জ্বালানি সংকট উত্তরণে বড় সম্ভাবনা সৌরবিদ্যুৎ, ধীরগতি ও নীতিগত জটিলতায় এখনও পিছিয়ে বাংলাদেশ
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকটে যখন দেশের জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পরিচালনা ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে, তখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি—বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ দেশের বিদ্যুৎ খাতে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব সমাধান হিসেবে সামনে এসেছে। তবে দীর্ঘদিনের নীতিগত উদাসীনতা, দরপত্র ছাড়া চুক্তি বাতিল সংক্রান্ত আইনি জটিলতা এবং জমি ও অর্থায়নের নানা সংকটে এই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। [TECHTARANGA-POST:2917]সরেজমিনে দেখা যায়, ২০২৪ সালে পাবনার ভবানীপুরে পদ্মার চরের ৪০০ একর জমিতে নির্মিত ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। বর্তমানে যেখানে ফার্নেস তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিটে ২৮ টাকার বেশি এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে প্রায় ১৫ টাকা খরচ হয়, সেখানে সৌরবিদ্যুতের খরচ পড়ছে তুলনামূলক অনেক কম। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সম্প্রতি প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুতের দাম ৮ টাকার নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। [TECHTARANGA-POST:2921]সৌরবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এ খাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যানুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা ২৮ হাজার ৩৪৭ মেগাওয়াট হলেও গ্রিড যুক্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানির (সৌর, পানি ও বায়ু) ১৯টি কেন্দ্র থেকে আসে মাত্র ১ হাজার ৮৯ মেগাওয়াট, যা মোট উৎপাদনের মাত্র ৪ শতাংশ। স্রেডার ছাদভিত্তিক বিদ্যুৎ হিসাব করলেও তা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশের বেশি নয়। ২০২১ ও ২০২৫ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি প্রধানত পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে। ২০১০ থেকে ২০২৩ সালে বিদ্যুৎ খাতে ৩ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের মধ্যে নবায়নযোগ্য খাতে এসেছে মাত্র ৩.৩ শতাংশ।বিগত সরকারের আমলে 'বিশেষ বিধান আইনে' উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া অনুমোদন দেওয়া ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মতিপত্র পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাতিল করা হয়। ওই সিদ্ধান্তের পর ১৫টি কোম্পানি আদালতে রিট করে। বাতিল হওয়া কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। তবে বর্তমানে অন্তর্বর্তী ও পরবর্তী উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কম দামে ১১টি কেন্দ্রের চুক্তি ও নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ছাদভিত্তিক সোলার এবং রামপালের মতো খালি সরকারি জমিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দিচ্ছে। [TECHTARANGA-POST:2912]জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বর্তমানে ১৮ লাখ একর অকৃষি জমি এবং ৩৬ লাখ একর খাসজমি রয়েছে। চরের মাত্র ৩০ হাজার একর জমি ব্যবহার করেই প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং যেসব বাতিলকৃত প্রকল্পে অগ্রগতি ও প্রকৃত বিনিয়োগ ছিল, সেগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে দ্রুত উৎপাদনে আনার বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে। দ্রুততম সময়ে প্রশাসনিক ও জমি সংক্রান্ত জটিলতা দূর করা গেলে সৌরবিদ্যুৎই হতে পারে দেশের মূল সাশ্রয়ী জ্বালানি উৎস।