প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০১ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত
স্বাধীন আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার ||
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা ও লাগাতার মূল্যবৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট ত্রিমুখী চাপের মুখে পড়েই সরকারকে বাধ্য হয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তবে তিনি সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাওয়ার লক্ষণ দেখা গেলেই সরকার অনতিবিলম্বে দেশের বাজারেও দাম কমিয়ে ভোক্তাদের বড় ধরনের স্বস্তি দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। আজ সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে অবস্থিত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রতিমন্ত্রী এই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন।সম্প্রতি দেশের বাজারে পরপর দুই দফায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ জনগণের মনে যে তীব্র উদ্বেগ ও নাভিশ্বাস তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, প্রতি মাসেই বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম পুনর্নির্ধারণ করার একটি নিয়মিত আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। তবে দেশের মানুষের কথা বিবেচনা করে মে মাসে তেলের দামে কোনো ধরনের পরিবর্তন বা সমন্বয় করা হয়নি। সরকারের মূল নীতিই হলো, অত্যন্ত জরুরি বা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে না গেলে সাধারণ জনগণের ওপর কোনো ধরনের বাড়তি আর্থিক বোঝা বা চাপ সৃষ্টি করা হবে না। কিন্তু বর্তমান সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র ভূরাজনৈতিক সংকট ও যুদ্ধাবস্থার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার যেভাবে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে, সেই বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সরকারকে বাধ্য হয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই দাম বাড়ানোর কঠিন সিদ্ধান্তটি নিতে হয়েছে।প্রতিমন্ত্রী দেশের সার্বিক জ্বালানি চিত্র তুলে ধরে আরও বলেন, বাংলাদেশে মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ছেষট্টি শতাংশই হলো ডিজেল। দেশের পরিবহন খাত থেকে শুরু করে কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে এই জ্বালানির ভূমিকা অপরিসীম। আর এই অতি প্রয়োজনীয় জ্বালানির পেছনেই সরকারকে প্রতি বছর সবচেয়ে বড় অঙ্কের ভর্তুকি গুনতে হয়। তাই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, গণপরিবহন ভাড়া এবং কৃষকের সেচ খরচের ওপর যাতে নতুন কোনো বড় ধাক্কা না আসে, সেই মানবিক দিক বিবেচনা করে এবার ডিজেলের দাম সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম আরও বাড়ার কোনো আশঙ্কা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বেশ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকার অত্যন্ত আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান উত্তেজনা ও সংকট খুব দ্রুত নিরসন হবে। আর আন্তর্জাতিক বাজারে দামের পারদ একটু নামলেই সরকার কালক্ষেপণ না করে সেই সুফল দেশের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এটি একটি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকার এবং জনগণের প্রতি এই প্রশাসনের গভীর দায়বদ্ধতা রয়েছে, তাই মানুষের কষ্ট লাঘবে যেকোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর করা হবে।একই সময়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির গুঞ্জন ও সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রতিমন্ত্রী পরিষ্কার জানান, বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের মূল কাজটি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে করে থাকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। নতুন করে দাম বাড়ানোর কোনো প্রস্তাব যদি এসেও থাকে, তবে তা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে গণশুনানির মাধ্যমে সব পক্ষের মতামত নিয়ে তবেই চূড়ান্ত করা হয়। বর্তমান সরকার এই কমিশনের স্বাধীন ক্ষমতা ও আইনি শ্রেষ্ঠত্ব পুরোপুরি পুনর্বহাল করেছে, ফলে এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত বা আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। বিশ্ববাজারে দাম কমার সময়েও দেশের বাজারে দাম বাড়ানোর যে সমালোচনা সুশীল সমাজ ও ভোক্তাদের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে, তার জবাবে প্রতিমন্ত্রী যুক্তি দিয়ে বলেন, অতীতে বৈশ্বিক বাজারে যখন হু হু করে দাম বাড়ছিল, তখন সরকার তাৎক্ষণিকভাবে সেই পুরো চাপ জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়নি। বছরের পর বছর বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখা হয়েছে, যার ফলে সরকারের ওপর এখন এক বিশাল আর্থিক ঘাটতি ও চাপ তৈরি হয়েছে।তিনি আরও যোগ করেন যে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষি খাতে সরকারি প্রণোদনা ও ব্যয় নির্বিঘ্নে অব্যাহত রাখতে হলে এই ভর্তুকির বিষয়টিও দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে সবাইকে বিবেচনা করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এই ভর্তুকির লাগাম টেনে ধরতে সরকার এখন নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদনের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। বেসরকারি খাতের কাছ থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার সনাতন পদ্ধতি থেকে সরে এসে ধীরে ধীরে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের মতো টেকসই জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো হবে। এর ফলে সামগ্রিক উৎপাদন খরচ যেমন কমে আসবে, তেমনি ভর্তুকির চাপ থেকেও রাষ্ট্র মুক্ত হতে পারবে, যা পরিশেষে গ্রাহকদের অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে দেশের সমুদ্রসীমার গভীর ও অগভীর ব্লকে জ্বালানি অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা, ইস্টার্ন রিফাইনারির বহু প্রতীক্ষিত দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণসহ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, দেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাসের তীব্র সংকট নিরসনে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির অবকাঠামো আরও সম্প্রসারণ এবং নতুন ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সরকার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
প্রধান সম্পাদক : কাদির নোমান, সম্পাদক : আল জাবিরী, প্রকাশক : আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল