রাজধানী ঢাকায় যথাযথ অনুমোদন না নিয়ে কিংবা নকশা চরমভাবে লঙ্ঘন করে গড়ে ওঠা হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে এবার কঠোর অ্যাকশনে নামছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনে গড়ে ওঠা এসব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি। রাজউকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রাথমিক যাচাইয়ে যেসব হাসপাতাল ভবন নিরাপত্তার দিক থেকে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হবে, আইন অনুযায়ী সেগুলোর কার্যক্রম সরাসরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি সামান্য ও সংশোধনযোগ্য, সেগুলোকে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে নিয়মের আওতায় আনা হবে।
রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, যেকোনো ভবন নির্মাণের সময় এর ব্যবহারিক অনুমোদন (আবাসিক নাকি বাণিজ্যিক) নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও রাজধানীর একটি বড় অংশের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক এই নিয়ম মানছে না। কোথাও সাধারণ আবাসিক ভবনে নিবিড় বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, আবার কোথাও শপিং মল বা অন্য কাজের জন্য অনুমোদিত ভবনে হাসপাতাল পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া বহুতল হাসপাতাল ভবনে বাধ্যতামূলক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সিঁড়ি এবং জরুরি বহির্গমন পথ (ইমার্জেন্সি এক্সিট) না রেখে রোগীদের জীবনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে।
রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম এ বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, হাসপাতাল যেহেতু মানুষের জীবন রক্ষার জায়গা, তাই সেখানে নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রাণহানির ঝুঁকি থাকলে তা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। প্রাথমিকভাবে রাজধানীর সব হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেসব হাসপাতালে অগ্নি ও ভূমিকম্প নিরাপত্তা নিশ্চিত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় খোলা জায়গা আছে, সেগুলোকে নীতিমালার আওতায় এনে পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে। তবে নিরাপত্তাজনিত বড় ধরনের ব্যত্যয় বা গাফিলতির ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, রাজধানীতে বর্তমানে কতটি হাসপাতাল রাজউকের রাজকীয় অনুমোদন নিয়ে চলছে কিংবা কতটিতে নকশাগত জালিয়াতি রয়েছে—তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যভাণ্ডার বা ডেটাবেজ রাজউকের কাছে নেই। ফলে প্রথমবারের মতো একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি গত ২৭ মে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার পর হাসপাতালটির ভবন পরিদর্শনে গিয়ে রাজউক একাধিক ভয়াবহ অনিয়ম দেখতে পায়। হাসপাতাল কমপ্লেক্সের ছয়টি ভবনের মধ্যে মাত্র দুটির রাজউকের অনুমোদন ছিল। এমনকি অনুমোদিত ভবনেও নকশা লঙ্ঘন করে ছয়তলার পরিবর্তে আটতলা নির্মাণ, জরুরি সিঁড়ির অভাব ও অনুমোদনবহির্ভূত ক্যাফেটেরিয়া তৈরির প্রমাণ মেলে, যার পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূলত এই ঘটনার পরেই নড়েচড়ে বসেছে রাজউক প্রশাসন।
রাজউকের এই অভিযানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও আকস্মিক হাসপাতাল বন্ধ করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএইচসিডিএ) মহাসচিব ও ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এএম শামীম বলেন, সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত হাসপাতাল বন্ধ করা নয়, বরং কীভাবে সেগুলোকে নিরাপদ রেখে সচল রাখা যায়, সে বিষয়ে মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান বের করা। দীর্ঘদিন ধরে সেবা দিয়ে আসা কোনো হাসপাতাল হঠাৎ বন্ধ করে দিলে রোগীদের ওপর এর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই অনিয়ম সংশোধনের জন্য সময় দেওয়াই হবে অধিক বাস্তবসম্মত সমাধান।
একই সুর শোনা গেছে বারিধারার মাদানী হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. ইব্রাহিম মাসুম বিল্লাহর কণ্ঠেও। তিনি এই কার্যক্রম যেন কোনো প্রকার হয়রানির কারণ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখার অনুরোধ জানান। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ মনে করেন, রাজধানীর অধিকাংশ হাসপাতালই প্রফেশনাল হাসপাতাল উপযোগী নকশায় নির্মিত নয়। আর এর দায় শুধু ভবন মালিকদের নয়, দীর্ঘদিন ধরে রাজউকের তদারকির যে দুর্বলতা ছিল—তাও সমানভাবে দায়ী। তিনিও অতি ঝুঁকিপূর্ণগুলো বাদে মাঝারি ও কম ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সময় দিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুন ২০২৬
রাজধানী ঢাকায় যথাযথ অনুমোদন না নিয়ে কিংবা নকশা চরমভাবে লঙ্ঘন করে গড়ে ওঠা হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে এবার কঠোর অ্যাকশনে নামছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনে গড়ে ওঠা এসব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি। রাজউকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রাথমিক যাচাইয়ে যেসব হাসপাতাল ভবন নিরাপত্তার দিক থেকে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হবে, আইন অনুযায়ী সেগুলোর কার্যক্রম সরাসরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি সামান্য ও সংশোধনযোগ্য, সেগুলোকে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে নিয়মের আওতায় আনা হবে।
রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, যেকোনো ভবন নির্মাণের সময় এর ব্যবহারিক অনুমোদন (আবাসিক নাকি বাণিজ্যিক) নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও রাজধানীর একটি বড় অংশের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক এই নিয়ম মানছে না। কোথাও সাধারণ আবাসিক ভবনে নিবিড় বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, আবার কোথাও শপিং মল বা অন্য কাজের জন্য অনুমোদিত ভবনে হাসপাতাল পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া বহুতল হাসপাতাল ভবনে বাধ্যতামূলক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সিঁড়ি এবং জরুরি বহির্গমন পথ (ইমার্জেন্সি এক্সিট) না রেখে রোগীদের জীবনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে।
রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম এ বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, হাসপাতাল যেহেতু মানুষের জীবন রক্ষার জায়গা, তাই সেখানে নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রাণহানির ঝুঁকি থাকলে তা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। প্রাথমিকভাবে রাজধানীর সব হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেসব হাসপাতালে অগ্নি ও ভূমিকম্প নিরাপত্তা নিশ্চিত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় খোলা জায়গা আছে, সেগুলোকে নীতিমালার আওতায় এনে পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে। তবে নিরাপত্তাজনিত বড় ধরনের ব্যত্যয় বা গাফিলতির ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, রাজধানীতে বর্তমানে কতটি হাসপাতাল রাজউকের রাজকীয় অনুমোদন নিয়ে চলছে কিংবা কতটিতে নকশাগত জালিয়াতি রয়েছে—তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যভাণ্ডার বা ডেটাবেজ রাজউকের কাছে নেই। ফলে প্রথমবারের মতো একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি গত ২৭ মে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার পর হাসপাতালটির ভবন পরিদর্শনে গিয়ে রাজউক একাধিক ভয়াবহ অনিয়ম দেখতে পায়। হাসপাতাল কমপ্লেক্সের ছয়টি ভবনের মধ্যে মাত্র দুটির রাজউকের অনুমোদন ছিল। এমনকি অনুমোদিত ভবনেও নকশা লঙ্ঘন করে ছয়তলার পরিবর্তে আটতলা নির্মাণ, জরুরি সিঁড়ির অভাব ও অনুমোদনবহির্ভূত ক্যাফেটেরিয়া তৈরির প্রমাণ মেলে, যার পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূলত এই ঘটনার পরেই নড়েচড়ে বসেছে রাজউক প্রশাসন।
রাজউকের এই অভিযানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও আকস্মিক হাসপাতাল বন্ধ করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএইচসিডিএ) মহাসচিব ও ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এএম শামীম বলেন, সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত হাসপাতাল বন্ধ করা নয়, বরং কীভাবে সেগুলোকে নিরাপদ রেখে সচল রাখা যায়, সে বিষয়ে মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান বের করা। দীর্ঘদিন ধরে সেবা দিয়ে আসা কোনো হাসপাতাল হঠাৎ বন্ধ করে দিলে রোগীদের ওপর এর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই অনিয়ম সংশোধনের জন্য সময় দেওয়াই হবে অধিক বাস্তবসম্মত সমাধান।
একই সুর শোনা গেছে বারিধারার মাদানী হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. ইব্রাহিম মাসুম বিল্লাহর কণ্ঠেও। তিনি এই কার্যক্রম যেন কোনো প্রকার হয়রানির কারণ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখার অনুরোধ জানান। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ মনে করেন, রাজধানীর অধিকাংশ হাসপাতালই প্রফেশনাল হাসপাতাল উপযোগী নকশায় নির্মিত নয়। আর এর দায় শুধু ভবন মালিকদের নয়, দীর্ঘদিন ধরে রাজউকের তদারকির যে দুর্বলতা ছিল—তাও সমানভাবে দায়ী। তিনিও অতি ঝুঁকিপূর্ণগুলো বাদে মাঝারি ও কম ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সময় দিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন