প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬
দলীয় বিরোধিতায় ট্রাম্পের ‘অস্ত্রায়ন’ তহবিল স্থগিত
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রায় একশো আশি কোটি বা এক দশমিক সাত সাত ছয় বিলিয়ন ডলারের একটি অত্যন্ত বিতর্কিত বিশেষ তহবিল শেষ পর্যন্ত স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে হোয়াইট হাউস। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, অতীতে যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ‘অস্ত্রায়নের’ বা প্রশাসনিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, মূলত তাদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার লক্ষ্যেই এই বিশাল তহবিলটি গঠন করা হয়েছিল। তবে ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির প্রভাবশালী আইনপ্রণেতারাই এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলায় এবং এর কঠোর বিরোধিতা করায় শেষ মুহূর্তে হোয়াইট হাউস তাদের অবস্থান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। সোমবার এই সংবেদনশীল পরিস্থিতির সাথে সরাসরি জড়িত একাধিক মার্কিন নীতিনির্ধারক ও বিশ্বস্ত সূত্র এই বিশেষ তহবিলটি সাময়িকভাবে স্থগিত করার খবরটি নিশ্চিত করেছে।চঞ্চল্যকর এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে মার্কিন বিচার বিভাগের একটি অত্যন্ত গোপন আইনি সমঝোতা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক কর সংক্রান্ত বিভিন্ন গোপন নথিপত্র আইনবহির্ভূতভাবে অপব্যবহার ও ফাঁসের অভিযোগে দেশটির কেন্দ্রীয় রাজস্ব বিভাগের বিরুদ্ধে ১০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সেই দীর্ঘস্থায়ী মামলার একটি গোপন নিষ্পত্তি বা সমঝোতা চুক্তি হিসেবেই মূলত এই এক দশমিক সাত সাত ছয় বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিলটি গঠন করা হয়। তবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এই বিতর্কিত তহবিল ঘোষণার পরপরই মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। রিপাবলিকান পার্টির প্রবীণ সিনেটরদের সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গা ছিল এই যে, দুই হাজার একুশ সালের ৬ জানুয়ারি মার্কিন ক্যাপিটল হিল বা সংসদ ভবনে বর্বরোচিত হামলাকারী দাঙ্গাবাজরাও সাধারণ মার্কিন করদাতাদের এই কষ্টার্জিত টাকায় গঠিত তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ পেয়ে যেতে পারে। এর পাশাপাশি এই সমঝোতা চুক্তির অধীনে আরেকটি অদ্ভুত শর্ত ছিল যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার পরিবারের সদস্যদের অতীত কর ফাইল বা আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের তদন্ত বা নিরীক্ষা করা যাবে না। এই বিশেষ শর্তটির কারণে কড়া সমালোচকেরা এটিকে আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তৈরি করা একটি ‘গোপন তহবিল’ হিসেবে আখ্যা দেন। এর মাঝেই গত শুক্রবার দেশের ফেডারেল বিচারকেরা এই বিতর্কিত তহবিলের ওপর একটি সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করলে মার্কিন বিচার বিভাগ আদালতের সেই আদেশ মেনে চলার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়।এই বিশেষ তহবিলকে কেন্দ্র করে মার্কিন ক্যাপিটল হিলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজের রাজনৈতিক দলের ভেতরেই এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ লক্ষ্য করা গেছে। সামনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় নির্বাচন থাকা সত্ত্বেও দলের শীর্ষস্থানীয় ও অভিজ্ঞ সিনেটরদের মতামতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ট্রাম্প বিভিন্ন রাজ্যে তার নিজের পছন্দের বিতর্কিত প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়ায় আগে থেকেই চরম ক্ষুব্ধ ছিলেন রিপাবলিকান দলের অনেক প্রবীণ নেতা। মেমোরিয়াল ডের ছুটি কাটিয়ে দলটির সিনেটররা যখন ওয়াশিংটনে ফিরে আসেন, তখন দেশের বাজেট সংক্রান্ত একটি বড় ধরনের অচলাবস্থার মাঝেই তারা হোয়াইট হাউসকে এই বিতর্কিত তহবিল অনতিবিলম্বে বাতিল করার জন্য একটি চূড়ান্ত সময়সীমা বা আলটিমেটাম বেঁধে দেন। সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রভাবশালী নেতা জন থুন অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় প্রশাসনকে সতর্ক করে দিয়ে জানিয়ে দেন যে, হোয়াইট হাউস নিজে থেকে এই কার্যক্রম বন্ধ না করলে দেশের বাজেট পাসসহ সামনের কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতেই তারা সহযোগিতা করবেন না এবং এগোনোর কোনো পথ থাকবে না। ট্রাম্পের অত্যন্ত অনুগত ও অন্ধ ভক্ত হিসেবে পরিচিত ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ এই বিতর্কিত তহবিল গঠনের পেছনে মূল ভূমিকা পালন করলেও, ক্ষুব্ধ সিনেটরদের তীব্র তোপের মুখে পড়ে এখন তার নিজের স্থায়ী পদ পাওয়ার বিষয়টিই এক মস্ত বড় আইনি ও রাজনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।পুরো এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ‘খুব একটা খুশি বা সন্তুষ্ট নন’ বলে তার ঘনিষ্ঠ ও পারিবারিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং দলের বড় ধরনের ভাঙন রোধ করতে আপাতত এই স্থগিতাদেশ মুখ বুজে মেনে নেওয়া ছাড়া তার সামনে অন্য কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না। অন্য দিকে, বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটরা এই সুযোগে হোয়াইট হাউস এবং ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা ও আক্রমণ শুরু করেছে। সিনেটের সংখ্যালঘু দলের প্রভাবশালী নেতা চাক শুমার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে আমেরিকার কোনো রাষ্ট্রপতি যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এমন কোনো গোপন তহবিল তৈরি করতে না পারেন, সেজন্য তারা চলতি সপ্তাহেই সিনেটে একটি নতুন ও কঠোর আইন পাসের জন্য জোরালো চাপ সৃষ্টি করবেন। ফলশ্রুতিতে, এই বিশাল তহবিলটি আপাতত সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলেও এটিকে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একক ও একচ্ছত্র ক্ষমতার ওপর নিজের দলের আইনপ্রণেতাদের পক্ষ থেকে একটি মস্ত বড় ধাক্কা হিসেবেই দেখছেন বিশ্ব রাজনীতির বিশ্লেষকেরা।তথ্যসূত্র: রয়টার্স।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল