ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেড় দশকের বিতর্কিত ও পরনির্ভরশীল পররাষ্ট্রনীতির অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে যে কূটনৈতিক স্থবিরতা ও একপাক্ষিক আনুগত্যের অভিযোগ ছিল, তা কাটিয়ে বর্তমান সরকার আত্মমর্যাদাবোধকে পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে নির্ধারণ করেছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সুদূরপ্রসারী ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক দর্শনের আলোকে বর্তমান সরকার যে পথচলা শুরু করেছে, তা আধুনিক বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে পররাষ্ট্রনীতিতে যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন পরিচয়ে পরিচিত করেছিলেন। তার শাসনামলে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যেমন সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তেমনি চীন ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গেও বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়ে সেই ঐতিহ্যের প্রতিই পুনরায় দায়বদ্ধতা প্রদর্শন করেছেন। মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ও স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে মালয়েশিয়া এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক সংলাপে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, বাংলাদেশ কোনো বিশেষ বলয় নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করেই তার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি বিস্তৃত করছে।
মালয়েশিয়া সফরের ঠিক পরপরই প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর বাংলাদেশের জন্য ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গভীরতর করা সময়ের দাবি। বিশেষ করে যখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন চীনের মতো শক্তিধর দেশের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বাংলাদেশকে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করবে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো চীনের সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বড় ধরনের অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট বা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে অববাহিকা অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের পানি সংকট নিরসন হবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে।
প্রতিরক্ষা সক্ষমতার দিক থেকেও বাংলাদেশের জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াউর রহমানের আমলে চীনের সহায়তায় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী যেভাবে পুনর্গঠিত ও শক্তিশালী হয়েছিল, বর্তমান সরকার সেই ধারার আধুনিকায়নে বিশ্বাসী। বর্তমান সেনাপ্রধান দেশের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়নে যে গুরুত্ব দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নে চীনের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মাল্টিরোল ফাইটার জেট ও অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায়, যা যেকোনো বহিঃশক্তির আগ্রাসনী মনোভাবের বিপরীতে কার্যকর প্রতিরোধের দেয়াল গড়ে তুলবে। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে নেওয়া একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ।
চীন সফরের মূল এজেন্ডায় প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পাচ্ছে। মিয়ানমার ও তার সামরিক জান্তার ওপর চীনের যে প্রভাব রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে একটি টেকসই ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে বাংলাদেশ জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। পররাষ্ট্র সচিবের ভাষ্যমতে, এবারের সফরে বেশ কিছু দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। যার মধ্যে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপনের মতো প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে কয়েক ধাপ এগিয়ে নেবে।
পরিশেষে, বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট শক্তির তাঁবেদার হওয়ার বদলে নিজস্ব সার্বভৌমত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই সরকারের লক্ষ্য। মানুষ আশা করছে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর বাংলাদেশের জন্য এমন এক কূটনৈতিক সুফল বয়ে আনবে, যেখানে কোনো অদৃশ্য চাপের প্রভাব থাকবে না। বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে এবং উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাবে নিজস্ব গতিতে ও স্বাধীন সত্তায়।

সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেড় দশকের বিতর্কিত ও পরনির্ভরশীল পররাষ্ট্রনীতির অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে যে কূটনৈতিক স্থবিরতা ও একপাক্ষিক আনুগত্যের অভিযোগ ছিল, তা কাটিয়ে বর্তমান সরকার আত্মমর্যাদাবোধকে পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে নির্ধারণ করেছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সুদূরপ্রসারী ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক দর্শনের আলোকে বর্তমান সরকার যে পথচলা শুরু করেছে, তা আধুনিক বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে পররাষ্ট্রনীতিতে যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন পরিচয়ে পরিচিত করেছিলেন। তার শাসনামলে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যেমন সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তেমনি চীন ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গেও বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়ে সেই ঐতিহ্যের প্রতিই পুনরায় দায়বদ্ধতা প্রদর্শন করেছেন। মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ও স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে মালয়েশিয়া এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক সংলাপে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, বাংলাদেশ কোনো বিশেষ বলয় নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করেই তার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি বিস্তৃত করছে।
মালয়েশিয়া সফরের ঠিক পরপরই প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর বাংলাদেশের জন্য ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গভীরতর করা সময়ের দাবি। বিশেষ করে যখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন চীনের মতো শক্তিধর দেশের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বাংলাদেশকে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করবে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো চীনের সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বড় ধরনের অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট বা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে অববাহিকা অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের পানি সংকট নিরসন হবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে।
প্রতিরক্ষা সক্ষমতার দিক থেকেও বাংলাদেশের জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াউর রহমানের আমলে চীনের সহায়তায় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী যেভাবে পুনর্গঠিত ও শক্তিশালী হয়েছিল, বর্তমান সরকার সেই ধারার আধুনিকায়নে বিশ্বাসী। বর্তমান সেনাপ্রধান দেশের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়নে যে গুরুত্ব দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নে চীনের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মাল্টিরোল ফাইটার জেট ও অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায়, যা যেকোনো বহিঃশক্তির আগ্রাসনী মনোভাবের বিপরীতে কার্যকর প্রতিরোধের দেয়াল গড়ে তুলবে। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে নেওয়া একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ।
চীন সফরের মূল এজেন্ডায় প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পাচ্ছে। মিয়ানমার ও তার সামরিক জান্তার ওপর চীনের যে প্রভাব রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে একটি টেকসই ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে বাংলাদেশ জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। পররাষ্ট্র সচিবের ভাষ্যমতে, এবারের সফরে বেশ কিছু দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। যার মধ্যে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপনের মতো প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে কয়েক ধাপ এগিয়ে নেবে।
পরিশেষে, বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট শক্তির তাঁবেদার হওয়ার বদলে নিজস্ব সার্বভৌমত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই সরকারের লক্ষ্য। মানুষ আশা করছে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর বাংলাদেশের জন্য এমন এক কূটনৈতিক সুফল বয়ে আনবে, যেখানে কোনো অদৃশ্য চাপের প্রভাব থাকবে না। বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে এবং উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাবে নিজস্ব গতিতে ও স্বাধীন সত্তায়।

আপনার মতামত লিখুন