র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের সাবেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে বিভীষিকাময় চিত্র ফুটে উঠেছে, তা এককথায় নজিরবিহীন। তার দীর্ঘ সময়ের দেহরক্ষী বা রানার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সেনা কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-এক-এ সাক্ষ্য দিতে গিয়ে যে জবানবন্দি দিয়েছেন, তা দেশের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়কে উন্মোচিত করেছে। ইমরুল কায়েসের ভাষ্যমতে, জিয়াউল আহসানের অধীনে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিজ চোখে অন্তত দেড়শ থেকে দুই শতাধিক মানুষকে নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে দেখেছেন। তার এই সাক্ষ্য কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, বরং তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশের ভয়াবহ ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইমরুল কায়েসের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, তিনি ২০০১ সালে সেনাবাহিনীর আর্মার্ড কোরে যোগ দেওয়ার পর ২০১০ সালে র্যাব সদর দপ্তরে বদলি হন। ব্যক্তিগত পরিচিতির সূত্র ধরে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে তিনি তার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিনের মাথায় তিনি টঙ্গীর রেললাইনের পাশে এক নৃশংস ঘটনার সাক্ষী হন। রাতে একটি কালো মাইক্রোবাসে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং সেখানে বস্তাবন্দী অবস্থায় থাকা এক নিথর দেহ রেললাইনের ওপর ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ট্রেন চলে যাওয়ার পর সেই দেহটি যে মূলত একটি মৃতদেহ ছিল তা নিশ্চিত করেন তিনি। এই ঘটনা তার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
সাক্ষ্যদানকালে বিডিআর বিদ্রোহ পরবর্তী পরিস্থিতির ভয়াবহতাও উঠে আসে। রেবেল হান্ট নামের অভিযানে অন্তত আট থেকে দশজন বিডিআর সদস্যকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছিল বলে ইমরুল দাবি করেন। কখনো ইনজেকশন পুশ করে, আবার কখনো সিমেন্টের বস্তার সঙ্গে বেঁধে পোস্তগোলা ব্রিজের পাশে নদীর গভীরে ডুবিয়ে হত্যা করা হতো তাদের। এছাড়া উত্তরা, কাঁচপুর ও জাফলংসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে সাজানো হত্যাকাণ্ডের বিশদ বিবরণ দেন তিনি। তার বর্ণনায় উঠে আসে, কীভাবে নির্জন স্থানে নিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বা সরাসরি গুলি করে মানুষকে হত্যা করা হতো। এ সময় জিয়াউল আহসানের সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত থাকতেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী গুমের প্রসঙ্গটি জবানবন্দির অন্যতম চাঞ্চল্যকর অংশ। ইমরুলের ভাষ্যমতে, ২০১২ সালের এপ্রিলে ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর র্যাব সদর দপ্তরে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ বিরাজ করছিল। তিনি জিয়াউল আহসানকে ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলতে শোনেন, যেখানে তিনি অনেকটা ক্ষোভ ও আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন যে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ইলিয়াস আলীকে গুম করার কাজটি সম্পন্ন করার পরও এখন তাকে নানাভাবে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। এই কথোপকথনে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টাকে ইঙ্গিত করছিলেন বলে সাক্ষীর ধারণা। ইলিয়াস আলীকে গুম করার ক্ষেত্রে যে উচ্চপর্যায়ের যোগসাজশ ছিল, তা এই সাক্ষ্যের মধ্য দিয়ে আবারও জনসমক্ষে এসেছে।
পরিশেষে, ইমরুল কায়েসের এই জবানবন্দি শুধু একটি বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ নয়, এটি একজন সৈনিকের বিবেকের দংশন থেকে বেরিয়ে আসা সত্যের বহিঃপ্রকাশ। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, দেশের সুরক্ষার শপথ নিয়ে তিনি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু সাধারণ মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়। দীর্ঘদিনের এই বিভীষিকা থেকে মুক্তি এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় তিনি সব তথ্য ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরেছেন। এই জবানবন্দি প্রমাণ করে যে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছিল। এখন ট্রাইব্যুনাল কীভাবে এই সাক্ষ্য ও প্রমাণাদির ভিত্তিতে রায় প্রদান করেন, সেটাই দেখার বিষয়।

সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের সাবেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে বিভীষিকাময় চিত্র ফুটে উঠেছে, তা এককথায় নজিরবিহীন। তার দীর্ঘ সময়ের দেহরক্ষী বা রানার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সেনা কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-এক-এ সাক্ষ্য দিতে গিয়ে যে জবানবন্দি দিয়েছেন, তা দেশের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়কে উন্মোচিত করেছে। ইমরুল কায়েসের ভাষ্যমতে, জিয়াউল আহসানের অধীনে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিজ চোখে অন্তত দেড়শ থেকে দুই শতাধিক মানুষকে নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে দেখেছেন। তার এই সাক্ষ্য কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, বরং তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশের ভয়াবহ ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইমরুল কায়েসের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, তিনি ২০০১ সালে সেনাবাহিনীর আর্মার্ড কোরে যোগ দেওয়ার পর ২০১০ সালে র্যাব সদর দপ্তরে বদলি হন। ব্যক্তিগত পরিচিতির সূত্র ধরে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে তিনি তার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিনের মাথায় তিনি টঙ্গীর রেললাইনের পাশে এক নৃশংস ঘটনার সাক্ষী হন। রাতে একটি কালো মাইক্রোবাসে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং সেখানে বস্তাবন্দী অবস্থায় থাকা এক নিথর দেহ রেললাইনের ওপর ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ট্রেন চলে যাওয়ার পর সেই দেহটি যে মূলত একটি মৃতদেহ ছিল তা নিশ্চিত করেন তিনি। এই ঘটনা তার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
সাক্ষ্যদানকালে বিডিআর বিদ্রোহ পরবর্তী পরিস্থিতির ভয়াবহতাও উঠে আসে। রেবেল হান্ট নামের অভিযানে অন্তত আট থেকে দশজন বিডিআর সদস্যকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছিল বলে ইমরুল দাবি করেন। কখনো ইনজেকশন পুশ করে, আবার কখনো সিমেন্টের বস্তার সঙ্গে বেঁধে পোস্তগোলা ব্রিজের পাশে নদীর গভীরে ডুবিয়ে হত্যা করা হতো তাদের। এছাড়া উত্তরা, কাঁচপুর ও জাফলংসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে সাজানো হত্যাকাণ্ডের বিশদ বিবরণ দেন তিনি। তার বর্ণনায় উঠে আসে, কীভাবে নির্জন স্থানে নিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বা সরাসরি গুলি করে মানুষকে হত্যা করা হতো। এ সময় জিয়াউল আহসানের সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত থাকতেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী গুমের প্রসঙ্গটি জবানবন্দির অন্যতম চাঞ্চল্যকর অংশ। ইমরুলের ভাষ্যমতে, ২০১২ সালের এপ্রিলে ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর র্যাব সদর দপ্তরে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ বিরাজ করছিল। তিনি জিয়াউল আহসানকে ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলতে শোনেন, যেখানে তিনি অনেকটা ক্ষোভ ও আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন যে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ইলিয়াস আলীকে গুম করার কাজটি সম্পন্ন করার পরও এখন তাকে নানাভাবে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। এই কথোপকথনে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টাকে ইঙ্গিত করছিলেন বলে সাক্ষীর ধারণা। ইলিয়াস আলীকে গুম করার ক্ষেত্রে যে উচ্চপর্যায়ের যোগসাজশ ছিল, তা এই সাক্ষ্যের মধ্য দিয়ে আবারও জনসমক্ষে এসেছে।
পরিশেষে, ইমরুল কায়েসের এই জবানবন্দি শুধু একটি বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ নয়, এটি একজন সৈনিকের বিবেকের দংশন থেকে বেরিয়ে আসা সত্যের বহিঃপ্রকাশ। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, দেশের সুরক্ষার শপথ নিয়ে তিনি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু সাধারণ মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়। দীর্ঘদিনের এই বিভীষিকা থেকে মুক্তি এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় তিনি সব তথ্য ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরেছেন। এই জবানবন্দি প্রমাণ করে যে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছিল। এখন ট্রাইব্যুনাল কীভাবে এই সাক্ষ্য ও প্রমাণাদির ভিত্তিতে রায় প্রদান করেন, সেটাই দেখার বিষয়।

আপনার মতামত লিখুন