প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬
ভেঙে পড়েছে পুলিশের ম্যানুয়াল সোর্সিং ব্যবস্থা
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা নিউমার্কেটে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে। হত্যাকাণ্ডের ঠিক পর পরই সংগৃহীত ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার চিত্রে দেখা যায়, দুই অপরাধী টিটনকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি বর্ষণের পর একটি মোটরসাইকেলে চড়ে চোখের পলকে পালিয়ে যাচ্ছে। অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের পর এক মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন পর্যন্ত মূল ঘাতকদের গ্রেপ্তার করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি খুনিরা আসলে কারা এবং তাদের আসল পরিচয় কী, সে সম্পর্কে তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখনো সম্পূর্ণ অন্ধকারের মধ্যে হাতড়াচ্ছেন। প্রযুক্তিগত সহায়তায় ধারণকৃত ভিডিওচিত্রে অপরাধীদের অবয়ব বা চেহারা স্পষ্ট না হওয়া এবং সনাতন পদ্ধতির নিজস্ব তথ্যদাতার অভাবের কারণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করার পরও এই রহস্যের কোনো জট খুলতে পারছে না বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।কেবল এই একটি ঘটনাই নয়, বর্তমান সময়ে সারা দেশেই হত্যা, ডাকাতি, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো নানা অপরাধমূলক ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে, যার বেশিরভাগেরই কোনো কূলকিনারা করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের ভিডিওচিত্র মিললেও আসামিদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না, আবার অনেক ঘটনায় অপরাধীকে শনাক্ত করাই এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চরম ব্যর্থতার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে মাঠপর্যায়ে পুলিশের সনাতন তথ্যদাতা বা গোপন সোর্স ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়াকে। সাম্প্রতিক সময়ে বড় কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে প্রথমে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হয়; কিন্তু প্রযুক্তি যখন ব্যর্থ হয়, তখন তড়িঘড়ি করে মাঠপর্যায়ে তথ্যদাতার সন্ধান করা হয়। তবে দীর্ঘদিনের যোগাযোগের অভাব এবং হঠাৎ করে তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় এই পেশাদার তথ্যদাতারা পুলিশকে আর নিরাপদ বা নির্ভরযোগ্য মনে করছেন না।সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্রের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমান সময়ে এই সমস্ত গোপন তথ্যদাতাদের পেছনে ব্যয় করার জন্য যে পরিমাণ অর্থ বা গোয়েন্দা ভাতা বরাদ্দ থাকে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সামান্য ও নগণ্য। এই স্বল্প অর্থ দিয়ে একজন পেশাদার তথ্যদাতাকে দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখা বা বিশ্বস্ত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, যে সামান্য পরিমাণ গোয়েন্দা অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা অনেক সময় মাঠপর্যায়ের মূল তদন্তকারী দলনেতাদের কাছে পৌঁছায় না। ওপরের স্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের হাত ঘুরে নিচের কর্মকর্তাদের কাছে যাওয়ার আগেই সেই বরাদ্দের বড় অংশ গায়েব হয়ে যায়। এর ফলে মামলার মূল তদন্ত ও তদারকি কর্মকর্তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। পুলিশের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র স্বীকার করেছে যে, বর্তমান বাজারে এই গোপন তথ্যদাতাদের আর্থিক চাহিদাও আকাশচুম্বী এবং তারা প্রায় সবাই এটিকে একটি স্থায়ী পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। কিন্তু তাদের সেই চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত অর্থ সরবরাহ করা সম্ভব না হওয়ায় মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা এখন তথ্যদাতাদের এড়িয়ে চলতেই বেশি পছন্দ করছেন।তথ্যদাতার এই অভাব ও সনাতন ব্যবস্থার ধসের কারণে সবচেয়ে বড় ও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে স্পর্শকাতর মামলা এবং বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে। শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসী বা অপরাধ জগতের মূল হোতাদের গতিবিধি ও নিখুঁত অবস্থান পর্যবেক্ষণ করার জন্য যে বিপুল পরিমাণ খরচের প্রয়োজন হয়, তা বহন করা এখন সাধারণ কর্মকর্তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাবে আগে থেকেই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বা অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বর্তমান সময়ে মাঠপর্যায়ে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা না থাকা অনেক অদক্ষ কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পদে বসানোর কারণে এই সংকট আরও তীব্র রূপ ধারণ করেছে। তারা মাঠের তথ্যদাতাদের মনস্তত্ত্ব বোঝেন না এবং তাদের সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবহার করতেও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছেন। এছাড়া অনেক সময় অপরাধ জগতের তথ্যদাতারা নিজেরা বেপরোয়া ও বিতর্কিত নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ায় পুলিশ প্রশাসনকেও সামাজিকভাবে চরম বিব্রত হতে হয়, যার ফলে অনেকেই আর তাদের ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না। বিশেষ করে চব্বিশ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের সামগ্রিক মনোবল ভেঙে পড়ায় এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামো নড়বড়ে হওয়ায় এই তথ্যদাতা ব্যবস্থার ওপর এক মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যা দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রিত রাখতে হলে শুধু প্রযুক্তির ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করলে চলবে না, এর পাশাপাশি সনাতন পদ্ধতির মাঠপর্যায়ের তথ্যদাতা ব্যবস্থাটিকেও সমানভাবে সচল রাখতে হবে। বিগত চব্বিশ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশের যে তথ্যদাতা কাঠামোটি ভেঙে পড়েছিল, তা আজ পর্যন্ত পরিপূর্ণভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়নি। এলাকাভিত্তিক এই গোপন তথ্য ব্যবস্থাটিকে যদি আবার নতুন করে সক্রিয় করা না যায়, তবে কেবল সিসি ক্যামেরা বা প্রযুক্তির সাহায্যে অপরাধ প্রতিরোধ করা যাবে না। প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার জায়গায় এই তথ্যদাতারা সক্রিয় থাকলে অপরাধ ঘটার আগেই তা ঠেকানো এবং অপরাধের পর আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। সাবেক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তারাও মনে করেন, আধুনিক প্রযুক্তিতে রূপান্তরের সময়ে সনাতন তথ্যদাতাদের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ায় এই মস্ত বড় শূন্যতা ও সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশ যারা সফলভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করছে, তারা প্রযুক্তির পাশাপাশি এই গোপন মানবিক তথ্যদাতাদের অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বজায় রাখে। আমাদের দেশেও কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে তা প্রথমে সুনির্দিষ্ট করে সেই অনুযায়ী তথ্যদাতাদের সাথে সুসম্পর্ক ও যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে।অবশ্য পুলিশ সদর দপ্তরের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, অপরাধের সবচেয়ে বড় উৎস হলো বস্তুগত ও চাক্ষুষ প্রমাণ, তা যে কোনো মাধ্যম থেকেই আসুক না কেন। অতীতে যখন প্রযুক্তির এত ছড়াছড়ি ছিল না, তখন কোনো অপরাধ ঘটলে কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তথ্যদাতাদের মাধ্যমে সন্দেহভাজনদের ধরে আনা হতো এবং অনেক সময় মূল অপরাধীকে বের করতে গিয়ে নিরীহ মানুষকেও হয়রানির শিকার হতে হতো। তাছাড়া তথ্যদাতারা অনেক সময় নিজেদের আড়াল করতে গিয়ে পুলিশের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, যা নতুন সামাজিক সমস্যা তৈরি করে। তবে বর্তমান পুলিশ প্রশাসনে যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তার তীব্র সংকট রয়েছে—এমন বাস্তব সত্যটি স্বীকার করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে চাইলেও এখন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো যাচ্ছে না। কারণ বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে তারা বিভিন্ন ভালো পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যদিও তারা সরাসরি কোনো নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ছিলেন না; কিন্তু বর্তমানের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে তাদের পোস্টিং দিলে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে নানা তীব্র সমালোচনা ও বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল