দিকপাল

সাগরে বিলীন হচ্ছে যুক্তরাজ্যের বাড়ি, সড়ক ও রেললাইন


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : সোমবার, ২৫ মে ২০২৬ | ০৪:৪৬ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

সাগরে বিলীন হচ্ছে যুক্তরাজ্যের বাড়ি, সড়ক ও রেললাইন


বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট এবং এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে যুক্তরাজ্যের বিশাল উপকূলীয় অঞ্চল এখন এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। সাগরের করাল গ্রাসে ধীরে ধীরে সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে শত শত মানুষের সাজানো ঘরবাড়ি, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেললাইন। বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আগামী মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির হাজার হাজার বাড়িঘর এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বহু অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অথচ এই চরম জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে দূরদর্শী বা সুদূরপ্রসারী কোনো জাতীয় মহাপরিকল্পনা বা স্থায়ী পদক্ষেপ এখনো চোখে পড়েনি, যা ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে।

প্রকৃতির এই বিধ্বংসী রূপের সবচেয়ে বড় উদাহরণ তৈরি হয়েছে দক্ষিণ ডেভনের টরক্রস ও স্ল্যাপটনের মধ্যবর্তী একটি উপকূলীয় সড়কে, যা স্থানীয়ভাবে ‘স্ল্যাপটন লাইন’ নামে পরিচিত। একপাশে মিষ্টি জলের হ্রদ এবং অন্যপাশে উত্তাল সমুদ্রঘেরা এই দৃষ্টিনন্দন ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি মূলত কিংসব্রিজ ও ডার্টমাউথ শহরকে সংযুক্ত করার একমাত্র মাধ্যম ছিল। চলতি বছরের শীতকালীন এক ভয়াবহ সামুদ্রিক ঝড়ের আঘাতে সড়কটির একটি বড় অংশ ধসে সমুদ্রের নিচে তলিয়ে গেছে। যদিও বহু বছর আগে থেকেই বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা এই সড়কটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছিলেন, তবুও প্রশাসন কোনো আগাম বা কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। সড়কটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ওই অঞ্চলের পর্যটন শিল্প এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার ওপর। সেখানকার একটি স্থানীয় পর্যটন ক্যাম্পসাইটের মালিক গিল স্টেরি অত্যন্ত হতাশা প্রকাশ করে জানান যে, তিন মাস পার হয়ে গেলেও রাস্তাটি মেরামতের জন্য কোনো দৃশ্যমান কাজ শুরু করা হয়নি। তাদের কাছে এখন মনে হচ্ছে যে প্রশাসন তাদের পুরোপুরি ভুলে গেছে।

ডেভন কাউন্টি কাউন্সিলের পরিবহনবিষয়ক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ড্যান থমাস এই সংকটের গভীরতা স্বীকার করে জানিয়েছেন, ধসে পড়া এই সড়কটি পুনর্নির্মাণ করতে প্রায় আঠারো মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল তহবিলের প্রয়োজন, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় কাউন্সিলের ওপর এক বিরাট আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন যে, দেশজুড়ে তৈরি হওয়া এই ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য জাতীয় পর্যায়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বা বড় ধরনের সরকারি গাইডলাইন নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ডেভনই নয়, যুক্তরাজ্যের আরও বেশ কিছু অঞ্চল এখন তীব্র উপকূলীয় ভাঙনের মুখে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইয়র্কশায়ারের ইস্ট রাইডিং, উত্তর নরফোক, সাফোক এবং আইল অব ওয়াইট। বিশেষ করে ইয়র্কশায়ারের হোল্ডারনেস উপকূলে প্রতিবছর গড়ে সাড়ে চার মিটার পর্যন্ত স্থলভাগ সাগরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, যা বর্তমান পুরো ইউরোপের মধ্যে অন্যতম দ্রুততম উপকূল ক্ষয়ের একটি নজিরবিহীন ও বিপজ্জনক উদাহরণ।

সরকারি পরিসংখ্যান ও বৈজ্ঞানিক হিসাব অনুযায়ী, আগামী ৮০ বছরের মধ্যে শুধু উপকূলীয় ভাঙনের কারণেই অন্তত দশ হাজারেরও বেশি স্থায়ী সম্পত্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে, যদিও বেসরকারি কিছু সংস্থার অনুমানে এই সংখ্যা বিশ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন এবং ১১৪ মাইল গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ সাগরের পানিতে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার হুমকির মুখে রয়েছে। এই অবিশ্বাস্য পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়ভাবে কিছু উপকূলরেখা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নেওয়া হলেও সেগুলোর কৌশল মূলত অত্যন্ত সীমিত। এই পরিকল্পনাগুলো মূলত তিনটি ধারায় বিভক্ত—কোথাও সমুদ্রের বাঁধ বা প্রতিরক্ষা জোরদার করে ‘লাইন ধরে রাখা’, কোথাও প্রকৃতিকে মেনে নিয়ে ‘নিয়ন্ত্রিত পুনর্বিন্যাস’ করা এবং অনেক জায়গায় ‘কোনো সক্রিয় হস্তক্ষেপ নয়’ নীতি গ্রহণ করা। অর্থাৎ, কিছু কিছু দুর্গম এলাকায় প্রশাসন উপকূলকে তার নিজের মতো করে ভেঙে সমুদ্রের দিকে সরে যেতে দিচ্ছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এক চরম নির্মম বাস্তবতা।

ব্রিটিশ সরকার বর্তমানে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ছত্রিশ মিলিয়ন পাউন্ডের কয়েকটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু করেছে, যা পরবর্তীতে আরও আঠারো মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ দিয়ে বড় করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ক্ষতিগ্রস্ত ও গৃহহীন হয়ে পড়া মানুষকে ভবিষ্যতের এই চরম বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে সহায়তা করা। তবে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এখনো যেসব মানুষ এই নদী বা সমুদ্র ভাঙনে নিজেদের শেষ সম্বল ঘরবাড়ি হারাচ্ছেন, তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা বিশেষ বীমা ব্যবস্থা রাখা হয়নি। নরফোক এলাকায় পরিচালিত একটি বিশেষ গবেষণা প্রকল্পের গবেষক সোফি ডে জানান, নিজের চোখের সামনে নিজের পরম যত্নে গড়া বাড়িটি ভেঙে ফেলার দৃশ্য অনেক পরিবারের জন্য এক চরম মানসিক ট্র্যাজেডি ও শোকের মতো অভিজ্ঞতা। সম্প্রতি হ্যাপিসবার্গ এলাকায় যখন দুই নারীর বাড়ি ভাঙা হচ্ছিল, তখন তারা নির্বাক হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের শেষ স্মৃতিটুকু বিলীন হতে দেখছিলেন, যা যেকোনো মানুষের জন্য এক গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত।

এই চরম মানবিক বিপর্যয়ের মাঝেও এক নতুন ও অদ্ভুত সামাজিক সংকট তৈরি হয়েছে, যাকে আইল অব ওয়াইট কাউন্সিলের পরিবেশ কর্মকর্তারা ‘দুর্যোগ পর্যটন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আধুনিক যুগের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আধিক্য এবং কনটেন্ট নির্মাতারা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের এই ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্ট ও নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার মুহূর্তগুলোকে সস্তা জনপ্রিয়তা বা ভিউ পাওয়ার আশায় ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এটি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মানসিক যন্ত্রণাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যদিও ডেভনের টরক্রস এলাকাকে সমুদ্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় এনে সেখানে প্রায় সাড়ে উনিশ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি সরকারি প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে, তবে ধসে পড়া মূল সড়কটি পুনর্নির্মাণে সরকার আদৌ কোনো সরাসরি অর্থায়ন করবে কি না, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। অন্যদিকে ইয়র্কশায়ারের কিছু উপকূলীয় এলাকাকে স্থায়ীভাবে ‘কোনো সক্রিয় হস্তক্ষেপ নয়’ অঞ্চল হিসেবে ছেড়ে দেওয়ায় সেখানকার মানুষের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বিশ্বব্যাপী পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু সংকট যদি অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে আগামী দিনগুলোতে ব্রিটেনের মানচিত্র থেকে বহু ঐতিহ্যবাহী জনপদ চিরতরে মুছে যাবে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬


সাগরে বিলীন হচ্ছে যুক্তরাজ্যের বাড়ি, সড়ক ও রেললাইন

প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬

featured Image


বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট এবং এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে যুক্তরাজ্যের বিশাল উপকূলীয় অঞ্চল এখন এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। সাগরের করাল গ্রাসে ধীরে ধীরে সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে শত শত মানুষের সাজানো ঘরবাড়ি, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেললাইন। বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আগামী মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির হাজার হাজার বাড়িঘর এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বহু অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অথচ এই চরম জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে দূরদর্শী বা সুদূরপ্রসারী কোনো জাতীয় মহাপরিকল্পনা বা স্থায়ী পদক্ষেপ এখনো চোখে পড়েনি, যা ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে।

প্রকৃতির এই বিধ্বংসী রূপের সবচেয়ে বড় উদাহরণ তৈরি হয়েছে দক্ষিণ ডেভনের টরক্রস ও স্ল্যাপটনের মধ্যবর্তী একটি উপকূলীয় সড়কে, যা স্থানীয়ভাবে ‘স্ল্যাপটন লাইন’ নামে পরিচিত। একপাশে মিষ্টি জলের হ্রদ এবং অন্যপাশে উত্তাল সমুদ্রঘেরা এই দৃষ্টিনন্দন ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি মূলত কিংসব্রিজ ও ডার্টমাউথ শহরকে সংযুক্ত করার একমাত্র মাধ্যম ছিল। চলতি বছরের শীতকালীন এক ভয়াবহ সামুদ্রিক ঝড়ের আঘাতে সড়কটির একটি বড় অংশ ধসে সমুদ্রের নিচে তলিয়ে গেছে। যদিও বহু বছর আগে থেকেই বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা এই সড়কটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছিলেন, তবুও প্রশাসন কোনো আগাম বা কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। সড়কটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ওই অঞ্চলের পর্যটন শিল্প এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার ওপর। সেখানকার একটি স্থানীয় পর্যটন ক্যাম্পসাইটের মালিক গিল স্টেরি অত্যন্ত হতাশা প্রকাশ করে জানান যে, তিন মাস পার হয়ে গেলেও রাস্তাটি মেরামতের জন্য কোনো দৃশ্যমান কাজ শুরু করা হয়নি। তাদের কাছে এখন মনে হচ্ছে যে প্রশাসন তাদের পুরোপুরি ভুলে গেছে।

ডেভন কাউন্টি কাউন্সিলের পরিবহনবিষয়ক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ড্যান থমাস এই সংকটের গভীরতা স্বীকার করে জানিয়েছেন, ধসে পড়া এই সড়কটি পুনর্নির্মাণ করতে প্রায় আঠারো মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল তহবিলের প্রয়োজন, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় কাউন্সিলের ওপর এক বিরাট আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন যে, দেশজুড়ে তৈরি হওয়া এই ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য জাতীয় পর্যায়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বা বড় ধরনের সরকারি গাইডলাইন নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ডেভনই নয়, যুক্তরাজ্যের আরও বেশ কিছু অঞ্চল এখন তীব্র উপকূলীয় ভাঙনের মুখে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইয়র্কশায়ারের ইস্ট রাইডিং, উত্তর নরফোক, সাফোক এবং আইল অব ওয়াইট। বিশেষ করে ইয়র্কশায়ারের হোল্ডারনেস উপকূলে প্রতিবছর গড়ে সাড়ে চার মিটার পর্যন্ত স্থলভাগ সাগরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, যা বর্তমান পুরো ইউরোপের মধ্যে অন্যতম দ্রুততম উপকূল ক্ষয়ের একটি নজিরবিহীন ও বিপজ্জনক উদাহরণ।

সরকারি পরিসংখ্যান ও বৈজ্ঞানিক হিসাব অনুযায়ী, আগামী ৮০ বছরের মধ্যে শুধু উপকূলীয় ভাঙনের কারণেই অন্তত দশ হাজারেরও বেশি স্থায়ী সম্পত্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে, যদিও বেসরকারি কিছু সংস্থার অনুমানে এই সংখ্যা বিশ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন এবং ১১৪ মাইল গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ সাগরের পানিতে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার হুমকির মুখে রয়েছে। এই অবিশ্বাস্য পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়ভাবে কিছু উপকূলরেখা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নেওয়া হলেও সেগুলোর কৌশল মূলত অত্যন্ত সীমিত। এই পরিকল্পনাগুলো মূলত তিনটি ধারায় বিভক্ত—কোথাও সমুদ্রের বাঁধ বা প্রতিরক্ষা জোরদার করে ‘লাইন ধরে রাখা’, কোথাও প্রকৃতিকে মেনে নিয়ে ‘নিয়ন্ত্রিত পুনর্বিন্যাস’ করা এবং অনেক জায়গায় ‘কোনো সক্রিয় হস্তক্ষেপ নয়’ নীতি গ্রহণ করা। অর্থাৎ, কিছু কিছু দুর্গম এলাকায় প্রশাসন উপকূলকে তার নিজের মতো করে ভেঙে সমুদ্রের দিকে সরে যেতে দিচ্ছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এক চরম নির্মম বাস্তবতা।

ব্রিটিশ সরকার বর্তমানে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ছত্রিশ মিলিয়ন পাউন্ডের কয়েকটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু করেছে, যা পরবর্তীতে আরও আঠারো মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ দিয়ে বড় করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ক্ষতিগ্রস্ত ও গৃহহীন হয়ে পড়া মানুষকে ভবিষ্যতের এই চরম বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে সহায়তা করা। তবে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এখনো যেসব মানুষ এই নদী বা সমুদ্র ভাঙনে নিজেদের শেষ সম্বল ঘরবাড়ি হারাচ্ছেন, তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা বিশেষ বীমা ব্যবস্থা রাখা হয়নি। নরফোক এলাকায় পরিচালিত একটি বিশেষ গবেষণা প্রকল্পের গবেষক সোফি ডে জানান, নিজের চোখের সামনে নিজের পরম যত্নে গড়া বাড়িটি ভেঙে ফেলার দৃশ্য অনেক পরিবারের জন্য এক চরম মানসিক ট্র্যাজেডি ও শোকের মতো অভিজ্ঞতা। সম্প্রতি হ্যাপিসবার্গ এলাকায় যখন দুই নারীর বাড়ি ভাঙা হচ্ছিল, তখন তারা নির্বাক হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের শেষ স্মৃতিটুকু বিলীন হতে দেখছিলেন, যা যেকোনো মানুষের জন্য এক গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত।

এই চরম মানবিক বিপর্যয়ের মাঝেও এক নতুন ও অদ্ভুত সামাজিক সংকট তৈরি হয়েছে, যাকে আইল অব ওয়াইট কাউন্সিলের পরিবেশ কর্মকর্তারা ‘দুর্যোগ পর্যটন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আধুনিক যুগের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আধিক্য এবং কনটেন্ট নির্মাতারা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের এই ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্ট ও নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার মুহূর্তগুলোকে সস্তা জনপ্রিয়তা বা ভিউ পাওয়ার আশায় ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এটি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মানসিক যন্ত্রণাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যদিও ডেভনের টরক্রস এলাকাকে সমুদ্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় এনে সেখানে প্রায় সাড়ে উনিশ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি সরকারি প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে, তবে ধসে পড়া মূল সড়কটি পুনর্নির্মাণে সরকার আদৌ কোনো সরাসরি অর্থায়ন করবে কি না, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। অন্যদিকে ইয়র্কশায়ারের কিছু উপকূলীয় এলাকাকে স্থায়ীভাবে ‘কোনো সক্রিয় হস্তক্ষেপ নয়’ অঞ্চল হিসেবে ছেড়ে দেওয়ায় সেখানকার মানুষের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বিশ্বব্যাপী পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু সংকট যদি অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে আগামী দিনগুলোতে ব্রিটেনের মানচিত্র থেকে বহু ঐতিহ্যবাহী জনপদ চিরতরে মুছে যাবে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল