দিকপাল

তোরাজা: যেখানে মৃত্যু শুধু বিদায় নয়, এক বিশাল আয়োজন


ইসরাত জাহান
ইসরাত জাহান
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৬:৪৩ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

তোরাজা: যেখানে মৃত্যু শুধু বিদায় নয়, এক বিশাল আয়োজন
Torajan people of Indonesia, death is part of a spiritual journey

কল্পনা করুন, একটি বাড়িতে পরিবারের একজন সদস্য মারা গেছেন। কিন্তু তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে সমাহিত করা হচ্ছে না। পরিবারের মানুষজন তাঁর পাশে আছেন, তাঁকে ঘিরে চলছে দৈনন্দিন জীবনের নানা আচার। অন্যদিকে, পরিবার প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন এক অনুষ্ঠানের, যার খরচ কখনো কখনো বিপুল পরিমাণ অর্থে পৌঁছাতে পারে। 

এটি কোনো উপন্যাসের গল্প নয়। ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ সুলাওয়েসির তোরাজা অঞ্চলে কিছু পরিবারে এমন ঐতিহ্য আজও দেখা যায়।এখানে মৃত্যু মানেই তাৎক্ষণিক বিদায় নয়। কখনো কখনো শেষ বিদায়ের আগে অপেক্ষা চলে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর। আর সেই বিদায়ের আয়োজন ঘিরে থাকে ভালোবাসা, বিশ্বাস, সামাজিক মর্যাদা এবং বিপুল ব্যয়ের এক জটিল গল্প।

ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ সুলাওয়েসির পাহাড়ি অঞ্চলে বাস করে তোরাজা (Toraja) জনগোষ্ঠী। তাঁদের সংস্কৃতিতে মৃত্যু এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা পৃথিবীর অনেক মানুষের কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে। এখানে একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁকে বিদায় জানানোর অনুষ্ঠান কখনো কখনো অত্যন্ত ব্যয়বহুল, দীর্ঘ এবং বহু মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়।তোরাজা সংস্কৃতিতে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কেবল মৃতদেহ সমাহিত করার আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি পরিবারের ভালোবাসা, সামাজিক মর্যাদা, পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

কেন এত ব্যয়বহুল এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া?

তোরাজা জনগোষ্ঠীর বিখ্যাত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নাম Rambu Solo’। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য, সামাজিক অবস্থান এবং স্থানীয় রীতির ওপর নির্ভর করে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন ছোট বা বিশাল হতে পারে। কিছু বড় অনুষ্ঠানে শত শত অতিথি আসেন এবং একাধিক দিন ধরে নানা আনুষ্ঠানিকতা চলে।

এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো মহিষ। কিছু ঐতিহ্যগত বিশ্বাসে মহিষ মৃত ব্যক্তির পরকালের যাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। পাশাপাশি মহিষের সংখ্যা ও ধরন পরিবারের সামাজিক মর্যাদারও প্রতীক হতে পারে।দামি মহিষের পাশাপাশি অতিথিদের খাবার, থাকার ব্যবস্থা, অস্থায়ী অনুষ্ঠানস্থল এবং অন্যান্য আয়োজনের খরচও পরিবারের ওপর বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। 

 

মৃতদেহ বছরের পর বছর বাড়িতে রাখা হয় কেন?

 

পরিবারের সদস্যরা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও সম্পদ সংগ্রহ করতে সময় নিতে পারেন। এই অপেক্ষার সময় কিছু ঐতিহ্য অনুসরণকারী পরিবার মৃত ব্যক্তিকে to makula’—অর্থাৎ অসুস্থ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁদের রীতি অনুসারে, দেহটি সংরক্ষণ করে বাড়িতে রাখা হয় এবং পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে এমনভাবে আচরণ করেন যেন তিনি এখনো তাঁদের কাছেই আছেন।কিছু ক্ষেত্রে এই অপেক্ষা কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও স্থায়ী হতে পারে। তবে এটি সব পরিবারে একইভাবে পালিত হয় না।

তোরাজাদের ঐতিহ্যবাহী বাড়ির নাম টংকোনান (Tongkonan)। কিছু নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, মৃত ব্যক্তিকে বাড়ির দক্ষিণ প্রান্তের একটি বিশেষ কক্ষে রাখা হতো। এই অবস্থানের সঙ্গে তাঁদের পূর্বপুরুষদের জগৎ ও মৃত্যুসংক্রান্ত ঐতিহ্যগত বিশ্বাসের সম্পর্ক রয়েছে।তোরাজাদের প্রচলিত মহাজাগতিক ধারণায় দক্ষিণ দিককে সাদান নদীর নিম্নপ্রবাহের দিকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই দিকটি মৃত ব্যক্তি ও পূর্বপুরুষদের জগতের প্রতীকী অর্থ বহন করে। তোরাজাদের কিছু ঐতিহ্যগত বিশ্বাসে পূর্বদিক ও সূর্যোদয়ের বিশেষ প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে।

তোরাজাদের ঐতিহ্যে মৃত্যুর পরপরই মৃত ব্যক্তিকে সব সময় সম্পূর্ণ মৃত হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কিছু পরিবার তাঁকে to makula’, অর্থাৎ অসুস্থ বা অসুস্থ অবস্থায় থাকা ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করে।

এই বিশ্বাসের কারণে পরিবারের সদস্যরা মৃত ব্যক্তির সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারেন, যেন তিনি এখনো তাঁদের সঙ্গে বাড়িতে রয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে তাঁকে খাবার ও পানীয় দেওয়া এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলার মতো আচারের কথাও নথিভুক্ত হয়েছে।

তোরাজা জনগোষ্ঠীর কিছু পরিবারের কাছে মৃত্যু মানেই তাৎক্ষণিক বিচ্ছেদ নয়। শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মৃত ব্যক্তিকে তাঁরা অসুস্থ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। তাই তাঁর জন্য খাবার রাখা, তাঁর পাশে থাকা কিংবা তাঁর সঙ্গে কথা বলার মতো আচারের মধ্য দিয়ে তাঁরা যেন বিদায়ের আগের সময়টুকু আরও কিছুদিন ধরে রাখেন।

 

একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ঠিক কী ঘটে?

বড় আকারের Rambu Solo’ অনুষ্ঠানে সাধারণত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় থাকে:

  • অতিথিদের আগমন: আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনেরা শোক প্রকাশ করতে এবং পরিবারের পাশে দাঁড়াতে আসেন।
  • উপহার ও পশু প্রদান: আত্মীয়রা তাঁদের সামর্থ্য অনুযায়ী মহিষ, শূকর বা অন্যান্য উপহার দিতে পারেন।
  • ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান: গান, সমবেত নৃত্য এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতি পালন করা হয়।
  • সমাধিস্থ করা: আনুষ্ঠানিকতা শেষে মৃত ব্যক্তিকে সমাধিস্থ করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে পাহাড়ের পাথর কেটে তৈরি কবর বা পারিবারিক সমাধি ব্যবহার করা হয়।

অনুষ্ঠানের সময়কাল পরিবার, সামাজিক অবস্থান এবং স্থানীয় প্রথা অনুসারে পরিবর্তিত হয়। কিছু বড় অনুষ্ঠান প্রায় সাত দিন ধরে চলতে পারে।

একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার খরচ কত হতে পারে?

২০১৬ সালে National Geographic-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে তোরাজার একটি অভিজাত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য শুধু মহিষের খরচই ৪০০,০০০ মার্কিন ডলারের বেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনে একটি মহিষের গড় মূল্য হিসেবে প্রায় ২০ মিলিয়ন ইন্দোনেশীয় রুপিয়াও উল্লেখ ছিল। এগুলো সেই সময়কার প্রতিবেদনভিত্তিক পরিসংখ্যান, বর্তমান বাজারদর নয়।

এমন বিশাল খরচের অর্থ এই নয় যে তোরাজার প্রতিটি পরিবার এত টাকা ব্যয় করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আয়োজনের আকার পরিবারের সামর্থ্য ও নিজস্ব ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে।এই প্রথার আরেকটি দিক হলো পরিবারের ওপর সামাজিক প্রত্যাশা। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে পারস্পরিক দায়িত্ব, পূর্ববর্তী অনুষ্ঠানে পাওয়া সহায়তার প্রতিদান এবং পরিবারের সম্মান রক্ষার ধারণা বড় আয়োজনের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যয়বহুল অনুষ্ঠানের জন্য কোনো কোনো পরিবার ঋণগ্রস্তও হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, তোরাজার অনেক মানুষের কাছে এই অনুষ্ঠান পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী করা, মৃত ব্যক্তিকে সম্মান জানানো এবং সম্পদ ভাগাভাগি করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

মৃত্যুকে দেখার এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি

তোরাজার সংস্কৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সব সমাজ মৃত্যু ও শোককে একইভাবে দেখে না। কোথাও সংক্ষিপ্ত আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে বিদায় জানানো হয়, আবার কোথাও পরিবারের সবাইকে একত্রিত করে দীর্ঘ সময় ধরে বিদায়ের আয়োজন করা হয়। তোরাজার মানুষের কাছে Rambu Solo’ শুধু একজন মৃত ব্যক্তির শেষকৃত্য নয়; এটি পূর্বপুরুষদের স্মরণ, আত্মীয়তার বন্ধন এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও প্রকাশ।তাঁদের এই ঐতিহ্য আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে: একজন প্রিয় মানুষকে শেষ সম্মান জানাতে একটি পরিবার কত দূর যেতে প্রস্তুত? এই প্রশ্নের উত্তর প্রতিটি পরিবার ও সংস্কৃতিতে আলাদা। আর তোরাজার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সেই বৈচিত্র্যেরই একটি অসাধারণ উদাহরণ।

 

বিষয় : তোরাজা: যেখানে মৃত্যু শুধু বিদায় নয়, এক বিশাল আয়োজন

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬


তোরাজা: যেখানে মৃত্যু শুধু বিদায় নয়, এক বিশাল আয়োজন

প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

কল্পনা করুন, একটি বাড়িতে পরিবারের একজন সদস্য মারা গেছেন। কিন্তু তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে সমাহিত করা হচ্ছে না। পরিবারের মানুষজন তাঁর পাশে আছেন, তাঁকে ঘিরে চলছে দৈনন্দিন জীবনের নানা আচার। অন্যদিকে, পরিবার প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন এক অনুষ্ঠানের, যার খরচ কখনো কখনো বিপুল পরিমাণ অর্থে পৌঁছাতে পারে। 

এটি কোনো উপন্যাসের গল্প নয়। ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ সুলাওয়েসির তোরাজা অঞ্চলে কিছু পরিবারে এমন ঐতিহ্য আজও দেখা যায়।এখানে মৃত্যু মানেই তাৎক্ষণিক বিদায় নয়। কখনো কখনো শেষ বিদায়ের আগে অপেক্ষা চলে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর। আর সেই বিদায়ের আয়োজন ঘিরে থাকে ভালোবাসা, বিশ্বাস, সামাজিক মর্যাদা এবং বিপুল ব্যয়ের এক জটিল গল্প।

ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ সুলাওয়েসির পাহাড়ি অঞ্চলে বাস করে তোরাজা (Toraja) জনগোষ্ঠী। তাঁদের সংস্কৃতিতে মৃত্যু এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা পৃথিবীর অনেক মানুষের কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে। এখানে একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁকে বিদায় জানানোর অনুষ্ঠান কখনো কখনো অত্যন্ত ব্যয়বহুল, দীর্ঘ এবং বহু মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়।তোরাজা সংস্কৃতিতে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কেবল মৃতদেহ সমাহিত করার আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি পরিবারের ভালোবাসা, সামাজিক মর্যাদা, পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

কেন এত ব্যয়বহুল এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া?

তোরাজা জনগোষ্ঠীর বিখ্যাত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নাম Rambu Solo’। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য, সামাজিক অবস্থান এবং স্থানীয় রীতির ওপর নির্ভর করে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন ছোট বা বিশাল হতে পারে। কিছু বড় অনুষ্ঠানে শত শত অতিথি আসেন এবং একাধিক দিন ধরে নানা আনুষ্ঠানিকতা চলে।

এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো মহিষ। কিছু ঐতিহ্যগত বিশ্বাসে মহিষ মৃত ব্যক্তির পরকালের যাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। পাশাপাশি মহিষের সংখ্যা ও ধরন পরিবারের সামাজিক মর্যাদারও প্রতীক হতে পারে।দামি মহিষের পাশাপাশি অতিথিদের খাবার, থাকার ব্যবস্থা, অস্থায়ী অনুষ্ঠানস্থল এবং অন্যান্য আয়োজনের খরচও পরিবারের ওপর বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। 

 

মৃতদেহ বছরের পর বছর বাড়িতে রাখা হয় কেন?

 

পরিবারের সদস্যরা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও সম্পদ সংগ্রহ করতে সময় নিতে পারেন। এই অপেক্ষার সময় কিছু ঐতিহ্য অনুসরণকারী পরিবার মৃত ব্যক্তিকে to makula’—অর্থাৎ অসুস্থ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁদের রীতি অনুসারে, দেহটি সংরক্ষণ করে বাড়িতে রাখা হয় এবং পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে এমনভাবে আচরণ করেন যেন তিনি এখনো তাঁদের কাছেই আছেন।কিছু ক্ষেত্রে এই অপেক্ষা কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও স্থায়ী হতে পারে। তবে এটি সব পরিবারে একইভাবে পালিত হয় না।

তোরাজাদের ঐতিহ্যবাহী বাড়ির নাম টংকোনান (Tongkonan)। কিছু নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, মৃত ব্যক্তিকে বাড়ির দক্ষিণ প্রান্তের একটি বিশেষ কক্ষে রাখা হতো। এই অবস্থানের সঙ্গে তাঁদের পূর্বপুরুষদের জগৎ ও মৃত্যুসংক্রান্ত ঐতিহ্যগত বিশ্বাসের সম্পর্ক রয়েছে।তোরাজাদের প্রচলিত মহাজাগতিক ধারণায় দক্ষিণ দিককে সাদান নদীর নিম্নপ্রবাহের দিকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই দিকটি মৃত ব্যক্তি ও পূর্বপুরুষদের জগতের প্রতীকী অর্থ বহন করে। তোরাজাদের কিছু ঐতিহ্যগত বিশ্বাসে পূর্বদিক ও সূর্যোদয়ের বিশেষ প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে।

তোরাজাদের ঐতিহ্যে মৃত্যুর পরপরই মৃত ব্যক্তিকে সব সময় সম্পূর্ণ মৃত হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কিছু পরিবার তাঁকে to makula’, অর্থাৎ অসুস্থ বা অসুস্থ অবস্থায় থাকা ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করে।

এই বিশ্বাসের কারণে পরিবারের সদস্যরা মৃত ব্যক্তির সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারেন, যেন তিনি এখনো তাঁদের সঙ্গে বাড়িতে রয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে তাঁকে খাবার ও পানীয় দেওয়া এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলার মতো আচারের কথাও নথিভুক্ত হয়েছে।

তোরাজা জনগোষ্ঠীর কিছু পরিবারের কাছে মৃত্যু মানেই তাৎক্ষণিক বিচ্ছেদ নয়। শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মৃত ব্যক্তিকে তাঁরা অসুস্থ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। তাই তাঁর জন্য খাবার রাখা, তাঁর পাশে থাকা কিংবা তাঁর সঙ্গে কথা বলার মতো আচারের মধ্য দিয়ে তাঁরা যেন বিদায়ের আগের সময়টুকু আরও কিছুদিন ধরে রাখেন।

 

একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ঠিক কী ঘটে?

বড় আকারের Rambu Solo’ অনুষ্ঠানে সাধারণত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় থাকে:

  • অতিথিদের আগমন: আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনেরা শোক প্রকাশ করতে এবং পরিবারের পাশে দাঁড়াতে আসেন।
  • উপহার ও পশু প্রদান: আত্মীয়রা তাঁদের সামর্থ্য অনুযায়ী মহিষ, শূকর বা অন্যান্য উপহার দিতে পারেন।
  • ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান: গান, সমবেত নৃত্য এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতি পালন করা হয়।
  • সমাধিস্থ করা: আনুষ্ঠানিকতা শেষে মৃত ব্যক্তিকে সমাধিস্থ করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে পাহাড়ের পাথর কেটে তৈরি কবর বা পারিবারিক সমাধি ব্যবহার করা হয়।

অনুষ্ঠানের সময়কাল পরিবার, সামাজিক অবস্থান এবং স্থানীয় প্রথা অনুসারে পরিবর্তিত হয়। কিছু বড় অনুষ্ঠান প্রায় সাত দিন ধরে চলতে পারে।

একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার খরচ কত হতে পারে?

২০১৬ সালে National Geographic-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে তোরাজার একটি অভিজাত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য শুধু মহিষের খরচই ৪০০,০০০ মার্কিন ডলারের বেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনে একটি মহিষের গড় মূল্য হিসেবে প্রায় ২০ মিলিয়ন ইন্দোনেশীয় রুপিয়াও উল্লেখ ছিল। এগুলো সেই সময়কার প্রতিবেদনভিত্তিক পরিসংখ্যান, বর্তমান বাজারদর নয়।

এমন বিশাল খরচের অর্থ এই নয় যে তোরাজার প্রতিটি পরিবার এত টাকা ব্যয় করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আয়োজনের আকার পরিবারের সামর্থ্য ও নিজস্ব ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে।এই প্রথার আরেকটি দিক হলো পরিবারের ওপর সামাজিক প্রত্যাশা। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে পারস্পরিক দায়িত্ব, পূর্ববর্তী অনুষ্ঠানে পাওয়া সহায়তার প্রতিদান এবং পরিবারের সম্মান রক্ষার ধারণা বড় আয়োজনের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যয়বহুল অনুষ্ঠানের জন্য কোনো কোনো পরিবার ঋণগ্রস্তও হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, তোরাজার অনেক মানুষের কাছে এই অনুষ্ঠান পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী করা, মৃত ব্যক্তিকে সম্মান জানানো এবং সম্পদ ভাগাভাগি করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

মৃত্যুকে দেখার এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি

তোরাজার সংস্কৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সব সমাজ মৃত্যু ও শোককে একইভাবে দেখে না। কোথাও সংক্ষিপ্ত আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে বিদায় জানানো হয়, আবার কোথাও পরিবারের সবাইকে একত্রিত করে দীর্ঘ সময় ধরে বিদায়ের আয়োজন করা হয়। তোরাজার মানুষের কাছে Rambu Solo’ শুধু একজন মৃত ব্যক্তির শেষকৃত্য নয়; এটি পূর্বপুরুষদের স্মরণ, আত্মীয়তার বন্ধন এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও প্রকাশ।তাঁদের এই ঐতিহ্য আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে: একজন প্রিয় মানুষকে শেষ সম্মান জানাতে একটি পরিবার কত দূর যেতে প্রস্তুত? এই প্রশ্নের উত্তর প্রতিটি পরিবার ও সংস্কৃতিতে আলাদা। আর তোরাজার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সেই বৈচিত্র্যেরই একটি অসাধারণ উদাহরণ।

 


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল