রাজধানীর গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে সিসা লাউঞ্জগুলোর কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে আসলেও থেমে নেই এর অবৈধ ব্যবসা। লাউঞ্জ বন্ধ হওয়ায় কৌশল বদলে এখন পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক হয়ে উঠেছে এই মাদক কারবার। অনলাইনে অর্ডার নিয়ে কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে লাখ টাকার হুক্কা ও সিসার দামি দামি ফ্লেভার। সম্প্রতি দেশের ইতিহাসে সিসার সবচেয়ে বড় চালান জব্দ এবং একটি অনলাইন চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। অভিযানে মোট ৬৬ কেজি সিসা ও ৪১টি হুক্কা জব্দ করা হয়েছে।
গত ২ জুলাই রাজধানীর ভাটারা ও গুলশানের কালাচাঁদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে সিসা বিক্রির দুটি অনলাইন চক্রের মূল হোতাসহ ৩ জনকে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—ইরানি বংশোদ্ভূত বাংলাদেশি যমজ সহোদর আহমেদ শরিফি ও মেহদাদ শরিফি এবং অন্য চক্রের মাকসুদ আলম। তদন্তে জানা যায়, ইরানি দুই ভাইয়ের বাবা ব্যবসার সুবাদে বাংলাদেশে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। দুই ভাই নিয়মিত ইরানে যাতায়াত করতেন এবং সেখান থেকেই সিসার ব্যবসার ধারণা নিয়ে দেশে এসে অনলাইনে এই কারবার শুরু করেন। অন্যদিকে, গ্রেপ্তার মাকসুদ আলম বনানীর বিভিন্ন সিসা লাউঞ্জে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। সেখান থেকেই বাজারের চাহিদা বুঝতে পেরে প্রথমে বিভিন্ন লাউঞ্জে এবং পরবর্তীতে অনলাইনে সিসা ও হুক্কা সরবরাহ শুরু করেন। এই দুই চক্রের আরও অন্তত পাঁচ সদস্য বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে, যাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, চক্র দুটি দুবাই থেকে ‘লাগেজ পার্টি’-র মাধ্যমে বিভিন্ন মডেলের দামী হুক্কা দেশে এনে বাসায় মজুত রাখত। ২০ হাজার থেকে শুরু করে ১ লাখ টাকা মূল্যের হুক্কা এবং প্রায় লাখ টাকা দামের বিভিন্ন ফ্লেভার (সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ভ্যানিলা, মিন্ট ও ডাবল অ্যাপেল) তাদের কালেকশনে থাকত। অনলাইনে অর্ডার পাওয়ার পর তারা অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করত এবং কুরিয়ার সার্ভিসে পার্সেল করে ক্রেতার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিত। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, মৌলভীবাজার, নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, নরসিংদী ও ফরিদপুরসহ দেশের অন্তত ১৫টি জেলায় তারা সিসা সরবরাহ করেছে। ব্যক্তি পর্যায়ের ক্রেতা ছাড়াও বিভিন্ন সিসা লাউঞ্জ ও পাঁচতারকা হোটেলেও তাদের নিয়মিত সাপ্লাই ছিল। গ্রেপ্তারকৃতদের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে ইতিমধ্যেই ৩০০ জন ক্রেতাকে শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে অর্ধশতই দেশের ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান।
আইন অনুযায়ী, ০.২ শতাংশের বেশি নিকোটিনযুক্ত সিসা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং মাদক হিসেবে গণ্য। ডিএনসির রাসায়নিক পরীক্ষাগারে এ পর্যন্ত পরীক্ষা করা কোনো সিসার নমুনাতেই ০.২ শতাংশের নিচে নিকোটিন পাওয়া যায়নি; অর্থাৎ দেশে বিক্রি হওয়া সিসা মূলত মারাত্মক মাদক। অনেকের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে সিসা সিগারেটের চেয়ে কম ক্ষতিকর, যা দেশে এর বিস্তার বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সিসা সেবনে ফুসফুস, মূত্রথলি ও পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে। এটি হৃদরোগের আশঙ্কা বাড়ায় এবং লিভারের কার্যকারিতা ব্যাহত করাসহ কিডনি বিকল করে দিতে পারে। এছাড়া আলো-আঁধারির পরিবেশে একই হুক্কা বা পাইপ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করার ফলে যক্ষ্মা ও হেপাটাইটিসের মতো মারাত্মক সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ডিএনসির ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ের উপ-পরিচালক শামীম আহম্মেদ জানান, লাউঞ্জগুলো বন্ধ হওয়ায় অনেক ক্রেতা অনলাইনে ঝুঁকছেন এবং কুরিয়ারের মাধ্যমে এই মাদকের বিস্তার ঘটছে। এসব অনলাইন চক্রকে পুরোপুরি নির্মূল করতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কঠোর নজরদারি ও চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুলাই ২০২৬
রাজধানীর গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে সিসা লাউঞ্জগুলোর কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে আসলেও থেমে নেই এর অবৈধ ব্যবসা। লাউঞ্জ বন্ধ হওয়ায় কৌশল বদলে এখন পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক হয়ে উঠেছে এই মাদক কারবার। অনলাইনে অর্ডার নিয়ে কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে লাখ টাকার হুক্কা ও সিসার দামি দামি ফ্লেভার। সম্প্রতি দেশের ইতিহাসে সিসার সবচেয়ে বড় চালান জব্দ এবং একটি অনলাইন চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। অভিযানে মোট ৬৬ কেজি সিসা ও ৪১টি হুক্কা জব্দ করা হয়েছে।
গত ২ জুলাই রাজধানীর ভাটারা ও গুলশানের কালাচাঁদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে সিসা বিক্রির দুটি অনলাইন চক্রের মূল হোতাসহ ৩ জনকে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—ইরানি বংশোদ্ভূত বাংলাদেশি যমজ সহোদর আহমেদ শরিফি ও মেহদাদ শরিফি এবং অন্য চক্রের মাকসুদ আলম। তদন্তে জানা যায়, ইরানি দুই ভাইয়ের বাবা ব্যবসার সুবাদে বাংলাদেশে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। দুই ভাই নিয়মিত ইরানে যাতায়াত করতেন এবং সেখান থেকেই সিসার ব্যবসার ধারণা নিয়ে দেশে এসে অনলাইনে এই কারবার শুরু করেন। অন্যদিকে, গ্রেপ্তার মাকসুদ আলম বনানীর বিভিন্ন সিসা লাউঞ্জে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। সেখান থেকেই বাজারের চাহিদা বুঝতে পেরে প্রথমে বিভিন্ন লাউঞ্জে এবং পরবর্তীতে অনলাইনে সিসা ও হুক্কা সরবরাহ শুরু করেন। এই দুই চক্রের আরও অন্তত পাঁচ সদস্য বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে, যাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, চক্র দুটি দুবাই থেকে ‘লাগেজ পার্টি’-র মাধ্যমে বিভিন্ন মডেলের দামী হুক্কা দেশে এনে বাসায় মজুত রাখত। ২০ হাজার থেকে শুরু করে ১ লাখ টাকা মূল্যের হুক্কা এবং প্রায় লাখ টাকা দামের বিভিন্ন ফ্লেভার (সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ভ্যানিলা, মিন্ট ও ডাবল অ্যাপেল) তাদের কালেকশনে থাকত। অনলাইনে অর্ডার পাওয়ার পর তারা অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করত এবং কুরিয়ার সার্ভিসে পার্সেল করে ক্রেতার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিত। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, মৌলভীবাজার, নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, নরসিংদী ও ফরিদপুরসহ দেশের অন্তত ১৫টি জেলায় তারা সিসা সরবরাহ করেছে। ব্যক্তি পর্যায়ের ক্রেতা ছাড়াও বিভিন্ন সিসা লাউঞ্জ ও পাঁচতারকা হোটেলেও তাদের নিয়মিত সাপ্লাই ছিল। গ্রেপ্তারকৃতদের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে ইতিমধ্যেই ৩০০ জন ক্রেতাকে শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে অর্ধশতই দেশের ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান।
আইন অনুযায়ী, ০.২ শতাংশের বেশি নিকোটিনযুক্ত সিসা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং মাদক হিসেবে গণ্য। ডিএনসির রাসায়নিক পরীক্ষাগারে এ পর্যন্ত পরীক্ষা করা কোনো সিসার নমুনাতেই ০.২ শতাংশের নিচে নিকোটিন পাওয়া যায়নি; অর্থাৎ দেশে বিক্রি হওয়া সিসা মূলত মারাত্মক মাদক। অনেকের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে সিসা সিগারেটের চেয়ে কম ক্ষতিকর, যা দেশে এর বিস্তার বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সিসা সেবনে ফুসফুস, মূত্রথলি ও পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে। এটি হৃদরোগের আশঙ্কা বাড়ায় এবং লিভারের কার্যকারিতা ব্যাহত করাসহ কিডনি বিকল করে দিতে পারে। এছাড়া আলো-আঁধারির পরিবেশে একই হুক্কা বা পাইপ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করার ফলে যক্ষ্মা ও হেপাটাইটিসের মতো মারাত্মক সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ডিএনসির ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ের উপ-পরিচালক শামীম আহম্মেদ জানান, লাউঞ্জগুলো বন্ধ হওয়ায় অনেক ক্রেতা অনলাইনে ঝুঁকছেন এবং কুরিয়ারের মাধ্যমে এই মাদকের বিস্তার ঘটছে। এসব অনলাইন চক্রকে পুরোপুরি নির্মূল করতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কঠোর নজরদারি ও চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন