দিকপাল

যক্ষ্মার টিকা কি বদলে দেবে ডায়াবেটিস চিকিৎসার ধারা?


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬ | ০৩:১০ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

যক্ষ্মার টিকা কি বদলে দেবে ডায়াবেটিস চিকিৎসার ধারা?

যক্ষ্মা প্রতিরোধের শতবর্ষী পুরোনো টিকা বিসিজি এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ যক্ষ্মা প্রতিরোধের পাশাপাশি এই টিকাটি এখন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। মার্কিন চিকিৎসকদের সাম্প্রতিক দাবি অনুযায়ী, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নতুন করে বিন্যাস করার মাধ্যমে এই টিকা অটোইমিউন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং কৃত্রিম ইনসুলিনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে অসাধারণ সাফল্য দেখাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্সে আয়োজিত আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের এক বিশেষ সভায় ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের বিশিষ্ট গবেষক ডক্টর ডেনিস ফস্টম্যান তার গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল তুলে ধরেন। গবেষণার তথ্যমতে, টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগে মানুষের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভুলবশত অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী বিটা কোষগুলোকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে ফেলে। বিসিজি টিকা শরীরের এই ক্ষতিকর অটোইমিউন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে অগ্ন্যাশয়কে পুনরায় সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের ওপর এই টিকার কয়েকটি ডোজ প্রয়োগ করে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, যারা নিয়মিত টিকা নিয়েছেন তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রয়েছে।

গবেষণার প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে যে, যারা বিসিজি টিকা গ্রহণ করেছেন, তারা সাধারণ রোগীদের তুলনায় প্রায় ১৮৪ শতাংশ বেশি সময় রক্তে সুস্থ ও স্বাভাবিক শর্করার মাত্রা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এছাড়া চিকিৎসকরা প্রাপ্তবয়স্কদের সুপ্ত অটোইমিউন ডায়াবেটিস বা টাইপ ১.৫ ডায়াবেটিস রোগীদের ওপরও এই টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছেন। সেখানে দেখা গেছে, টিকাটি সরাসরি সুগার না কমালেও রোগের বিস্তার বা শরীরে এর তীব্রতা বৃদ্ধির গতিকে অনেকটাই ধীর করে দিয়েছে। সবচেয়ে আশার কথা হলো, টিকা গ্রহণের পাঁচ বছর পরও রোগীদের অগ্ন্যাশয় থেকে প্রাকৃতিকভাবে ইনসুলিন উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়নি। উল্টোদিকে, যারা টিকা গ্রহণ করেননি তাদের ক্ষেত্রে ইনসুলিনের প্রয়োজনীয়তা প্রায় ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শরীরের সামগ্রিক অবস্থার অবনতিরই ইঙ্গিত দেয়।

১৯২০ সালের দিকে আবিষ্কৃত বিসিজি টিকা ডায়াবেটিস সম্পূর্ণ নিরাময় করবে এমনটি এখনই দাবি না করা হলেও, এটি যে ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনাকে সহজতর করবে তা নিশ্চিত। দীর্ঘমেয়াদী এই চিকিৎসার ফলে রোগীদের নিয়মিত ইনসুলিন নেওয়ার কষ্ট ও শারীরিক জটিলতা অনেকখানি কমে আসবে, যা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে। বর্তমানে বিসিজি টিকার এই নতুন গুনাগুণ কাজে লাগিয়ে আলঝেইমার রোগের চিকিৎসার জন্যও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। তবে এই সাফল্যের পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে বাণিজ্যিক অনাগ্রহ। অত্যন্ত সাশ্রয়ী এবং এক ডলারের কম মূল্যের এই টিকার পেটেন্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বড় বড় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এর পেছনে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তা সত্ত্বেও চিকিৎসকরা আশাবাদী এবং তারা এই চিকিৎসাপদ্ধতিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে বর্তমানে আরও বড় পরিসরে এবং নিবিড়ভাবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


যক্ষ্মার টিকা কি বদলে দেবে ডায়াবেটিস চিকিৎসার ধারা?

প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬

featured Image

যক্ষ্মা প্রতিরোধের শতবর্ষী পুরোনো টিকা বিসিজি এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ যক্ষ্মা প্রতিরোধের পাশাপাশি এই টিকাটি এখন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। মার্কিন চিকিৎসকদের সাম্প্রতিক দাবি অনুযায়ী, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নতুন করে বিন্যাস করার মাধ্যমে এই টিকা অটোইমিউন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং কৃত্রিম ইনসুলিনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে অসাধারণ সাফল্য দেখাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্সে আয়োজিত আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের এক বিশেষ সভায় ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের বিশিষ্ট গবেষক ডক্টর ডেনিস ফস্টম্যান তার গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল তুলে ধরেন। গবেষণার তথ্যমতে, টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগে মানুষের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভুলবশত অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী বিটা কোষগুলোকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে ফেলে। বিসিজি টিকা শরীরের এই ক্ষতিকর অটোইমিউন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে অগ্ন্যাশয়কে পুনরায় সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের ওপর এই টিকার কয়েকটি ডোজ প্রয়োগ করে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, যারা নিয়মিত টিকা নিয়েছেন তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রয়েছে।

গবেষণার প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে যে, যারা বিসিজি টিকা গ্রহণ করেছেন, তারা সাধারণ রোগীদের তুলনায় প্রায় ১৮৪ শতাংশ বেশি সময় রক্তে সুস্থ ও স্বাভাবিক শর্করার মাত্রা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এছাড়া চিকিৎসকরা প্রাপ্তবয়স্কদের সুপ্ত অটোইমিউন ডায়াবেটিস বা টাইপ ১.৫ ডায়াবেটিস রোগীদের ওপরও এই টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছেন। সেখানে দেখা গেছে, টিকাটি সরাসরি সুগার না কমালেও রোগের বিস্তার বা শরীরে এর তীব্রতা বৃদ্ধির গতিকে অনেকটাই ধীর করে দিয়েছে। সবচেয়ে আশার কথা হলো, টিকা গ্রহণের পাঁচ বছর পরও রোগীদের অগ্ন্যাশয় থেকে প্রাকৃতিকভাবে ইনসুলিন উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়নি। উল্টোদিকে, যারা টিকা গ্রহণ করেননি তাদের ক্ষেত্রে ইনসুলিনের প্রয়োজনীয়তা প্রায় ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শরীরের সামগ্রিক অবস্থার অবনতিরই ইঙ্গিত দেয়।

১৯২০ সালের দিকে আবিষ্কৃত বিসিজি টিকা ডায়াবেটিস সম্পূর্ণ নিরাময় করবে এমনটি এখনই দাবি না করা হলেও, এটি যে ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনাকে সহজতর করবে তা নিশ্চিত। দীর্ঘমেয়াদী এই চিকিৎসার ফলে রোগীদের নিয়মিত ইনসুলিন নেওয়ার কষ্ট ও শারীরিক জটিলতা অনেকখানি কমে আসবে, যা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে। বর্তমানে বিসিজি টিকার এই নতুন গুনাগুণ কাজে লাগিয়ে আলঝেইমার রোগের চিকিৎসার জন্যও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। তবে এই সাফল্যের পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে বাণিজ্যিক অনাগ্রহ। অত্যন্ত সাশ্রয়ী এবং এক ডলারের কম মূল্যের এই টিকার পেটেন্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বড় বড় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এর পেছনে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তা সত্ত্বেও চিকিৎসকরা আশাবাদী এবং তারা এই চিকিৎসাপদ্ধতিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে বর্তমানে আরও বড় পরিসরে এবং নিবিড়ভাবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল