পোশাক খাতে শ্রমের অবমূল্যায়ন
বিস্ময়! এ কোন সময়, এ কেমন সমাজ! শ্রমিকের ঘামে গড়ে ওঠে সভ্যতার পোশাক শিল্পপ্রাসাদ, অথচ সেই শ্রমিকের বুকেই নামে আঘাত, যে হাতে গড়ে সুখের বাগান, সে হাতেই আজ লাঠির আঘাত! এ কেমন বিচার, এ কেমন সুবিচার?যে শ্রমিকের ঘামে সচল কলকারখানা, যার শ্রমে আলোকিত নগর, সাজে অট্টালিকা, যার ঘামে ভেজে শিল্পের চাকা, সেই শ্রমিকের ঘরেই কেন অভাবের হাহাকার? কেন তার সন্তানের মুখে অন্নের দীর্ঘশ্বাস? কেন ন্যায্য মজুরি চাইতে গিয়ে তাকে হতে হয় নির্যাতনের শিকার?হে শিল্পপতি! একবার কি তাকিয়ে দেখেছ শ্রমিকের চোখের দিকে? সেখানে জমে আছে কত না বলা কান্না, কত স্বপ্নের মৃত্যু, কত বঞ্চনার ইতিহাস! তোমার সুখের প্রতিটি স্পন্দনের মূলে আছে শ্রমিকের ঘাম, তোমার বিলাসী জীবনের প্রতিটি আয়োজনে মিশে আছে তাদের রক্তজল করা পরিশ্রম। তবু কেন তোমার হৃদয়ে মানবতার সাড়া নেই? কেন তাদের ন্যায্য পাওনা দিতে এত অনীহা? মনে রেখো— শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার প্রাপ্য মূল্য বুঝিয়ে দেওয়া সভ্যতার দাবি।হে সুশীল সমাজ! আজ তোমাদের কণ্ঠে প্রতিবাদের ভাষা নেই কেন? হে আইন সমাজ! অন্যায়ের সামনে তোমাদের দৃষ্টি এত অসহায় কেন? হে সংবাদমাধ্যম! তোমাদের ক্যামেরায় কি আর ধরা পড়ে না শ্রমিকের কান্না, নির্যাতনের দৃশ্য? তোমাদের কলমে কি কালি ফুরিয়ে গেছে? নাকি সত্যের সংবাদ আজ ক্ষমতার দরজায় বন্দি হয়ে আছে?শ্রমিকেরা প্রতিদিন ঠকছে, বঞ্চনার আগুনে পুড়ছে দেশজুড়ে। কেউ হারাচ্ছে মজুরি, কেউ হারাচ্ছে অধিকার, কেউবা হারাচ্ছে বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। অথচ যারা নীতির কথা বলে, মানবতার বুলি আওড়ায়, তারাই আজ নীরবতার দেয়ালে বন্দি! কোথায় সেই বিবেক? কোথায় ন্যায়বিচার? আর কত রক্ত ঝরলে থামবে শ্রমের অবমূল্যায়ন?মনে রেখো, হে ক্ষমতাধর, শ্রমিক কোনো করুণার পাত্র নয়, সে তার শ্রমের ন্যায্য অধিকার চায়। সে ভিক্ষা চায় না, চায় না অনুগ্রহ; চায় ঘাম ঝরানো শ্রমের সঠিক মূল্য, চায় নিরাপদ কর্মস্থল, চায় মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার একটু অধিকার।যে হাতে তৈরি হয় দেশের সমৃদ্ধি, সে হাত কেন থাকবে শূন্য? যে কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে অর্থনীতি, সে কাঁধ কেন বহন করবে বঞ্চনার বোঝা? যে মানুষটি গড়ে তোলে আগামীর বাংলাদেশ, তার বর্তমান কেন হবে এত অন্ধকার?আর নয় অবহেলা, আর নয় নির্যাতন, আর নয় শ্রমিকের অধিকার হরণের আয়োজন। শ্রমিকের মুখে হাসি ফুটুক, ঘরে ঘরে ফিরুক স্বস্তি, ন্যায্য মজুরিতে বাঁচুক প্রতিটি পরিবার, মানবিক হোক কর্মক্ষেত্র, জাগুক বিবেকের শক্তি।মনে রেখো— শ্রমিক বাঁচলে বাঁচবে শিল্প, শিল্প বাঁচলে বাঁচবে দেশ। শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হলে অন্যায়ের আন্দোলন শেষ হবে।যারা শ্রমিকের অধিকার কেড়ে নেয়, যারা শ্রমের ন্যায্য মূল্য দিতে চায় না, তারা উন্নয়নের পথে বাধা, তারা মানবতার কাছে দায়বদ্ধ। আজ সময় এসেছে জেগে ওঠার, আজ সময় এসেছে বিবেকের দরজা খোলার। শ্রমিকের ঘামে যে দেশের উন্নয়ন, সেই দেশে শ্রমিকের চোখে জল কেন? সরকারের উচিত, শ্রমিকদের এই দুঃসময়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে বেতন-সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান করা।শেষে বলতে চাই, শ্রমিকের ঘাম কোনো করুণা নয়, শ্রমিকের অধিকার কোনো দয়া নয়। শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন চাই— এটাই হোক সভ্য সমাজের অঙ্গীকার, এটাই হোক আগামীর বাংলাদেশের অধিকার।