দিকপাল

এড. মোস্তফা নুর

গণসার্বভৌমত্ব কী এবং কেন?


প্রকাশ : শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৩৬ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

গণসার্বভৌমত্ব কী এবং কেন?

রাজনীতির মৌলিক শিক্ষা যাদের নেই, তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত হচ্ছে শুধু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও রাজনীতির মিথ্যা দোহাই দিয়ে।

এর ফলে চাটুকার, দলবাজ ও মূর্খরা মুখে মুখে শুধু গণতন্ত্রের কথা বলে নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু তারা গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটিও বোঝে না। এদের অধিকাংশই চরম অগণতান্ত্রিক, নেপোটিজমচর্চাকারী ও স্বেচ্ছাচারী একটি নেক্সাসের গোলাম।

এই গোলামরা জানে না, পৃথিবীতে গণতান্ত্রিক রাজনীতিরও একটি বৈজ্ঞানিক কাঠামো আছে। ফলে তারা অবিরাম রাজনীতিবিজ্ঞানের মৌলিক ধারণার বাইরে কথা বলতে থাকে।

এই মূর্খ পণ্ডিতেরা মনে করে, যে রাজনৈতিক দল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পায়, সেই রাজনৈতিক দলই নিজেকে সরকার ঘোষণা করে গণসার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করার ক্ষমতা অর্জন করে!

অথচ একটি সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সরকার কখনো সার্বভৌম নয়। রাজনৈতিক দলগুলো গণসার্বভৌমত্বের সঙ্গে বেইমানি করবে না—এই অঙ্গীকারেই জনগণের সামনে শপথ নেয় এবং নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এই অঙ্গীকার অপরিহার্য। কারণ, অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে জনগণের কাছে তাদের রাজনৈতিক বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

ফলে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার বৈধ মালিকানা জনগণের হাতে—এটিই গণসার্বভৌমত্ব। একটি রাষ্ট্রের প্রধান ভিত্তিগুলোর অন্যতম হলো গণসার্বভৌমত্ব। এই গণসার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করা মানে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিকেই অস্বীকার করা।

সকল রাজনৈতিক দল, অরাজনৈতিক সংগঠন এবং সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণকারী রাজনৈতিক দলকে রাজনৈতিক মৌলিক বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে চর্চা করতে হবে। নিজ নিজ দলের জনশক্তি ও সাধারণ জনগণের মধ্যে এসব মৌলিক রাজনৈতিক ধারণা অবিরাম আলোচনা, শিক্ষা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে হবে। এর মধ্য দিয়েই জাতীয় ঐক্য ও সংহতি গড়ে তোলার কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করা সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে সরকার পরিচালনাকারী রাজনৈতিক দল এবং সরকারের চাটুকারদের মনে রাখা উচিত—সরকারকে সার্বভৌম শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কোনো রাজনীতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। কারণ সরকার জনগণের কাছ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়; জনগণের ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা পায় না।

যে ধরনের রাজনীতি পরিবারতন্ত্র, লুটতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, সেই ঘুণে ধরা পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়ে গণসার্বভৌমত্বভিত্তিক একটি কার্যকর রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে না পারলে বাংলাদেশের সামনে প্রকৃত মুক্তির পথ তৈরি হবে না। তাই পুরোনো লুটেরাতন্ত্রের প্রতিভূ এবং সুবিধাবাদী অপশক্তির প্রভাববলয় চূর্ণ-বিচূর্ণ করে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির নতুন ভিত্তি নির্মাণ করতে হবে।

গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংজ্ঞা লুটেরা ও সুবিধাবাদী চটকদারদের মুখ থেকে শোনার সময় নেই। এই বৈষম্যবাদী অপশক্তিগুলো অনেক সময় বিশেষ সুবিধাবাদী ‘সুশীল সমাজ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তাদের ভূমিকা, অবস্থান ও স্বার্থের প্রশ্নে জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে।

কোনো রাজনৈতিক শক্তি বা গোষ্ঠীকে অন্ধভাবে গ্রহণ বা বর্জন না করে তাদের কর্মকাণ্ড, বক্তব্য, নীতি ও জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিচার করেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ, গণতন্ত্র ও গণসার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার মূল শর্ত হলো জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা, সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান এবং রাষ্ট্রক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

গণসার্বভৌমত্বের মূল কথা খুব সরল—রাষ্ট্র জনগণের, রাষ্ট্রের ক্ষমতার বৈধ উৎস জনগণ এবং সরকার জনগণের অর্পিত দায়িত্ব পালনকারী প্রতিষ্ঠান। এই মৌলিক সত্য যতদিন রাজনৈতিক সংস্কৃতির কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও জনগণের অধিকার সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।


লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক ও নজরুল গবেষক।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬


গণসার্বভৌমত্ব কী এবং কেন?

প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

রাজনীতির মৌলিক শিক্ষা যাদের নেই, তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত হচ্ছে শুধু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও রাজনীতির মিথ্যা দোহাই দিয়ে।

এর ফলে চাটুকার, দলবাজ ও মূর্খরা মুখে মুখে শুধু গণতন্ত্রের কথা বলে নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু তারা গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটিও বোঝে না। এদের অধিকাংশই চরম অগণতান্ত্রিক, নেপোটিজমচর্চাকারী ও স্বেচ্ছাচারী একটি নেক্সাসের গোলাম।

এই গোলামরা জানে না, পৃথিবীতে গণতান্ত্রিক রাজনীতিরও একটি বৈজ্ঞানিক কাঠামো আছে। ফলে তারা অবিরাম রাজনীতিবিজ্ঞানের মৌলিক ধারণার বাইরে কথা বলতে থাকে।

এই মূর্খ পণ্ডিতেরা মনে করে, যে রাজনৈতিক দল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পায়, সেই রাজনৈতিক দলই নিজেকে সরকার ঘোষণা করে গণসার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করার ক্ষমতা অর্জন করে!

অথচ একটি সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সরকার কখনো সার্বভৌম নয়। রাজনৈতিক দলগুলো গণসার্বভৌমত্বের সঙ্গে বেইমানি করবে না—এই অঙ্গীকারেই জনগণের সামনে শপথ নেয় এবং নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এই অঙ্গীকার অপরিহার্য। কারণ, অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে জনগণের কাছে তাদের রাজনৈতিক বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

ফলে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার বৈধ মালিকানা জনগণের হাতে—এটিই গণসার্বভৌমত্ব। একটি রাষ্ট্রের প্রধান ভিত্তিগুলোর অন্যতম হলো গণসার্বভৌমত্ব। এই গণসার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করা মানে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিকেই অস্বীকার করা।

সকল রাজনৈতিক দল, অরাজনৈতিক সংগঠন এবং সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণকারী রাজনৈতিক দলকে রাজনৈতিক মৌলিক বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে চর্চা করতে হবে। নিজ নিজ দলের জনশক্তি ও সাধারণ জনগণের মধ্যে এসব মৌলিক রাজনৈতিক ধারণা অবিরাম আলোচনা, শিক্ষা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে হবে। এর মধ্য দিয়েই জাতীয় ঐক্য ও সংহতি গড়ে তোলার কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করা সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে সরকার পরিচালনাকারী রাজনৈতিক দল এবং সরকারের চাটুকারদের মনে রাখা উচিত—সরকারকে সার্বভৌম শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কোনো রাজনীতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। কারণ সরকার জনগণের কাছ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়; জনগণের ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা পায় না।

যে ধরনের রাজনীতি পরিবারতন্ত্র, লুটতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, সেই ঘুণে ধরা পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়ে গণসার্বভৌমত্বভিত্তিক একটি কার্যকর রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে না পারলে বাংলাদেশের সামনে প্রকৃত মুক্তির পথ তৈরি হবে না। তাই পুরোনো লুটেরাতন্ত্রের প্রতিভূ এবং সুবিধাবাদী অপশক্তির প্রভাববলয় চূর্ণ-বিচূর্ণ করে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির নতুন ভিত্তি নির্মাণ করতে হবে।

গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংজ্ঞা লুটেরা ও সুবিধাবাদী চটকদারদের মুখ থেকে শোনার সময় নেই। এই বৈষম্যবাদী অপশক্তিগুলো অনেক সময় বিশেষ সুবিধাবাদী ‘সুশীল সমাজ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তাদের ভূমিকা, অবস্থান ও স্বার্থের প্রশ্নে জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে।

কোনো রাজনৈতিক শক্তি বা গোষ্ঠীকে অন্ধভাবে গ্রহণ বা বর্জন না করে তাদের কর্মকাণ্ড, বক্তব্য, নীতি ও জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিচার করেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ, গণতন্ত্র ও গণসার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার মূল শর্ত হলো জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা, সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান এবং রাষ্ট্রক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

গণসার্বভৌমত্বের মূল কথা খুব সরল—রাষ্ট্র জনগণের, রাষ্ট্রের ক্ষমতার বৈধ উৎস জনগণ এবং সরকার জনগণের অর্পিত দায়িত্ব পালনকারী প্রতিষ্ঠান। এই মৌলিক সত্য যতদিন রাজনৈতিক সংস্কৃতির কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও জনগণের অধিকার সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।


লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক ও নজরুল গবেষক।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল