আশ্চর্য!
রাহিল দাঁড়িয়ে আছে একটা পুরানো আমলের কাঠের জাহাজে। অনেকটা মুভিতে দেখা সমুদ্রের বুকে পাল তোলা বড় জলদস্যুদের জাহাজের মতো। উপরে বিস্তৃত খোলা নীল আকাশ। দূরে খানিক মেঘ দেখা যাচ্ছে। নিচে সমুদ্রের নীল জলরাশি আর উঁচু উঁচু ঢেউ।
আশ্চর্য এই জন্য যে এখানে তার থাকার কথা না। সে কি কোথাও বেড়াতে এসেছে? কার সাথেই বা এসেছে? আশেপাশের কাউকে তার চেনা মনে হচ্ছে না। বরং সবার চেহারা আর পোশাক দুটোই বিচিত্র, ভিনদেশি। মনে হচ্ছে এটা যেন কোনো শুটিংয়ের সেট। ভারী অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত সেনাদের যুদ্ধ জাহাজের শুটিং।
রাহিল স্মৃতি হাতড়ে মনে করার চেষ্টা করে। যতদূর মনে পড়ে, সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর সে চুপিচুপি বাবার স্টাডি রুমে আসে। যা আসলে ঠিক স্টাডি রুমও না, দুইটা বড় বুকশেলফ সহ বাসার দ্বিতীয় লিভিং রুম।
রাহিলের বয়স এবার দশ হবে। সে বই পড়তে পছন্দ করে। তাই যখন রাতে ঘুম আসছিল না তখন টুলের ওপর দাঁড়িয়ে শেলফের উপরের তাক থেকে অনেক কষ্টে বাইজেন্টাইন সভ্যতার ওপর একটা বই বের করে সে। যদিও সেটা ছিল বড়দের, লেখাগুলোও কঠিন। তাই সে পাতা উল্টে অস্ত্র ও অন্যান্য ব্যবহার্য জিনিসের হাতে আঁকা ছবি দেখছিল আর হেডলাইন পড়ছিল। । আপাতত শুধু এটুকুই মনে পড়ছে তার।
একজন সৈনিকের ধাক্কায় সম্বিত ফিরে পায় সে। তাকে খেতে ডাকছে। কি যেন একটা অচেনা ভাষায় কথা বলছে আশেপাশের মানুষেরা কিন্তু সে ঠিকই বুঝতে পারছে।
সৈনিক ভদ্রলোক হাঁটতে হাঁটতে এমনভাবে গল্প করছেন দেখে মনে হচ্ছে, তারা দুজন বন্ধু। রাহিল এবার নিজের দিকে তাকায়। নিজেকে ভালো করে দেখার পর সে নিশ্চিত হয়ে যায় এটা কোনো শুটিংয়ের সেট না। এবং সময়কাল আর যাই হোক বর্তমান না।
এই জাহাজে, সে একজন পূর্ণবয়স্ক সৈনিক। যুদ্ধের পোশাক তার গায়ে। সাথে আছে কোমরের বেল্টে ঝুলানো দুই দিকে ধারওয়ালা লম্বা তলোয়ার। অনেকগুলো তামার আংটা জোড়া দিলে যেমন হয়, সেরকম বর্ম পড়ে আছে সে। পায়ে চামড়ার জুতা না বলে পা-ঢাকা বা পা-বাঁধা বললে ঠিক থাকবে। যদিও তা এখনকার চামড়ার ব্যাগ বা জুতার মতো মসৃন নয়। কি সাংঘাতিক! সে কি স্বপ্ন দেখছে? যেটাই হোক, একটুও ভয় পায় না সে। বরং উত্তেজনা বোধ করে, সাথে খানিকটা গর্বও।
হাঁটতে হাঁটতে তারা জাহাজের ভেতরে সিঁড়ি দিয়ে একতলা নিচে নেমে বড় ডাইনিং হলে চলে এসেছে। ডাইনিং হল হলেও এখানে কোনো টেবিল বা চেয়ার নেই। রুমের এক মাথায় সৈনিকের পোশাক পড়া মোটা-বড়সড় এক লোক লাইনে অপেক্ষারত সৈনিকদের এক এক করে সবার হাতে থাকা পাত্রে চারটা মোটা থ্যাবড়ানো রুটি, মাংস আর জাউয়ের মতো একপ্রকার ঘন তরল বাটিতে করে ঢেলে দিচ্ছেন। খাবার হলের পরিবেশটা উৎসবের মতো। কিছু সৈনিক খাবার পেয়ে খুশিতে হল্লা করছে, ‘ভেড়া, ভেড়া’ বলে। বোঝা গেল ভেড়ার মাংস তাদের কাছে লোভনীয় খাবার।
হলের মেঝেতে বসে অল্প একটু মাংস ছিড়ে মুখে দিয়ে স্বাদটা বোঝার চেষ্টা করলো রাহিল। মাংস যদিও শুকনো, মশলাপাতি তেমন নেই, তবু ভালো লাগলো খেতে। রুটি কোনোমতে একটা খেতে পারলো। আর জাউটা একদমই স্বাদহীন মনে হলো তার কাছে। গমের নরম সিদ্ধ আস্ত দানাগুলো জিহ্বায় লাগতেই চিনতে পারলো। তবে এতে সম্ভবত চাল নেই, শুধু গম আর সবজি আছে। রাহিলের মা গম দিয়ে প্রায়ই বাসায় হালিম বানান, তাই সে গমের স্বাদ আর টেক্সচারের সাথে পরিচিত।
মায়ের কথা মনে পড়তেই বুকটা কেমন করে উঠলো রাহিলের, যেন অনেকদিন দেখেনি।
খাবার শেষ করে দুজন ডেক-এ এসে দাঁড়ালো। চারদিকে আরও একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখলো রাহিল। সবাই হাঁটা-চলা, গল্প-গুজব, হাসাহাসি করছে।
নাহ্, কোনোভাবেই পরিবেশটা যুদ্ধের বলে মনে হচ্ছে না।
এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন সৈন্যের মাঝখানে চেয়ারে এক ভদ্রলোক বসে আছেন। তাঁর পোশাকটা ঠিক সৈন্যদের মতো নয়। দামি পরিধেয় এবং বিভিন্ন অলংকার দেখে মনে হচ্ছে ভদ্রলোক উঁচু পদমর্যাদার কেউ। তাঁর ঠিক পাশেই মেঝেতে রাখা পাঁচটা বিশাল সিন্দুক।
পাশে দাঁড়ানো বন্ধুর কাছে কৌশলে জাহাজের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেই যে উত্তর আসলো তা এরকম।
কিছুদিন আগেই বুলগারদের কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে, শান্তির বার্তা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সম্রাট চতুর্থ কনস্ট্যানটাইন। তাই বুলগারদের উদ্দেশ্যে শান্তির বার্তা নিয়ে রওনা দিয়েছে এই জাহাজ। নেতৃত্বে আছেন সম্রাটের বিশ্বাসভাজন একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সিন্দুকে থাকা মহামূল্যবান সোনা, রূপার অলঙ্কার, ঝুড়ি ভর্তি নাশপাতি, ডুমুর ফল এবং কাঠের ব্যারেলে গম ও অন্যান্য শস্য সবই উপহার হিসেবে পাঠানো হচ্ছে।
এবার বিষয়টা বুঝতে পারে রাহিল। সেই সাথে এসবকিছু দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে যত ভাবছে ততই সে ভেতরে ভেতরে একটা রোমাঞ্চ অনুভব করছে। কখন যে বাবাকে সবকিছু বলতে পারবে!
আজকের এখানে আসাটা অনেকটা টাইম ট্রাভেলের মতো মনে হচ্ছে তার কাছে। যদিও রাহিল জানে না, আদৌ ফিরতে পারবে কি না। তবে ফিরে যেতে পারলে সে অবশ্যই জানার চেষ্টা করবে চতুর্থ কনস্ট্যানটাইন বলে সত্যিই কোনো সম্রাট ছিলেন কি না? থাকলে, তিনি কোন সময়ের মানুষ ছিলেন? এবং সত্যিই কি শান্তির বার্তা পাঠানো হয়েছিল?
তারপর সবগুলো তথ্য মিলিয়ে দেখবে, বইয়ের সাথে এবং গুগলেও।
পাটাতনে বসে এসব ভাবতে ভাবতে আকাশ ভারী, কালো মেঘে ঢেকে গেছে। জাহাজের সবাই মিলে একধরনের চিৎকার, হইচই করছে যা সত্যিই ভয়ের।
সৈনিকরা ছোটাছুটি করে পাটাতনে থাকা সিন্দুকগুলো জাহাজের নিচতলায় নিয়ে গেল। কয়েকজন দৌড়াদৌড়ি করে পালের রশি খুলে দিল যেন বাতাসের তোড়ে জাহাজ ভারসাম্য না হারায়। অন্যরা, যা কিছু ভারী জিনিস আছে তা ধরাধরি করে পানিতে ফেলে দিতে লাগলো।
রাহিলও অপেক্ষা না করে এগিয়ে গেল তাদের সাহায্যে। শুধু সম্রাটের উপহার ছাড়া আর প্রায় সবকিছুই ফেলে দেয়া হলো পানিতে। সে এক হুলুস্থুল অবস্থা। তাদের প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছে কোনো মহা দুর্যোগ ঘটতে চলেছে।
দেখতে দেখতে প্রচণ্ড ঝড়ের তোড়ে খেলনার মতো সামনে-পেছনে দুলছে ওদের জাহাজটা। যা কিছু ছোটখাটো জিনিস ফেলা হয়নি, সেসব গড়াগড়ি খাচ্ছে পাটাতনে। রাহিলের মনের অবস্থা অনেকটা ঝড়ের কবলে পড়া জাহাজের মতোই। জাহাজটা পুরোপুরি উল্টে যেতেই রাহিলও অন্য সৈনিকদের সাথে উন্মত্ত সমুদ্রের বুকে আছড়ে পড়লো। তলিয়ে যেতে থাকলো সমুদ্রের গভীরে।
দূরে পানির মধ্যে আলোকবর্তিকার মতো কেউ একজন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে হলো। কাছে আসতেই সে বাবাকে চিনতে পারে। রাহিলকে কোলে করে কোনোমতে পানির ওপরের দিকে ওঠার চেষ্টা করছেন তিনি। প্রথমে মনে হয় অনেক দূর থেকে কেউ চিৎকার করছে। ধীরে ধীরে কানের কাছে মায়ের কণ্ঠস্বর পরিষ্কার শুনতে পায় সে। আরো কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারে, বাবা তাকে মেঝে থেকে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে। ভাগ্যিস!
পরের দিন স্কুলে যাওয়ার সময় রাহিল বাবাকে বলে, ‘জানো বাবা কাল কোথায় গিয়েছিলাম?’
‘না, এখন সেসব শুনতে চাইনা। সামনে তোমার ফাইনাল পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত পাঠ্য বইয়ের বাইরে সবকিছু বন্ধ।’
রাহিল ‘কিন্তু বাবা’- বলতেই বাবা গাড়ির ড্যাশবোর্ডে থাকা রেডিও চালু করে দেন।
‘ক্রোয়েশিয়ার কাছে সমুদ্রের তলদেশে পাওয়া গেছে এমন একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ যাকে এযাবৎকালের বাইজেনটাইন সাাম্রাজ্যের সপ্তম শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বলে মনে করছেন প্রত্নতত্তবিদেরা। জাহাজে পাওয়া গেছে মুক্তা, রুবি খচিত সোনা ও রূপার অলঙ্কার, সাম্রাজ্যের উচ্চপদস্থ গুরুত্বপূর্ণ পদধারী ব্যক্তির সিল সহ আংটি এবং আরও অন্যান্য মহামূল্যবান জিনিস।……..’

বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬
আশ্চর্য!
রাহিল দাঁড়িয়ে আছে একটা পুরানো আমলের কাঠের জাহাজে। অনেকটা মুভিতে দেখা সমুদ্রের বুকে পাল তোলা বড় জলদস্যুদের জাহাজের মতো। উপরে বিস্তৃত খোলা নীল আকাশ। দূরে খানিক মেঘ দেখা যাচ্ছে। নিচে সমুদ্রের নীল জলরাশি আর উঁচু উঁচু ঢেউ।
আশ্চর্য এই জন্য যে এখানে তার থাকার কথা না। সে কি কোথাও বেড়াতে এসেছে? কার সাথেই বা এসেছে? আশেপাশের কাউকে তার চেনা মনে হচ্ছে না। বরং সবার চেহারা আর পোশাক দুটোই বিচিত্র, ভিনদেশি। মনে হচ্ছে এটা যেন কোনো শুটিংয়ের সেট। ভারী অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত সেনাদের যুদ্ধ জাহাজের শুটিং।
রাহিল স্মৃতি হাতড়ে মনে করার চেষ্টা করে। যতদূর মনে পড়ে, সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর সে চুপিচুপি বাবার স্টাডি রুমে আসে। যা আসলে ঠিক স্টাডি রুমও না, দুইটা বড় বুকশেলফ সহ বাসার দ্বিতীয় লিভিং রুম।
রাহিলের বয়স এবার দশ হবে। সে বই পড়তে পছন্দ করে। তাই যখন রাতে ঘুম আসছিল না তখন টুলের ওপর দাঁড়িয়ে শেলফের উপরের তাক থেকে অনেক কষ্টে বাইজেন্টাইন সভ্যতার ওপর একটা বই বের করে সে। যদিও সেটা ছিল বড়দের, লেখাগুলোও কঠিন। তাই সে পাতা উল্টে অস্ত্র ও অন্যান্য ব্যবহার্য জিনিসের হাতে আঁকা ছবি দেখছিল আর হেডলাইন পড়ছিল। । আপাতত শুধু এটুকুই মনে পড়ছে তার।
একজন সৈনিকের ধাক্কায় সম্বিত ফিরে পায় সে। তাকে খেতে ডাকছে। কি যেন একটা অচেনা ভাষায় কথা বলছে আশেপাশের মানুষেরা কিন্তু সে ঠিকই বুঝতে পারছে।
সৈনিক ভদ্রলোক হাঁটতে হাঁটতে এমনভাবে গল্প করছেন দেখে মনে হচ্ছে, তারা দুজন বন্ধু। রাহিল এবার নিজের দিকে তাকায়। নিজেকে ভালো করে দেখার পর সে নিশ্চিত হয়ে যায় এটা কোনো শুটিংয়ের সেট না। এবং সময়কাল আর যাই হোক বর্তমান না।
এই জাহাজে, সে একজন পূর্ণবয়স্ক সৈনিক। যুদ্ধের পোশাক তার গায়ে। সাথে আছে কোমরের বেল্টে ঝুলানো দুই দিকে ধারওয়ালা লম্বা তলোয়ার। অনেকগুলো তামার আংটা জোড়া দিলে যেমন হয়, সেরকম বর্ম পড়ে আছে সে। পায়ে চামড়ার জুতা না বলে পা-ঢাকা বা পা-বাঁধা বললে ঠিক থাকবে। যদিও তা এখনকার চামড়ার ব্যাগ বা জুতার মতো মসৃন নয়। কি সাংঘাতিক! সে কি স্বপ্ন দেখছে? যেটাই হোক, একটুও ভয় পায় না সে। বরং উত্তেজনা বোধ করে, সাথে খানিকটা গর্বও।
হাঁটতে হাঁটতে তারা জাহাজের ভেতরে সিঁড়ি দিয়ে একতলা নিচে নেমে বড় ডাইনিং হলে চলে এসেছে। ডাইনিং হল হলেও এখানে কোনো টেবিল বা চেয়ার নেই। রুমের এক মাথায় সৈনিকের পোশাক পড়া মোটা-বড়সড় এক লোক লাইনে অপেক্ষারত সৈনিকদের এক এক করে সবার হাতে থাকা পাত্রে চারটা মোটা থ্যাবড়ানো রুটি, মাংস আর জাউয়ের মতো একপ্রকার ঘন তরল বাটিতে করে ঢেলে দিচ্ছেন। খাবার হলের পরিবেশটা উৎসবের মতো। কিছু সৈনিক খাবার পেয়ে খুশিতে হল্লা করছে, ‘ভেড়া, ভেড়া’ বলে। বোঝা গেল ভেড়ার মাংস তাদের কাছে লোভনীয় খাবার।
হলের মেঝেতে বসে অল্প একটু মাংস ছিড়ে মুখে দিয়ে স্বাদটা বোঝার চেষ্টা করলো রাহিল। মাংস যদিও শুকনো, মশলাপাতি তেমন নেই, তবু ভালো লাগলো খেতে। রুটি কোনোমতে একটা খেতে পারলো। আর জাউটা একদমই স্বাদহীন মনে হলো তার কাছে। গমের নরম সিদ্ধ আস্ত দানাগুলো জিহ্বায় লাগতেই চিনতে পারলো। তবে এতে সম্ভবত চাল নেই, শুধু গম আর সবজি আছে। রাহিলের মা গম দিয়ে প্রায়ই বাসায় হালিম বানান, তাই সে গমের স্বাদ আর টেক্সচারের সাথে পরিচিত।
মায়ের কথা মনে পড়তেই বুকটা কেমন করে উঠলো রাহিলের, যেন অনেকদিন দেখেনি।
খাবার শেষ করে দুজন ডেক-এ এসে দাঁড়ালো। চারদিকে আরও একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখলো রাহিল। সবাই হাঁটা-চলা, গল্প-গুজব, হাসাহাসি করছে।
নাহ্, কোনোভাবেই পরিবেশটা যুদ্ধের বলে মনে হচ্ছে না।
এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন সৈন্যের মাঝখানে চেয়ারে এক ভদ্রলোক বসে আছেন। তাঁর পোশাকটা ঠিক সৈন্যদের মতো নয়। দামি পরিধেয় এবং বিভিন্ন অলংকার দেখে মনে হচ্ছে ভদ্রলোক উঁচু পদমর্যাদার কেউ। তাঁর ঠিক পাশেই মেঝেতে রাখা পাঁচটা বিশাল সিন্দুক।
পাশে দাঁড়ানো বন্ধুর কাছে কৌশলে জাহাজের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেই যে উত্তর আসলো তা এরকম।
কিছুদিন আগেই বুলগারদের কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে, শান্তির বার্তা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সম্রাট চতুর্থ কনস্ট্যানটাইন। তাই বুলগারদের উদ্দেশ্যে শান্তির বার্তা নিয়ে রওনা দিয়েছে এই জাহাজ। নেতৃত্বে আছেন সম্রাটের বিশ্বাসভাজন একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সিন্দুকে থাকা মহামূল্যবান সোনা, রূপার অলঙ্কার, ঝুড়ি ভর্তি নাশপাতি, ডুমুর ফল এবং কাঠের ব্যারেলে গম ও অন্যান্য শস্য সবই উপহার হিসেবে পাঠানো হচ্ছে।
এবার বিষয়টা বুঝতে পারে রাহিল। সেই সাথে এসবকিছু দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে যত ভাবছে ততই সে ভেতরে ভেতরে একটা রোমাঞ্চ অনুভব করছে। কখন যে বাবাকে সবকিছু বলতে পারবে!
আজকের এখানে আসাটা অনেকটা টাইম ট্রাভেলের মতো মনে হচ্ছে তার কাছে। যদিও রাহিল জানে না, আদৌ ফিরতে পারবে কি না। তবে ফিরে যেতে পারলে সে অবশ্যই জানার চেষ্টা করবে চতুর্থ কনস্ট্যানটাইন বলে সত্যিই কোনো সম্রাট ছিলেন কি না? থাকলে, তিনি কোন সময়ের মানুষ ছিলেন? এবং সত্যিই কি শান্তির বার্তা পাঠানো হয়েছিল?
তারপর সবগুলো তথ্য মিলিয়ে দেখবে, বইয়ের সাথে এবং গুগলেও।
পাটাতনে বসে এসব ভাবতে ভাবতে আকাশ ভারী, কালো মেঘে ঢেকে গেছে। জাহাজের সবাই মিলে একধরনের চিৎকার, হইচই করছে যা সত্যিই ভয়ের।
সৈনিকরা ছোটাছুটি করে পাটাতনে থাকা সিন্দুকগুলো জাহাজের নিচতলায় নিয়ে গেল। কয়েকজন দৌড়াদৌড়ি করে পালের রশি খুলে দিল যেন বাতাসের তোড়ে জাহাজ ভারসাম্য না হারায়। অন্যরা, যা কিছু ভারী জিনিস আছে তা ধরাধরি করে পানিতে ফেলে দিতে লাগলো।
রাহিলও অপেক্ষা না করে এগিয়ে গেল তাদের সাহায্যে। শুধু সম্রাটের উপহার ছাড়া আর প্রায় সবকিছুই ফেলে দেয়া হলো পানিতে। সে এক হুলুস্থুল অবস্থা। তাদের প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছে কোনো মহা দুর্যোগ ঘটতে চলেছে।
দেখতে দেখতে প্রচণ্ড ঝড়ের তোড়ে খেলনার মতো সামনে-পেছনে দুলছে ওদের জাহাজটা। যা কিছু ছোটখাটো জিনিস ফেলা হয়নি, সেসব গড়াগড়ি খাচ্ছে পাটাতনে। রাহিলের মনের অবস্থা অনেকটা ঝড়ের কবলে পড়া জাহাজের মতোই। জাহাজটা পুরোপুরি উল্টে যেতেই রাহিলও অন্য সৈনিকদের সাথে উন্মত্ত সমুদ্রের বুকে আছড়ে পড়লো। তলিয়ে যেতে থাকলো সমুদ্রের গভীরে।
দূরে পানির মধ্যে আলোকবর্তিকার মতো কেউ একজন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে হলো। কাছে আসতেই সে বাবাকে চিনতে পারে। রাহিলকে কোলে করে কোনোমতে পানির ওপরের দিকে ওঠার চেষ্টা করছেন তিনি। প্রথমে মনে হয় অনেক দূর থেকে কেউ চিৎকার করছে। ধীরে ধীরে কানের কাছে মায়ের কণ্ঠস্বর পরিষ্কার শুনতে পায় সে। আরো কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারে, বাবা তাকে মেঝে থেকে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে। ভাগ্যিস!
পরের দিন স্কুলে যাওয়ার সময় রাহিল বাবাকে বলে, ‘জানো বাবা কাল কোথায় গিয়েছিলাম?’
‘না, এখন সেসব শুনতে চাইনা। সামনে তোমার ফাইনাল পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত পাঠ্য বইয়ের বাইরে সবকিছু বন্ধ।’
রাহিল ‘কিন্তু বাবা’- বলতেই বাবা গাড়ির ড্যাশবোর্ডে থাকা রেডিও চালু করে দেন।
‘ক্রোয়েশিয়ার কাছে সমুদ্রের তলদেশে পাওয়া গেছে এমন একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ যাকে এযাবৎকালের বাইজেনটাইন সাাম্রাজ্যের সপ্তম শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বলে মনে করছেন প্রত্নতত্তবিদেরা। জাহাজে পাওয়া গেছে মুক্তা, রুবি খচিত সোনা ও রূপার অলঙ্কার, সাম্রাজ্যের উচ্চপদস্থ গুরুত্বপূর্ণ পদধারী ব্যক্তির সিল সহ আংটি এবং আরও অন্যান্য মহামূল্যবান জিনিস।……..’

আপনার মতামত লিখুন