ঢাকার পার্শ্ববর্তী শিল্পসমৃদ্ধ এলাকাগুলোতে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সরকার চার হাজার ৯৭৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। মূলত শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের প্রস্তাব অনুযায়ী, ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী জেলাজুড়ে বিস্তৃত ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ৫২টি নতুন সাবস্টেশন নির্মাণ করা হবে। ২০৩১ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ২৬৫ মেগা-ভোল্ট অ্যাম্পিয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার সুফল পাবেন প্রায় ৬০ লাখ গ্রাহক।
প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে পরামর্শক সংস্থা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৩৩ সাল নাগাদ উল্লেখিত এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ চাহিদা বেড়ে পাঁচ হাজার ৮২ মেগাওয়াটে পৌঁছাবে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামলাতে এবং সিস্টেম লস বর্তমানের ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনতে এই মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে ৫২টি নতুন ৩৩/১১ কিলোভোল্ট সাবস্টেশন নির্মাণের পাশাপাশি ১২টি পুরনো সাবস্টেশনের সক্ষমতা বাড়ানো হবে। এছাড়া প্রায় চার হাজার ২০০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ ও আপগ্রেড করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ১৫৮ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ ক্যাবল স্থাপন, নয়শটি ফল্ট লোকেটর, তিনটি সুইচিং স্টেশন এবং তিনটি নদী পারাপার টাওয়ার বসানো হবে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ক্ষেত্র হিসেবে সাভার, ধামরাই, কেরানীগঞ্জ, কালিয়াকৈর, গাজীপুর সদর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের বন্দর, রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ, আড়াইহাজার, মানিকগঞ্জ সদর, সাটুরিয়া এবং ময়মনসিংহের ভালুকা, ত্রিশাল ও গফরগাঁওয়ের মতো শিল্প-অধ্যুষিত উপজেলাগুলোও এই প্রকল্পের আওতায় থাকবে। বর্তমানে প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে এবং আগামী ২৮ জুন এ বিষয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা আহ্বান করা হয়েছে। তবে প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন প্রশ্ন তুলেছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ডিপিপিতে ২৩৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বেশি ধরা হয়েছে, যার যৌক্তিকতা নিয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৯৬ শতাংশই যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ক্রয়ের খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা নিয়েও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে কমিশন মত দিয়েছে। এছাড়া পরামর্শক সেবা, প্রশিক্ষণ ব্যয় এবং প্রশাসনিক ব্যয়ের যৌক্তিকতা পুনর্বিবেচনা করার সুপারিশ করা হয়েছে। সম্পূর্ণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কাছ থেকে দুই হাজার ৪৪০ কোটি টাকা ঋণের সংস্থান হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বাকি অর্থের মধ্যে এক হাজার ৩১৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং এক হাজার ২১৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী মো. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধির প্রবণতা বিবেচনায় নিয়েই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে এই প্রকল্পের অগ্রিম ক্রয় প্রক্রিয়া বা প্রকিউরমেন্ট শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরই কেবল ঠিকাদার নিয়োগ ও ক্রয়াদেশ প্রদান করা সম্ভব হবে। এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অনেক বেশি স্থিতিশীল হবে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬
ঢাকার পার্শ্ববর্তী শিল্পসমৃদ্ধ এলাকাগুলোতে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সরকার চার হাজার ৯৭৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। মূলত শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের প্রস্তাব অনুযায়ী, ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী জেলাজুড়ে বিস্তৃত ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ৫২টি নতুন সাবস্টেশন নির্মাণ করা হবে। ২০৩১ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ২৬৫ মেগা-ভোল্ট অ্যাম্পিয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার সুফল পাবেন প্রায় ৬০ লাখ গ্রাহক।
প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে পরামর্শক সংস্থা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৩৩ সাল নাগাদ উল্লেখিত এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ চাহিদা বেড়ে পাঁচ হাজার ৮২ মেগাওয়াটে পৌঁছাবে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামলাতে এবং সিস্টেম লস বর্তমানের ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনতে এই মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে ৫২টি নতুন ৩৩/১১ কিলোভোল্ট সাবস্টেশন নির্মাণের পাশাপাশি ১২টি পুরনো সাবস্টেশনের সক্ষমতা বাড়ানো হবে। এছাড়া প্রায় চার হাজার ২০০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ ও আপগ্রেড করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ১৫৮ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ ক্যাবল স্থাপন, নয়শটি ফল্ট লোকেটর, তিনটি সুইচিং স্টেশন এবং তিনটি নদী পারাপার টাওয়ার বসানো হবে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ক্ষেত্র হিসেবে সাভার, ধামরাই, কেরানীগঞ্জ, কালিয়াকৈর, গাজীপুর সদর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের বন্দর, রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ, আড়াইহাজার, মানিকগঞ্জ সদর, সাটুরিয়া এবং ময়মনসিংহের ভালুকা, ত্রিশাল ও গফরগাঁওয়ের মতো শিল্প-অধ্যুষিত উপজেলাগুলোও এই প্রকল্পের আওতায় থাকবে। বর্তমানে প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে এবং আগামী ২৮ জুন এ বিষয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা আহ্বান করা হয়েছে। তবে প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন প্রশ্ন তুলেছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ডিপিপিতে ২৩৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বেশি ধরা হয়েছে, যার যৌক্তিকতা নিয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৯৬ শতাংশই যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ক্রয়ের খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা নিয়েও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে কমিশন মত দিয়েছে। এছাড়া পরামর্শক সেবা, প্রশিক্ষণ ব্যয় এবং প্রশাসনিক ব্যয়ের যৌক্তিকতা পুনর্বিবেচনা করার সুপারিশ করা হয়েছে। সম্পূর্ণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কাছ থেকে দুই হাজার ৪৪০ কোটি টাকা ঋণের সংস্থান হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বাকি অর্থের মধ্যে এক হাজার ৩১৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং এক হাজার ২১৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী মো. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধির প্রবণতা বিবেচনায় নিয়েই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে এই প্রকল্পের অগ্রিম ক্রয় প্রক্রিয়া বা প্রকিউরমেন্ট শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরই কেবল ঠিকাদার নিয়োগ ও ক্রয়াদেশ প্রদান করা সম্ভব হবে। এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অনেক বেশি স্থিতিশীল হবে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন