পল্লবীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন প্রবীণ শিক্ষকের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে এক হৃদয়বিদারক বাস্তবতার চিত্র। তিনি আক্ষেপ করে জানান, মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে তার প্রিয় শিক্ষার্থীরা ধ্বংসের পথে। কোমলমতি ছাত্রদের মাদকাসক্তি থেকে দূরে রাখার সামান্য চেষ্টা করতে গিয়েই তাকে উল্টো প্রাণনাশের হুমকি পেতে হয়েছে। কেবল পল্লবী নয়, রাজধানীর প্রতিটি অলিগলিতে মাদক কারবারিদের এমন ভয়াবহ নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়েছে। পল্লবী এলাকার স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে অন্তত বিশটি মাদক বিক্রির স্পট গড়ে উঠেছে। একজন প্রধান মাদক মাফিয়াকে কেন্দ্র করে সেখানে ষোল থেকে সতেরোজন মাঠপর্যায়ের কারবারি কাজ করছে, যাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে স্থানীয় বহুতল ভবনের নিরাপত্তাকর্মীরাও। আর এদের হাতের নাগালে পড়ে শিক্ষার্থীরা তাদের ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পুরো রাজধানীতে প্রায় দুই শতাধিক মাদক মাফিয়া বা গডফাদার পর্দার আড়ালে থেকে এই মরণনেশার সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের আটটি অপরাধ অঞ্চল জুড়ে রয়েছে কয়েক শ মাদক কেনাবেচার কেন্দ্র। হাজার হাজার খুচরা বিক্রেতা মাঠপর্যায়ে মাদক পৌঁছে দিচ্ছে মানুষের হাতে। যদিও পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বরাবরই মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের কথা বলে আসছে, তবে বাস্তবতা ভিন্ন। অভিযানে নিয়মিতভাবে মাদক কারবারিরা আটক হলেও পর্দার আড়ালে থাকা মূল গডফাদাররা বরাবরই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, এই মাদকের বিষবাষ্প নিয়ন্ত্রণে রাখা এখন পুলিশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পুলিশের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, মে মাস থেকে শুরু হওয়া বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযানে পাঁচ হাজারের বেশি কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ অন্যান্য মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। তবে দুঃখজনক সত্য হলো, অভিযান সত্ত্বেও মাদক কারবারের রাশ টানা যাচ্ছে না। বিশেষ করে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে। বারবার অভিযান পরিচালনার পরও সেখানে মাদক ব্যবসা থামানো সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত অভিযান চললেও তালিকাভুক্ত অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। পুলিশের নথিপত্রে দেখা গেছে, কেবল মোহাম্মদপুর থানাতেই গত এক বছরে প্রায় ৬০ শতাংশ মামলা দায়ের হয়েছে মাদককেন্দ্রিক অপরাধের জেরে। জামিনে বেরিয়ে আসা শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা আবারও নতুন করে অপরাধ জগতে সক্রিয় হয়ে উঠছে।
বর্তমানে সরকার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে মাদকের বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত তালিকা তৈরির কাজ চলছে। পুলিশের তালিকায় প্রায় বিশ হাজার এবং বিজিবির তালিকায় চার হাজারের বেশি মাদক কারবারির নাম রয়েছে। রাজধানী ছাড়িয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা এই সিন্ডিকেটগুলো ধ্বংস করতে মরিয়া প্রশাসন। টেকনাফ, কক্সবাজার, কুমিল্লা ও রাজশাহীর মতো অঞ্চলগুলো থেকে শুরু করে খোদ রাজধানীতে—সবখানেই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের নাম উঠে এসেছে নথিপত্রে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকের এই মরণফাঁদ থেকে তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে কেবল আইন দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা এবং সামাজিক আন্দোলনের সমন্বিত রূপ।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তরুণদের মাদকমুক্ত রাখতে বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত প্রতিরোধের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, কেবল ভীতি বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিককে যদি এই লড়াইয়ে শামিল করা না যায়, তবে সুন্দর ও মানবিক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে না। মাদক গডফাদারদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথে ফেরানোর এখনই সময়।

সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬
পল্লবীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন প্রবীণ শিক্ষকের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে এক হৃদয়বিদারক বাস্তবতার চিত্র। তিনি আক্ষেপ করে জানান, মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে তার প্রিয় শিক্ষার্থীরা ধ্বংসের পথে। কোমলমতি ছাত্রদের মাদকাসক্তি থেকে দূরে রাখার সামান্য চেষ্টা করতে গিয়েই তাকে উল্টো প্রাণনাশের হুমকি পেতে হয়েছে। কেবল পল্লবী নয়, রাজধানীর প্রতিটি অলিগলিতে মাদক কারবারিদের এমন ভয়াবহ নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়েছে। পল্লবী এলাকার স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে অন্তত বিশটি মাদক বিক্রির স্পট গড়ে উঠেছে। একজন প্রধান মাদক মাফিয়াকে কেন্দ্র করে সেখানে ষোল থেকে সতেরোজন মাঠপর্যায়ের কারবারি কাজ করছে, যাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে স্থানীয় বহুতল ভবনের নিরাপত্তাকর্মীরাও। আর এদের হাতের নাগালে পড়ে শিক্ষার্থীরা তাদের ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পুরো রাজধানীতে প্রায় দুই শতাধিক মাদক মাফিয়া বা গডফাদার পর্দার আড়ালে থেকে এই মরণনেশার সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের আটটি অপরাধ অঞ্চল জুড়ে রয়েছে কয়েক শ মাদক কেনাবেচার কেন্দ্র। হাজার হাজার খুচরা বিক্রেতা মাঠপর্যায়ে মাদক পৌঁছে দিচ্ছে মানুষের হাতে। যদিও পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বরাবরই মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের কথা বলে আসছে, তবে বাস্তবতা ভিন্ন। অভিযানে নিয়মিতভাবে মাদক কারবারিরা আটক হলেও পর্দার আড়ালে থাকা মূল গডফাদাররা বরাবরই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, এই মাদকের বিষবাষ্প নিয়ন্ত্রণে রাখা এখন পুলিশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পুলিশের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, মে মাস থেকে শুরু হওয়া বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযানে পাঁচ হাজারের বেশি কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ অন্যান্য মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। তবে দুঃখজনক সত্য হলো, অভিযান সত্ত্বেও মাদক কারবারের রাশ টানা যাচ্ছে না। বিশেষ করে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে। বারবার অভিযান পরিচালনার পরও সেখানে মাদক ব্যবসা থামানো সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত অভিযান চললেও তালিকাভুক্ত অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। পুলিশের নথিপত্রে দেখা গেছে, কেবল মোহাম্মদপুর থানাতেই গত এক বছরে প্রায় ৬০ শতাংশ মামলা দায়ের হয়েছে মাদককেন্দ্রিক অপরাধের জেরে। জামিনে বেরিয়ে আসা শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা আবারও নতুন করে অপরাধ জগতে সক্রিয় হয়ে উঠছে।
বর্তমানে সরকার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে মাদকের বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত তালিকা তৈরির কাজ চলছে। পুলিশের তালিকায় প্রায় বিশ হাজার এবং বিজিবির তালিকায় চার হাজারের বেশি মাদক কারবারির নাম রয়েছে। রাজধানী ছাড়িয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা এই সিন্ডিকেটগুলো ধ্বংস করতে মরিয়া প্রশাসন। টেকনাফ, কক্সবাজার, কুমিল্লা ও রাজশাহীর মতো অঞ্চলগুলো থেকে শুরু করে খোদ রাজধানীতে—সবখানেই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের নাম উঠে এসেছে নথিপত্রে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকের এই মরণফাঁদ থেকে তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে কেবল আইন দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা এবং সামাজিক আন্দোলনের সমন্বিত রূপ।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তরুণদের মাদকমুক্ত রাখতে বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত প্রতিরোধের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, কেবল ভীতি বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিককে যদি এই লড়াইয়ে শামিল করা না যায়, তবে সুন্দর ও মানবিক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে না। মাদক গডফাদারদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথে ফেরানোর এখনই সময়।

আপনার মতামত লিখুন