প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬
আদ-দ্বীন হাসপাতালের অগ্নি নিরাপত্তা লাইসেন্স নেই: ফায়ার সার্ভিস
আকাশ মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার ||
রাজধানীর আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত সপ্তাহে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল। এবার সেই রেশ কাটতে না কাটতেই হাসপাতালটির বিরুদ্ধে অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত এক মারাত্মক উদাসীনতা ও অনিয়মের তথ্য সামনে এনেছে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্রীয় এই সেবা সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে জানিয়েছেন যে, বর্তমানে হাসপাতালটির কোনো বৈধ অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স নেই এবং তারা সরকারের কাছে বাধ্যতামূলক কোনো অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা বা ফায়ার সেফটি প্ল্যানও জমা দেয়নি।ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তদন্তে উঠে এসেছে যে, বিগত দুই হাজার তেইশ সালের পর থেকে এই নামী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স আর নতুন করে নবায়ন করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এর পাশাপাশি, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট এবং পরিকল্পিত নকশা জমা না দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি আইন ও বিধিমালা চরমভাবে লঙ্ঘন করেছে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টাফ অফিসার শাহজাহান সিকদার এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুই thousand তেইশ সালের পর থেকে তাদের ফায়ার লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই অবৈধভাবে তাদের চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। এই দীর্ঘ সময়ে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে হাসপাতালটিকে একাধিকবার আনুষ্ঠানিক ও লিখিত নোটিশ পাঠানো হলেও তাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের সদুত্তর বা ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, চলতি বছরের শুরুর দিকে অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সর্বশেষ এক চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। সেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল যে, আগামী তিন মাসের মধ্যে তাদের ভবনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা জমা দিতে হবে এবং সেই অনুযায়ী হাসপাতালের ভেতরে প্রয়োজনীয় সব অগ্নিনির্বাপণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, সরকারিভাবে বেঁধে দেওয়া সেই নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার পরও হাসপাতাল প্রশাসন তা বাস্তবায়ন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বা বিষয়টিকে পুরোপুরি এড়িয়ে গেছে।ফায়ার সার্ভিসের পাঠানো সেই চূড়ান্ত নোটিশে আইনি বাধ্যবাধকতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়েছিল যে, দেশের প্রচলিত অগ্নিরোধ ও নির্বাপণ আইন, ২০০৩ এবং বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোডের নিয়মনীতি অনুসারে, যেকোনো হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্র বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিচালনা করার আগে অবশ্যই অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া এবং তা বাস্তবে প্রয়োগ করা পুরোপুরি বাধ্যতামূলক। কিন্তু আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এই সব আইনি শর্ত ও জননিরাপত্তার বিষয়গুলোকে কোনো তোয়াক্কাই করেনি।তবে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আনা এই সব গুরুতর অভিযোগের বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আত্মপক্ষ সমর্থনের দাবি করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মানবসম্পদ ও কোম্পানি বিষয়াবলি বিভাগের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল জোর দিয়ে দাবি করেছেন যে, তাদের হাসপাতালের অগ্নিনিরাপত্তাসহ সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্র এবং লাইসেন্স সম্পূর্ণ হালনাগাদ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, অতি সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই সংক্রান্ত নির্দেশনা পাওয়ার পর পরই তাদের সমস্ত বৈধ নথিপত্র ইতিমধ্যেই যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।উল্লেখ্য যে, এর আগে গত বুধবার ভোররাতে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একসঙ্গে ছয়টি নবজাতকের আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর থেকেই হাসপাতালের সামগ্রিক চিকিৎসা সেবা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের জন্ম হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনার সঠিক কারণ উদঘাটন এবং হাসপাতালের কোনো গাফিলতি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পৃথকভাবে দুটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সরকারি এই তদন্ত কমিটিগুলোর পাশাপাশি, ঘটনার পর পরই রাজধানীর রমনা থানায় দায়ের করা একটি নিয়মিত মামলার অংশ হিসেবে পুলিশ প্রশাসনও এই ঘটনার নেপথ্যের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে গভীর তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। লাইসেন্সবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় এমন একটি বড় হাসপাতালে শত শত মানুষের চিকিৎসা নেওয়ার এই ঘটনাটি রাজধানীর চিকিৎসা খাতের সামগ্রিক তদারকি ও অবহেলার চিত্রকেই আবারও নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল