প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬
রামিসা হত্যা: ‘আর কোনো বাবা-মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়’
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
রাজধানীর পল্লবী এলাকায় আট বছর বয়সী অবুজ শিশু রামিসাকে বর্বরোচিতভাবে ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তার ভাগ্যাহত বাবা এবং এই মামলার প্রধান বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা। নিজের একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে চরম শোকগ্রস্ত এই পিতা তীব্র ক্ষোভ ও আকুতি প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অপরাধীদের ছাড় দেওয়ার কারণে আর কোনো বাবা-মায়ের বুক যেন এভাবে অকালে খালি না হয়। সন্তান হারানোর এই সুতীব্র বেদনা যে কতটা ভয়ঙ্কর, তা কেবল একজন ভুক্তভোগী পিতাই উপলব্ধি করতে পারেন।আজ মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে প্রথম সাক্ষী হিসেবে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে নিজের জবানবন্দি ও সাক্ষ্য দিতে এসে আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সামনে তিনি এসব কথা বলেন। এদিন ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারক মাসরুর সালেকীন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে রামিসার বাবার আবেগঘন ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করেন। আদালতে নিজের জবানবন্দি দেওয়ার পর রামিসার বাবা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, তিনি দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে আদালতের কাছে তার নিষ্পাপ ও অবুজ সন্তানের ওপর সংঘটিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং বর্বরোচিত ধর্ষণের ঘটনার সম্পূর্ণ সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন। একইসঙ্গে এই স্পর্শকাতর মামলার আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিতের বাস্তব বাস্তবায়ন দেখতে চান।তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সমাজে এই ধরনের অপরাধীদের যদি কঠোর শাস্তি না দেওয়া হয়, তবে অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়বে। তিনি চান না যে আর কোনো অসহায় বাবা-মায়ের বুক এভাবে অকালে খালি হোক, কোনো পরিবার যেন সন্তান হারানোর তীব্র যন্ত্রণায় ভেতরে ভেতরে ভেঙে না পড়ে কিংবা নিষ্পাপ সন্তানের বিচার চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আদালতের বারান্দায় বারান্দায় চোখের জল ফেলে দাঁড়াতে বাধ্য হোক। এই একটি বিচার যেন সমাজের অন্যান্য অপরাধীদের জন্য একটি কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করে।রামিসার বাবার প্রথম সাক্ষ্যগ্রহণের পাশাপাশি আজ আদালতে আরও যাদের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে তলব করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে রয়েছেন এই মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানার অপরাধ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডকারী বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট, শিশুটির মরদেহের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক, ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহকারী ফরেনসিক কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রতিবেশী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। এর আগে আজ সকালে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে মামলার প্রধান ঘাতক আসামি সোহেল রানাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এবং তার অপরাধের সহযোগী স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে আদালত প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয়। শুনানির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে তাদের ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সুরক্ষিত হাজতখানায় বন্দি রাখা হয়েছিল।উল্লেখ্য, গতকাল সোমবার এই ট্রাইব্যুনাল শুনানির পর প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের বিরুদ্ধে আনীত সমস্ত অভিযোগ আমলে নিয়ে সুনির্দিষ্ট চার্জগঠন বা অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর আইনি আদেশ প্রদান করেন। একই সঙ্গে বিজ্ঞ আদালত এই চাঞ্চল্যকর মামলার সত্যতা ও অপরাধ প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১৭ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে ক্রমান্বয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আদালতে হাজির হওয়ার বিশেষ সমন বা তলবনামা জারি করেন।দালিলিক মামলার বিবরণ ও এজাহার থেকে জানা যায়, গত উনিশে মে প্রতিবেশী ফ্ল্যাটের দুশ্চরিত্র ভাড়াটিয়া সোহেল রানা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী ছোট্ট রামিসা আক্তারকে কৌশলে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিজের জনশূন্য ঘরে নিয়ে যায়। সেখানে সে শিশুটির ওপর পাশবিক ও বর্বরোচিত উপায়ে ধর্ষণ চালায়। পরবর্তীতে নিজের এই ভয়ঙ্কর অপরাধ ও পাপের চিহ্ন সম্পূর্ণ ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় শিশুটিকে গলা কেটে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং পরবর্তীতে প্রমাণ লোপাটের জন্য লাশটি টুকরো টুকরো করার চেষ্টা চালায়। এই লোমহর্ষক ঘটনার পরদিন স্থানীয় থানা পুলিশ ও প্রতিবেশীরা সোহেলের বন্ধ ঘর থেকে রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে।ঘটনার দিনই পুলিশ তৎপরতা চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্নাকে হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হলেও, মূল ঘাতক সোহেল রানা ঘরের জানালার লোহার গ্রিল কেটে কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে পল্লবী থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল উন্নত তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ সহায়তা নিয়ে এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা নামক এলাকা থেকে ঘাতক সোহেল রানাকে লোহার হাতকড়াসহ গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এই পাশবিক ঘটনার পর চব্বিশে মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও খুনের অকাট্য প্রমাণাদিসহ নিখুঁত অভিযোগপত্র দাখিল করেন, যার সূত্র ধরেই আজ আদালতে এই প্রথম সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব সম্পন্ন হলো।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল