ইয়েমেনে আকস্মিক সামরিক সংঘাতের নতুন বিস্তার দীর্ঘ চার বছরের ভঙ্গুর ও অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিকে সম্পূর্ণ ভেস্তে দিয়েছে। এই আঞ্চলিক উত্তেজনা এখন লোহিত সাগরের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ রুটকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার মধ্যে এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি নজিরবিহীন এবং দ্বিতীয় ধাক্কা দিতে পারে।
সম্প্রতি সানআ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং সৌদি সমর্থিত সরকার আকস্মিক বোমাবর্ষণ করে। তাদের দাবি, ওই রানওয়েতে অবতরণ করতে যাওয়া একটি ইরানি বিমানে সামরিক বিশেষজ্ঞ, ড্রোন প্রযুক্তি এবং অত্যাধুনিক যোগাযোগ সরঞ্জাম ছিল।
অন্যদিকে, হাউথি বিদ্রোহীরা এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, বিমানটিতে তেহরানে প্রয়াত ইরানি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা শেষে ফিরে আসা প্রতিনিধি দল এবং দুই শতাধিক গুরুতর অসুস্থ ইয়েমেনি রোগী ছিলেন। এই বোমাবর্ষণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে হাউথিরা বিমানটি হোদাইদাহ বন্দরে ঘুরিয়ে দেয় এবং সৌদি আরবের আবহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে পাল্টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এই ঘটনার পরপরই হাউথিরা রিয়াদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা প্রশমনের যুগের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘোষণা করে।
লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত মাত্র ২৯ কিলোমিটার চওড়া ‘বাব আল-মানদাব প্রণালী’ এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে বড় ডেথ-ট্র্যাপ বা ফাঁদে পরিণত হতে যাচ্ছে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধের জেরে ইরান ইতিমধ্যে পারস্য উপসাগরের ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দিয়েছে, যার বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজের ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে ইরান ও তার মিত্র হাউথিরা যদি লোহিত সাগরের বাব আল-মানদাবও সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলে, তবে সেটি হবে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি ‘দ্বিমুখী ফাঁদ’ (Pincer Movement)। এই দুই প্রণালী একযোগে বন্ধ হলে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২৫ শতাংশ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করা এই রুটটি বন্ধ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
হরমুজ প্রণালীর সংকট এড়াতে কুয়েত, কাতার বা আমিরাতের মতো দেশগুলো সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলেও সৌদি আরব তাদের ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ ব্যবহার করে আসছিল। সৌদি আরামকো পরিচালিত এই পাইপলাইনের মাধ্যমে দৈনিক ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরে নিয়ে নিরাপদে রপ্তানি করা হচ্ছিল।
তবে হাউথিরা যদি লোহিত সাগরের বাব আল-মানদাব প্রণালী অবরুদ্ধ করে ফেলে, তবে ইয়ানবু বন্দর থেকে এশিয়ার বাজারে যাওয়ার পথটি বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে সৌদি আরবের এই সফল বিকল্প ব্যবস্থাটিও সম্পূর্ণ অকার্যকর প্রমাণিত হবে। বাধ্য হয়ে পণ্যবাহী ও তেলবাহী জাহাজগুলোকে আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ হয়ে পুরো মহাদেশ ঘুরে যেতে হবে। এতে যাতায়াত সময় ১০ থেকে ১৪ দিন বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি জাহাজের পরিচালনা ও বীমা খরচ আকাশচুম্বী হবে, যা বিশ্বজুড়ে এক নজিরবিহীন অর্থনৈতিক মন্দা ডেকে আনতে পারে।

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুলাই ২০২৬
ইয়েমেনে আকস্মিক সামরিক সংঘাতের নতুন বিস্তার দীর্ঘ চার বছরের ভঙ্গুর ও অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিকে সম্পূর্ণ ভেস্তে দিয়েছে। এই আঞ্চলিক উত্তেজনা এখন লোহিত সাগরের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ রুটকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার মধ্যে এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি নজিরবিহীন এবং দ্বিতীয় ধাক্কা দিতে পারে।
সম্প্রতি সানআ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং সৌদি সমর্থিত সরকার আকস্মিক বোমাবর্ষণ করে। তাদের দাবি, ওই রানওয়েতে অবতরণ করতে যাওয়া একটি ইরানি বিমানে সামরিক বিশেষজ্ঞ, ড্রোন প্রযুক্তি এবং অত্যাধুনিক যোগাযোগ সরঞ্জাম ছিল।
অন্যদিকে, হাউথি বিদ্রোহীরা এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, বিমানটিতে তেহরানে প্রয়াত ইরানি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা শেষে ফিরে আসা প্রতিনিধি দল এবং দুই শতাধিক গুরুতর অসুস্থ ইয়েমেনি রোগী ছিলেন। এই বোমাবর্ষণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে হাউথিরা বিমানটি হোদাইদাহ বন্দরে ঘুরিয়ে দেয় এবং সৌদি আরবের আবহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে পাল্টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এই ঘটনার পরপরই হাউথিরা রিয়াদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা প্রশমনের যুগের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘোষণা করে।
লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত মাত্র ২৯ কিলোমিটার চওড়া ‘বাব আল-মানদাব প্রণালী’ এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে বড় ডেথ-ট্র্যাপ বা ফাঁদে পরিণত হতে যাচ্ছে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধের জেরে ইরান ইতিমধ্যে পারস্য উপসাগরের ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দিয়েছে, যার বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজের ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে ইরান ও তার মিত্র হাউথিরা যদি লোহিত সাগরের বাব আল-মানদাবও সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলে, তবে সেটি হবে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি ‘দ্বিমুখী ফাঁদ’ (Pincer Movement)। এই দুই প্রণালী একযোগে বন্ধ হলে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২৫ শতাংশ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করা এই রুটটি বন্ধ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
হরমুজ প্রণালীর সংকট এড়াতে কুয়েত, কাতার বা আমিরাতের মতো দেশগুলো সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলেও সৌদি আরব তাদের ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ ব্যবহার করে আসছিল। সৌদি আরামকো পরিচালিত এই পাইপলাইনের মাধ্যমে দৈনিক ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরে নিয়ে নিরাপদে রপ্তানি করা হচ্ছিল।
তবে হাউথিরা যদি লোহিত সাগরের বাব আল-মানদাব প্রণালী অবরুদ্ধ করে ফেলে, তবে ইয়ানবু বন্দর থেকে এশিয়ার বাজারে যাওয়ার পথটি বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে সৌদি আরবের এই সফল বিকল্প ব্যবস্থাটিও সম্পূর্ণ অকার্যকর প্রমাণিত হবে। বাধ্য হয়ে পণ্যবাহী ও তেলবাহী জাহাজগুলোকে আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ হয়ে পুরো মহাদেশ ঘুরে যেতে হবে। এতে যাতায়াত সময় ১০ থেকে ১৪ দিন বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি জাহাজের পরিচালনা ও বীমা খরচ আকাশচুম্বী হবে, যা বিশ্বজুড়ে এক নজিরবিহীন অর্থনৈতিক মন্দা ডেকে আনতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন