দিকপাল

যুক্তরাষ্ট্র ইরান উত্তেজনার মাঝে সৌদি আরবের পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় পাকিস্তানের


শামিমা লিয়া
শামিমা লিয়া আন্তর্জাতিক ডেস্ক এডিটর
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬ | ১০:৫৯ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্র ইরান উত্তেজনার মাঝে সৌদি আরবের পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় পাকিস্তানের

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সৌদি আরবকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তান ইরানকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—সৌদি আরবের ওপর যেকোনো হামলা ইসলামাবাদের জন্য ‘রেড লাইন’। এমন হামলাকে পাকিস্তানের নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে পাকিস্তানের সরকারি কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, হুথিদের সর্বশেষ হামলা ইসলামাবাদের উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাই নয়, পাকিস্তানও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এই সংকটে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল পাকিস্তান। একই সময়ে দেশটি সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় রিয়াদে হাজারো সেনাসদস্য ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন রেখেছে। ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে ইসলামাবাদের সামনে কূটনৈতিক ও সামরিক—উভয় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, পাকিস্তানের বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে ইরানকে জানিয়ে দিয়েছে যে সৌদি আরবের ওপর হামলা মানেই পাকিস্তানের ওপর হামলা। এটি ইসলামাবাদের জন্য একটি ‘রেড লাইন’।

চলতি বছরের শুরুতে ইরানের সামরিক পদক্ষেপ নিয়েও পাকিস্তান উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তবে কর্মকর্তাদের মতে, হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তের কাছাকাছি পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন থাকায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তাদের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

হুথিরা অভিযোগ করেছে, সৌদি আরব ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে তারা সৌদি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। যদিও এখন পর্যন্ত হামলা একটি ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, তবু চার বছর ধরে চলা সীমান্তবর্তী শান্ত পরিস্থিতি এতে ভেঙে গেছে।

পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, এত দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি হবে বলে ইসলামাবাদ ধারণা করেনি। অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি জেনারেল গুলাম মুস্তাফা বলেছেন, দেশটির নেতৃত্ব এখনো কূটনৈতিকভাবে সব পক্ষকে সংযত রাখার চেষ্টা করছে। তবে হুথিরা যদি সৌদি আরবের অভ্যন্তরে আরও বিস্তৃত হামলা চালায়, তাহলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে।

পাকিস্তানের কর্মকর্তারা ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের মতো রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অবস্থানের পার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আলীর ভাষায়, ইরানে কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামরিক বাহিনীর প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে এবং ইসলামাবাদও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।

সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রভাব পড়ে কূটনৈতিক যোগাযোগেও। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফর দুই দিন পিছিয়ে যায়। পরে প্রতিনিধি দলটি পাকিস্তানে পৌঁছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপ নিয়ে আলোচনা করে।

এদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেছেন, টেকসই সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনার কোনো বিকল্প নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ভূমিকা দেশটির জন্য যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি বাড়িয়ে দিচ্ছে ঝুঁকিও। সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা—এই দুই অবস্থানকে একসঙ্গে ধরে রাখা ইসলামাবাদের জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।

পাকিস্তানের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার উদ্যোগ থেকে সরে আসার কোনো পরিকল্পনা নেই। কারণ এই উদ্যোগে পাকিস্তানের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত।

তবে মধ্যস্থতা-সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্র স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যুদ্ধের অবসান সবার জন্যই কাম্য। কিন্তু সৌদি আরব যদি পাকিস্তানের সহায়তা চায়, তাহলে ইসলামাবাদ তাদের পাশেই দাঁড়াবে—এ বিষয়ে কোনো দ্বিধা নেই।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬


যুক্তরাষ্ট্র ইরান উত্তেজনার মাঝে সৌদি আরবের পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় পাকিস্তানের

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুলাই ২০২৬

featured Image

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সৌদি আরবকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তান ইরানকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—সৌদি আরবের ওপর যেকোনো হামলা ইসলামাবাদের জন্য ‘রেড লাইন’। এমন হামলাকে পাকিস্তানের নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে পাকিস্তানের সরকারি কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, হুথিদের সর্বশেষ হামলা ইসলামাবাদের উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাই নয়, পাকিস্তানও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এই সংকটে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল পাকিস্তান। একই সময়ে দেশটি সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় রিয়াদে হাজারো সেনাসদস্য ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন রেখেছে। ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে ইসলামাবাদের সামনে কূটনৈতিক ও সামরিক—উভয় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, পাকিস্তানের বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে ইরানকে জানিয়ে দিয়েছে যে সৌদি আরবের ওপর হামলা মানেই পাকিস্তানের ওপর হামলা। এটি ইসলামাবাদের জন্য একটি ‘রেড লাইন’।

চলতি বছরের শুরুতে ইরানের সামরিক পদক্ষেপ নিয়েও পাকিস্তান উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তবে কর্মকর্তাদের মতে, হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তের কাছাকাছি পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন থাকায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তাদের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

হুথিরা অভিযোগ করেছে, সৌদি আরব ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে তারা সৌদি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। যদিও এখন পর্যন্ত হামলা একটি ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, তবু চার বছর ধরে চলা সীমান্তবর্তী শান্ত পরিস্থিতি এতে ভেঙে গেছে।

পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, এত দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি হবে বলে ইসলামাবাদ ধারণা করেনি। অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি জেনারেল গুলাম মুস্তাফা বলেছেন, দেশটির নেতৃত্ব এখনো কূটনৈতিকভাবে সব পক্ষকে সংযত রাখার চেষ্টা করছে। তবে হুথিরা যদি সৌদি আরবের অভ্যন্তরে আরও বিস্তৃত হামলা চালায়, তাহলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে।

পাকিস্তানের কর্মকর্তারা ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের মতো রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অবস্থানের পার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আলীর ভাষায়, ইরানে কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামরিক বাহিনীর প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে এবং ইসলামাবাদও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।

সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রভাব পড়ে কূটনৈতিক যোগাযোগেও। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফর দুই দিন পিছিয়ে যায়। পরে প্রতিনিধি দলটি পাকিস্তানে পৌঁছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপ নিয়ে আলোচনা করে।

এদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেছেন, টেকসই সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনার কোনো বিকল্প নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ভূমিকা দেশটির জন্য যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি বাড়িয়ে দিচ্ছে ঝুঁকিও। সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা—এই দুই অবস্থানকে একসঙ্গে ধরে রাখা ইসলামাবাদের জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।

পাকিস্তানের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার উদ্যোগ থেকে সরে আসার কোনো পরিকল্পনা নেই। কারণ এই উদ্যোগে পাকিস্তানের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত।

তবে মধ্যস্থতা-সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্র স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যুদ্ধের অবসান সবার জন্যই কাম্য। কিন্তু সৌদি আরব যদি পাকিস্তানের সহায়তা চায়, তাহলে ইসলামাবাদ তাদের পাশেই দাঁড়াবে—এ বিষয়ে কোনো দ্বিধা নেই।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল