দিকপাল

শারদীয় দুর্গাপূজার দিনগুলোতে একদিকে থাকে মৃদু গরম, আবার শেষ রাতের দিকে অনুভূত হয় হালকা হিমেল পরশ। পাশাপাশি মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে অঞ্জলি দেওয়া, প্রিয়জনদের সাথে আড্ডা এবং আরতির আয়োজনে অংশ নেওয়ার জন্য পোশাকে চাই সৌন্দর্য ও স্বাচ্ছন্দ্যের মেলবন্ধন।

শরতের শুভ্রতায় ঢাকের বাদ্য: পোশাক আর খাবারের রঙে বাংলাদেশের দুর্গাপূজা


অভিলাষ মাহমুদ
অভিলাষ মাহমুদ সাব-এডিটর
প্রকাশ : শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০৯ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

শরতের শুভ্রতায় ঢাকের বাদ্য: পোশাক আর খাবারের রঙে বাংলাদেশের দুর্গাপূজা

শরতের আকাশজুড়ে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘের আনাগোনা, ভোরের ঘাসে শিউলির শুভ্রতা আর নদীর ধারে নদীর হাওয়ায় কাসফুলের দোলাচল—প্রকৃতি যেন নিজের হাতে ক্যানভাস সাজিয়ে ঘোষণা করে দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা। আশ্বিন ও কার্তিকের এই সময়টায় বাংলায় নেমে আসে এক অনাবিল আনন্দের উৎসব। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা হলেও বাংলাদেশে এর আবেদন বহুমাত্রিক। এটি কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডিতে আটকে থাকে না; বরং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক সর্বজনীন উৎসব, সামাজিক সম্প্রীতি এবং পারিবারিক মিলনের মহাসম্মেলনে পরিণত হয়। 

মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জলদগম্ভীর কণ্ঠে চণ্ডীপাঠের সুর দিয়ে যে উৎসবের সূচনা, মহাসপ্তমী থেকে বিজয়াদশমীর সিঁদুরখেলা পর্যন্ত তার প্রতিটি দিনই মুখরিত থাকে আনন্দে। চারপাশের এই কোলাহল আর আলোকের ঝরনাধারায় নিজেদের সাজিয়ে তোলা এবং আপ্যায়নে বিশেষ খাবারের আয়োজন উৎসবের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অক্টোবর বা আশ্বিনের মাঝামাঝি এই সময়ে বাংলাদেশের আবহাওয়া, পূজার ঘনঘটা এবং বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরে দেখার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পোশাক ও খাদ্যাভ্যাসে কিছুটা পরিকল্পনা থাকলে পূজা হয়ে ওঠে যেমন আনন্দময়, তেমনই স্বাচ্ছন্দ্যময়।

আবহাওয়া ও আচারের মেলবন্ধনে শারদীয় পোশাক

শারদীয় দুর্গাপূজার দিনগুলোতে একদিকে থাকে মৃদু গরম, আবার শেষ রাতের দিকে অনুভূত হয় হালকা হিমেল পরশ। পাশাপাশি মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে অঞ্জলি দেওয়া, প্রিয়জনদের সাথে আড্ডা এবং আরতির আয়োজনে অংশ নেওয়ার জন্য পোশাকে চাই সৌন্দর্য ও স্বাচ্ছন্দ্যের মেলবন্ধন।

ষষ্ঠী থেকে নবমী: সকাল ও সন্ধ্যার সাজ

সকালের অঞ্জলির সাজ: সকালের পূজা ও অঞ্জলির সময় আবহাওয়া কিছুটা গরম থাকে, আর পরিবেশ থাকে স্নিগ্ধ। তাই সুতি (Cotton), জামদানি, তাঁত কিংবা লিনেনের মতো হালকা ও আরামদায়ক কাপড়ের পোশাক বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। নারীদের ক্ষেত্রে বাসন্তী, হালকা হলুদ, ঘি-রঙা কিংবা পেস্টাল শেডের সুতি বা জামদানি শাড়ি পরিবেশের সাথে চমৎকার মানিয়ে যায়। পুরুষেরা বেছে নিতে পারেন সুতি সালোয়ার-কামিজ, হালকা কুর্তা কিংবা শার্ট-প্যান্ট।

বিকেলের মণ্ডপ দর্শন ও সন্ধ্যার আরতি: বিকেল নামতেই উৎসবের আবহ জমকালো রূপ নেয়। ধূপের ধোঁয়া, কাঁসার ঘণ্টার শব্দ আর ঢাকের শব্দে মণ্ডপ প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে। এই সময়ে রেশম বা সিল্ক, কাঞ্জিভরম, হাফ-সিল্ক কিংবা চণ্দেরি শাড়িতে নিজেদের সাজাতে পারেন নারীরা। ঐতিহ্যবাহী লাল-সাদা শাড়ির কদর সব সময়ই অনন্য। পুরুষদের জন্য ধুতি-পাঞ্জাবি, জ্যাকেট-কুর্তা কিংবা সিল্কের রাজকীয় পাঞ্জাবি উৎসবের জৌলুস বাড়িয়ে দেয়।

বিজয়াদশমীর ঐতিহ্যবাহী সাজ

পূজার শেষ দিন অর্থাৎ বিজয়াদশমীতে পোশাকে থাকে ঐতিহ্য আর আবেগের ছোঁয়া। সিঁদুরখেলা ও প্রতিমা বিসর্জনের এই ক্ষণে নারীদের প্রধান পছন্দ লাল-পাড় সাদা শাড়ি, গোরদের শাড়ি কিংবা লাল-সাদা কম্বিনেশনের লেহেঙ্গা বা সালওয়ার স্যুট। হাতে শাঁখা-পোলা আর কপালে লাল টিপ বাঙালির সনাতনী রূপকে যেন পূর্ণতা দেয়। পুরুষদের ক্ষেত্রেও ধুতি-পাঞ্জাবির ধ্রুপদী সাজই এই দিনের প্রধান আকর্ষণ।

পোশাকের টিপস: দীর্ঘ সময় হেঁটে মণ্ডপ দেখার পরিকল্পনা থাকলে আঁটসাঁট পোশাক ও অতিরিক্ত ভারী গয়না এড়িয়ে চলাই ভালো। বিশেষ করে জুতো নির্বাচনের ক্ষেত্রে ফ্যাশনের পাশাপাশি স্বাচ্ছন্দ্যের কথা মাথায় রাখা জরুরি।

পূজার ভোজ ও স্বাদের উৎসব

পূজার আমেজ খাবারের আয়োজন ছাড়া একেবারেই অসম্পূর্ণ। বাংলাদেশে দুর্গাপূজা মানেই ঘরোয়া রান্নাবান্নার ঘ্রাণ, মণ্ডপের প্রসাদ এবং আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের বাড়িতে ভুড়িভোজের দাওয়াত। মহাঅষ্টমীর নিরামিষ থেকে শুরু করে দশমীর আমিষ ভোজ—প্রতিটি দিনের খাবারেই থাকে বিশেষ বৈচিত্র্য।

মহাপ্রসাদ ও অষ্টমীর নিরামিষ

মহাসপ্তমী ও মহাঅষ্টমীর দিনগুলোতে থাকে মহাপ্রসাদের বিশেষ আয়োজন। মন্দিরে মন্দিরে পরিবেশন করা হয় খিচুড়ি ভোগ, সঙ্গে বাহারি সবজির লাবড়া, পাঁচমিশালি তরকারি, বেগুন ভাজা, চাটনি ও পায়েস। বাড়িতেও এই দিনগুলোতে সম্পূর্ণ নিরামিষ পদ রান্না হয়। বিশেষ করে সকালে গরম গরম ফুলকো লুচি, নারকেল দিয়ে ছোলার ডাল কিংবা কাশ্মীরি আলুর দম বাঙালি সনাতনীদের ঘরে ঘরে এক চিরচেনা দৃশ্য।

নবমী ও দশমীর রাজকীয় আমিষ ভোজ

মহানবমী ও বিজয়াদশমীতে বাঙালির রসনা বিলাস পৌঁছায় চূড়ান্ত শিখরে। অনেক বাড়িতেই এই দিনগুলোতে ঐতিহ্যবাহী আমিষ রান্নার ধুম পড়ে:

১. কচি পাঠার ঝোল: সরষের তেলে মাখানো মশলা দিয়ে ধিমে আঁচে রান্না করা কচি পাঠার ঝোল নবমীর দুপুরের ভোজের প্রধান আকর্ষণ।

২. ইলিশ ও গলদা চিংড়ির পদ: সর্ষে ইলিশ, ইলিশ ভাপা, কিংবা ডাবের ভিতর চিংড়ি রান্নার স্বাদ পূজার আবহকে আরও রাজকীয় করে তোলে।

৩. ভেটকি পাতুড়ি: কলাপাতা পেঁচিয়ে ভাপে রান্না করা সর্ষে-পোস্ত মাখানো ভেটকি পাতুড়ি উৎসবের মেনুতে এনে দেয় অনন্য স্বাদ।

মিষ্টিমুখ ও বিজয়ার কোলাকুলি

বিজয়াদশমীতে দেবী বিসর্জনের পর শুরু হয় পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় ও ছোটদের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেওয়ার পালা। মিষ্টিমুখ ছাড়া এই পর্ব পূর্ণ হয় না। ঘরোয়াভাবে তৈরি হয় নারকেল নাড়ু, তিলের নাড়ু, মুড়ির মোয়া, ছানার সন্দেশ, জিলিপি, রসগোল্লা এবং খাজা। বিজয়ার শুভেচ্ছা জানাতে মিষ্টির সাথে নিমকি, ঘুরঘুরা বা নানা ধরণের নোনতা পদ পরিবেশন করার ঐতিহ্যও সমানভাবে জনপ্রিয়।

সামাজিক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

বাংলাদেশের দুর্গাপূজার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এর অসাম্প্রদায়িক চেতনা। মণ্ডপে আলো ঝলমলে সান্ধ্যকালীন আরতি দেখতে এবং ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, সিলেট কিংবা খুলনার পূজা মণ্ডপগুলোতে সব ধর্মের মানুষ একত্র হন। ঢাকের তালে নাচ, মেলায় ঘুরে কেনাকাটা এবং প্রসাদ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা বাঙালির নিজস্ব সম্প্রীতি।

শরতের এই মহোৎসব কেবল পঞ্জিকার একটি বিশেষ সময় নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, শিল্পবোধ এবং একতাবদ্ধ থাকার এক অনন্য মাধ্যম। পোশাকের স্নিগ্ধতা, সুস্বাদু খাবারের তৃপ্তি এবং আন্তরিক সম্পর্কের উষ্ণতায় প্রতি বছর শারদীয় দুর্গাপূজা আমাদের জীবনে নিয়ে আসে নতুন আনন্দের বার্তা, যা হিংসা-দ্বেষ ভুলে মানুষকে একসূত্রে গেঁথে রাখে।

বিষয় : শরতের শুভ্রতায় ঢাকের বাদ্য, পোশাক আর খাবারের রঙে বাংলাদেশের দুর্গাপূজা,

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬


শরতের শুভ্রতায় ঢাকের বাদ্য: পোশাক আর খাবারের রঙে বাংলাদেশের দুর্গাপূজা

প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

শরতের আকাশজুড়ে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘের আনাগোনা, ভোরের ঘাসে শিউলির শুভ্রতা আর নদীর ধারে নদীর হাওয়ায় কাসফুলের দোলাচল—প্রকৃতি যেন নিজের হাতে ক্যানভাস সাজিয়ে ঘোষণা করে দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা। আশ্বিন ও কার্তিকের এই সময়টায় বাংলায় নেমে আসে এক অনাবিল আনন্দের উৎসব। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা হলেও বাংলাদেশে এর আবেদন বহুমাত্রিক। এটি কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডিতে আটকে থাকে না; বরং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক সর্বজনীন উৎসব, সামাজিক সম্প্রীতি এবং পারিবারিক মিলনের মহাসম্মেলনে পরিণত হয়। 

মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জলদগম্ভীর কণ্ঠে চণ্ডীপাঠের সুর দিয়ে যে উৎসবের সূচনা, মহাসপ্তমী থেকে বিজয়াদশমীর সিঁদুরখেলা পর্যন্ত তার প্রতিটি দিনই মুখরিত থাকে আনন্দে। চারপাশের এই কোলাহল আর আলোকের ঝরনাধারায় নিজেদের সাজিয়ে তোলা এবং আপ্যায়নে বিশেষ খাবারের আয়োজন উৎসবের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অক্টোবর বা আশ্বিনের মাঝামাঝি এই সময়ে বাংলাদেশের আবহাওয়া, পূজার ঘনঘটা এবং বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরে দেখার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পোশাক ও খাদ্যাভ্যাসে কিছুটা পরিকল্পনা থাকলে পূজা হয়ে ওঠে যেমন আনন্দময়, তেমনই স্বাচ্ছন্দ্যময়।

আবহাওয়া ও আচারের মেলবন্ধনে শারদীয় পোশাক

শারদীয় দুর্গাপূজার দিনগুলোতে একদিকে থাকে মৃদু গরম, আবার শেষ রাতের দিকে অনুভূত হয় হালকা হিমেল পরশ। পাশাপাশি মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে অঞ্জলি দেওয়া, প্রিয়জনদের সাথে আড্ডা এবং আরতির আয়োজনে অংশ নেওয়ার জন্য পোশাকে চাই সৌন্দর্য ও স্বাচ্ছন্দ্যের মেলবন্ধন।

ষষ্ঠী থেকে নবমী: সকাল ও সন্ধ্যার সাজ

সকালের অঞ্জলির সাজ: সকালের পূজা ও অঞ্জলির সময় আবহাওয়া কিছুটা গরম থাকে, আর পরিবেশ থাকে স্নিগ্ধ। তাই সুতি (Cotton), জামদানি, তাঁত কিংবা লিনেনের মতো হালকা ও আরামদায়ক কাপড়ের পোশাক বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। নারীদের ক্ষেত্রে বাসন্তী, হালকা হলুদ, ঘি-রঙা কিংবা পেস্টাল শেডের সুতি বা জামদানি শাড়ি পরিবেশের সাথে চমৎকার মানিয়ে যায়। পুরুষেরা বেছে নিতে পারেন সুতি সালোয়ার-কামিজ, হালকা কুর্তা কিংবা শার্ট-প্যান্ট।

বিকেলের মণ্ডপ দর্শন ও সন্ধ্যার আরতি: বিকেল নামতেই উৎসবের আবহ জমকালো রূপ নেয়। ধূপের ধোঁয়া, কাঁসার ঘণ্টার শব্দ আর ঢাকের শব্দে মণ্ডপ প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে। এই সময়ে রেশম বা সিল্ক, কাঞ্জিভরম, হাফ-সিল্ক কিংবা চণ্দেরি শাড়িতে নিজেদের সাজাতে পারেন নারীরা। ঐতিহ্যবাহী লাল-সাদা শাড়ির কদর সব সময়ই অনন্য। পুরুষদের জন্য ধুতি-পাঞ্জাবি, জ্যাকেট-কুর্তা কিংবা সিল্কের রাজকীয় পাঞ্জাবি উৎসবের জৌলুস বাড়িয়ে দেয়।

বিজয়াদশমীর ঐতিহ্যবাহী সাজ

পূজার শেষ দিন অর্থাৎ বিজয়াদশমীতে পোশাকে থাকে ঐতিহ্য আর আবেগের ছোঁয়া। সিঁদুরখেলা ও প্রতিমা বিসর্জনের এই ক্ষণে নারীদের প্রধান পছন্দ লাল-পাড় সাদা শাড়ি, গোরদের শাড়ি কিংবা লাল-সাদা কম্বিনেশনের লেহেঙ্গা বা সালওয়ার স্যুট। হাতে শাঁখা-পোলা আর কপালে লাল টিপ বাঙালির সনাতনী রূপকে যেন পূর্ণতা দেয়। পুরুষদের ক্ষেত্রেও ধুতি-পাঞ্জাবির ধ্রুপদী সাজই এই দিনের প্রধান আকর্ষণ।

পোশাকের টিপস: দীর্ঘ সময় হেঁটে মণ্ডপ দেখার পরিকল্পনা থাকলে আঁটসাঁট পোশাক ও অতিরিক্ত ভারী গয়না এড়িয়ে চলাই ভালো। বিশেষ করে জুতো নির্বাচনের ক্ষেত্রে ফ্যাশনের পাশাপাশি স্বাচ্ছন্দ্যের কথা মাথায় রাখা জরুরি।

পূজার ভোজ ও স্বাদের উৎসব

পূজার আমেজ খাবারের আয়োজন ছাড়া একেবারেই অসম্পূর্ণ। বাংলাদেশে দুর্গাপূজা মানেই ঘরোয়া রান্নাবান্নার ঘ্রাণ, মণ্ডপের প্রসাদ এবং আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের বাড়িতে ভুড়িভোজের দাওয়াত। মহাঅষ্টমীর নিরামিষ থেকে শুরু করে দশমীর আমিষ ভোজ—প্রতিটি দিনের খাবারেই থাকে বিশেষ বৈচিত্র্য।

মহাপ্রসাদ ও অষ্টমীর নিরামিষ

মহাসপ্তমী ও মহাঅষ্টমীর দিনগুলোতে থাকে মহাপ্রসাদের বিশেষ আয়োজন। মন্দিরে মন্দিরে পরিবেশন করা হয় খিচুড়ি ভোগ, সঙ্গে বাহারি সবজির লাবড়া, পাঁচমিশালি তরকারি, বেগুন ভাজা, চাটনি ও পায়েস। বাড়িতেও এই দিনগুলোতে সম্পূর্ণ নিরামিষ পদ রান্না হয়। বিশেষ করে সকালে গরম গরম ফুলকো লুচি, নারকেল দিয়ে ছোলার ডাল কিংবা কাশ্মীরি আলুর দম বাঙালি সনাতনীদের ঘরে ঘরে এক চিরচেনা দৃশ্য।

নবমী ও দশমীর রাজকীয় আমিষ ভোজ

মহানবমী ও বিজয়াদশমীতে বাঙালির রসনা বিলাস পৌঁছায় চূড়ান্ত শিখরে। অনেক বাড়িতেই এই দিনগুলোতে ঐতিহ্যবাহী আমিষ রান্নার ধুম পড়ে:

১. কচি পাঠার ঝোল: সরষের তেলে মাখানো মশলা দিয়ে ধিমে আঁচে রান্না করা কচি পাঠার ঝোল নবমীর দুপুরের ভোজের প্রধান আকর্ষণ।

২. ইলিশ ও গলদা চিংড়ির পদ: সর্ষে ইলিশ, ইলিশ ভাপা, কিংবা ডাবের ভিতর চিংড়ি রান্নার স্বাদ পূজার আবহকে আরও রাজকীয় করে তোলে।

৩. ভেটকি পাতুড়ি: কলাপাতা পেঁচিয়ে ভাপে রান্না করা সর্ষে-পোস্ত মাখানো ভেটকি পাতুড়ি উৎসবের মেনুতে এনে দেয় অনন্য স্বাদ।

মিষ্টিমুখ ও বিজয়ার কোলাকুলি

বিজয়াদশমীতে দেবী বিসর্জনের পর শুরু হয় পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় ও ছোটদের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেওয়ার পালা। মিষ্টিমুখ ছাড়া এই পর্ব পূর্ণ হয় না। ঘরোয়াভাবে তৈরি হয় নারকেল নাড়ু, তিলের নাড়ু, মুড়ির মোয়া, ছানার সন্দেশ, জিলিপি, রসগোল্লা এবং খাজা। বিজয়ার শুভেচ্ছা জানাতে মিষ্টির সাথে নিমকি, ঘুরঘুরা বা নানা ধরণের নোনতা পদ পরিবেশন করার ঐতিহ্যও সমানভাবে জনপ্রিয়।

সামাজিক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

বাংলাদেশের দুর্গাপূজার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এর অসাম্প্রদায়িক চেতনা। মণ্ডপে আলো ঝলমলে সান্ধ্যকালীন আরতি দেখতে এবং ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, সিলেট কিংবা খুলনার পূজা মণ্ডপগুলোতে সব ধর্মের মানুষ একত্র হন। ঢাকের তালে নাচ, মেলায় ঘুরে কেনাকাটা এবং প্রসাদ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা বাঙালির নিজস্ব সম্প্রীতি।

শরতের এই মহোৎসব কেবল পঞ্জিকার একটি বিশেষ সময় নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, শিল্পবোধ এবং একতাবদ্ধ থাকার এক অনন্য মাধ্যম। পোশাকের স্নিগ্ধতা, সুস্বাদু খাবারের তৃপ্তি এবং আন্তরিক সম্পর্কের উষ্ণতায় প্রতি বছর শারদীয় দুর্গাপূজা আমাদের জীবনে নিয়ে আসে নতুন আনন্দের বার্তা, যা হিংসা-দ্বেষ ভুলে মানুষকে একসূত্রে গেঁথে রাখে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল