দিকপাল

আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসে সতর্কবার্তা: বাংলাদেশে ভয়ংকর ‘জম্বি’ মাদকের বিস্তার


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬ | ০৩:০২ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসে সতর্কবার্তা: বাংলাদেশে ভয়ংকর ‘জম্বি’ মাদকের বিস্তার

আমেরিকায় আতঙ্কের কারণ হয়ে ওঠা ভয়ংকর মাদক ‘জম্বি’ এখন বাংলাদেশের জননিরাপত্তার জন্য নতুন উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার মেট্রোরেল স্টেশন, গাজীপুরের টঙ্গী এবং দিনাজপুরের হিলিসহ দেশের কয়েকটি অঞ্চলে কিছু ব্যক্তির অস্বাভাবিক আচরণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ভাইরাল হওয়া এসব ভিডিও বিশ্লেষণ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা শাখা নিশ্চিত হয়েছে যে, এগুলো মূলত ভয়ংকর জম্বি মাদকের প্রভাবে ঘটা শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। প্রাথমিকভাবে এটি সাধারণ কোনো মাদকের প্রভাব বলে মনে করা হলেও, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার পর ডিএনসি নিশ্চিত হয়েছে যে এটি জাইলাজিন নামক এক প্রকার চেতনানাশক ওষুধের অপব্যবহার।


মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জম্বি মাদক মূলত পশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত এক ধরনের শক্তিশালী চেতনানাশক। এটিকে ফেনটানিল বা হেরোইনের মতো মাদকের সঙ্গে মিশিয়ে সেবন করা হয়। এর ভয়াবহ প্রভাবে সেবনকারীর হাঁটাচলা, কথা বলা ও আচার-আচরণ জীবন্মৃত বা জম্বিদের মতো হয়ে যায়। এমনকি অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে শরীরের চামড়ায় পচন ধরে এবং শ্বাসকষ্ট বা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে টেক্সাস থেকে একটি চক্র এই মাদক বাংলাদেশে নিয়ে আসছে। মূলত ধনাঢ্য পরিবারের বিপথগামী তরুণদের লক্ষ্য করেই এই ভয়াবহ মাদক দেশে প্রবেশ করানো হচ্ছে। অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এই চক্রটিকে শনাক্তের কাজ চলছে এবং অতি দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।


বাংলাদেশে মাদকের এই নতুন প্রাদুর্ভাবের পাশাপাশি ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন এবং সাম্প্রতিক সময়ে কিটামিন, কুশ, এলএসডি ও আইসের মতো মাদকের নীরব বিস্তারও চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, দেশের ৩২টি জেলার প্রায় দেড় শতাধিক সীমান্ত রুট দিয়ে প্রতিদিন দেদারছে বিভিন্ন ধরনের মাদক প্রবেশ করছে। এই মাদক ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছেন কয়েক স্তরের কারবারি; যেখানে খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের পাশাপাশি রয়েছে প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি ‘গডফাদার’। বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করলেও গডফাদারদের অধরা থাকাটা মাদক নির্মূলে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেশিরভাগ অভিযানেই কেবল মাদক বহনকারীরা গ্রেপ্তার হচ্ছে, কিন্তু মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।


মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জনবল ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তারা মাদক নির্মূলে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের ঘোষণার পর থেকে চালানো বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন পর্যায়ের কারবারিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। অধিদপ্তরের অপারেশনস শাখার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দ্রুতই গোয়েন্দা ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য আধুনিক অস্ত্র সরবরাহের প্রক্রিয়া শুরু হবে, যা মাদকবিরোধী অভিযানিক কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চার করবে। মাদক নির্মূলে কেবল অভিযানই যথেষ্ট নয়, বরং এই সংকট মোকাবিলায় তরুণ সমাজকে সচেতন করা এবং পারিবারিক নজরদারি বৃদ্ধির বিকল্প নেই। প্রতি বছরের মতো এবারও আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস পালনের মাধ্যমে দেশজুড়ে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে ডিএনসি। তবে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন, গডফাদারদের আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত এবং সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ না করা পর্যন্ত এই জাতীয় সংকটের স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন।

 

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬


আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসে সতর্কবার্তা: বাংলাদেশে ভয়ংকর ‘জম্বি’ মাদকের বিস্তার

প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬

featured Image

আমেরিকায় আতঙ্কের কারণ হয়ে ওঠা ভয়ংকর মাদক ‘জম্বি’ এখন বাংলাদেশের জননিরাপত্তার জন্য নতুন উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার মেট্রোরেল স্টেশন, গাজীপুরের টঙ্গী এবং দিনাজপুরের হিলিসহ দেশের কয়েকটি অঞ্চলে কিছু ব্যক্তির অস্বাভাবিক আচরণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ভাইরাল হওয়া এসব ভিডিও বিশ্লেষণ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা শাখা নিশ্চিত হয়েছে যে, এগুলো মূলত ভয়ংকর জম্বি মাদকের প্রভাবে ঘটা শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। প্রাথমিকভাবে এটি সাধারণ কোনো মাদকের প্রভাব বলে মনে করা হলেও, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার পর ডিএনসি নিশ্চিত হয়েছে যে এটি জাইলাজিন নামক এক প্রকার চেতনানাশক ওষুধের অপব্যবহার।


মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জম্বি মাদক মূলত পশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত এক ধরনের শক্তিশালী চেতনানাশক। এটিকে ফেনটানিল বা হেরোইনের মতো মাদকের সঙ্গে মিশিয়ে সেবন করা হয়। এর ভয়াবহ প্রভাবে সেবনকারীর হাঁটাচলা, কথা বলা ও আচার-আচরণ জীবন্মৃত বা জম্বিদের মতো হয়ে যায়। এমনকি অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে শরীরের চামড়ায় পচন ধরে এবং শ্বাসকষ্ট বা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে টেক্সাস থেকে একটি চক্র এই মাদক বাংলাদেশে নিয়ে আসছে। মূলত ধনাঢ্য পরিবারের বিপথগামী তরুণদের লক্ষ্য করেই এই ভয়াবহ মাদক দেশে প্রবেশ করানো হচ্ছে। অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এই চক্রটিকে শনাক্তের কাজ চলছে এবং অতি দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।


বাংলাদেশে মাদকের এই নতুন প্রাদুর্ভাবের পাশাপাশি ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন এবং সাম্প্রতিক সময়ে কিটামিন, কুশ, এলএসডি ও আইসের মতো মাদকের নীরব বিস্তারও চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, দেশের ৩২টি জেলার প্রায় দেড় শতাধিক সীমান্ত রুট দিয়ে প্রতিদিন দেদারছে বিভিন্ন ধরনের মাদক প্রবেশ করছে। এই মাদক ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছেন কয়েক স্তরের কারবারি; যেখানে খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের পাশাপাশি রয়েছে প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি ‘গডফাদার’। বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করলেও গডফাদারদের অধরা থাকাটা মাদক নির্মূলে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেশিরভাগ অভিযানেই কেবল মাদক বহনকারীরা গ্রেপ্তার হচ্ছে, কিন্তু মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।


মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জনবল ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তারা মাদক নির্মূলে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের ঘোষণার পর থেকে চালানো বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন পর্যায়ের কারবারিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। অধিদপ্তরের অপারেশনস শাখার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দ্রুতই গোয়েন্দা ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য আধুনিক অস্ত্র সরবরাহের প্রক্রিয়া শুরু হবে, যা মাদকবিরোধী অভিযানিক কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চার করবে। মাদক নির্মূলে কেবল অভিযানই যথেষ্ট নয়, বরং এই সংকট মোকাবিলায় তরুণ সমাজকে সচেতন করা এবং পারিবারিক নজরদারি বৃদ্ধির বিকল্প নেই। প্রতি বছরের মতো এবারও আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস পালনের মাধ্যমে দেশজুড়ে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে ডিএনসি। তবে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন, গডফাদারদের আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত এবং সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ না করা পর্যন্ত এই জাতীয় সংকটের স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন।

 


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল