিল দেশি-বিদেশে নথিভুক্ত হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভূমিকার বিষয়টি উঠে এসেছে। এছাড়া ২০২৫ সালের জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতরের অনুসন্ধানেও বিগত আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগের তথ্য উঠে আসায় বর্তমান সময়ে এমন মন্তব্য জনমনে নতুন করে ভীতির সঞ্চার করেছে।
আইজিপির এই বক্তব্যের পর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। টিটিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান একে ‘অপরিণামদর্শী ও বিপজ্জনক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যার বৈধতা খোঁজা আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি ছাড়া কিছু নয়। আসকের মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল করিম জানান, একজন দায়িত্বশীল পুলিশপ্রধানের কাছ থেকে এমন বক্তব্য কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয় এবং তা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পেশাগত নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অন্যদিকে, অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন যে, শুধু বলপ্রয়োগ বা কঠোরতার মাধ্যমে অপরাধ নির্মূল সম্ভব নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ মনে করেন, অপরাধীদের পাশাপাশি তাদের আশ্রয়দাতা ও মদদদাতাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি। এছাড়া সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকও উল্লেখ করেছেন যে, অভিযুক্ত ব্যক্তির যত বড় অপরাধই থাক না কেন, প্রচলিত বিচারব্যবস্থা ও সংশোধিত হওয়ার অধিকার তার রয়েছে। অতীতের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতিতে ফিরে না গিয়ে, প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মাধ্যমেই কেবল টেকসই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

আপনার মতামত লিখুন