উক্রেনের ওপর রাশিয়ার সাম্প্রতিক ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রেক্ষাপটে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তুরস্কের ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন। এই সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি ইউক্রেনের আকাশসীমা সুরক্ষায় মিত্রদেশগুলোর কাছে জরুরি ভিত্তিতে অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের জন্য জোর দাবি জানাবেন।
তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় মঙ্গল ও বুধবার (৭ ও ৮ জুলাই) অনুষ্ঠিতব্য এই ন্যাটো সম্মেলনটি জেলেনস্কির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে দু-দুটি বড় ধরনের রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৫০ জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর জেলেনস্কির এই সহায়তার আবেদন আরও জোরালো রূপ নিয়েছে।
আঙ্কারার এই সম্মেলনে জেলেনস্কির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে জেলেনস্কি ট্রাম্পের কাছে যুক্তি তুলে ধরবেন যে রাশিয়ার এই ‘নিষ্ঠুর’ হামলা মূলত তাদের শক্তির নয়, বরং দুর্বলতার লক্ষণ। একই সঙ্গে ভ্লাদিমির পুতিনকে একটি ‘মর্যাদাপূর্ণ’ শান্তি আলোচনার টেবিলে বসাতে রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানাবেন তিনি।
রাশিয়ার এই তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পেছনে ইউক্রেনের নিজস্ব একটি সফল সামরিক কৌশল কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা ব্যাপক বৃদ্ধি করেছে। ইউক্রেনীয় ড্রোনের আঘাতে রাশিয়ার বেশ কয়েকটি তেল শোধনাগার এবং সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে রাশিয়ায় ব্যাপক জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানিয়েছেন, রাতারাতি কিয়েভ থেকে মস্কোর দিকে ধেয়ে আসা ৪৩০টি ড্রোনের ‘অধিকাংশই’ রুশ প্রতিরক্ষা বাহিনী ভূপাতিত করেছে। তবে এই সফল ড্রোন হামলার বিপরীতে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ইউক্রেন চরম হিমশিম খাচ্ছে। গত সোমবারের রুশ হামলায় ইউক্রেনীয় বাহিনী প্রায় সব ড্রোন ধ্বংস করতে পারলেও একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ঠেকাতে পারেনি। কয়েক হাজার কিলোমিটার গতিসম্পন্ন এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করার জন্য ইউক্রেনের কাছে মার্কিন তৈরি ‘প্যাট্রিয়ট’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
এক ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আজকের আধুনিক বিশ্বে ব্যালিস্টিক সন্ত্রাস থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বৃদ্ধি না করাটা অত্যন্ত অনভিপ্রেত।” তিনি ইউরোপীয় মিত্রদের গুদামে মজুত থাকা প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইউক্রেনের হাতে তুলে দেওয়ার আহ্বান জানান।
বর্তমানে বিশ্বজুড়েই প্যাট্রিয়ট সিস্টেমের সংকট রয়েছে। তাই ন্যাটো দেশগুলোর সহায়তায় ইউক্রেন এখন নিজস্ব প্রযুক্তিতে এর সমমানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে।
বছরের পর বছর ধরে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালানোর পর, এখন রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনীয় ড্রোন আঘাত হানায় মস্কো একে ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে অ্যাখ্যা দিচ্ছে। তবে জেলেনস্কি একে রাশিয়ার ওপর একটি ‘প্রভাব অভিযান’ হিসেবে দেখছেন, যার উদ্দেশ্য পুতিনকে কিয়েভের শর্ত মেনে শান্তি আলোচনায় বাধ্য করা।
ইউক্রেনের এই সফল ড্রোন হামলা এখন সীমান্ত ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সেন্ট পিটার্সবার্গের তেল টার্মিনাল এবং মস্কোর শোধনাগারের পর এবার সীমান্ত থেকে ২,৫০০ কিলোমিটার দূরে সাইবেরিয়ার ওমস্ক শহরের একটি তেল শোধনাগারেও সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এছাড়া ২০১৪ সালে রাশিয়ার সংযুক্ত করা ক্রিমিয়া উপদ্বীপেও এখন প্রায় প্রতিদিন ইউক্রেনীয় ড্রোন আঘাত হানছে, যার ফলে সেখানে বিদ্যুৎ ও খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
পুতিনের দাবি ছিল তিনি রাশিয়াকে নব্বইয়ের দশকের বিশৃঙ্খলা থেকে উদ্ধার করেছেন, অথচ এখন খোদ মস্কোতেই ড্রোন হামলা এবং জ্বালানি রেশনিংয়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জেলেনস্কি ন্যাটো ও ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন যে ইউক্রেন যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। কিয়েভ চায় আগামী শীতকাল শুরু হওয়ার আগেই ‘শক্তি অথবা কূটনীতির’ মাধ্যমে এই যুদ্ধের দ্রুত অবসান ঘটাতে। তবে এর জন্য তাদের প্রথম প্রয়োজন আকাশ সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র।

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬
উক্রেনের ওপর রাশিয়ার সাম্প্রতিক ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রেক্ষাপটে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তুরস্কের ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন। এই সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি ইউক্রেনের আকাশসীমা সুরক্ষায় মিত্রদেশগুলোর কাছে জরুরি ভিত্তিতে অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের জন্য জোর দাবি জানাবেন।
তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় মঙ্গল ও বুধবার (৭ ও ৮ জুলাই) অনুষ্ঠিতব্য এই ন্যাটো সম্মেলনটি জেলেনস্কির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে দু-দুটি বড় ধরনের রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৫০ জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর জেলেনস্কির এই সহায়তার আবেদন আরও জোরালো রূপ নিয়েছে।
আঙ্কারার এই সম্মেলনে জেলেনস্কির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে জেলেনস্কি ট্রাম্পের কাছে যুক্তি তুলে ধরবেন যে রাশিয়ার এই ‘নিষ্ঠুর’ হামলা মূলত তাদের শক্তির নয়, বরং দুর্বলতার লক্ষণ। একই সঙ্গে ভ্লাদিমির পুতিনকে একটি ‘মর্যাদাপূর্ণ’ শান্তি আলোচনার টেবিলে বসাতে রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানাবেন তিনি।
রাশিয়ার এই তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পেছনে ইউক্রেনের নিজস্ব একটি সফল সামরিক কৌশল কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা ব্যাপক বৃদ্ধি করেছে। ইউক্রেনীয় ড্রোনের আঘাতে রাশিয়ার বেশ কয়েকটি তেল শোধনাগার এবং সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে রাশিয়ায় ব্যাপক জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানিয়েছেন, রাতারাতি কিয়েভ থেকে মস্কোর দিকে ধেয়ে আসা ৪৩০টি ড্রোনের ‘অধিকাংশই’ রুশ প্রতিরক্ষা বাহিনী ভূপাতিত করেছে। তবে এই সফল ড্রোন হামলার বিপরীতে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ইউক্রেন চরম হিমশিম খাচ্ছে। গত সোমবারের রুশ হামলায় ইউক্রেনীয় বাহিনী প্রায় সব ড্রোন ধ্বংস করতে পারলেও একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ঠেকাতে পারেনি। কয়েক হাজার কিলোমিটার গতিসম্পন্ন এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করার জন্য ইউক্রেনের কাছে মার্কিন তৈরি ‘প্যাট্রিয়ট’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
এক ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আজকের আধুনিক বিশ্বে ব্যালিস্টিক সন্ত্রাস থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বৃদ্ধি না করাটা অত্যন্ত অনভিপ্রেত।” তিনি ইউরোপীয় মিত্রদের গুদামে মজুত থাকা প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইউক্রেনের হাতে তুলে দেওয়ার আহ্বান জানান।
বর্তমানে বিশ্বজুড়েই প্যাট্রিয়ট সিস্টেমের সংকট রয়েছে। তাই ন্যাটো দেশগুলোর সহায়তায় ইউক্রেন এখন নিজস্ব প্রযুক্তিতে এর সমমানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে।
বছরের পর বছর ধরে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালানোর পর, এখন রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনীয় ড্রোন আঘাত হানায় মস্কো একে ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে অ্যাখ্যা দিচ্ছে। তবে জেলেনস্কি একে রাশিয়ার ওপর একটি ‘প্রভাব অভিযান’ হিসেবে দেখছেন, যার উদ্দেশ্য পুতিনকে কিয়েভের শর্ত মেনে শান্তি আলোচনায় বাধ্য করা।
ইউক্রেনের এই সফল ড্রোন হামলা এখন সীমান্ত ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সেন্ট পিটার্সবার্গের তেল টার্মিনাল এবং মস্কোর শোধনাগারের পর এবার সীমান্ত থেকে ২,৫০০ কিলোমিটার দূরে সাইবেরিয়ার ওমস্ক শহরের একটি তেল শোধনাগারেও সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এছাড়া ২০১৪ সালে রাশিয়ার সংযুক্ত করা ক্রিমিয়া উপদ্বীপেও এখন প্রায় প্রতিদিন ইউক্রেনীয় ড্রোন আঘাত হানছে, যার ফলে সেখানে বিদ্যুৎ ও খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
পুতিনের দাবি ছিল তিনি রাশিয়াকে নব্বইয়ের দশকের বিশৃঙ্খলা থেকে উদ্ধার করেছেন, অথচ এখন খোদ মস্কোতেই ড্রোন হামলা এবং জ্বালানি রেশনিংয়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জেলেনস্কি ন্যাটো ও ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন যে ইউক্রেন যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। কিয়েভ চায় আগামী শীতকাল শুরু হওয়ার আগেই ‘শক্তি অথবা কূটনীতির’ মাধ্যমে এই যুদ্ধের দ্রুত অবসান ঘটাতে। তবে এর জন্য তাদের প্রথম প্রয়োজন আকাশ সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র।

আপনার মতামত লিখুন